![]() |
| অর্থনীতিতে গভীর সংকটে বাংলাদেশ |
রাজস্ব ঘাটতির ভয়াবহ চিত্র
চলতি অর্থবছরের প্রথম আট মাসে বাংলাদেশের রাজস্ব আহরণের চিত্র বড়ই করুণ। সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এই সময়ে রাজস্ব ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৭১,৪৭২ কোটি টাকা।লক্ষ্যমাত্রা ছিল: ৩ লাখ ২৫,৮০২ কোটি টাকা। আদায় হয়েছে মাত্র: ২ লাখ ৫,৪৩০ কোটি টাকা।
অর্থাৎ, লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে আদায়ের হার প্রায় ২২ শতাংশ পিছিয়ে আছে। বাকি চার মাসে ৩ লাখ কোটি টাকা আদায়ের যে চ্যালেঞ্জ, তা প্রায় অসম্ভব বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। কারণ, এখন পর্যন্ত কোনো মাসেই ৪০ হাজার কোটি টাকার বেশি রাজস্ব আদায় করা সম্ভব হয়নি, অথচ লক্ষ্য পূরণ করতে হলে প্রতি মাসে দরকার ৭৫ হাজার কোটিরও বেশি।
কর ব্যবস্থাপনার ভঙ্গুর দশা
আয়কর, ভ্যাট এবং আমদানি শুল্ক—তিনটি প্রধান খাতেই ধস নেমেছে। কেননা বছর বছর করদাতার সংখ্যা বৃদ্ধি হলেও রাজস্ব বাড়ছে না। দেশে প্রায় ১ কোটি ২৮ লাখ টিআইএন (TIN) ধারী থাকলেও রিটার্ন জমা দিচ্ছেন মাত্র ৪৬ লাখ মানুষ। এই বিশাল গ্যাপ প্রমাণ করে যে, দেশের কর নেট এখনো কতটা দুর্বল এবং প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার কতটা অভাব রয়েছে। এর পাশাপাশি ডলার সংকটের কারণে আমদানি কমে তলানিতে। যেকারণে ভ্যাট ও শুল্ক আদায় বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
জোড়াতালি দিয়ে চলছে রাষ্ট্র
রাজস্ব আয় না থাকলেও রাষ্ট্রের খরচ কিন্তু থেমে নেই। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা থেকে শুরু করে ঋণের সুদ ও বড় প্রকল্পের ব্যয় মেটাতে সরকার বাধ্য হয়ে ব্যাংক থেকে থেকে লোন করছে। অর্থবছরের প্রথম নয় মাসেই ব্যাংক থেকে সরকারের ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৯ হাজার কোটি টাকা।এটি চলতি বছরের মূল লক্ষ্যমাত্রাকেও ছাড়িয়ে গেছে। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন যে, সরকার যদি এভাবে ব্যাংক থেকে টাকা তুলে নেয়, তবে বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবাহ সংকুচিত হবে। এতে বিনিয়োগ কমবে, নতুন শিল্প কলকারখানা গড়ে উঠবে না এবং কর্মসংস্থান থমকে যাবে।
আইএমএফে ঋণের কিস্তি নিয়ে অনিশ্চয়তা
বর্তমানে দেশের মোট বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ ২৩ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে গেছে। এর মধ্যে আগামী পাঁচ বছরেই পরিশোধ করতে হবে প্রায় ২৬ বিলিয়ন ডলার। অন্যদিকে, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (IMF) ৪.৭৫ বিলিয়ন ডলার ঋণের পরবর্তী কিস্তি পাওয়া নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। শর্ত পূরণে ব্যর্থতার কারণে বৈদেশিক সহায়তার যে আশ্বাস ছিল, তাতেও এখন কালো মেঘ জমেছে।জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি ও মূল্যস্ফীতি
বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম বাড়ার ফলে সরকার বাধ্য হয়ে দেশেও জ্বালানি তেলের দাম বাড়িয়েছে। যদিও সরকার বার-বার আশ্বস্ত করেছিলো দাম বাড়ানো হবেনা, তবে শেষমেশ ভর্তুকির চাপ কমাতে তেলের দাম বাড়িয়েছে সরকার। যদিও প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা রুহুল কবির রেজভী বলেছেন, জনগণের দাবির কারণেই সরকার তেলের দান কিছুটা বাড়িয়েছে। তবে এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে সাধারণ মানুষের ওপরে। বর্তমানে মূল্যস্ফীতি ৮ শতাংশের ওপরে। মানুষের মজুরি বৃদ্ধির হারের চেয়ে ব্যয়ের গতি বেশি হওয়ায় সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে অনেক গেছে।
দারিদ্র্যের খটখটানি ও জিডিপি প্রবৃদ্ধি
বিগত কয়েক বছরে বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি ধারাবাহিকভাবে কমছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা নেমে এসেছে মাত্র ৩.৪৯ শতাংশে। প্রবৃদ্ধির সুফল সাধারণ মানুষের কাছে না পৌঁছানোয় দেশে দারিদ্র্য আবার মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে বর্তমানে দারিদ্র্যের হার ২১.২ শতাংশ, অর্থাৎ প্রায় ৩ কোটি ৬০ লাখ মানুষ দারিদ্র্যসীমার চরম নিচে বাস করছে। আয় বৈষম্য বা এখন ০.৫-এর কাছাকাছি, যা উচ্চ বৈষম্যের স্পষ্ট ইঙ্গিত।

