![]() |
| দায় চাপানো রাজনীতি কবে বন্ধ হবে? |
আইএমএফের ঋণের কিস্তি নিয়ে জটিলতা: দায়ী অন্তর্বর্তীকালীন সরকার
সম্প্রতি আইএমএফের ঋণের পরবর্তী কিস্তি আটকে যাওয়া নিয়ে দেশের অর্থনীতিতে উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে। সরকার পক্ষ থেকে একে বিগত আমলের সরকারের সমন্বয়হীনতার কথা বলা হলেও হলেও আইএমএফের সাম্প্রতিক পর্যবেক্ষণ ভিন্ন কথা বলছে। আইএমএফ তাদের প্রতিবেদনে স্পষ্ট করেছে যে, বিএনপি সরকারের কিছু হঠকারী সিদ্ধান্ত, বিশেষ করে 'ব্যাংক রেজুলেশন আইন' পাসের প্রক্রিয়া এবং প্রয়োগে অস্পষ্টতা বিদেশি বিনিয়োগকারী ও ঋণদাতাদের মধ্যে আস্থার সংকট তৈরি করেছে।ব্যাংক খাতের সংস্কারের নামে তড়িঘড়ি করে নেওয়া পদক্ষেপগুলো হিতে বিপরীত হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রিজার্ভ ব্যবস্থাপনা এবং মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতার দায় যখন পূর্ববর্তী সরকারের ওপর চাপানো হয়, তখন সরকারের নিজস্ব নীতিগত দুর্বলতাগুলো আড়ালে পড়ে যায়। ঋণের শর্ত পূরণে এই সরকারের প্রশাসনিক ধীরগতি আজ অর্থনৈতিক অচলাবস্থার অন্যতম প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
হামের টিকা সংকট: অবহেলা না কি দুর্নীতি?
দেশের স্বাস্থ্যখাতে বর্তমানে এক ভয়াবহ পরিস্থিতি বিরাজ করছে। বিশেষ করে 'হাম' (Measles) মহামারী আকার ধারণ করেছে, যা জনমনে চরম আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে। অথচ অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হলো, দেশের হাসপাতাল ও টিকাদান কেন্দ্রগুলোতে হামের টিকার তীব্র সংকট চলছে। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে বাচ্চাদের মৃত্যু সংবাদ প্রতিদিনই খবরের হেডলাইন হচ্ছে। এখানেও সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, পূর্ববর্তী সরকারের রেখে যাওয়া শূন্য তহবিল বা দূর্নীতি ও অব্যবস্থাপনায় এমন অবস্থা সৃষ্টি হয়েছে।তবে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, টিকার জন্য বরাদ্দকৃত অর্থের সঠিক ব্যবহার নিয়ে ধোঁয়াশা রয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, হামের টিকার জন্য সংরক্ষিত তহবিলের অর্থ অপচয় বা করা হয়েছে। জীবনরক্ষাকারী ওষুধের এই সংকটের সময় দায় চাপানোর সংস্কৃতি কেবল সাধারণ মানুষের মৃত্যুকে ত্বরান্বিত করছে। মহামারী নিয়ন্ত্রণে যেখানে যুদ্ধকালীন তৎপরতা প্রয়োজন, সেখানে "টাকা নেই" বা "আগের সরকার সব শেষ করে গেছে" এমন অজুহাত জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্য নয়।
জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সংকট কেন?
দেশের শিল্পোৎপাদন ও জনজীবন আজ জ্বালানি সংকটে বিপর্যস্ত। লোডশেডিং এবং গ্যাসের তীব্র সংকট অর্থনীতিকে পঙ্গু করে দিচ্ছে। জ্বালানি খাত বন্দী ভারতে। এখানে বৈশ্বিক সমস্যার দোহাই দেওয়া যথেষ্ট নয়। অন্য সকল রাষ্ট্র যখন জ্বালানির জন্য ভিন্ন উৎসের সন্ধান করছিলো তখন বিএনপি সরকার রাশিয়া থেকে তেল কেনার পারমিশন আমেরিকা থেকে চেয়েছিল। অথচ আমেরিকা নিজেই রাশিয়া থেকে তেল কিনছে।বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, জ্বালানির ভিন্ন উৎসের সন্ধান না করা বর্তমান সরকারের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা। যা প্রশাসনিক অদক্ষতার। এই প্রশাসনিক ব্যর্থতাকে আড়াল করতে অন্যের ওপর দোষ দিয়ে নিজের গা বাঁচানোর চেষ্টা মূলত দেশের অর্থনীতিকেই দীর্ঘমেয়াদী ঝুঁকির মুখে ফেলছে।
বিশ্লেষকদের মতে, দায় চাপানোর রাজনীতির তিনটি প্রধান কুফল রয়েছে:
- জবাবদিহিতার অভাব: যখনই কোনো ব্যর্থতা আসে, দায় অন্যের ওপর চাপিয়ে দিলে বর্তমান প্রশাসন নিজেদের জবাবদিহিতা থেকে মুক্ত মনে করে।
- সংকটের দীর্ঘসূত্রতা: সমস্যার মূল কারণ অনুসন্ধান না করে দোষারোপের পেছনে সময় ব্যয় করায় প্রকৃত সমাধান বিলম্বিত হয়।
- আস্থার সংকট: বিদেশি সংস্থা ও উন্নয়ন সহযোগীরা যখন দেখে সরকার সমস্যার সমাধান না করে রাজনৈতিক বয়ান তৈরিতে ব্যস্ত, তখন তারা সহযোগিতার হাত গুটিয়ে নেয়।
সংকট নিয়ে জনগণ ও বিশেষজ্ঞদের মতামত
একটি রাষ্ট্রের চালকের আসনে বসে পেছনের আয়নায় তাকিয়ে গাড়ি চালানো সম্ভব নয়। বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ আজ দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে দিশেহারা, জনগণ স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত এবং অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তায় আতঙ্কিত। এই মুহূর্তে প্রয়োজন একটি সুসংগত অর্থনৈতিক পরিকল্পনা। হোক আইএমএফের শর্ত পূরণ অথবা হামের টিকা নিশ্চিতকরণ—সবকিছুই নির্ভর করছে বর্তমান সরকারের রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও প্রশাসনিক দক্ষতার ওপর।পূর্ববর্তী সরকারের ত্রুটি-বিচ্যুতি ইতিহাসে স্থান পাবে, কিন্তু বর্তমানের দুর্ভোগ নিরসনের দায়ভার সম্পূর্ণভাবে বর্তমান প্রশাসনের। আত্মসাৎ বা অব্যবস্থাপনার অভিযোগ যদি ওঠে, তবে তা তদন্ত করে বিচার করা সরকারের কাজ, কিন্তু সেই অজুহাতে সেবা বন্ধ রাখা কোনোভাবেই যুক্তিযুক্ত নয়।

