মওলানা ভাসানীকে নিয়ে মিথ্যা দাবী করলেন তারেক রহমান

Khomota
0
মওলানা ভাসানী and তারেক রহমান
মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানীর মাজার জিয়ারত শেষে ভাষণ দিচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান
টাঙ্গাইলের সন্তোষে মজলুম জননেতা মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানীর মাজার জিয়ারত শেষে আয়োজিত এক জনসভায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের দেওয়া একটি বক্তব্যকে কেন্দ্র করে দেশজুড়ে তীব্র বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তাঁর ভাষণে দাবি করেছেন, ১৯৭৯ সালের নির্বাচনের সময় মওলানা ভাসানী স্বয়ং তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের হাতে ‘ধানের শীষ’ প্রতীক তুলে দিয়েছিলেন।

একজন মৃত ব্যক্তি কীভাবে প্রতীক তুলে দিলেন?

অথচ ইতিহাস বলছে, মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী ১৯৭৬ সালেই ইন্তেকাল করেছেন। একজন মৃত ব্যক্তি তাঁর মৃত্যুর প্রায় আড়াই বছর পর কীভাবে সশরীরে উপস্থিত হয়ে কাউকে নির্বাচনী প্রতীক তুলে দিতে পারেন, এমন অলৌকিক ও ভিত্তিহীন দাবি এখন 'টক অফ দ্য কান্ট্রি' হয়ে দাঁড়িয়েছে। রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পদে আসীন একজনের মুখ থেকে এমন তথ্যগত বিভ্রাটকে সচেতন মহল ‘ইতিহাসের নির্লজ্জ বিকৃতি’ হিসেবে আখ্যা দিচ্ছেন।

জনসভায় নারী কর্মীদের হট্টগোল, ঝগড়া থামালেন তারেক রহমান

মঙ্গলবার বিকেলে পহেলা বৈশাখ উপলক্ষে আয়োজিত এই জনসভার শুরু থেকেই পরিবেশ ছিল বেশ বিশৃঙ্খল। মঞ্চে দাঁড়িয়ে প্রধানমন্ত্রী যখন মওলানা ভাসানীর স্মৃতিচারণ করছিলেন, তখন সামনের সারিতে বসা নারী কর্মীদের মধ্যে ব্যাপক হট্টগোল ও ঝগড়া শুরু হয়। পরিস্থিতি সামাল দিতে প্রধানমন্ত্রীকে বারবার বক্তব্য থামিয়ে বিরক্তি প্রকাশ করতে দেখা যায়।

পরবর্তীতে তিনি অনেকটা অনুনয়ের সুরে বলেন, "এ বোনেরা আপনাদের একটু চুপ করে বসতে হবে, এত ঝগড়া করলে হবে না তো; শান্ত হয়ে বসতে হবে, একটু কষ্ট করে বসেন।" জনসভার বিশৃঙ্খল পরিবেশ এবং প্রধানমন্ত্রীর তথ্যগত অসংলগ্নতা—সব মিলিয়ে অনুষ্ঠানটি একটি অপেশাদার আয়োজনে পরিণত হয়।

মাওলানা ভাসানীকে নিয়ে কাল্পনিক দাবী করলেন তারেক রহমান

​প্রধানমন্ত্রী তাঁর বক্তব্যে দাবি করেন, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান যখন দায়িত্ব নিলেন, তখন মওলানা ভাসানী তাঁর কাজের মধ্যে নিজের আদর্শের প্রতিফলন দেখতে পান। প্রধানমন্ত্রীর ভাষায়, "সেজন্যই যখন ১৯৭৯ সালে নির্বাচনের সময় আসলো, সেই সময় মাওলানা ভাসানী শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে বললেন, তোমার হাতে আমি ধানের শীষ তুলে দিলাম।"

বিশ্ব সংবাদমাধ্যম গুলোর আর্কাইভ যা বলছে

কিন্তু ঐতিহাসিক নথিপত্র এবং তৎকালীন বিশ্ব সংবাদমাধ্যমের আর্কাইভ ঘেঁটে দেখা যায়, মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী ১৯৭৬ সালের ১৭ নভেম্বর ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। ১৯৭৯ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারির সংসদ নির্বাচনের সময় তিনি জীবিতই ছিলেন না। মৃত মানুষকে নির্বাচনের মাঠে উপস্থিত করার এই অপচেষ্টা কেবল রাজনৈতিক দেউলিয়াত্বই নয়, বরং একজন মহান নেতার স্মৃতির প্রতি চরম অবমাননা।

ধানের শীষ মার্কার আসল মালিক কে? ধানের শীষ যেভাবে পেলো বিএনপি

‘ধানের শীষ’ প্রতীকের প্রকৃত ইতিহাস বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এটি মূলত মওলানা ভাসানীর দল ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ)-এর প্রতীক ছিল। ১৯৭০ সালের নির্বাচনেও ন্যাপ এই প্রতীক ব্যবহারের প্রস্তুতি নিয়েছিল। পরবর্তীতে জিয়াউর রহমান বিএনপি গঠন করলে মওলানা ভাসানীর অনেক অনুসারী নেতা বিএনপিতে যোগ দেন এবং সেই সূত্র ধরে প্রতীকটি বিএনপির রাজনৈতিক সম্পদে পরিণত হয়।

কিন্তু এই রাজনৈতিক বিবর্তনকে সশরীরে প্রতীক হস্তান্তরের একটি ‘কাল্পনিক গল্পে’ রূপান্তর করা হয়েছে, যার কোনো বাস্তব ভিত্তি নেই। ইতিহাসবিদরা মনে করেন, তরুণ প্রজন্মের কাছে নিজ দলের গ্রহণযোগ্যতা বাড়াতে গিয়ে ইতিহাসের এমন স্পর্শকাতর বিষয়ে ভুল তথ্য পরিবেশন করা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।

ইতিহাস বিকৃতি কি কোন সুস্থ রাজনীতি হতে পারে?

বিশ্লেষক ও জনসভায় উপস্থিত জনতার একাংশ এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ব্যবহারকারীরা প্রধানমন্ত্রীর এই বক্তব্যকে হাস্যকর বলে অভিহিত করেছেন। অনেকের মতে, টাঙ্গাইলের মাটিতে দাঁড়িয়ে সেই মাটিরই শ্রেষ্ঠ সন্তান মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী সম্পর্কে এমন ভুল তথ্য দেওয়া স্থানীয় আবেগকেও আঘাত করেছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, উন্নয়ন বা রাজনীতির কথা বলতে গিয়ে মৃত ব্যক্তিকে অলৌকিকভাবে বাঁচিয়ে তোলা কোনো সুস্থ ধারার রাজনীতি হতে পারে না। এই ঘটনার পর সুশীল সমাজ থেকে জোরালো দাবি উঠেছে যে, সরকারি তথ্য বা রাষ্ট্রীয় ভাষণ প্রদানের আগে যেন ন্যূনতম ঐতিহাসিক সত্যতা যাচাই করা হয়। ইতিহাস বিকৃতির এই সংস্কৃতি কেবল সত্যকে আড়াল করে না, বরং দেশের গৌরবোময় অতীতকেও কলঙ্কিত করে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে আইন ও ইতিহাস নিয়ে ওপেন চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিলেন ব্যারিস্টার ফুয়াদ
আরও পড়ুন →

Post a Comment

0 Comments

Post a Comment (0)

#buttons=(Ok, Go it!) #days=(20)

Our website uses cookies to enhance your experience. Check Now
Ok, Go it!