জুলাই জাতীয় সনদ ও গণভোট অধ্যাদেশ: আইনি সংকটে রাষ্ট্র সংস্কারের রূপরেখা
মঙ্গলবার (৩ মার্চ, ২০২৬) বেলা ১১টার দিকে বিচারপতি রাজিক আল জলিল এবং বিচারপতি মো. আনোয়ারুল ইসলাম শাহীনের সমন্বয়ে গঠিত একটি দ্বৈত হাইকোর্ট বেঞ্চ এই আদেশ দেন। আদালতের এই রুল জারির ফলে সংস্কার প্রক্রিয়ার আইনি ভিত্তি নিয়ে রাজনৈতিক ও আইনি অঙ্গনে নতুন করে আলোচনার ঝড় উঠেছে।
আদালতের আদেশ ও বিবাদীগণ
আদালত এই বিষয়ে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোকে আগামী চার সপ্তাহের মধ্যে কারণ দর্শানোর নির্দেশ দিয়েছেন। রিট আবেদনে উল্লিখিত অভিযোগগুলোর ভিত্তিতে কেন এই অধ্যাদেশ ও পরিষদকে অবৈধ ঘোষণা করা হবে না, তার জবাব দিতে হবে। মামলায় বিবাদী করা হয়েছে:- মন্ত্রিপরিষদ সচিব
- আইন সচিব
- জাতীয় ঐকমত্য কমিশন
- প্রধান নির্বাচন কমিশনারসহ সরকারের সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের।
রিটের প্রেক্ষাপট ও আবেদনকারীদের যুক্তি
গত সোমবার সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী চৌধুরী রেদোয়ান-ই খোদা রনি এবং অ্যাডভোকেট গাজী মো. মাহবুব আলম পৃথক দুটি রিট আবেদন করেন। তাদের আবেদনের মূল নির্যাস ছিল—বিদ্যমান সংবিধানের কোনো সুনির্দিষ্ট কাঠামোর বাইরে গিয়ে 'জুলাই জাতীয় সনদ' নামক কোনো দলিল রাষ্ট্রীয়ভাবে চাপিয়ে দেওয়া যায় কি না।
আবেদনকারীদের দাবি, সংবিধান সংস্কারের জন্য গঠিত পরিষদের সদস্যদের শপথ নেওয়ার কোনো সাংবিধানিক ভিত্তি নেই। কারণ, সংবিধান অনুযায়ী শপথের একটি নির্দিষ্ট ফরম্যাট এবং কর্তৃপক্ষ থাকে। সংস্কার পরিষদের কার্যক্রমকে তারা 'অসাংবিধানিক' বলে অভিহিত করেছেন। এর আগে গত ১৮ ফেব্রুয়ারি অ্যাডভোকেট ইউনুছ আলী আকন্দ জনস্বার্থে আরও একটি রিট দায়ের করেছিলেন, যেখানে জুলাই সনদকে সংবিধানের সঙ্গে সরাসরি সাংঘর্ষিক দাবি করে এর কার্যকারিতা স্থগিতের আবেদন জানানো হয়েছিল।
শুনানিতে আইনজীবীদের বাগযুদ্ধ
মঙ্গলবার আদালতে উভয় পক্ষের আইনজীবীদের মধ্যে দীর্ঘ যুক্তিতর্ক ও বিতর্ক হয়। রিটকারীদের পক্ষে: জ্যেষ্ঠ আইনজীবী আহসানুল করিম ও সৈয়দ মামুন মাহবুব শুনানিতে বলেন, "রাষ্ট্র সংস্কারের নামে সংবিধানের মৌলিক কাঠামোকে পাশ কাটিয়ে কোনো অধ্যাদেশ জারি করা হলে তা বিচার বিভাগীয় পর্যালোচনার ঊর্ধ্বে নয়। জুলাই জাতীয় সনদ একটি রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা হতে পারে, কিন্তু একে আইনি রূপ দিতে গেলে বিদ্যমান আইনি কাঠামো অনুসরণ করতে হবে।"
বিপক্ষে (সরকার ও সংস্কার পরিষদের সমর্থনে):
রিটের তীব্র বিরোধিতা করেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মোহাম্মদ হোসেন লিপু, ব্যারিস্টার ইমরান আবদুল্লাহ সিদ্দিকী এবং অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ শিশির মনির। তাদের যুক্তি ছিল, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান একটি 'Extra-constitutional' পরিস্থিতির জন্ম দিয়েছে। যেখানে জনগণের সর্বোচ্চ আকাঙ্ক্ষাই আইনের প্রধান উৎস। তারা মনে করেন, সংস্কার পরিষদের শপথ ও জুলাই সনদকে সাধারণ আইনি পাল্লায় মাপা ঠিক হবে না, কারণ এটি একটি বিপ্লবী সরকার ও জনগণের ম্যান্ডেটের অংশ।
জুলাই জাতীয় সনদ ও গণভোট অধ্যাদেশের গুরুত্ব
এটি মূলত গত বছরের অভ্যুত্থানের শহীদ ও আহতদের স্বপ্ন এবং রাষ্ট্র পুনর্গঠনের একটি সামাজিক চুক্তির প্রতিফলন। এতে ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থার বিলোপ এবং একটি ইনক্লুসিভ বা অন্তর্ভুক্তিমূলক গণতন্ত্রের কথা বলা হয়েছে।গণভোট অধ্যাদেশ: সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে গণভোটের বিধান বাদ দেওয়া হয়েছিল। বর্তমান সরকার জনগণের সরাসরি মতামত গ্রহণের লক্ষ্যে গণভোটের বিধানটি অধ্যাদেশের মাধ্যমে পুনরুজ্জীবিত করার চেষ্টা করছে। সমালোচকদের মতে, সংসদের অনুপস্থিতিতে অধ্যাদেশ দিয়ে সংবিধানের মৌলিক পরিবর্তনের চেষ্টা করা ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।
আইনি ও সাংবিধানিক জটিলতা যেখানে
বাংলাদেশের সংবিধানের ১৪২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, সংবিধান সংশোধনের ক্ষমতা কেবল সংসদের। বর্তমানে কোনো সংসদ নেই। ফলে 'ডকট্রিন অব নেসেসিটি' বা 'প্রয়োজনীয়তার নীতি' প্রয়োগ করে সরকার এই পরিবর্তনগুলো করতে চাইছে। তবে আইনি বিশেষজ্ঞদের একটি অংশ মনে করেন, যদি আদালত এই রিটের প্রেক্ষিতে কোনো কঠোর রায় দেয়, তবে সংস্কার কার্যক্রম বড় ধরনের বাধার সম্মুখীন হতে পারে। অন্যদিকে, সরকার পক্ষের ধারণা, আদালত শেষ পর্যন্ত জনস্বার্থ এবং অভ্যুত্থানের ন্যায্যতাকে প্রাধান্য দেবে।জনমত ও রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া
রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে এই রুল নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। প্রধান প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা স্বীকার করলেও তারা একটি নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে নির্বাচনের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের দাবি জানিয়ে আসছে। অনেক বিশ্লেষকের মতে, এই আইনি লড়াইটি আসলে সংস্কার বনাম নির্বাচনের মধ্যকার দীর্ঘস্থায়ী বিতর্কের একটি প্রতিচ্ছবি।
