গভর্মেন্টের মধ্যে অনেক গুলো গভর্নমেন্ট আছে কিন্তু তারা কারা বুঝা যাচ্ছে না: হাসনাত

সরকারের ভেতরে সরকার—দেশ আসলে চালাচ্ছে কারা? সিদ্ধান্ত গ্রহণের ধোঁয়াশা, গোপন ক্ষমতার বলয় এবং আমলাতন্ত্র নিয়ে এমপি হাসনাত আব্দুল্লাহর বিস্ফোরক বক্তব্যের
সরকারের ভেতরে সরকার—দেশ আসলে চালাচ্ছে কারা? :হাসনাত আব্দুল্লাহ
গভর্মেন্টের মধ্যে অনেক গুলো গভর্নমেন্ট আছে কিন্তু তারা কারা বুঝা যাচ্ছে না: হাসনাত

​সাম্প্রতিক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এনসিপি (NCP) নেতা এবং বর্তমান সংসদ সদস্য হাসনাত আব্দুল্লাহর একটি বক্তব্য জাতীয় রাজনীতিতে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। তাঁর এই দীর্ঘ এবং স্পষ্ট বক্তব্যে উঠে এসেছে বর্তমান সরকারের রাষ্ট্র পরিচালনার ধরণ, আমলাতন্ত্রের দৌরাত্ম্য, বিচার বিভাগ ও পুলিশের দলীয়করণ এবং সর্বোপরি নির্বাচন-পূর্ববর্তী প্রতিশ্রুতির সাথে নির্বাচন-পরবর্তী বাস্তবতার আকাশপাতাল ফারাক। ৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থান এবং জুলাই প্রজন্মের আকাঙ্ক্ষাকে ধারণ করে তিনি যে বার্তা দিয়েছেন, তা কেবল একটি রাজনৈতিক সমালোচনাই নয়, বরং বর্তমান রাষ্ট্রকাঠামোর একটি গভীর ময়নাতদন্ত।
​ ​

জ্বালানি খাত নিয়ে উদ্বেগ

​হাসনাত আব্দুল্লাহ তাঁর বক্তব্যের শুরুতেই দেশের জ্বালানি খাতের একটি ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরেছেন। সরকারের ডিজেল নির্ভরতা এবং স্পট মার্কেট থেকে জ্বালানি কেনার প্রক্রিয়ায় আমলাদের ভূমিকার কঠোর সমালোচনা করেছেন তিনি। তাঁর মতে, সরকারের ভেতরে থাকা অনেক আমলা দেশপ্রেমিক হলেও, একটি বড় অংশ সরকারি পদের অপব্যবহার করে বিভিন্ন প্রাইভেট কোম্পানির 'এজেন্ট' হিসেবে কাজ করছে। তারা নিজেদের ব্যক্তিগত এজেন্ডা সরকারের পলিসিতে ঢুকিয়ে দিচ্ছে। এটি একটি রাষ্ট্রের জন্য চরম বিপদের সংকেত, যেখানে নীতিনির্ধারণী পর্যায় পুঁজিপতিদের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়।

এই আমলাতান্ত্রিক সিন্ডিকেট ভাঙতে এবং জ্বালানি নিরাপত্তায় স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনে তিনি নবায়নযোগ্য শক্তির (Renewable Energy) ওপর জোর দিয়েছেন। ৭ থেকে ৯ গিগাওয়াট পর্যন্ত নবায়নযোগ্য শক্তির উৎপাদন বাড়াতে পারলে দেশের সার্বিক চাহিদা মেটানো সম্ভব বলে তিনি মনে করেন। এর মাধ্যমে শুধু আমদানিনির্ভরতাই কমবে না, বরং জ্বালানি খাতের সিন্ডিকেটও দুর্বল হবে।

সরকারের ভেতরে অনেক গুলো সরকার

​বক্তব্যের অন্যতম তাৎপর্যপূর্ণ অংশ হলো বর্তমান সরকারের সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা নিয়ে তাঁর পর্যবেক্ষণ। তিনি বিগত শেখ হাসিনা সরকারের সাথে বর্তমান সরকারের একটি তুলনামূলক চিত্র এঁকেছেন। তিনি বলেন, বর্তমান সরকারের ​সিদ্ধান্তের কেন্দ্রবিন্দু আসলে কোথায়? সেটা বুঝা যাচ্ছে না। শেখ হাসিনার শাসনামলে একটি বিষয় স্পষ্ট ছিল যে, দিনশেষে যেকোনো সিদ্ধান্তের কেন্দ্রবিন্দু ছিলেন শেখ হাসিনা। কিন্তু বর্তমান সরকারের ক্ষেত্রে হাসনাত আব্দুল্লাহর পর্যবেক্ষণ হলো—এখানে কে সিদ্ধান্ত নিচ্ছে তা স্পষ্ট নয়। "সরকারের ভেতরে আরও অনেক সরকার আছে" (Governments within government) কাজ করছে বলে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন।

​তিনি উল্লেখ করেন যে, প্রধানমন্ত্রীকে বা নীতিনির্ধারকদের প্রতিনিয়ত 'ভুল বোঝানো' হচ্ছে। সরকারের চারপাশে এমন কিছু প্রান্তিক বা সুবিধাবাদী গোষ্ঠী অবস্থান নিয়েছে, যারা রাষ্ট্র সংস্কারের মূল জন-আকাঙ্ক্ষা থেকে সরকারকে যোজন যোজন দূরে সরিয়ে নিচ্ছে।

​ সংস্কারের নামে প্রতারণা এবং রাজনৈতিক ভণ্ডামি

​হাসনাত আব্দুল্লাহ বক্তব্যে রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের অভিযোগ তুলেন। তিনি সরাসরি জনাব সালাহউদ্দিন সাহেবের একটি বক্তব্যের উদ্ধৃতি দিয়ে বর্তমান ক্ষমতাসীনদের মনস্তত্ত্ব উন্মোচন করেছেন। ​তিনি অভিযোগ করেন যে, নির্বাচন যেন কোনোভাবেই না পিছিয়ে যায়, সে জন্য নির্বাচনের আগে সংস্কারের সমস্ত দাবি মৌখিকভাবে মেনে নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু ক্ষমতায় বসার পর সেই প্রতিশ্রুতিগুলো ছুঁড়ে ফেলা হয়েছে।

​নির্বাচন হয়ে যাওয়ার পর এখন আর সাধারণ মানুষকে পাত্তা দেওয়া হচ্ছে না। হাসনাত আব্দুল্লাহ একে সরাসরি "ভণ্ডামি" বলে আখ্যায়িত করেছেন। তাঁর মতে, সরকার মনে করছে যেহেতু তারা নির্বাচিত হয়ে গেছে, তাই এখন আর জনমতের তোয়াক্কা করার কোন প্রয়োজন নেই। এর ফলে দেশের প্রতিটি সাধারণ নাগরিক এবং ভোটার চরমভাবে প্রতারিত হয়েছেন। এমনকি যারা বিএনপিকে ভোট দিয়ে নির্বাচিত করেছেন, তারাও এই কাঠামোগত পরিবর্তনের অভাবে হতাশ।

​বিচার বিভাগ ও পুলিশেকে দলীয়করণ

​রাষ্ট্রের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দুটি স্তম্ভ—বিচার বিভাগ এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সংস্কার না হওয়া নিয়ে তিনি তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। দীর্ঘ ১৭ বছর ধরে পুলিশকে যেভাবে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে, তা থেকে বেরিয়ে আসার জন্য একটি 'পুলিশ সংস্কার কমিশন' গঠন করা অত্যাবশ্যকীয় ছিল। পুলিশের নিজেদের সুরক্ষার জন্যই এটি দরকার ছিল। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, পুলিশের পোস্টিং, প্রমোশন এবং পদায়ন এখনো মন্ত্রীদের মর্জির ওপর নির্ভরশীল। কাঠামোতে কোনো পরিবর্তন আসেনি।

বিচার বিভাগের স্বাধীন সচিবালয় করার যে দাবি ছিল, তা বাস্তবায়িত হয়নি। আইনমন্ত্রী সংসদে দাঁড়িয়ে অসত্য তথ্য দিয়েছেন বলে হাসনাত আব্দুল্লাহ অভিযোগ করেন। যদিও খাতাকলমে বলা হচ্ছে যে বিচারকদের পোস্টিং বা প্রমোশনে আইনমন্ত্রীর এখতিয়ার নেই, কিন্তু বাস্তবে আইনমন্ত্রী যা চান, তা-ই হয়। এই পরিস্থিতিতে বিচারকদের পক্ষে ভয়হীনভাবে বিচারকার্য পরিচালনা করা অসম্ভব।

​নতুন স্বৈরাচারের আশঙ্কা

​হাসনাত আব্দুল্লাহ একটি ভয়ংকর রাজনৈতিক বাস্তবতার দিকে আঙুল তুলেছেন। শেখ হাসিনা সবকিছু নিজের হাতে কেন্দ্রীভূত করেও শেষ পর্যন্ত টিকে থাকতে পারেননি। কিন্তু সেই পতন থেকে বর্তমান সরকার শিক্ষা নেয়নি। তিনি একটি উদাহরণ দিয়ে বলেন যে, মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মচারীর নিখোঁজ ছেলেকে খুঁজে বের করার মতো সাধারণ বিষয়ও তারেক জিয়াকে সমাধান করতে হচ্ছে। সবকিছুর নিয়ন্ত্রণ শীর্ষ নেতৃত্বের হাতে রাখার এই প্রবণতা রাষ্ট্রের প্রাতিষ্ঠানিক অসহায়ত্ব প্রমাণ করে। সবকিছু একজন ব্যক্তির আঙুলের ইশারায় চলার এই সংস্কৃতি কখনোই গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের জন্য সুখকর হতে পারে না।

বক্তব্যে তিনি আরো বলেন—এমন কোনো রাষ্ট্রকাঠামো বা সিস্টেম যেন আর বিদ্যমান না থাকে, যার ভেতরে প্রবেশ করে যেকোনো সাধারণ ব্যক্তি আবার নতুন করে 'শেখ হাসিনা' হয়ে বের হয়ে আসে। অর্থাৎ, ব্যক্তি বদলালেও যদি স্বৈরাচারী কাঠামো না বদলায়, তবে ফ্যাসিবাদ বারবার ফিরে আসবে।