জ্বালানি সংকটে দেশে হাহাকার: সরকারের তামাশা বনাম নির্মম বাস্তবতা

Khomota
0
bnp, oil, war
বাংলাদেশ আজ এক অদ্ভুত ও ভয়াবহ ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে। দেশের সাধারণ মানুষ যখন দু'লিটার তেলের জন্য পাম্পে পাম্পে দিশেহারা হয়ে ঘুরেছে, নিজের কর্মঘণ্টা জলাঞ্জলি দিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা রোদে পুড়ে বৃষ্টিতে ভিজে যখন দিন শেষে শূন্য হাতে ঘরে ফিরছে, তখন সরকারের মন্ত্রী আর আমলাদের মুখে শোনা যাচ্ছে রূপকথার গল্প। অথচ জাতীয় সংসদে দাঁড়িয়ে সরকারের মন্ত্রীরা দাবি করছেন—"দেশে কোনো জ্বালানি সংকট নেই।" আর বাস্তবে পাম্পে তেল না পেয়ে গাড়ি চাপা দিয়ে খুনের মতো নৃশংস ঘটনা ঘটছে, আমলাদের বক্তব্য আর দেশের বাস্তবতা পরস্পরবিরোধী অবস্থা কেবল দুঃখজনক নয়, বরং দেশের সাধারণ মানুষের সাথে এটা এক চরম উপহাস।

সম্প্রতি সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম গণমাধ্যমের সামনে এক অদ্ভুত বক্তব্য দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, "তেল না পেলে আমাকে কল দিবেন।" তেলের মতো একটি জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ পণ্যের সরবরাহ নিশ্চিত করা যেখানে একটি মন্ত্রণালয়ের পদ্ধতিগত দায়িত্ব, সেখানে ব্যক্তিগতভাবে ফোন করার এই আশ্বাস সাধারণ মানুষের কাছে সস্তা নাটক ছাড়া আর কিছুই মনে হয়নি।

প্রশ্ন উঠেছে, ঢাকা থেকে গ্রাম-গঞ্জ পর্যন্ত ছড়িয়ে থাকা কোটি কোটি সাধারণ মানুষের মধ্যে কতজন মানুষ মন্ত্রীর ব্যক্তিগত নম্বর জানেন? যেকারণে তিনি ধরে নিয়েছেন তেলের জন্য তার কাছে কোন সাধারণ জনগণ ফোন করেনি মানে হচ্ছে দেশে কোন তেলের ঘাটতি নাই। তাছাড়া ফোন কলে তিনি কয়জনের তেলের সমস্যা সমাধান করবেন? যখন পাম্পের মালিকরা বলছেন 'তেল নাই', তখন মন্ত্রীকে ফোন দিয়ে কি রাতারাতি তেলের ট্যাঙ্কার হাজির হবে? এই ধরনের লাগামহীন বক্তব্য সংকটে থাকা মানুষের কাটা ঘায়ে নুনের ছিটা দেওয়ার নামান্তর।

তেলের সংকটে মানুষ আজ দিশেহারা। ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থেকে দিন শেষে খালি হাতে বাসায় ফিরতে হচ্ছে। কখনো কখনো চার-পাঁচটা পাম্প ঘুরে নামমাত্র তেল পাওয়া যাচ্ছে। এমন অবস্থায় মানুষের মাথা ঠিক না থাকাটাই স্বাভাবিক। এরই মধ্যে খবর এসেছে, তেল না পেয়ে রাগে-ক্ষোভে পাম্পের কর্মীর ওপর গাড়ি চালিয়ে দিয়ে হত্যা করার মতো বীভৎস ঘটনা ঘটছে। এটি কেবল একটি দুর্ঘটনা নয়, এটি একটি রাষ্ট্রের অব্যবস্থাপনার চরম বহিঃপ্রকাশ।

তেলের অভাবে আজ কৃষি কাজ বন্ধ, পরিবহন বন্ধ, নিত্যপণ্যের দাম আকাশচুম্বী। এই দমবন্ধ করা পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষের ক্ষোভ যখন সহিংসতায় রূপ নেয়, তখন তার দায়ভার সরাসরি সরকারের ওপর বর্তায়। অথচ সরকার এই সামাজিক অস্থিরতা নিরসনে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ না নিয়ে কেবল ফাঁকা বুলি আওড়াচ্ছে।

সোমবার বিকেলে জাতীয় সংসদ অধিবেশনে ঢাকা-১৪ আসনের সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার মীর আহমেদ বিন কাসেম (আরমান) যখন মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতি এবং দেশে জ্বালানি সংকটে মানুষের মৃত্যুর মতো ঘটনা তুলে ধরলেন, তখন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ অত্যন্ত তাচ্ছিল্যের সাথে দাবি করলেন যে—"দেশে জ্বালানির কোনো সংকট বর্তমানে নেই।"

মন্ত্রীর এই বক্তব্যের সাথে সাথেই সংসদ উত্তাল হয়ে ওঠে। বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্যরা দাঁড়িয়ে তীব্র প্রতিবাদ জানান। কারণ, তারা জানেন বাইরের বাস্তব পরিস্থিতি কী। যখন সারা দেশের মানুষ তেলের জন্য হাহাকার করছে, তখন সংসদে বসে এমন মিথ্যে দাবি করা জনগণের সাথে প্রতারণা ছাড়া আর কিছু হতে পারে না বলে জনগণ মনে করছেন। প্রতিমন্ত্রীর এই মিথ্যে বক্তব্য প্রমাণ করে যে, সরকারের উচ্চপদস্থরা আজ সাধারণ মানুষের জীবন থেকে কতটা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছেন।

সরকার দলীয় মন্ত্রী ও আমলারা মাঝেমধ্যেই অদ্ভুত সব তত্ত্ব নিয়ে হাজির হচ্ছেন। কখনো তারা বলেছেন পর্যাপ্ত তেল আছে, আবার কখনো বলছেন তেল সীমান্ত দিয়ে পাচার হয়ে যাচ্ছে। যদি পর্যাপ্ত তেল থেকেই থাকে, তবে পাম্পগুলো কেন বন্ধ? আর যদি তেল পাচার হয়েই থাকে, তবে সেই সীমান্ত পাহারার দায়িত্ব কার? সীমান্ত দিয়ে তেল পাচার হওয়া মানে কি সরকারের গোয়েন্দা সংস্থা এবং সীমান্ত রক্ষী বাহিনীর চরম ব্যর্থতা নয় কি? নিজেদের ব্যর্থতা ঢাকতে পাচার হওয়ার গল্প অত্যন্ত হাস্যকর এবং দায়িত্বজ্ঞানহীনতা। তেল নিয়ে সরকারের নীতিনির্ধারক বা আমলাদের কোনো দূরদর্শী পরিকল্পনা পরিলক্ষিত হচ্ছে না। তারা কেবল দিন আনি দিন খাই নীতিতে দেশ চালাচ্ছেন বলে জনগণ মনে করছেন।

কিছুদিন আগে বিএনপি সরকার রাশিয়া থেকে তেল কিনতে আমেরিকার কাছে অনুমতি চেয়েছে। একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্রের জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য আমেরিকার কাছে 'অনুমতি' চেয়েছে—এমন খবর জনমনে গভীর সংশয় তৈরি করেছে। তবে কি বাংলাদেশ তার পররাষ্ট্রনীতি এবং সার্বভৌমত্ব পশ্চিমের কাছে বর্গা দিয়েছে? রাশিয়ার তেলের ওপর নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও ভারত বা চীন নিজেদের জনগণের স্বার্থে সস্তায় তেল কিনতে পারে, তবে বাংলাদেশ কেন পারবে না? একটি সার্বভৌম রাষ্ট্রের জন্য কেন ওয়াশিংটনের সবুজ সংকেতের অপেক্ষা করতে হবে? এই 'বর্গা দেওয়া' মানসিকতা প্রমাণ করে যে আমাদের সার্বভৌমত্ব আজ পশ্চিমে বন্দী।
Tags

Post a Comment

0 Comments

Post a Comment (0)

#buttons=(Ok, Go it!) #days=(20)

Our website uses cookies to enhance your experience. Check Now
Ok, Go it!