আয়-ব্যয়ের বিশাল ব্যবধানে দিশেহারা সরকার

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে গভীর সংকট: রেকর্ড পরিমাণ রাজস্ব ঘাটতি, ব্যাংক ঋণের বোঝা এবং ডলার সংকটে দিশেহারা রাষ্ট্র। মূল্যস্ফীতি ও রিজার্ভের চাপে সাধারণ মান
Bangladesh Economy, Revenue Deficit, Remittance
অর্থনীতিতে গভীর সংকটে বাংলাদেশ
বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনীতি এখন এক গভীর ও জটিল সন্ধিক্ষণের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। একদিকে রাষ্ট্রের বিশাল খরচের বোঝা, অন্যদিকে তলানিতে গিয়ে ঠেকছে আয়ের উৎস। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (NBR) সাম্প্রতিক তথ্য এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের ঋণের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, রাষ্ট্র নামক এই বিশাল কাঠামোটি এখন অনেকটা মধ্যবিত্ত পরিবারের মতো দিশেহারা—যেখানে মাসের শেষে হিসাব মেলাতে গিয়ে গৃহকর্তার কপালে দুশ্চিন্তার ভাঁজ।

রাজস্ব ঘাটতির ভয়াবহ চিত্র

চলতি অর্থবছরের প্রথম আট মাসে বাংলাদেশের রাজস্ব আহরণের চিত্র বড়ই করুণ। সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এই সময়ে রাজস্ব ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৭১,৪৭২ কোটি টাকা।

লক্ষ্যমাত্রা ছিল: ৩ লাখ ২৫,৮০২ কোটি টাকা। আদায় হয়েছে মাত্র: ২ লাখ ৫,৪৩০ কোটি টাকা।

অর্থাৎ, লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে আদায়ের হার প্রায় ২২ শতাংশ পিছিয়ে আছে। বাকি চার মাসে ৩ লাখ কোটি টাকা আদায়ের যে চ্যালেঞ্জ, তা প্রায় অসম্ভব বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। কারণ, এখন পর্যন্ত কোনো মাসেই ৪০ হাজার কোটি টাকার বেশি রাজস্ব আদায় করা সম্ভব হয়নি, অথচ লক্ষ্য পূরণ করতে হলে প্রতি মাসে দরকার ৭৫ হাজার কোটিরও বেশি।

কর ব্যবস্থাপনার ভঙ্গুর দশা

আয়কর, ভ্যাট এবং আমদানি শুল্ক—তিনটি প্রধান খাতেই ধস নেমেছে। কেননা বছর বছর করদাতার সংখ্যা বৃদ্ধি হলেও রাজস্ব বাড়ছে না। দেশে প্রায় ১ কোটি ২৮ লাখ টিআইএন (TIN) ধারী থাকলেও রিটার্ন জমা দিচ্ছেন মাত্র ৪৬ লাখ মানুষ। এই বিশাল গ্যাপ প্রমাণ করে যে, দেশের কর নেট এখনো কতটা দুর্বল এবং প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার কতটা অভাব রয়েছে। এর পাশাপাশি ডলার সংকটের কারণে আমদানি কমে তলানিতে। যেকারণে ভ্যাট ও শুল্ক আদায় বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

জোড়াতালি দিয়ে চলছে রাষ্ট্র

রাজস্ব আয় না থাকলেও রাষ্ট্রের খরচ কিন্তু থেমে নেই। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা থেকে শুরু করে ঋণের সুদ ও বড় প্রকল্পের ব্যয় মেটাতে সরকার বাধ্য হয়ে ব্যাংক থেকে থেকে লোন করছে। ​অর্থবছরের প্রথম নয় মাসেই ব্যাংক থেকে সরকারের ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৯ হাজার কোটি টাকা।

এটি চলতি বছরের মূল লক্ষ্যমাত্রাকেও ছাড়িয়ে গেছে। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন যে, সরকার যদি এভাবে ব্যাংক থেকে টাকা তুলে নেয়, তবে বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবাহ সংকুচিত হবে। এতে বিনিয়োগ কমবে, নতুন শিল্প কলকারখানা গড়ে উঠবে না এবং কর্মসংস্থান থমকে যাবে।

আইএমএফে ঋণের কিস্তি নিয়ে অনিশ্চয়তা

বর্তমানে দেশের মোট বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ ২৩ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে। এর মধ্যে আগামী পাঁচ বছরেই পরিশোধ করতে হবে প্রায় ২৬ বিলিয়ন ডলার। অন্যদিকে, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (IMF) ৪.৭৫ বিলিয়ন ডলার ঋণের পরবর্তী কিস্তি পাওয়া নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। শর্ত পূরণে ব্যর্থতার কারণে বৈদেশিক সহায়তার যে আশ্বাস ছিল, তাতেও এখন কালো মেঘ জমেছে।

জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি ও মূল্যস্ফীতি

​বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম বাড়ার ফলে সরকার বাধ্য হয়ে দেশেও জ্বালানি তেলের দাম বাড়িয়েছে। যদিও সরকার বার-বার আশ্বস্ত করেছিলো দাম বাড়ানো হবেনা, তবে শেষমেশ ভর্তুকির চাপ কমাতে তেলের দাম বাড়িয়েছে সরকার। যদিও প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা রুহুল কবির রেজভী বলেছেন, জনগণের দাবির কারণেই সরকার তেলের দান কিছুটা বাড়িয়েছে। তবে এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে সাধারণ মানুষের ওপরে। বর্তমানে মূল্যস্ফীতি ৮ শতাংশের ওপরে। মানুষের মজুরি বৃদ্ধির হারের চেয়ে ব্যয়ের গতি বেশি হওয়ায় সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে অনেক গেছে।

দারিদ্র্যের খটখটানি ও জিডিপি প্রবৃদ্ধি

​বিগত কয়েক বছরে বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি ধারাবাহিকভাবে কমছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা নেমে এসেছে মাত্র ৩.৪৯ শতাংশে। প্রবৃদ্ধির সুফল সাধারণ মানুষের কাছে না পৌঁছানোয় দেশে দারিদ্র্য আবার মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে বর্তমানে দারিদ্র্যের হার ২১.২ শতাংশ, অর্থাৎ প্রায় ৩ কোটি ৬০ লাখ মানুষ দারিদ্র্যসীমার চরম নিচে বাস করছে। আয় বৈষম্য বা এখন ০.৫-এর কাছাকাছি, যা উচ্চ বৈষম্যের স্পষ্ট ইঙ্গিত।

কর্মসংস্থান নাই বেকার হচ্ছে মানুষ

​বাংলাদেশের অর্থনীতি এখন খাদের কিনারে। একদিকে আকাশছোঁয়া মূল্যস্ফীতি কমানোর জন্য সুদের হার বাড়ানো জরুরি, অন্যদিকে সুদের হার বাড়লে বিনিয়োগ থমকে যাওয়ার আশংকা এবং নতুন কর্মসংস্থান বন্ধ হওয়ার ঝুঁকি থাকে। সরকার একসঙ্গে বাজার নিয়ন্ত্রণ ও উন্নয়ন—দুই দিক সামলানোর চেষ্টা করলেও বিশেষজ্ঞরা একে প্রায় অসম্ভব বলে মনে করছেন। তাদের মতে, অর্থনীতির ভিত শক্ত না করে শুধু উচ্চাভিলাসী প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা দিলে তা দীর্ঘস্থায়ী হবে না; বরং এই মুহূর্তে প্রবৃদ্ধির চেয়ে আর্থিক স্থিতিশীলতা ফেরানোই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

ব্যাংকিং খাতের নাজুক অবস্থা ও খেলাপি ঋণ

​দেশের আর্থিক খাতের সবচেয়ে বড় ক্ষত হলো ব্যাংক খাতের খেলাপি ঋণ। রাজনৈতিক প্রভাব এবং দুর্বল তদারকির কারণে এই খাতটি এখন অর্থনীতির সবচেয়ে দুর্বল জায়গা। আমানতকারীদের আস্থা ফেরাতে কয়েকটি ব্যাংককে জরুরি তারল্য সহায়তা দিয়ে টিকিয়ে রাখা হচ্ছে। তবে বড় ধরনের সংস্কার ছাড়া এই সংকট কাটিয়ে ওঠা কঠিন হবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

​রেমিট্যান্সে শেষ ভরসা

​দেশের বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্য এখন বেশ সংকটে। একদিকে পণ্য আমদানির খরচ হু হু করে বাড়ছে, কিন্তু সেই তুলনায় রপ্তানি আয় বাড়ছে না। এই মুহুর্তে প্রবাসীদের ঘাম ঝরানো অর্থ অক্সিজেন দিচ্ছে রাষ্ট্রকে। তবে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতি এবং জ্বালানি সংকট এই ভরসার জায়গাতেও অনিশ্চয়তার কালো মেঘ তৈরি করেছে। ডলারের তীব্র সংকটে টাকার মান যখন প্রতিনিয়ত কমছে, তখন রেমিট্যান্স প্রবাহ কাঙ্ক্ষিত হারে না বাড়লে রিজার্ভের পতন ঠেকানো এবং দেশের অর্থনীতিকে সচল রাখা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়বে।
জনগণের দাবীতে তেলের দাম কিছুটা বেড়েছে রুহুল কবির রেজভী, জনগণের লিখিত
আরও পড়ুন →