Responsive Advertisement

রাষ্ট্রে চলছে 'পুতুলনাচ', জাদুকর তবে কে?

Deep State Bangladesh
আমরা যখন ভোটকেন্দ্রে গিয়ে পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিই, তখন আমাদের মনে এক ধরণের প্রশান্তি কাজ করে— "আজ আমি আমার দেশের ভাগ্যবিধাতা নির্বাচন করলাম।" কিন্তু রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অন্ধকার অলিগলি এবং আধুনিক ভূ-রাজনীতির মারপ্যাঁচ যারা বোঝেন, তারা মুচকি হাসেন। তাদের মতে, আমরা কেবল ‘পুতুল’ নির্বাচন করি; আর সেই পুতুলের সুতো যাদের হাতে থাকে, তাদেরই বলা হয় ‘ডিপ স্টেট’ (Deep State) বা রাষ্ট্রের মধ্যে আরেকটি রাষ্ট্র। এটি এমন এক অদৃশ্য শক্তি, যা কোনো সংবিধান মানে না, কোনো নির্বাচনের তোয়াক্কা করে না, অথচ রাষ্ট্রের প্রতিটি নিশ্বাস নিয়ন্ত্রণ করে।

ডিপ স্টেট আসলে কী?

'ডিপ স্টেট' বা 'গভীর রাষ্ট্র' কোনো অলৌকিক বিষয় নয়। এটি মূলত একটি রাষ্ট্রের অভ্যন্তরে গড়ে ওঠা একটি সমান্তরাল সরকার। সহজভাবে বললে, একটি দেশের স্থায়ী আমলাতন্ত্র, গোয়েন্দা সংস্থা, সামরিক বাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তা, প্রভাবশালী বিচারক এবং বৃহৎ পুঁজিপতিদের (Oligarchs) এমন একটি গোপন আঁতাত, যারা পর্দার আড়ালে থেকে দীর্ঘমেয়াদী জাতীয় নীতি নির্ধারণ করে। এরা মনে করে সরকার আসবে, সরকার যাবে; কিন্তু আমাদের এজেন্ডা অপরিবর্তিত থাকবে।" একজন প্রধানমন্ত্রী বা প্রেসিডেন্ট সর্বোচ্চ ৪ বা ৫ বছরের জন্য ক্ষমতায় আসেন। এবং তিনি জনগণের কাছে দায়বদ্ধ। কিন্তু একজন গোয়েন্দা প্রধান বা শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তা বা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর হয়তো ২০-৩০ বছর ধরে ব্যবস্থার ভেতরে আছেন। তারা মনে করেন, হুট করে আসা একজন রাজনীতিবিদ রাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদী 'কৌশলগত স্বার্থ' বুঝবেন না। তাই তারা নিজেদেরকে 'রাষ্ট্রের প্রকৃত অভিভাবক' মনে করে শাসনভার নিজেদের অঘোষিত নিয়ন্ত্রণে রাখেন।

ডিপ স্টেট কীভাবে কাজ করে?

ডিপ স্টেট কোনো গায়ের জোরে শাসন করে না; তারা শাসন করে 'পারসেপশন' বা ধারণার ওপর ভিত্তি করে। গোয়েন্দা সংস্থাগুলো প্রতিদিন হাজার হাজার গোপন তথ্য সংগ্রহ করে। তারা রাষ্ট্রপ্রধানকে কেবল সেই তথ্যটুকুই দেয়, যা তাদের নিজস্ব এজেন্ডার সাথে মেলে।

ভাবুন তো, একটা বিশাল জাহাজ চলছে। প্রতি পাঁচ বছর পর পর জাহাজের ক্যাপ্টেন বদলায়। কিন্তু জাহাজের ইঞ্জিন রুমের মেকানিক, রাডার অপারেটর আর পুরনো খালাসিরা কখনো বদলায় না। নতুন ক্যাপ্টেন এসে বললেন, "জাহাজ বাঁয়ে ঘোরান!" কিন্তু মেকানিকরা যদি গোপনে জাহাজের সিস্টেম পরিবর্তন করে রাখে বা রাডার ভুল দেখায়, তবে ক্যাপ্টেন কিছুই করতে পারবেন না। এই চিরস্থায়ী মেকানিক আর খালাসিরাই হলো ডিপ স্টেট। তাদের কোনো ইলেকশন নেই, কিন্তু তাদের সিলেকশনই শেষ কথা।

দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক এবং বড় বড় কর্পোরেট হাউসগুলো অনেক সময় সরকারের চেয়েও শক্তিশালী হয়। যদি কোনো সরকার তাদের স্বার্থবিরোধী নীতি নেয়, তবে তারা বাজারে কৃত্রিম অস্থিরতা তৈরি করে বা মুদ্রার মান কমিয়ে দিয়ে সরকারকে চাপে ফেলে দেয়। আধুনিক ডিপ স্টেটের সবচেয়ে বড় সাফল্য হলো মূলধারার সংবাদমাধ্যমকে কবজায় রাখে। এবং তারাই নির্দিষ্ট 'ন্যারেটিভ' বা বয়ান তৈরি করে, কাকে হিরো বানাতে হবে আর কাকে খলনায়ক।

ডিপ স্টেটের অস্তিত্ব কেবল তাত্ত্বিক নয়, বরং ইতিহাসের পাতায় এর রক্তাক্ত অধ্যায় রয়েছে। ‘ডিপ স্টেট’ শব্দটির উৎপত্তি তুরস্কেই। ১৯২০ এর দশক থেকে তুরস্কের সামরিক বাহিনী এবং বিচার বিভাগ একটি শক্তিশালী জোট গড়ে তোলে। তাদের উদ্দেশ্য ছিল কামাল আতাতুর্কের ধর্মনিরপেক্ষ আদর্শ রক্ষা করা। কিন্তু বাস্তবে এটি ছিল একটি স্বৈরাচারী কাঠামো। ১৯৬০ থেকে ১৯৯৭ সাল পর্যন্ত তুরস্কের ইতিহাসে প্রতিটি সামরিক অভ্যুত্থানের পেছনে ছিল এই ‘ডেরিন দেভলেত’। তারা মনে করত, জনগণ ভুল মানুষকে ভোট দিয়েছে, তাই বন্দুকের নলে ক্ষমতা দখল করে তারা 'দেশ রক্ষা' করছে। ২০১৬ সালের ব্যর্থ অভ্যুত্থানটিও ছিল এই কাঠামোরই একটি মরণকামড়।

আবার দক্ষিণ এশিয়ায় ডিপ স্টেটের সবচেয়ে জীবন্ত উদাহরণ হলো পাকিস্তান। পাকিস্তানে একটা কথা প্রচলিত— "সেখানে আল্লাহ্, আর্মি আর আমেরিকা ছাড়া গাছের পাতাও নড়ে না।" এটাকে বলা হয় ‘The Establishment’। পাকিস্তানের ইতিহাসে কোনো প্রধানমন্ত্রীই আজ পর্যন্ত তার পূর্ণ মেয়াদ শেষ করতে পারেননি। এর কারণ হলো রাওয়ালপিন্ডির জেনারেলরা। জুলফিকার আলী ভুট্টো থেকে শুরু করে নওয়াজ শরীফ এবং সাম্প্রতিক ইমরান খান—সবাই যখনই ডিপ স্টেটের নিজস্ব এজেন্ডার বাইরে স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি বা অভ্যন্তরীণ নীতি নিতে চেয়েছেন, তখনই তাদের ক্ষমতাচ্যুত হতে হয়েছে। পাকিস্তানে ভোট হয় সত্য, কিন্তু রেজাল্ট নির্ধারিত থাকে অদৃশ্য টেবিলে।

ইউক্রেন সংকটকে অনেকে কেবল দুই দেশের যুদ্ধ হিসেবে দেখেন। কিন্তু এর গভীরে রয়েছে পশ্চিমা ডিপ স্টেটের বিশাল বিনিয়োগ। ২০১৪ সালের ইউক্রেনের ‘ইউরোমাইদান’ বিপ্লব ছিল মূলত একটি বিদেশি মদতপুষ্ট শাসন পরিবর্তন। পশ্চিমা গোয়েন্দা সংস্থাগুলো সেখানে এমন এক সরকার বসাতে চেয়েছিল যারা রাশিয়ার বিপরীতে ন্যাটোর স্বার্থ রক্ষা করবে। আজ ইউক্রেন ধ্বংসস্তূপ, কিন্তু আমেরিকান ও ইউরোপীয় ‘মিলিটারি-ইন্ডাস্ট্রিয়াল কমপ্লেক্স’ বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের অস্ত্র বিক্রি করে লাভবান হচ্ছে। জনগণের আবেগ এখানে ব্যবহৃত হয়েছে কেবল দাবার ঘুঁটি হিসেবে।

ডিপ স্টেট কেন সাধারণ মানুষের জন্য ভয়াবহ?

অনেকেই প্রশ্ন করেন, "ডিপ স্টেট থাকলে ক্ষতি কী? তারা তো শিক্ষিত এবং কৌশলী লোক, তারা দেশ চালালে সমস্যা কোথায়?" সমস্যাটা এখানে নয়, সমস্যাটি হলো জবাবদিহিতার অভাব। এখানেই হয় গণতন্ত্রের অপমৃত্যু। আপনি যাকে ভোট দিলেন, সে যদি সিদ্ধান্ত নিতে না পারে, তবে আপনার ভোটের মূল্য কোথায়? তখন আপনার ভোটের মূল্য শূন্য। গণতন্ত্র তখন কেবল একটি আনুষ্ঠানিকতায় পরিণত হয়।

ডিপ স্টেট সাধারণত অস্ত্র ব্যবসায়ী এবং বহুজাতিক কোম্পানির স্বার্থ রক্ষা করে। তাদের কাছে মানুষের জীবনের চেয়ে ‘লবিস্ট’দের সন্তুষ্টি বড়। এর ফলে সিরিয়া, লিবিয়া বা আফগানিস্তানের মতো মানবতা ধ্বংসকারী দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ তৈরি হয়। ডিপ স্টেট নাগরিকদের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা কেড়ে নেয়। ‘জাতীয় নিরাপত্তা’র দোহাই দিয়ে তারা প্রত্যেকের ফোন কল, মেসেজ এবং গতিবিধির ওপর নজর রাখে, যা প্রকারান্তরে একটি ডিজিটাল কারাগারে পরিণত করে সমাজকে।

তাহলে এর সমাধানের উপায় কী?

ডিপ স্টেট কোনো ব্যক্তি নয় যে তাকে গ্রেপ্তার করলেই সব শেষ হয়ে যাবে। এটি একটি ‘সিস্টেম’। একে ভাঙতে হলে প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদী সংস্কার। সকল গোয়েন্দা সংস্থার ওপর শক্তিশালী সংসদীয় কমিটি থাকতে হবে, যাদের কাছে তারা প্রতিটি পয়সার হিসাব এবং প্রতিটি অপারেশনের ব্যাখ্যা দিতে বাধ্য থাকবে। ডিপ স্টেট কোনো অমর সত্তা নয়। এটি টিকে থাকে আমাদের অজ্ঞতা আর উদাসীনতার ওপর ভর করে। এর জন্য জনগণকে সতর্ক হতে হবে। মূলধারার টিভি চ্যানেলের বাইরে স্বাধীন গবেষক এবং সাংবাদিকদের কথা শুনুতে হবে।দেশের কোন সংকট বা অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের পেছনে 'কার লাভ হচ্ছে?' এই প্রশ্নটা করতে শিখতে হবে।

সবসময় জমলুমের পক্ষে অবস্থান নিতে হবে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক এবং বড় কর্পোরেশনগুলোর ক্ষমতাকে বিকেন্দ্রীকরণ করতে হবে। কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠী যেন জাতীয় অর্থনীতিকে জিম্মি করতে না পারে। যদিও কয়দিন আগে আমরা দেখেছি মব করে কিভাবে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। এছাড়া ডিপ স্টেট সর্বদা দেশের মধ্যে জাতিগত বা ধর্মভিত্তিক ঘৃণা সৃষ্টি করে জনগণেকে ভিন্ন কাজে ব্যস্ত রাখে। সর্বোপরি ডিপ স্টেট হলো ক্ষমতার এক অন্ধকার গহ্বর। এটি অন্ধকারেই শক্তিশালী, আলোর সামনে এটি অত্যন্ত ভঙ্গুর। আমরা যদি কেবল টেলিভিশনের পর্দা বা হেডলাইনের ওপর ভিত্তি করে দুনিয়াকে দেখি, তবে আমরা চিরকাল এই অদৃশ্য সাম্রাজ্যের পুতুল হয়েই থাকব। প্রকৃত স্বাধীনতা কেবল তখনই আসবে, যখন ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু অন্ধকার ড্রয়িং রুম থেকে বের হয়ে জনগণের প্রকাশ্য আলোচনা এবং সম্মতির ওপর প্রতিষ্ঠিত হবে।

বিশ্বের বর্তমান অস্থির ভূ-রাজনীতি আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে যে, আমরা এক মহা প্রলয়ের সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছি। হয় আমরা সচেতন নাগরিক হবো, নয়তো আমরা এই অদৃশ্য সম্রাটদের চিরস্থায়ী প্রজা হয়ে থাকব।

Post a Comment

0 Comments