প্রবাসীদের মৃত্যুতে ড. শফিকুরের শোক: মরদেহ দ্রুত দেশে আনার দাবি

প্রবাসীর অকাল মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন জামায়াতে ইসলামীর আমীর ড. শফিকুর রহমান। রেমিট্যান্স যোদ্ধাদের অবদান এবং তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে রাষ্ট্রে
প্রবাসীদের মৃত্যুতে ড. শফিকুরের শোক


মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতায় বাংলাদেশি শ্রমিকদের প্রাণহানির ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমীর ডা. শফিকুর রহমান। সম্প্রতি এক হামলায় দুই বাংলাদেশি নিহত ও বেশ কয়েকজন আহত হওয়ার প্রেক্ষিতে তিনি এই শোকবার্তা দেন।

বিবৃতিতে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, প্রবাসীরা আমাদের রেমিট্যান্স যোদ্ধা এবং অর্থনীতির প্রাণশক্তি। বিদেশের মাটিতে তাঁদের এই অকাল মৃত্যু দেশের জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতি। তিনি নিহতদের আত্মার শান্তি কামনা করেন এবং শোকাতুর স্বজনদের প্রতি সহমর্মিতা প্রকাশ করেন।

​শোকবার্তায় যা বললেন ডা. শফিকুর রহমান

​জামায়াত আমীর বলেন, "প্রবাসীরা আমাদের অর্থনীতির প্রাণশক্তি। পরিবারের মুখে হাসি ফোটাতে এবং দেশের অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে তারা বিদেশের মাটিতে হাড়ভাঙা পরিশ্রম করে। এই রেমিট্যান্স যোদ্ধাদের বিদেশের মাটিতে এমন মৃত্যু অত্যন্ত বেদনাদায়ক। আমরা দোয়া করি, আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা যেন তাকে জান্নাতুল ফেরদাউস নসিব করেন এবং তার পরিবারকে এই কঠিন শোক সইবার তাওফিক দান করেন।"

​তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, প্রবাসীদের কল্যাণে জামায়াতে ইসলামী সর্বদা সোচ্চার। বিশেষ করে বিদেশে অবস্থানরত শ্রমিকদের যেকোনো বিপদে-আপদে আইনি ও মানবিক সহায়তা প্রদান করা রাষ্ট্রের নৈতিক দায়িত্ব।

​রেমিট্যান্স যোদ্ধা ও প্রবাসীদের অবদান

​বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের প্রেক্ষাপট চিন্তা করলে প্রবাসীদের অবদান কোনোভাবেই অস্বীকার করার উপায় নেই। জিডিপিতে রেমিট্যান্সের অবদান উল্লেখযোগ্য। কঠোর পরিশ্রম করে প্রবাসীরা যে অর্থ পাঠান, তা দিয়ে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালী হয়।

​প্রবাসীদের অবদানের মূল ক্ষেত্রগুলো:
  • ​বৈদেশিক মুদ্রার প্রবাহ: রপ্তানি আয়ের পরেই রেমিট্যান্স বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার দ্বিতীয় বৃহত্তম উৎস। ​
  • গ্রামীণ অর্থনীতি: প্রবাসীদের পাঠানো অর্থ গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে সরাসরি প্রভাব ফেলে। ​ 
  • বেকারত্ব দূরীকরণ: বিদেশে কর্মসংস্থানের মাধ্যমে দেশের বিশাল শ্রমশক্তির একটি অংশ স্বাবলম্বী হচ্ছে।

​প্রবাসীদের অকাল মৃত্যু ও নিরাপত্তা ঝুঁকি: একটি গভীর বিশ্লেষণ


​প্রতি বছর হাজার হাজার প্রবাসী বাংলাদেশি বিদেশের মাটিতে মৃত্যুবরণ করছেন। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, এসব মৃত্যুর একটি বড় অংশই ঘটে হৃদরোগ (Heart Attack) এবং কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনার কারণে।

​মৃত্যুর প্রধান কারণসমূহ:
  • অত্যধিক মানসিক চাপ: ঋণ করে বিদেশে যাওয়া এবং পরিবারের বড় চাহিদা মেটাতে গিয়ে প্রবাসীরা প্রচণ্ড মানসিক চাপে থাকেন। 
  •  অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ: অনেক সময় ছোট একটি কক্ষে গাদাগাদি করে অনেক শ্রমিককে থাকতে হয়, যা তাদের স্বাস্থ্যের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলে। 
  • দীর্ঘ কর্মঘণ্টা: অতিরিক্ত আয়ের আশায় অনেকে ১২ থেকে ১৬ ঘণ্টা পর্যন্ত কাজ করেন, যা স্ট্রোক বা হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়।  
  • সচেতনতার অভাব: অনেক শ্রমিক বিদেশের আইন ও নিরাপত্তা সরঞ্জাম ব্যবহারে দক্ষ নন, ফলে দুর্ঘটনা ঘটে।

​রাষ্ট্র ও দূতাবাসের করনীয়

​জামায়াত আমীর তার শোকবার্তায় পরোক্ষভাবে প্রবাসীদের অধিকারের দিকে ইঙ্গিত করেছেন। প্রবাসীরা যখন বিদেশে মারা যান, তখন তাদের মরদেহ দেশে আনা এবং তাদের বকেয়া পাওনা আদায়ের ক্ষেত্রে দূতাবাসগুলোকে আরও কার্যকর ভূমিকা পালন করতে হবে বলে তিনি জোর দাবি করেন।

​জরুরি পদক্ষেপসমূহ:
  • ​মরদেহ দ্রুত দেশে আনা: বিদেশের মাটিতে আইনি জটিলতা কাটিয়ে প্রবাসীর মরদেহ যেন দ্রুত স্বজনদের কাছে পৌঁছায়, তা নিশ্চিত করা। ​ 
  • বীমা সুবিধা: প্রত্যেক প্রবাসীর জন্য বাধ্যতামূলক বীমার ব্যবস্থা করা, যাতে দুর্ঘটনার পর পরিবার আর্থিক সহায়তা পায়। ​ 
  • আইনি সহায়তা: কফিলের (মালিক) দ্বারা নির্যাতনের শিকার হলে বা বেতন না পেলে দ্রুত আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত করা।

    ড. শফিকুর রহমানের মানবিক রাজনীতি ও প্রাসঙ্গিকতা

    ​ডা. শফিকুর রহমান আমীর হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই বিভিন্ন মানবিক ও সামাজিক ইস্যুতে সরব রয়েছেন। বন্যা, অগ্নিকাণ্ড বা প্রবাসীদের মৃত্যুতে তার এই দ্রুত শোক প্রকাশ এবং পাশে দাঁড়ানোর বিষয়টি সাধারণ মানুষের মধ্যে ইতিবাচক সাড়া ফেলে। জামায়াতে ইসলামী সাধারণত তাদের সমাজসেবা উইংয়ের মাধ্যমে দুর্গত মানুষের পাশে দাঁড়ায়।

    ​বিশ্লেষকদের মতে, প্রবাসীদের প্রতি এই সহমর্মিতা কেবল একটি রাজনৈতিক বার্তা নয়, বরং এটি প্রবাসী কমিউনিটির সাথে দলের সম্পর্ক আরও দৃঢ় করার একটি প্রয়াস। কারণ মধ্যপ্রাচ্যসহ ইউরোপ-আমেরিকায় বাংলাদেশি প্রবাসীদের একটি বড় অংশ জামায়াতের আদর্শের অনুসারী বা সমর্থক।

    ​প্রবাসীদের অধিকার রক্ষায় ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টা প্রয়োজন

    ​একটি উন্নত ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়তে হলে প্রবাসীদের অবদানকে কেবল সংখ্যা দিয়ে বিচার করলে চলবে না। তাদের জীবন ও জীবিকার মানোন্নয়নে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা নিতে হবে। ডা. শফিকুর রহমানের এই শোক প্রকাশ সেই বার্তাই মনে করিয়ে দেয় যে— প্রবাসীরা আমাদের সম্পদ, তাদের অবহেলা করার সুযোগ নেই।

    ​আমরা আশা করি, সরকার ও রাজনৈতিক দলগুলো প্রবাসীদের অধিকার রক্ষায় কেবল সমবেদনার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করবে। প্রতিটি রেমিট্যান্স যোদ্ধা যেন বিদেশের মাটিতে মর্যাদার সাথে কাজ করতে পারেন এবং তাদের জীবন সুরক্ষিত থাকে।