শাপলা চত্বর ট্র্যাজেডি: প্রথম থেকে শেষ
শাপলা চত্বরের ৫ মে'র গণহত্যার গুম হওয়া সত্য উন্মোচন! আইসিটি ট্রাইব্যুনালের তদন্ত এবং বেওয়ারিশ লাশ দাফনের পরিসংখ্যানগত প্রমাণে দেখুন নিহতের প্রকৃত সংখ্
![]() |
২০১৩ সালের ৫ মে রাতে মতিঝিলের শাপলা চত্বরে অবস্থানরত নিরস্ত্র হেফাজতে ইসলামের কর্মীদের ওপর ফ্যাসিস্ট হাসিনা সরকারের বর্বরোচিত হামলা ও হত্যাযজ্ঞের দৃশ্য। |
ধর্ম অবমাননার প্রতিবাদ এবং ইসলামী মূল্যবোধ রক্ষার দাবিতে তারা দেশব্যাপী একটি বিশাল গণজাগরণ তৈরি করে। সরকারের কাছে নিজেদের দাবিদাওয়া তুলে ধরতে হেফাজতে ইসলাম '১৩ দফা দাবি' ঘোষণা করে। এই দাবিগুলো আদায়ের লক্ষ্যেই মূলত তারা ৫ই মে ঢাকা অবরোধ এবং মতিঝিলের শাপলা চত্বরে মহাসমাবেশের ডাক দেয়।
হেফাজতে ইসলামের প্রধান দাবিগুলো (১৩ দফার সারাংশ)
ধর্ম অবমাননার কঠোর আইন: সংবিধানে 'আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস' পুনঃস্থাপন করা এবং ইসলাম ও মহানবী (সা.)-এর কটূক্তিকারীদের সর্বোচ্চ শাস্তি (মৃত্যুদণ্ড) নিশ্চিত করতে জাতীয় সংসদে আইন পাস করা। কথিত নাস্তিক ব্লগারদের বিচার: যারা আল্লাহ, রাসূল (সা.) ও ইসলাম ধর্ম নিয়ে কটূক্তি করেছে, সেই 'নাস্তিক ব্লগারদের' গ্রেপ্তার ও ফাঁসি দেওয়া এবং তাদের পরিচালিত ব্লগগুলো বন্ধ করে দেওয়া। ইসলামবিরোধী নীতি বাতিল: সরকারের প্রস্তাবিত জাতীয় নারীনীতি ও শিক্ষানীতির যেসব ধারা ইসলামের সাথে সাংঘর্ষিক বলে তারা মনে করেছিল, সেগুলো বাতিল করা এবং শিক্ষার সর্বস্তরে ইসলামী শিক্ষাকে বাধ্যতামূলক করা। কাদিয়ানিদের অমুসলিম ঘোষণা: কাদিয়ানিদের (আহমদীয়া সম্প্রদায়) সরকারিভাবে অমুসলিম ঘোষণা করা এবং তাদের প্রকাশ্য প্রচারণা বন্ধ করা। অপসংস্কৃতি ও বেহায়াপনা বন্ধ: ব্যক্তি ও সমাজ জীবনে ইসলামবিরোধী কর্মকাণ্ড, সংস্কৃতির নামে বেহায়াপনা, অবাধ মেলামেশা এবং বিদেশি অপসংস্কৃতির অনুপ্রবেশ বন্ধ করা। আলেম-ওলামাদের সুরক্ষা: ভাস্কর্য নির্মাণের নামে মূর্তিপূজার সংস্কৃতি বন্ধ করা এবং আলেম-ওলামাদের ওপর জুলুম-নির্যাতন বন্ধ করে মসজিদ-মাদ্রাসাসহ ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
এই ১৩ দফা দাবি আদায়ের জন্য হেফাজতে ইসলাম ২০১৩ সালের ৫ই মে 'ঢাকা অবরোধ' কর্মসূচির ডাক দেয়। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত—গ্রাম, গঞ্জ ও মাদ্রাসা থেকে লাখ লাখ ছাত্র, শিক্ষক এবং সাধারণ মানুষ ঢাকার প্রবেশমুখগুলোতে অবস্থান নেয়। অবরোধ কর্মসূচি শেষে বিকেলে তারা মতিঝিলের শাপলা চত্বরে একটি বিশাল মহাসমাবেশের আয়োজন করে। প্রাথমিকভাবে মহাসমাবেশ শেষে তাদের নিজ নিজ গন্তব্যে ফিরে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু দাবি আদায়ের প্রশ্নে সরকারের পক্ষ থেকে সুস্পষ্ট কোনো আশ্বাস না পেয়ে এবং ঢাকার বিভিন্ন জায়গায় পুলিশের হামলার জেরে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।
দিনের শেষের দিকে হেফাজতে ইসলামের নেতারা ঘোষণা দেন যে, দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত তারা শাপলা চত্বরেই তাদের অবস্থান চালিয়ে যাবেন। মূলত, ইসলাম অবমাননার প্রতিবাদ, নিজেদের ধর্মীয় বিশ্বাস ও মূল্যবোধ রক্ষা এবং ১৩ দফা দাবি আদায়ের জন্য সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করতেই সেদিন দেশের নানা প্রান্ত থেকে লাখো সাধারণ মানুষ ও আলেম-ওলামা শাপলা চত্বরের সমাবেশে যোগদান করেছিলেন। আর এই নিরস্ত্র ও শান্তিপূর্ণ অবস্থান কর্মসূচীর জের ধরে রাতেই আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তাদের ওপর ইতিহাসের সেই ভয়াবহ ক্র্যাকডাউন চালায়।
দীর্ঘ এক দশকেরও বেশি সময় ধরে এই রাতের প্রকৃত ঘটনা, নিহতের সংখ্যা এবং রাষ্ট্রীয় বাহিনীর নির্মমতার চিত্র তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে ধামাচাপা দিয়ে রেখেছিল। তবে সময়ের পরিক্রমায়, ক্ষমতার পালাবদলের পর আজ সেই গুম হওয়া সত্যগুলো একে একে বেরিয়ে আসছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের (আইসিটি) সাম্প্রতিক তদন্ত এবং গাণিতিক ও পরিসংখ্যানগত অকাট্য প্রমাণের ভিত্তিতে শাপলা চত্বরে সংঘটিত এই মানবতাবিরোধী অপরাধের এক পূর্ণাঙ্গ ও ভয়াবহ চিত্র এখন জাতির সামনে উন্মোচিত হয়েছে।
সম্প্রতি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম সাংবাদিকদের সামনে এক চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ করেছেন। তিনি সুস্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, ২০১৩ সালের ৫ই মে শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের মহাসমাবেশে একটি সুপরিকল্পিত গণহত্যা চালানো হয়েছিল। ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা দীর্ঘ সময় ধরে অত্যন্ত নিবিড়ভাবে এই ঘটনার তদন্ত করছে এবং ইতোমধ্যেই প্রায় ৯০ শতাংশ তদন্ত কাজ সম্পন্ন হয়েছে।
এই প্রাথমিক তদন্তেই অন্তত ৩২ জনকে নির্মমভাবে হত্যার সুনির্দিষ্ট প্রমাণ পেয়েছে ট্রাইব্যুনালের তদন্ত দল। চিফ প্রসিকিউটর আশা প্রকাশ করেছেন, চলতি মাসেই এই তদন্তের পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন দাখিল করা সম্ভব হবে। এই গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ মোট ২০ থেকে ২৫ জনকে আসামি করা হতে পারে বলে তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন। তবে তদন্তের বৃহত্তর স্বার্থে এখনই সব আসামির নাম প্রকাশ করা থেকে বিরত থাকছে ট্রাইব্যুনাল।
ইতিমধ্যেই আইসিটি ট্রাইব্যুনালে দায়ের হওয়া একটি মিস কেসে ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত সাবেক ফ্যাসিস্ট প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ মোট ৯ জনকে প্রাথমিকভাবে প্রধান আসামি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এই আসামিদের তালিকায় রয়েছে দেশের বড় বড় রাঘব বোয়ালেরা। যাদের মধ্যে রাষ্ট্রীয় উচ্চপদস্থ থেকে শুরু করে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তারা এই গণহত্যার মাস্টারমাইন্ড হিসেবে কাজ করেছিলেন। যাদের মধ্যে চারজন ইতিমধ্যেই গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে আছেন।
তারা হলেন—সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামসুল হক টুকু, পুলিশের সাবেক আইজিপি এ কে এম শহীদুল হক, গুম ও ক্রসফায়ারের অন্যতম কারিগর হিসেবে পরিচিত বরখাস্ত হওয়া সেনা কর্মকর্তা মেজর জেনারেল (অব.) জিয়াউল আহসান এবং পুলিশের সাবেক উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি) মোল্যা নজরুল ইসলাম, অন্যদিকে, প্রধান আসামি ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনাসহ বাকি পাঁচজন বর্তমানে পলাতক রয়েছেন। এই পলাতক আসামিরা হলেন—তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহীউদ্দীন খান আলমগীর, গণজাগরণ মঞ্চের মুখপাত্র ইমরান এইচ সরকার, পুলিশের তৎকালীন মহাপরিদর্শক (আইজিপি) হাসান মাহমুদ খন্দকার এবং আরেক সাবেক আইজিপি ও র্যাবের সাবেক ডিজি বেনজীর আহমেদ।
৫ই মে'র এই মর্মান্তিক ঘটনার পর থেকে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন ফ্যাসিস্ট সরকার ও তার আজ্ঞাবহ প্রশাসন নিহতের সংখ্যা নিয়ে লাগাতার মিথ্যাচার করে এসেছে। ঘটনার পর পরই শেখ হাসিনার তৎকালীন সামরিক সচিব প্রকাশ্যে এসে দাবি করেছিলেন যে, শাপলা চত্বরের অভিযানে কেউ মারা যায়নি। তিনি দেশবাসীকে বিভ্রান্ত করার জন্য বলেছিলেন, "মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সুস্পষ্ট নির্দেশনা ছিল আলেম-ওলামা এবং কোমলমতি শিক্ষার্থীদের যেন কোনো ক্ষতি না হয়। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী অত্যন্ত ধৈর্যের সাথে পরিস্থিতি সামাল দিয়েছে। নিহতের যে তালিকা দেওয়া হচ্ছে তা অপপ্রচার, আমরা খোঁজ নিয়ে দেখেছি তারা মাদ্রাসায় শিক্ষকতা করছেন।" কেউ মসজিদে ইমামমতি করছেন। রাষ্ট্রের একটি শীর্ষ পর্যায় থেকে এমন নির্লজ্জ মিথ্যাচার শুধু নিহতদের পরিবারকেই নয়, বরং পুরো দেশের মানুষকে স্তব্ধ করে দিয়েছিল।
মানবাধিকার সংস্থা অধিকারের তদন্ত রিপোর্ট
এই রাষ্ট্রীয় মিথ্যাচারের বিরুদ্ধে প্রথম শক্ত অবস্থান নিয়েছিল মানবাধিকার সংস্থা 'অধিকার'। তারা অত্যন্ত সাহসিকতার সাথে অনুসন্ধান চালিয়ে ৬১ জন নিহতের একটি তালিকা তৈরি করে। এই তালিকাটি তারা হেফাজতে ইসলামের কাছে হস্তান্তরও করেছিল। কিন্তু সত্য প্রকাশ করায় ফ্যাসিস্ট হাসিনা সরকার ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে। অধিকার-এর এই কাজের অপরাধে সংস্থাটির নন্দিত মানবাধিকার নেতা ও সম্পাদক আদিলুর রহমান শুভ্রকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাকে গুম বা হত্যা করার গভীর ষড়যন্ত্র থাকলেও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোর প্রবল চাপের মুখে সরকার তা বাস্তবায়ন করতে পারেনি। তবে তার বিরুদ্ধে বানোয়াট মামলা দিয়ে দিনের পর দিন হয়রানি করা হয়। মূলত, ফ্যাসিস্ট হাসিনা সরকার দেশে একটি ভয়ের রাজত্ব কায়েম করে রেখেছিলো, যেন কেউ শাপলা চত্বরের নিহতের সংখ্যা নিয়ে টুঁ শব্দটিও করতে না পারে। কিন্তু সত্য তো আর কখনো চিরকাল চাপা থাকে না।৭১ এর ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি'র রিপোর্ট
এটি অবশ্যই একটি চমকপ্রদ ঘটনা, কেননা আওয়ামী লীগের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ এবং হেফাজতে ইসলামের চরম বিরোধী হিসেবে পরিচিত '৭১ এর ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি'র নিজস্ব তদন্তেই এই সরকারের মিথ্যাচার ধরা পড়ে যায়। শাহরিয়ার কবিরের নেতৃত্বাধীন এই 'মৌলবাদী ও সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাসী গণতদন্ত কমিশন'-এ ছিলেন অধ্যাপক অজয় রায়, মুনতাসির মামুন, শ্যামলী নাসরিন চৌধুরী, আবুল বারাকাত ও তুরিন আফরোজের মতো ব্যক্তিরা।যারা কোনোভাবেই হেফাজতের প্রতি সহানুভূতিশীল ছিলোনা, বরং চরম বিরোধী অবস্থান ছিলো হেফাজতের ব্যাপারে, অথচ তাদের দুই খণ্ডের রিপোর্টেই দেখা যায়, ৫ই মে ঢাকায় ২৪ জন, ৬ই মে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে ৯ জন, ৬ই মে হাটহাজারীতে ৫ জন এবং কুমিল্লায় ১ জনসহ মোট ৩৯ জন বেসামরিক ব্যক্তি নিহত হন। এছাড়া ৬ জন পুলিশ ও বিজিবি সদস্যসহ মোট ৪৫ জনের মৃত্যুর হিসাব তারা নিজেরাই নথিবদ্ধ করেছেন। যে সরকার দাবি করেছিল 'কেউ মারা যায়নি', তাদেরই আশীর্বাদপুষ্ট একটি কট্টর বিরোধী প্যানেলের এই রিপোর্ট প্রমাণ করে যে, নিহতের ঘটনা শুধু সত্যই ছিল না, বরং তা ছিল অত্যন্ত ব্যাপক।
তবে নিহতের প্রকৃত সংখ্যা এই ৩৯ বা ৬১-এর গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ নয়। স্বৈরশাসকরা যখন গণহত্যা চালায়, তখন তাদের প্রধান লক্ষ্য থাকে লাশ গুম করা। কারণ, একটি লাশ অসংখ্য প্রশ্নের জন্ম দেয়। মাটিতে পুঁতে রাখা হলেও নিহতদের শরীরে বিদ্ধ বুলেট কখনো পচে না, তা ফরেনসিক প্রমাণ হিসেবে থেকে যায়। তাই লাশ গুম করার সবচেয়ে 'নিরাপদ' রাষ্ট্রীয় পদ্ধতি হলো মৃতদেহগুলোকে 'বেওয়ারিশ' বা অজ্ঞাতপরিচয় হিসেবে আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে দাফন করে ফেলা। আর বাংলাদেশে এই বেওয়ারিশ লাশ দাফনের কাজটি আনুষ্ঠানিকভাবে করে থাকে আঞ্জুমান মফিদুল ইসলাম। এই আঞ্জুমান মফিদুল ইসলামের দাফনের পরিসংখ্যান গভীরভাবে বিশ্লেষণ করলে ৫ই মে'র গণহত্যার এক ভয়াবহ ও রোমহর্ষক সত্য বেরিয়ে আসে।
বেওয়ারিশ লাশের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ
পরিসংখ্যানগত বিশ্লেষণে (Statistical Analysis) দেখা যায়, আঞ্জুমান মফিদুল ইসলামের মাধ্যমে ২০১০ সালে ১২৪টি, ২০১১ সালে ১,১৯১টি এবং ২০১২ সালে ১,২৪৭টি বেওয়ারিশ লাশ দাফন করা হয়। অথচ ২০১৩ সালে এই সংখ্যাটি অস্বাভাবিকভাবে লাফি দিয়ে দাঁড়ায় ১,৪৩০-এ, যা অন্য যেকোনো সাধারণ বছরের তুলনায় অনেক বেশি। এটিকে যদি আমরা মাসভিত্তিক বিভাজন করে দেখি, তবে বিষয়টি আরও পরিষ্কার হয়ে যাবে।২০১২ সালের জুলাই থেকে ২০১৩ সালের এপ্রিল পর্যন্ত ১০ মাসে গড়ে প্রতি মাসে প্রায় ১০৩ জনের মতো বেওয়ারিশ লাশ দাফন করা হয়েছে। কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে শুধু ২০১৩ সালের মে মাসেই দাফন করা হয় অবিশ্বাস্য সংখ্যক ৩৬৭ জন বেওয়ারিশ লাশ! এটি মাসিক গড়ের চেয়ে ২৬৪ জন বেশি। এই অস্বাভাবিক সংখ্যাটিকে শুধু খালি চোখে 'বেশি' বললেই হবে না, বরং এটিকে পরিসংখ্যানের বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে 'আউটলায়ার' (Outlier) বা অস্বাভাবিক মান হিসেবে প্রমাণ করা সম্ভব। পরিসংখ্যানে 'মিন' (Mean) বা গড় এবং 'স্ট্যান্ডার্ড ডেভিয়েশন' (Standard Deviation) বা পরিমিত ব্যবধান ব্যবহার করে একটি উপাত্তের স্বাভাবিক সীমা নির্ধারণ করা যায়।
স্বাভাবিক ডিস্ট্রিবিউশন কার্ভ অনুযায়ী, বেশিরভাগ ডাটা গড়ের কাছাকাছি থাকে। গড়ের সাথে স্ট্যান্ডার্ড ডেভিয়েশনের দ্বিগুণ যোগ করলে আমরা 'আপার লিমিট' (Upper Limit) বা উচ্চসীমা পাই। এই সীমার বাইরে যে সংখ্যাটি অবস্থান করে, সেটিকেই আউটলায়ার বলা হয়, অর্থাৎ এটি কোনো স্বাভাবিক প্রক্রিয়ার অংশ নয়, বরং কোনো বড় ধরনের অস্বাভাবিক ঘটনার ফসল।
আঞ্জুমান মফিদুল ইসলামের এই মাসিক দাফনের ডাটাগুলোকে এক্সেলে (Excel) ফেলে হিসাব করলে দেখা যায়, মাসভিত্তিক দাফনের গড় (Mean) দাঁড়ায় ১০৫ জনের কাছাকাছি এবং স্ট্যান্ডার্ড ডেভিয়েশন আসে প্রায় ৪২। সেই অনুযায়ী, আপার লিমিট বা স্বাভাবিক দাফনের সর্বোচ্চ সীমা কোনোভাবেই নির্দিষ্ট একটি অঙ্কের বেশি হওয়ার কথা নয়। কিন্তু মে মাসের ৩৬৭ জন দাফনের এই সংখ্যাটি আপার লিমিটের চেয়েও অনেক, অনেক দূরে অবস্থান করে। কন্ডিশনাল ফরম্যাটিংয়ের মাধ্যমে দেখা যায়, পুরো বছরের মধ্যে একমাত্র মে মাসের ৩৬৭ সংখ্যাটিই হলো একটি চরম মাত্রার 'আউটলায়ার'।
যদি আমরা এই আউটলায়ার থেকে নিহতের ন্যূনতম সংখ্যা বের করতে চাই, তবে মে মাসের মোট দাফন (৩৬৭) থেকে আপার লিমিট (গড় + স্ট্যান্ডার্ড ডেভিয়েশনের দ্বিগুণ) বিয়োগ করতে হবে। এই গাণিতিক হিসাব করলে যে সংখ্যাটি বেরিয়ে আসে তা হলো কমপক্ষে ৭১ জন। অর্থাৎ, ২০১৩ সালের মে মাসে অন্তত ৭১টি বেওয়ারিশ লাশ দাফন করা হয়েছে যা কোনোভাবেই স্বাভাবিক মৃত্যু বা নিয়মিত বেওয়ারিশ লাশের অংশ নয়। এটি সম্পূর্ণ বৈজ্ঞানিক ও পরিসংখ্যানগতভাবে প্রমাণিত যে, এই ৭১টি লাশ অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে গুম করে আঞ্জুমান মফিদুল ইসলামের মাধ্যমে দাফন করতে বাধ্য করা হয়েছিল।
এখন আমরা যদি নিহতের মোট সংখ্যাটি মেলাতে চাই, তবে হিসাবটি খুব সরল ও ভয়ংকর। ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির মতো চরম বিরোধী গোষ্ঠীর চিহ্নিত করা নাম-পরিচয়সহ নিহত আলেম ও সাধারণ মানুষের সংখ্যা হলো ৩৯ জন। এর সাথে যদি পরিসংখ্যানগতভাবে প্রমাণিত মে মাসের অতিরিক্ত বেওয়ারিশ দাফন হওয়া ৭১ জনকে যোগ করা হয়, তবে ৫ই মে এবং এর আশেপাশের সময়ে নিহতের মোট সংখ্যা দাঁড়ায় কমপক্ষে ১১০ জনে (৩৯ + ৭১ = ১১০)। এই ১১০ জন মানুষের মৃত্যু কোনো বিচ্ছিন্ন দুর্ঘটনা ছিল না; এটি ছিল রাষ্ট্রের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে ব্যবহার করে চালানো একটি পরিকল্পিত ম্যাসাকার।
এই পরিসংখ্যান ও তথ্যগুলো প্রমাণ করে যে, তৎকালীন স্বৈরাচারী সরকার কতটা সুনিপুণভাবে তাদের অপরাধ ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করেছিল। তারা ভেবেছিল, লাশ গুম করে বেওয়ারিশ হিসেবে দাফন করলেই তাদের অপরাধ মাটিচাপা পড়ে যাবে। কিন্তু তারা বুঝতে পারেনি যে, বিজ্ঞান, পরিসংখ্যান এবং প্রযুক্তির এই যুগে কোনো সত্যকেই চিরকাল অন্ধকারে রাখা যায় না। প্রতিটি উপাত্ত, প্রতিটি বেওয়ারিশ লাশের রেকর্ড আজ তাদের বিরুদ্ধে সাক্ষী দিচ্ছে।
আদালতের প্রাথমিক রিপোর্টে কি আছে?
আজ আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল যখন ৩২ জনের হত্যার অকাট্য প্রমাণ পাওয়ার কথা আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করছে, তখন তা মূলত এই দীর্ঘ এক দশকের চাপা পড়া সত্যেরই একটি আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি। ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা, তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, আইজিপি, র্যাব প্রধান থেকে শুরু করে যারা এই হত্যাযজ্ঞের নির্দেশদাতা এবং বাস্তবায়নকারী ছিলেন, আজ তাদের প্রত্যেকের কুকীর্তি আইনি কাঠামোর ভেতরে প্রবেশ করেছে। ৫ই মে রাতে যারা শাপলা চত্বরে বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে, রাতের আঁধারে ঘুমন্ত ও নিরস্ত্র আলেম-ওলামা ও মাদ্রাসা পড়ুয়া ছোটো-ছোটো বাচ্চাদের ওপর বুলেটের বৃষ্টি ঝরিয়েছিল, তারা আজ আইনের চোখে পলাতক ও দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি।শাপলা চত্বরের এই গণহত্যা শুধু বাংলাদেশের আইনি ইতিহাসের জন্যই নয়, বরং একটি জাতির ন্যায়বিচারের মাপকাঠি হিসেবেও বিবেচিত হবে। এই তদন্ত এবং বিচার প্রক্রিয়া আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, ক্ষমতা চিরস্থায়ী নয়, কিন্তু সত্য অবিনশ্বর। শহীদদের রক্তের প্রতিটি ফোঁটা, প্রতিটি গুম হওয়া লাশের হিসাব আজ কড়ায়-গণ্ডায় নেওয়া হচ্ছে। ট্রাইব্যুনালের আসন্ন পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন শুধু ৩২ জন নয়, বরং পরিসংখ্যান ও প্রমাণের ভিত্তিতে বেরিয়ে আসা প্রতিটি হারানো প্রাণের স্বীকৃতি ও বিচার নিশ্চিত করবে—এটাই আজ সমগ্র জাতির প্রত্যাশা।

