বাংলাদেশে সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ‘মব জাস্টিস’ বা দলবদ্ধভাবে আইন হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতা নিয়ে জনমনে গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে সোমবার (৯ মার্চ) কক্সবাজার জেলা আইন-শৃঙ্খলা কমিটির সভায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ অত্যন্ত কঠোর ভাষায় হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন। তিনি স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, দেশে কোনো ধরনের ‘মব কালচার’ সহ্য করা হবে না। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রর এই বক্তব্যের আড়ালে জুলাই বিপ্লবের কারিগর বা আন্দোলনের প্রেক্ষাপটকে গুলিয়ে ফেলার অবকাশ আছে কি না—তা নিয়ে শুরু হয়েছে নতুন বিতর্ক।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বলেছেন, “সব ঘটনাকে ‘মব’ হিসেবে চিহ্নিত করা ঠিক নয়।” এটি একটি সূক্ষ্ম আইনি ব্যাখ্যা হতে পারে। তার মতে, অনেক বিচ্ছিন্ন অপরাধকে জনরোষের তকমা দিয়ে হালকা করার সুযোগ নেই। যেমন—কাউকে আটকে রেখে নির্যাতন করা একটি সুনির্দিষ্ট ফৌজদারি অপরাধ। এটিকে ‘মব জাস্টিস’ বলে চালিয়ে না দিয়ে দণ্ডবিধির আওতাভুক্ত অপরাধ হিসেবে বিচার করতে হবে।
এই ব্যাখ্যাটি টেকনিক্যালি গুরুত্বপূর্ণ।
বিশেষ করে যারা জুলাই বিপ্লবে রাজপথে নেতৃত্ব দিয়েছেন, তাদের সুরক্ষা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে এই সংজ্ঞায়ন ঢাল হিসেবে কাজ করতে পারে। বিপ্লব পরবর্তী সময়ে অনেক ক্ষেত্রে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কারণে সাধারণ জনরোষের অজুহাতে ব্যক্তিগত শত্রুতা চরিতার্থ করার চেষ্টা দেখা গেছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এই ‘ডিফারেনশিয়েশন’ বা পৃথকীকরণ নীতি প্রকৃত অপরাধীকে শনাক্ত করতে সাহায্য করতে পারে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। যাতে বিপ্লবের সঙ্গে যুক্ত কোনো মাস্টারমাইন্ড বা সংগঠককে অহেতুক আইনি গ্যাঁড়াকলে পড়তে না হয়।
আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়নের পাশাপাশি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করার ঘোষণা দিয়েছেন। আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে সৈকতের সকল অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদের আল্টিমেটাম দিয়েছেন। শহরজুড়ে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন করে নজরদারি বৃদ্ধির যে পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে, তাকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন পর্যটন সংশ্লিষ্টরা। তবে উচ্ছেদ প্রক্রিয়ায় যাতে সাধারণ ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্ত না হন, সেদিকেও নজর রাখার দাবি উঠেছে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এই কঠোর অবস্থানের পর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও জনপরিসরে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে।
অনেক বিশ্লেষক মনে করছেন, ‘মব কালচার’ দমনের নামে যেন জুলাই বিপ্লবের উদ্যমী তরুণদের কন্ঠরোধ করা না হয়। সাধারণ মানুষের মতে, স্বৈরশাসনের পতনের পর যে জনজাগরণ তৈরি হয়েছে, তাকে দমনের হাতিয়ার হিসেবে আইনকে ব্যবহার করা হলে তা হিতে বিপরীত হতে পারে।
ফেসবুকে রেজওয়ান নামের একজন সচেতন নাগরিক মন্তব্য করেছেন,
"বিপ্লব মানেই বিশৃঙ্খলা নয়। আইন নিজের গতিতে চলবে—এটাই প্রত্যাশা। কিন্তু যদি প্রশাসন নিষ্ক্রিয় থাকে, তবেই মানুষ মব তৈরি করে। আগে প্রশাসনের ওপর জনগণের আস্থা ফেরাতে হবে।"
তবে সাধারণ মানুষের একটি বড় অংশের ভয় হলো, নির্দিষ্ট কোনো রাজনৈতিক গোষ্ঠী বা প্রভাবশালী মহল ব্যক্তিগত হিসাব মেটাতে এই 'মব' পরিস্থিতির অপব্যবহার করতে পারে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী, এগুলোকে যদি সুনির্দিষ্ট অপরাধ হিসেবে বিচার করা হয়, তবে নিরপরাধ মানুষের হেনস্তা হওয়ার ঝুঁকি কমবে।
সাইফুর রহমান নামের একজন ব্যক্তি মন্তব্য করেন,
জুলাই বিপ্লবের মূল লক্ষ্য ছিল একটি বৈষম্যহীন ও ন্যায়বিচারভিত্তিক সমাজ গঠন। সেই বিপ্লবের কারিগর বা ‘মাস্টারমাইন্ড’দের জন্য বর্তমান পরিস্থিতি একটি এসিড টেস্ট। মব কালচার দমনের প্রশাসনিক উদ্যোগকে স্বাগত জানানো হলেও, এর প্রয়োগ যেন কোনোভাবেই বিপ্লবের চেতনাকে ম্লান না করে।

0 Comments