কথা বললেই পুলিশ ধরে নিয়ে যাবে, এমনটি আর চলবে না। কেমন হবে আগামীর গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ?
কথা বললেই পুলিশ ধরে নিয়ে যাবে, এমনটি আর চলবে না।" একটি কার্যকর গণতন্ত্র ও ভীতিমুক্ত সমাজ বিনির্মাণে নাগরিকের বাকস্বাধীনতা কতটা জরুরি? সুশাসন ও রাজনৈতি
![]() |
| কথা বললেই পুলিশ ধরে নিয়ে যাবে এমনটি আর চলবে না: তারেক রহমান |
"কথা বললেই পুলিশ ধরে নিয়ে যাবে এমনটি আর চলবে না"—
এটি একটি সুস্থ গণতান্ত্রিক সমাজ বিনির্মাণের জন্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। এই বক্তব্যের গভীরে নিহিত রয়েছে রাষ্ট্রের নাগরিক অধিকার সুরক্ষার একটি স্পষ্ট দর্শন, যা বছরের পর বছর ধরে চর্চিত ভীতি ও দমন-পীড়নের সংস্কৃতির সম্পূর্ণ বিপরীত। জনগণের জন্য সর্বোত্তম রাষ্ট্রীয় কাঠামো কেমন হওয়া উচিত এবং বাকস্বাধীনতা কীভাবে একটি জাতির বুদ্ধিবৃত্তিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক বিকাশে ভূমিকা রাখে, তা এই প্রবন্ধে আলোচনা করা হয়েছে।
শাসকের মনস্তত্ত্ব এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছা
ঐতিহাসিকভাবে দেখা যায়, যখন কোনো দল ক্ষমতায় আসে, তখন তাদের তৃণমূল থেকে শীর্ষ পর্যায়ের অনেক নেতাকর্মীর মধ্যে এক ধরনের আধিপত্যবাদী মানসিকতা কাজ করে। তারা মনে করেন, ক্ষমতার অর্থ হলো সবার সমালোচনার ঊর্ধ্বে থাকা। এই মানসিকতা থেকেই ভিন্নমত পোষণকারীদের ওপর শুরু হয় আক্রমণ, আর সেই আক্রমণের হাতিয়ার হিসেবে অনেক সময় ব্যবহার করা হয় রাষ্ট্রীয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে।শাসকের বিরুদ্ধে বা অন্যায়ের বিরুদ্ধে একটা কথা বললো, আর পুলিশ এসে ধরে নিয়ে গেলো— এই সংস্কৃতি কেবল ব্যক্তির স্বাধীনতাই হরণ করে না, বরং পুরো সমাজে এক ধরনের 'চিলিং ইফেক্ট' (Chilling Effect) বা ভীতির সঞ্চার করে। প্রধানমন্ত্রী যখন নিজে এই ভীতির সংস্কৃতি ভাঙার কথা ব্যক্ত করেন, তখন তা জনগণের জন্য এক বিরাট স্বস্তির বার্তা বহন করে। কারণ, রাষ্ট্রপ্রধানের এই সদিচ্ছাই নির্ধারণ করে দেয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নাগরিকদের সাথে কেমন আচরণ করবে।
বাকস্বাধীনতার তাত্ত্বিক ও দার্শনিক ভিত্তি
দার্শনিক জন স্টুয়ার্ট মিল তাঁর বিখ্যাত প্রবন্ধ 'On Liberty'-তে বলেছেন, "যদি সমাজের একজন ব্যক্তি ছাড়া বাকি সবার মতও এক হয়, এবং ওই একজন ব্যক্তির মত ভিন্ন হয়, তবুও সমাজের অধিকার নেই ওই একজনকে চুপ করিয়ে দেওয়ার; ঠিক যেমন ওই ব্যক্তিরও অধিকার নেই সমাজকে চুপ করিয়ে দেওয়ার।"মানুষের চিন্তার বিকাশ ঘটে দ্বিমত ও বিতর্কের মাধ্যমে। যখন কোনো সমাজে শুধু একটি মাত্র মতকে 'সঠিক' বলে চাপিয়ে দেওয়া হয় এবং অন্য মতগুলোকে পুলিশের ভয় দেখিয়ে স্তব্ধ করে দেওয়া হয়, তখন সেই সমাজের বুদ্ধিবৃত্তিক মৃত্যু ঘটে। সত্য এবং সঠিক সিদ্ধান্ত তখনই বেরিয়ে আসে যখন সব ধরনের মতামতের মধ্যে স্বাধীন প্রতিযোগিতা থাকে।
জনগণের জন্য এটি সর্বোত্তম এই কারণে যে, বাকস্বাধীনতা থাকলে ভুল নীতি, দুর্নীতি এবং রাষ্ট্রীয় অন্যায়গুলো দ্রুত প্রকাশ্যে আসে। সরকার যদি ভুল পথে হাঁটে, তবে জনগণ স্বাধীনভাবে সমালোচনা করার সুযোগ পেলে সরকার সেই ভুল সংশোধনের সুযোগ পায়। অন্যথায়, স্তব্ধ সমাজে ভেতরে ভেতরে ক্ষোভ জমতে থাকে, যা একসময় জুলাই বিপ্লবের মতে বিস্ফোরক আকার ধারণ করে এবং রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা নষ্ট করে।
সংবিধান ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকারের মাপকাঠিতে বাকস্বাধীনতা
বাকস্বাধীনতা কোনো দয়ার দান নয়, এটি মানুষের জন্মগত অধিকার এবং সাংবিধানিক নিশ্চয়তা।
১৯৪৮ সালের সর্বজনীন মানবাধিকার ঘোষণার ১৯ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, "প্রত্যেক ব্যক্তিরই স্বাধীনভাবে মতামত পোষণ এবং প্রকাশের অধিকার রয়েছে। এর অর্থ হলো—কেউ আপনার মতামতে হস্তক্ষেপ করতে পারবে না এবং আপনি সীমানা নির্বিশেষে যেকোনো মাধ্যমে স্বাধীনভাবে তথ্য ও ধারণা খুঁজতে, পেতে এবং অন্যদের জানাতে পারবেন।"
বাংলাদেশের সংবিধান কি বলে?
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের ৩৯ নম্বর অনুচ্ছেদে চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতা এবং বাক্ ও ভাব প্রকাশের স্বাধীনতার নিশ্চয়তা প্রদান করা হয়েছে। অতীতে অনেক ক্ষেত্রেই দেখা গেছে যে, আইনের অপব্যাখ্যা বা কালো আইন' (Draconian Law) (যেমন— ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন বা অনুরূপ সাইবার আইন) মাধ্যমে নাগরিকের এই সাংবিধানিক অধিকারকে খর্ব করা হয়েছে। সামান্য সমালোচনা বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি স্ট্যাটাস দেওয়ার কারণেও রাতের অন্ধকারে পুলিশ এসে সাধারণ নাগরিক থেকে শুরু করে সাংবাদিক, লেখক বা কার্টুনিস্টদের তুলে নিয়ে গেছে। এবং বর্তমানেও কিছু ক্ষেত্রে আগের পুনরাবৃত্তি হতে দেখা গেছে।অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও সুশাসনে বাকস্বাধীনতার প্রভাব
নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন তাঁর গবেষণায় প্রমাণ করেছেন যে, একটি কার্যকর গণতান্ত্রিক এবং বাকস্বাধীনতাপূর্ণ রাষ্ট্রে কখনো দুর্ভিক্ষ হয় না। এর কারণ কী? কারণ হলো, যখন সংবাদমাধ্যম স্বাধীন থাকে এবং মানুষ তাদের অভাব-অভিযোগের কথা সরকারের কাছে নির্দ্বিধায় পৌঁছাতে পারে, তখন সরকার দ্রুত ব্যবস্থা নিতে বাধ্য হয়।যদি একটি সমাজে যখন বাকস্বাধীনতা থাকে:
দুর্নীতি হ্রাস পায়: সরকারি কর্মকর্তা থেকে শুরু করে মন্ত্রী বা জনপ্রতিনিধিরা দুর্নীতি করতে ভয় পান, কারণ তারা জানেন যে জনগণ বা গণমাধ্যম তা প্রকাশ করে দেবে।
জবাবদিহিতা নিশ্চিত হয়: স্থানীয় সরকার থেকে শুরু করে কেন্দ্রীয় সরকার— সর্বত্র স্বচ্ছতা আসে।
সঠিক নীতি প্রণয়ন: সরকারের ভুল প্রকল্প বা নীতিগুলো নিয়ে স্বাধীন বিশেষজ্ঞরা সমালোচনা করতে পারেন, ফলে রাষ্ট্রীয় অর্থের অপচয় রোধ হয়।
পুলিশের ভয়ে যদি মানুষ কথা না বলে, তবে দুর্নীতিবাজ ও লুটেরা শ্রেণি সমাজে মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। জনগণের সম্পদের সুরক্ষা নিশ্চিত করার জন্য বাকস্বাধীনতার কোনো বিকল্প নেই।
ভীতিমুক্ত সমাজ
একটি 'পুলিশি রাষ্ট্র' বা Police State-এর বৈশিষ্ট্য হলো নাগরিকের মনে সারাক্ষণ ভয় কাজ করা। "এই বুঝি কেউ আমার কথা শুনলো", "এই বুঝি আমার ফোনে আড়িপাতা হচ্ছে", "এই বুঝি আমাকে তুলে নিয়ে যাওয়া হলো"— এমন মানসিক ট্রমা বা ভীতি নিয়ে কোনো জাতি বিশ্বের বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারে না। যখন রাষ্ট্র নাগরিকদের নিশ্চয়তা দেয় যে, শুধু কথা বলার জন্য বা মত প্রকাশের জন্য পুলিশ কাউকে ধরে নিয়ে যাবে না, তখন নাগরিকদের মধ্যে এক অভূতপূর্ব আত্মবিশ্বাস ও মনস্তাত্ত্বিক মুক্তির জন্ম হয়। তারা নিজেদের রাষ্ট্রের প্রকৃত মালিক বলে অনুভব করে।এই মালিকানাবোধ বা Ownership থেকেই দেশপ্রেমের প্রকৃত বিকাশ ঘটে। নাগরিক ক্ষমতায়ন তখনই পূর্ণতা পায়, যখন মানুষ নির্ভয়ে শাসকের চোখের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করতে পারে।
ক্ষমতার অহংকার রোধ এবং দলীয় শৃঙ্খলা
উন্নয়নশীল দেশগুলোতে রাজনৈতিক অবক্ষয়ের মূল কারণ হলো ক্ষমতাসীন দলের কর্মীদের লাগামহীন আচরণ। দল ক্ষমতায় গেলেই কর্মীরা নিজেদের আইনের ঊর্ধ্বে ভাবতে শুরু করেন, চাঁদাবাজি, দখলদারি এবং সাধারণ মানুষকে হয়রানি করাকে তারা তাদের 'অধিকার' মনে করেন। ফলে জনগণের কাছে সরকারের ভাবমূর্তি নষ্ট হয় এই কর্মীদের কারণেই। স্থানীয় পর্যায়ে সাধারণ মানুষ রাষ্ট্র বা সরকারকে সরাসরি দেখে না, তারা দেখে ক্ষমতাসীন দলের স্থানীয় নেতা-কর্মীদের। তাই তাদের আচরণ যদি উদ্ধত হয়, তবে জনগণের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ তৈরি হয়।জনগণ যাতে অসন্তুষ্ট না হয় সেদিকে খেয়াল রাখার এবং দলীয় শৃঙ্খলা মেনে চলার যে নির্দেশ তারেক রহমান দিয়েছেন, তা যদি কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করা যায়, তবে তা হবে বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির জন্য একটি যুগান্তকারী পরিবর্তন। এর ফলে রাজনৈতিক দলগুলো ক্যাডারভিত্তিক সংগঠন থেকে জনকল্যাণমুখী সংগঠনে পরিণত হতে পারবে।
অপরাধ ও মতপ্রকাশের সীমারেখা: আইনের শাসন
রাজনৈতিক সমালোচনা, ব্যঙ্গ-বিদ্রুপ বা সরকারের নীতির বিরোধিতা করা কোনো অপরাধ নয়। কিন্তু উসকানিমূলক বক্তব্য (Hate Speech), যা সমাজে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা বাঁধাতে পারে, কারো ব্যক্তিগত সম্মানহানি (Defamation) বা রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রমূলক মিথ্যা তথ্য ছড়ানো (Disinformation)— এগুলো বাকস্বাধীনতার আওতায় পড়ে না।তবে চ্যালেঞ্জ হলো, অপরাধের সংজ্ঞা নির্ধারণ এবং বিচার প্রক্রিয়া। কোনো রাজনৈতিক নেতাকে অপছন্দ করা বা তার কাজের সমালোচনা করাকে যদি 'রাষ্ট্রদ্রোহ' বা 'মানহানি' হিসেবে সংজ্ঞায়িত করে পুলিশ লেলিয়ে দেওয়া হয়, তবে তা হবে আইনের অপব্যবহার। প্রকৃত অপরাধ এবং রাজনৈতিক মতপার্থক্যের মধ্যে একটি স্পষ্ট বিভাজন রেখা থাকতে হবে। পুলিশ কাজ করবে সুনির্দিষ্ট ফৌজদারি অপরাধ দমনে, কারো মুখ বন্ধ করার হাতিয়ার হিসেবে নয়। বিচার ব্যবস্থা হবে স্বাধীন এবং পুলিশ হবে নিরপেক্ষ।
স্থানীয় সরকার নির্বাচন এবং জনগণের অংশগ্রহণ
সামনে স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সংগঠনকে শক্তিশালী করার যে নির্দেশ বিএনপি দিয়েছে, তা গণতান্ত্রিক কাঠামোর একদম শেকড় মজবুত করার সাথে সম্পর্কিত। স্থানীয় সরকার হলো গণতন্ত্রের নার্সারি। স্থানীয় পর্যায়ে যদি জনগণ নির্ভয়ে, পুলিশের ভয় বা ক্ষমতাসীনদের চাপ ছাড়াই তাদের প্রতিনিধি নির্বাচন করতে পারে এবং সেই জনপ্রতিনিধিদের কাজের সমালোচনা করতে পারে, তবেই পুরো রাষ্ট্রযন্ত্র একটি মজবুত ভিত্তির ওপর দাঁড়াবে।স্থানীয় সরকার ব্যবস্থায় সব জায়গায় যোগ্য প্রার্থী দেওয়া এবং সংগঠনকে শক্তিশালী করার অর্থ হলো, পেশিশক্তি বা পুলিশি ক্ষমতার ওপর নির্ভর না করে জনগণের ভালোবাসার ওপর নির্ভর করা। "এই সমর্থন ধরে রাখতে পরিশ্রম করতে হবে। ছাড় দিতে হবে।"— রাজনীতিতে এই 'ছাড় দেওয়া' বা সহনশীলতার (Tolerance) শিক্ষাই একটি সভ্য সমাজের সবচেয়ে বড় অলঙ্কার।
বিশেষজ্ঞদের মতামত
বিশ্লেষকদের মতে একটি ভীতিহীন, গণতান্ত্রিক ও মানবিক রাষ্ট্র গড়ার জন্য বাকস্বাধীনতার সুরক্ষা অপরিহার্য। "কথা বললেই পুলিশ ধরে নিয়ে যাবে"— এই চরম স্বৈরতান্ত্রিক মানসিকতা থেকে বেরিয়ে আসার যে রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করা হয়েছে, তা যদি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করে, তবে তা জনগণের জন্য সর্বোত্তম ফলাফল বয়ে আনবে।জনগণের সর্বোচ্চ কল্যাণের জন্য প্রয়োজন এমন একটি রাষ্ট্রব্যবস্থা, যেখানে পুলিশ হবে জনগণের বন্ধু, শোষকের লাঠিয়াল নয়; যেখানে রাজনৈতিক কর্মীরা হবেন জনগণের সেবক, সমাজের প্রভু নয়; এবং যেখানে প্রতিটি নাগরিক তার ন্যায্য কথাটি নির্ভয়ে বলতে পারবে।
এই লক্ষ্য অর্জনের জন্য শুধু রাজনৈতিক সদিচ্ছাই যথেষ্ট নয়, বরং আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর কাঠামোগত সংস্কার, বিচার বিভাগের পূর্ণ স্বাধীনতা এবং সমাজের সর্বস্তরে অন্যের মতামতের প্রতি সম্মান দেখানোর চর্চা একান্ত প্রয়োজন। তবেই সেই জনসমর্থন স্থায়ী হবে এবং রাষ্ট্র সঠিক পথে অগ্রসর হয়ে একটি সত্যিকারের উন্নত ও গণতান্ত্রিক সমাজে পরিণত হবে।
