গণতন্ত্রের প্রথম স্তম্ভের পতন: কিভাবে এটি জল্লাদে পরিণত হয়?

গণতন্ত্রের প্রথম স্তম্ভ আইনসভা কীভাবে দুর্নীতিগ্রস্ত হয়ে জনগণকে আধুনিক দাসে পরিণত করে? ইতিহাস ও আধুনিক বিশ্বের গোপন ও চাঞ্চল্যকর তথ্য নিয়ে পড়ুন এই..
আইনসভা কীভাবে জনগণকে আধুনিক দাসে পরিণত করে?
গণতন্ত্রের প্রথম স্তম্ভ আইনসভা কীভাবে দুর্নীতিগ্রস্ত হয়ে জনগণকে আধুনিক দাসে পরিণত করে?

​গণতন্ত্র। একটি জাদুকরী শব্দ, তাই না? যা যুগ যুগ ধরে মানুষকে সমতা, অধিকার এবং স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখিয়ে আসছে। কিন্তু বাস্তবতা? একটি আদর্শ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের সম্পূর্ণ কাঠামোটি মূলত চারটি শক্তিশালী স্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে—আইনবিভাগ (Legislature), শাসনবিভাগ (Executive), বিচারবিভাগ (Judiciary) এবং সংবাদপত্র বা গণমাধ্যম (Media)।

এই চারটির মধ্যে প্রথম এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভটি হলো 'আইনবিভাগ' বা 'আইনসভা' ​মূলত, এই প্রথম স্তম্ভটি সরাসরি জনগণের ভোটের দ্বারা নির্বাচিত প্রতিনিধিদের নিয়ে গঠিত হয়। এর একমাত্র কাজ হলো জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষা চাওয়া-পাওয়ার প্রতিফলন ঘটিয়ে রাষ্ট্রের জন্য কল্যাণকর আইন প্রণয়ন করা এবং সরকারের অন্যান্য বিভাগের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা। কিন্তু বর্তমান বাস্তব চিত্রটি কেমন? আধুনিক যুগে এই প্রথম স্তম্ভটি কি আসলেই জনগণের কথা বলছে? আসলেই কি জণগণকে তারা বুঝতে পারছে? নাকি এটি এমন এক ভয়ংকর দানবে পরিণত হচ্ছে, যা সাধারণ মানুষকে অদৃশ্য শৃঙ্খলে আবদ্ধ করে দাসে পরিণত করছে?

​আজকের এই বিশেষ অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে আমরা খুব সহজে বুঝার চেষ্টা করবো কীভাবে গণতন্ত্রের প্রথম স্তম্ভ ধীরে ধীরে দুর্নীতিগ্রস্ত হয়, কিভাবে তারা ধীরে ধীরে জনগণকে দাসে পরিণত করে।

​গণতন্ত্রের শেকড়ে যেভাবে পচন ধরে

​আইনসভার মূল কাজ হলো আইন তৈরি করা। এটি সাধারণ একজন জনগণ শুনলে প্রথমেই বলবে, ওহ, আইন তৈরি করা। এটি যেন তার কাছে কিছুই না। কিন্তু এই সেক্টরটা ক্ষমতাধর, রাজনৈতিক অভিজাত এবং ধনকুবেরের জন্য কোহিনূর সেই হীরার মতো। যেমন,

নির্বাচনী অর্থের খেলা আধুনিক গণতন্ত্রে নির্বাচন অত্যন্ত ব্যয়বহুল একটি বিষয়ে পরিণত হয়েছে। একজন সৎ ও সাধারণ মানুষের পক্ষে কোটি কোটি টাকা খরচ করে নির্বাচনে জয়ী হওয়া প্রায় অসম্ভব। আর এখানেই প্রবেশ করে বড় বড় কর্পোরেশন এবং ধনকুবেররা। তারা রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীদের পেছনে বিপুল পরিমাণ অর্থ বিনিয়োগ করে। যেন ভোটে জিতে তাদের স্বার্থের জন্য কাজ করে। ফলে নির্বাচিত হওয়ার পর এই জনপ্রতিনিধিরা আর জনগণের প্রতিনিধি থাকেন না, তারা পরিণত হন সেই কর্পোরেশনগুলোর বেতনভুক্ত কর্মচারীতে।

​বৈধ ঘুষ বা 'লবিং' উন্নত বিশ্বে দুর্নীতিকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া হয়েছে 'লবিং'-এই শব্দটির মাধ্যমে। বড় বড় কোম্পানি কোটি কোটি ডলার খরচ করে লবিস্ট নিয়োগ করে, যারা আইনপ্রণেতাদের প্রভাবিত করে এমন সব আইন পাস করিয়ে নেয় যা তাদের ব্যবসার জন্য লাভজনক। যেমন অস্ত্র ব্যবসায়ী, ওষুধ কোম্পানি বা জীবাশ্ম জ্বালানি কোম্পানিগুলো নিজেদের স্বার্থে আইন প্রণয়ন করিয়ে জমজমাট ব্যবসা করে। এটি মূলত এক ধরনের 'বৈধ ঘুষ', যা আইনসভাকে ভেতর থেকে ফোকলা করে দেয়।

​পরিবারতন্ত্র ও ক্রনি ক্যাপিটালিজম অনেক রাষ্ট্রেই আইনসভা পরিণত হয় নির্দিষ্ট কিছু অভিজাত পরিবারের ব্যক্তিগত ক্লাবে। তারা নিজেদের ক্ষমতা চিরস্থায়ী করতে এমন সব অর্থনৈতিক নীতি প্রণয়ন করে যা কেবল তাদের ঘনিষ্ঠ ব্যবসায়ী বন্ধুদের একচেটিয়া আধিপত্য নিশ্চিত করে। এর ফলে সম্পদের পাহাড় গড়ে ওঠে মুষ্টিমেয় কিছু মানুষের হাতে, ফলে সাধারণ মানুষ বঞ্চিত হতে থাকে।

এই আধুনিক বিশ্বে ​দাসত্বের নতুন রূপ এই আধুনিক যুগে দাসত্বের সংজ্ঞা বদলে গেছে। এখন আর মানুষকে গলায় শিকল বেড়ি পরিয়ে বাজারে বিক্রি করা হয় না। বরং আধুনিক দাসত্ব হলো অর্থনৈতিক এবং আইনি দাসত্ব, যা তৈরি করা হয় আইনসভার ভেতরে বসে। আইনসভা এমন সব কর ব্যবস্থা এবং অর্থনৈতিক বিল পাস করে, যেখানে ধনীদের কর মওকুফ করা হয় এবং সাধারণ নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষের ওপর পরোক্ষ কর-ভ্যাটের বোঝা চাপিয়ে দেওয়া হয়। শিক্ষা ও চিকিৎসাকে এমনভাবে বেসরকারিকরণ ও ব্যয়বহুল করা হয় যে, সাধারণ মানুষ ব্যাংক থেকে ঋণ নিতে বাধ্য হয়। যেন সারা জীবন সেই ঋণের কিস্তি শোধ করতেই তাদের জীবন কেটে যায়। এই 'ডেট স্লেভারি' (Debt Slavery) বা ঋণের দাসত্ব আধুনিক বিশ্বের সবচেয়ে বড় হাতিয়ার।

যেভাবে মৌলিক ​অধিকার গুলো কেঁড়ে নেওয়া হয়

ব্যবসায়ীদের সুবিধা দিতে শ্রম আইনগুলোকে এমনভাবে সংশোধন করা হয় যাতে শ্রমিকদের ধর্মঘট করার বা ন্যায্য মজুরি দাবি করার অধিকার রাস্তা না থাকে। যেন কোম্পানিগুলো ইচ্ছেমতো কর্মী ছাঁটাই করতে পারে। মানুষের বেঁচে থাকার জন্য ন্যূনতম প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রগুলোকে (যেমন- পানি, বিদ্যুৎ, চিকিৎসা) লাভজনক পণ্যে পরিণত করার আইনি বৈধতা তৈরি করে দেয় এই আইনসভা।

​জনগণকে স্বাবলম্বী করার বদলে, আইনসভা এমন সব নীতি প্রণয়ন করে যাতে মানুষ সবসময় রাষ্ট্রের অনুদানের ওপর নির্ভরশীল থাকে। নির্বাচনের আগে কিছু ভাতা বা ত্রাণ দিয়ে তাদের ভোট কিনে নেওয়া হয়। ফলে পরবর্তীতে জনগণ তাদের প্রকৃত অধিকার আদায় করার জন্য এই নেতাদের পিছুপিছু ঘুরতে হয়।

​এই শোষণকে বৈধতা দিতে এবং জনগণকে অন্ধ করে রাখতে দুর্নীতিগ্রস্ত আইনসভা ও রাজনৈতিক দলগুলো বেশ কিছু পরীক্ষিত মনস্তাত্ত্বিক ও আইনি পন্থা অবলম্বন করে:

​জেরিম্যান্ডারিং (Gerrymandering): এটি আধুনিক গণতন্ত্রের এক ভয়ংকর কারচুপি। এখানে আইনসভা নিজেরাই তাদের নির্বাচনী এলাকার সীমানা এমনভাবে পুনঃনির্ধারণ করে, যাতে বিরোধী দলের ভোটগুলো বিভক্ত হয়ে যায় এবং ক্ষমতাসিন দলের জয় নিশ্চিত হয়। এর ফলে জনগণ ভোট দিলেও ফলাফলে কোনো পরিবর্তন আসে না।

​বিভাজন ও শাসন (Divide and Rule): এটি জনগণকে কখনোই তাদের আসল সমস্যা (যেমন- বেকারত্ব, মূল্যস্ফীতি, দুর্নীতি) নিয়ে একজোট হতে দেওয়া হয় না। আইনসভা এবং রাজনৈতিক নেতারা সুকৌশলে ধর্ম, বর্ণ, জাতি বা ভাষার নামে বিতর্কিত সব বিল বা আইন উত্থাপন করে। এর ফলে জনগণ নিজেদের মধ্যে মারামারিতে লিপ্ত থাকে, আর শাসকগোষ্ঠী নিরাপদে তাদের লুটপাট করতে থাকে।

​কৃত্রিম সংকট তৈরি: যখনই সরকারের বড় কোনো দুর্নীতি ফাঁস হওয়ার উপক্রম হয়ে যায়, তখনই সুকৌশলে দেশের মধ্যে নতুন কোনো বিতর্ক তৈরি করে দেওয়া হয়। আর এই দায়িত্বের মূল ভূমিকায় থাকে দেশের সুনামধন্য গণমাধ্যম গুলো। তারা তখন এমন সব বিষয় নিয়ে আলোচনায় ঝাপিয়ে পড়ে, যার সাথে জনগণের জীবনযাত্রার কোনো সম্পর্কই নেই।

​হিংস্রতার চূড়ান্ত রূপ: যখন আইনসভা রক্তপিপাসু হয়ে ওঠে

​আইনসভা যখন বুঝতে পারে যে তাদের দুর্নীতি, কারচুপি এবং শোষণের বিরুদ্ধে মানুষ জেগে উঠছে, তখন তারা তাদের সবচেয়ে ভয়ংকর এবং হিংস্র রূপটি প্রকাশ করে। একটি রাষ্ট্রের আইনসভা যখন হিংস্র হয়, তখন তার চেয়ে ভয়ংকর আর কিছু হতে পারে না, কারণ তারা তাদের প্রতিটি অপরাধকে 'আইনের মোড়ক' পরিয়ে বৈধতা দিয়ে দেয়।

ফলে ভিন্নমত দমনের জন্য আইনসভা 'জাতীয় নিরাপত্তা', 'সন্ত্রাসবাদ দমন' বা 'ডিজিটাল নিরাপত্তা'র দোহাই দিয়ে এমন সব আইন পাস করে, যার মাধ্যমে বিনা পরোয়ানায় যেকোনো নাগরিককে গ্রেপ্তার করা যায়। রাতের আঁধারে গিয়ে বাড়ি থেকে তুলে আনা যায়। আর এই আইনগুলোর ভাষা এতই অস্পষ্ট থাকে যে, সরকারের সমালোচনা করলেই তাকে 'রাষ্ট্রদ্রোহিতা' হিসেবে গণ্য করা যায়।

তখন ​এই আইনসভা পুলিশ ও নিরাপত্তা বাহিনীকে জবাবদিহিতার ঊর্ধ্বে তুলে দেয়। ফলে জনগণের করের টাকায় কেনা অস্ত্র জনগণের বুকেই তাক করা হয়। যখন সাধারণ মানুষ রাস্তায় নেমে প্রতিবাদ করে, তখন তাদের 'সন্ত্রাসী' বা 'দাঙ্গাবাজ' আখ্যা দিয়ে দমন করার আইনি অধিকার নিরাপত্তা বাহিনীকে দিয়ে দেওয়া হয়। এক প্রকার ভাড়াটে খুনির মতো।

​এই সমস্ত অপকর্ম কে আইনি ভিত্তি দিতে তারা সংবিধান সংশোধন করে বিচারবিভাগের ক্ষমতা খর্ব করে। নিজেদের পছন্দমতো বিচারক নিয়োগের আইন পাস করে, যাতে তাদের কোনো বেআইনি কাজের বিরুদ্ধে আদালত রায় দিতে না পারে।

আধুনিক বিশ্বের গোপন ও চাঞ্চল্যকর তথ্য

​আধুনিক দুনিয়ার এই দাসত্বের রূপ বুঝতে হলে আমাদের ইতিহাসের পাতা এবং বর্তমান বিশ্বের কিছু চাঞ্চল্যকর গোপন তথ্য সম্পর্কে জানতে হবে।

​রোমান সিনেটের পতন ও জুলিয়াস সিজার ইতিহাস সাক্ষী আছে, রোমান রিপাবলিকের পতনের অন্যতম কারণ ছিল তাদের প্রথম স্তম্ভ অর্থাৎ 'সিনেট'-এর চরম দুর্নীতি। সিনেটররা বিশাল সম্পদের মালিক বনে গিয়েছিল এবং সাধারণ নাগরিকদের দাসে পরিণত করেছিল। এই ক্ষোভেরই সুযোগ নিয়েছিলেন জুলিয়াস সিজার, যিনি জনগণের ত্রাতা হিসেবে আবির্ভূত হয়ে সিনেটকে ক্ষমতাহীন করে নিজেকে একনায়ক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। আর এই গণতন্ত্রের পাহারাদাররাই গণতন্ত্রের কবর খুঁড়েছিল।

পৃথিবীর ইতিহাসে আইনসভার মাধ্যমে গণতন্ত্র হত্যার সবচেয়ে বড় ও ভয়ংকর উদাহরণ হলো ১৯৩৩ সালের জার্মানির 'Enabling Act'। অ্যাডলফ হিটলার ক্ষমতা দখলের পর জার্মান সংসদ (রাইখস্ট্যাগ)-এ এমন একটি আইন পাস করিয়ে নেন, যা তাকে সংসদের অনুমোদন ছাড়াই আইন প্রণয়নের নিরঙ্কুশ ক্ষমতা দেয়। মজার ব্যাপার হলো, জার্মানির নির্বাচিত প্রতিনিধিরাই ভোট দিয়ে নিজেদের ক্ষমতা হিটলারের হাতে তুলে দিয়ে একনায়কতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেছিল। আর এভাবেই গণতন্ত্রের প্রথম স্তম্ভ নিজেই নিজের মৃত্যু পরোয়ানায় স্বাক্ষর করেছিল।

​আধুনিক বিশ্বের ডার্ক মানি ও 'সিটিজেনস ইউনাইটেড' (২০১০): যুক্তরাষ্ট্রকে বলা হয় আধুনিক গণতন্ত্রের সূতিকাগার। কিন্তু ২০১০ সালে সেদেশের সুপ্রিম কোর্ট "Citizens United v. FEC" মামলায় এক ঐতিহাসিক রায় দেয়, যা আমেরিকার আইনসভাকে চিরতরে কর্পোরেটদের দাসে পরিণত করেছে। এই রায়ের ফলে কর্পোরেশনগুলোকে 'ব্যক্তি' হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয় এবং নির্বাচনে তাদের অর্থ খরচের ওপর সব সীমা তুলে নেওয়া হয়। এর ফলে জন্ম হয় কালো টাকার, যেখানে কে কাকে ফান্ড দিচ্ছে তা গোপন রাখা যায়। ফলে আজ আমেরিকার পলিসি নির্ধারিত হয় সাধারণ মানুষের ভোটে নয়, বরং ওয়াল স্ট্রিটের বিলিয়নিয়ারদের দেওয়া ফান্ডিংয়ের মাধ্যমে। প্রিন্সটন ইউনিভার্সিটির এক গবেষণায় দেখা গেছে, আমেরিকার সাধারণ মানুষের মতামতের ওপর সরকারি নীতির পরিবর্তনের সম্ভাবনা প্রায় শূন্যের কাছাকাছি।

​ডিজিটাল নজরদারি ও পেগাসাস

আধুনিক যুগে আইনসভাগুলো 'জাতীয় নিরাপত্তার' নামে এমন সব গোপন বাজেট পাস করছে, যার মাধ্যমে রাষ্ট্র তার নিজের নাগরিকদের ওপরই সার্বক্ষণিক নজরদারি চালাচ্ছে। ইসরায়েলি সাইবার সিকিউরিটি ফার্ম 'এনএসও গ্রুপ' (NSO Group)-এর তৈরি স্পাইওয়্যার 'পেগাসাস'-এর কথা অনেকেই জানেন। এটি একটি জিরো-ক্লিক স্পাইওয়্যার, যা আপনার অজান্তেই আপনার স্মার্টফোনের সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নিতে পারে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সরকার, এমনকি গণতান্ত্রিক দেশের সরকারগুলোও মিলিয়ন মিলিয়ন ডলার খরচ করে এই প্রযুক্তি কিনেছে বিরোধী দলের নেতা, সাংবাদিক এবং মানবাধিকার কর্মীদের ওপর নজরদারী করাী জন্য। এবং এর সবকিছুরই বাজেট অনুমোদন করেছে সেই দেশের আইনসভা।

​ডেটা ম্যানিপুলেশন

গণতন্ত্রের প্রথম স্তম্ভ এখন আর কেবল ব্যালট বাক্সে সীমাবদ্ধ নেই, এটি চলে গেছে অ্যালগরিদমের হাতে। ক্যামব্রিজ অ্যানালিটিকা কেলেঙ্কারি আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়েছে কীভাবে সোশ্যাল মিডিয়া থেকে চুরি করা কোটি কোটি মানুষের ব্যক্তিগত ডেটা বিশ্লেষণ করে, তাদের মনস্তত্ত্ব বুঝে সুকৌশলে প্রোপাগান্ডা চালিয়ে নির্বাচনকে প্রভাবিত করা হয়। আইনপ্রণেতারা এই প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে শক্ত কোনো আইন প্রয়োগ করেন না, কারণ এই ডেটা ম্যানিপুলেশনের সবচেয়ে বড় সুবিধাভোগী তারা নিজেরাই।

তাই ​গণতন্ত্রের প্রথম স্তম্ভ বা আইনসভা যখন তার মূল উদ্দেশ্য থেকে বিচ্যুত হয়, তখন তা সাধারণ মানুষের জন্য সবচেয়ে বড় হুমকিতে পরিণত হয়। ইতিহাস আমাদের বারবার মনে করিয়ে দেয় যে, স্বৈরতন্ত্র কেবল সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমেই আসে না; বরং গণতান্ত্রিক লেবাসে, সংসদের ভেতরে বসে, 'জনগণের প্রতিনিধি'দের ভোটের মাধ্যমেই সবচেয়ে ভয়ংকর স্বৈরতন্ত্রের জন্ম হয়।

​আজকের আধুনিক বিশ্ব এক অদ্ভুত মোড়কে বন্দি। আমরা মনে করি আমরা স্বাধীন, কিন্তু আইনি বেড়াজাল, ঋণের বোঝা এবং নজরদারির জাঁতাকলে আমরা আসলে একবিংশ শতাব্দীর আধুনিক দাসে পরিণত হয়েছি। এই পরিস্থিতি থেকে মুক্তির একমাত্র উপায় হলো জনগণের নিরবচ্ছিন্ন সচেতনতা। নাগরিকদের বুঝতে হবে আইনসভায় কী বিল পাস হচ্ছে, কাদের স্বার্থে পাস হচ্ছে এবং কাদের টাকায় নির্বাচন পরিচালিত হচ্ছে। প্রথম স্তম্ভকে জবাবদিহিতার আওতায় আনতে না পারলে, গণতন্ত্র কেবল বইয়ের পাতায় লেখা একটি সুন্দর শব্দ হয়েই রয়ে যাবে, আর বাস্তবে তা পরিণত হবে শোষণের এক নির্মম হাতিয়ারে।
কথা বললেই পুলিশ ধরে নিয়ে যাবে, এমনটি আর চলবে না। কেমন হবে আগামীর গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ?
আরও পড়ুন →