ক্রুড অয়েলের সংকট কাটিয়ে উৎপাদনে ফিরছে দেশের একমাত্র রিফাইনারি

দীর্ঘ এক মাসের ক্রুড অয়েল বা অপরিশোধিত তেলের তীব্র সংকট কাটিয়ে অবশেষে উৎপাদনে ফিরছে দেশের একমাত্র রাষ্ট্রায়ত্ত ইস্টার্ন রিফাইনারি। মধ্যপ্রাচ্যের সংকট
দেশের একমাত্র রাষ্ট্রায়ত্ত জ্বালানি তেল পরিশোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারি পিএলসি (ইআরএল)
 দেশের একমাত্র রাষ্ট্রায়ত্ত জ্বালানি তেল পরিশোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারি পিএলসি (ইআরএল)

নিজস্ব প্রতিবেদক : শ্রেয়া ঘোষ
​দীর্ঘ প্রায় এক মাস বন্ধ থাকার পর অবশেষে স্বস্তির খবর দেশের জ্বালানি খাতে। অপরিশোধিত জ্বালানি তেল বা ক্রুড অয়েলের তীব্র সংকট কাটিয়ে আবারও উৎপাদনে ফিরতে যাচ্ছে দেশের একমাত্র রাষ্ট্রায়ত্ত জ্বালানি তেল পরিশোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারি পিএলসি (ইআরএল)। বৈশ্বিক সাপ্লাই চেইন বা সরবরাহ শৃঙ্খলের বাধা পেরিয়ে নতুন করে অপরিশোধিত তেলের চালান দেশে এসে পৌঁছানোয় আগামী ৭ মে থেকে প্রতিষ্ঠানটির মূল পরিশোধন কার্যক্রম পুনরায় শুরু হওয়ার কথা জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।

​মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক সংকট ও যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে বিশ্বব্যাপী জ্বালানি পরিবহনে যে স্থবিরতা তৈরি হয়েছিল, তা ধীরে ধীরে কাটতে শুরু করেছে। এর ফলে বাংলাদেশের জ্বালানি তেলের সরবরাহ ব্যবস্থাও পুনরায় স্বাভাবিক হওয়ার পথে এগোচ্ছে।

​মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতার প্রভাব

​বর্তমান বিশ্বায়নের যুগে বিশ্বের এক প্রান্তের অস্থিরতা যে অন্য প্রান্তে কতটা গভীর প্রভাব ফেলতে পারে, ইস্টার্ন রিফাইনারির এই সংকট তার একটি বড় প্রমাণ। মূলত মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতি এবং ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনার কারণেই এই তীব্র কাঁচামাল সংকট তৈরি হয়। বিশেষ করে আন্তর্জাতিক জ্বালানি পরিবহনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও ব্যস্ততম নৌপথ ‘হরমুজ প্রণালী’ এবং লোহিত সাগরে জাহাজ চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হওয়ায় বিশ্বব্যাপী জ্বালানি সরবরাহে বড় ধরনের বিপর্যয় নেমে আসে।

​নিরাপত্তা ঝুঁকির কারণে অনেক বড় বড় শিপিং কোম্পানি তাদের জাহাজের রুট পরিবর্তন করতে বাধ্য হয়, যার ফলে পরিবহন সময় ও খরচ—দুটিই বহুগুণ বেড়ে যায়। এই আন্তর্জাতিক লজিস্টিক বিপর্যয়ের সরাসরি প্রভাব পড়ে বাংলাদেশের ওপর। গত ১৮ ফেব্রুয়ারির পর দেশে আর কোনো ক্রুড অয়েল বা অপরিশোধিত তেলের জাহাজ এসে পৌঁছাতে পারেনি।

​৫৬ বছরের ইতিহাসে প্রথম সম্পূর্ণ শাটডাউন ইস্টার্ন রিফাইনারি

​কাঁচামালের সরবরাহ না থাকায় ইস্টার্ন রিফাইনারিকে এক জটিল পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়। মজুত থাকা অপরিশোধিত তেল দিয়ে কিছুদিন অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে কার্যক্রম চালানো হলেও, একপর্যায়ে কাঁচামালের সম্পূর্ণ ঘাটতি দেখা দেয়। এর ফলশ্রুতিতে গত ১৪ এপ্রিল ইস্টার্ন রিফাইনারির ক্রুড অয়েল প্রসেসিং ইউনিট (Crude Oil Processing Unit) পুরোপুরি বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয় কর্তৃপক্ষ।

​১৯৬৮ সালে এই রিফাইনারিটি বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু করার পর গত ৫৬ বছরে নানা চড়াই-উতরাই পেরিয়েলেও, কাঁচামালের অভাবে সম্পূর্ণ উৎপাদন বন্ধ করে দেওয়ার মতো ঘটনা এবারই প্রথম ঘটল। এটি দেশের জ্বালানি খাতের জন্য একটি ব্যতিক্রমী, নজিরবিহীন এবং একইসঙ্গে উদ্বেগজনক ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। উৎপাদন বন্ধ থাকায় দেশের অভ্যন্তরীণ জ্বালানি সরবরাহে, বিশেষ করে শিল্প ও পরিবহন খাতে মনস্তাত্ত্বিক ও কাঠামোগত ব্যাপক চাপ তৈরি হয়েছে।

​অপেক্ষার প্রহর শেষ, বন্দরে ভিড়তে চলেছে নতুন তেলের জাহাজ

​সংকট নিরসনে এবং বিকল্প পথে দ্রুত তেল আমদানির জন্য বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) জরুরি ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করে। এর সুফল হিসেবে দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে সৌদি আরব থেকে প্রায় এক লাখ মেট্রিক টন ক্রুড অয়েলবাহী একটি বিশাল জাহাজ দেশের উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছে। ​সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, জাহাজটি পৌঁছানো এবং তেল খালাসের একটি সুনির্দিষ্ট সময়রেখা নির্ধারণ করা হয়েছে:
  • ​৫ মে: অপরিশোধিত তেলবাহী জাহাজটি সফলভাবে চট্টগ্রাম বন্দরে এসে পৌঁছাবে। ​
  • ৬ মে: জাহাজ থেকে ক্রুড অয়েল খালাস বা আনলোডিংয়ের কাজ শুরু হবে এবং রিফাইনারির স্টোরেজ ট্যাংকে তা জমা করা হবে। ​
  • ৭ মে: তেল খালাস ও কারিগরি সব প্রস্তুতি সম্পন্ন হওয়ার পর ইস্টার্ন রিফাইনারির প্রসেসিং ইউনিটটি আবার চালু করা হবে এবং পুরোদমে পরিশোধন কার্যক্রম শুরু হবে।

​ইস্টার্ন রিফাইনারির সক্ষমতা ও পরিশোধিত তেলের ধরন

​বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তার এক অন্যতম প্রধান স্তম্ভ হলো ইস্টার্ন রিফাইনারি। প্রতিষ্ঠানটি মূলত দুই ধরনের উচ্চমানের অপরিশোধিত তেল পরিশোধন করে থাকে:

  • এরাবিয়ান লাইট (Arabian Light): যা মূলত সৌদি আরব থেকে আমদানি করা হয়।
  • মারবান (Murban): যা সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই) থেকে আনা হয়।


​প্রতি বছর দেশের ক্রমবর্ধমান জ্বালানি চাহিদা মেটাতে বিপিসি প্রায় ১৫ লাখ মেট্রিক টন অপরিশোধিত তেল আমদানি করে থাকে, যার পুরোটাই এই রিফাইনারিতে পরিশোধন করে ব্যবহারযোগ্য বিভিন্ন ধরনের জ্বালানি (যেমন: ডিজেল, পেট্রোল, অকটেন, কেরোসিন, ফার্নেস অয়েল ইত্যাদি) তৈরি করা হয়। অপরিশোধিত তেল এনে দেশে পরিশোধন করা আর্থিকভাবে অনেক বেশি সাশ্রয়ী। তাই এই পরিশোধনাগারটি একদিন বন্ধ থাকা মানে জাতীয় অর্থনীতিতে এর নেতিবাচক প্রভাব প্রকট।

​সরবরাহ স্থিতিশীল রাখতে দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ

​ইস্টার্ন রিফাইনারির উপ-মহাব্যবস্থাপক (প্ল্যানিং অ্যান্ড শিপিং) মো. মোস্তাফিজুর রহমান বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন। তিনি নিশ্চিত করেছেন যে, ৭ মে উৎপাদন শুরু হওয়ার পর আপাতত দেশে আর কোনো বড় ধরনের জ্বালানি সংকটের আশঙ্কা নেই। ​সরবরাহ ব্যবস্থা পুরোপুরি নিরবচ্ছিন্ন রাখতে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন ও বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশন (বিএসসি) যৌথভাবে কাজ করছে।

পরিকল্পনা অনুযায়ী: ​চলতি মে মাসের মধ্যেই সৌদি আরব বা বিকল্প উৎস থেকে আরও একটি জাহাজে করে অতিরিক্ত ক্রুড অয়েল দেশে পৌঁছানোর কথা রয়েছে। ​এছাড়াও মাসের শেষ দিকে সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে আরও এক লাখ মেট্রিক টন 'মারবান' ক্রুড অয়েল আমদানির প্রক্রিয়া চূড়ান্ত করা হয়েছে।

​ধারাবাহিকভাবে এই জাহাজগুলো দেশে আসতে শুরু করলে রিফাইনারির উৎপাদন আর বাধাগ্রস্ত হবে না এবং বাজারে জ্বালানির সরবরাহ পুরোপুরি স্থিতিশীল হবে।
গভর্মেন্টের মধ্যে অনেক গুলো গভর্নমেন্ট আছে কিন্তু তারা কারা বুঝা যাচ্ছে না: হাসনাত
আরও পড়ুন →