আজ জাতীয় সংসদের অধিবেশনে হাসনাত আব্দুল্লাহ সংবিধানের সীমাবদ্ধতা, গণঅভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপট এবং বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের বৈধতা নিয়ে এক সাহসী ও তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ তুলে ধরেছেন। আন্দালিব রহমান পার্থের বক্তব্যের পাল্টা জবাব দিতে গিয়ে তিনি স্পষ্ট করেছেন যে, যখন একটি দেশে গণঅভ্যুত্থান ঘটে, তখন জনগণের ইচ্ছাই সর্বোচ্চ আইন হিসেবে গণ্য হয়, কোনো নির্দিষ্ট কিতাব বা নথি নয়।
বক্তব্যের শুরুতেই তিনি ব্যারিস্টার আন্দালিব রহমান পার্থের সংবিধান বিষয়ক অবস্থানের কঠোর সমালোচনা করেন। তিনি অভিযোগ করেন, কিছু রাজনৈতিক পক্ষ সংবিধানের কেবল সেই অংশগুলোই মানছে যা তাদের স্বার্থ রক্ষা করে, আর যা বিপক্ষে যায় তা তারা অস্বীকার করছে। একে তিনি 'সুবিধাবাদী' (Opportunist) রাজনীতি হিসেবে অভিহিত করেন। তার মতে, একটি অভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে "কিছু মানবো আর কিছু মানবো না"—এমন দ্বিমুখী অবস্থান সাংবিধানিক স্থিতিশীলতার পরিপন্থী।
হাসনাত আরো বলেন, যদি বর্তমান সংবিধানকে 'বাইবেল' বা 'গসপেল'-এর মতো অলঙ্ঘনীয় ধরা হয়, তবে ৫ই আগস্ট পরবর্তী অনেক সিদ্ধান্তই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে। তিনি উল্লেখ করেন, ছয়ই আগস্টের পর ছাত্র-জনতার আকাঙ্ক্ষা ছিল বেগম জিয়াকে অবিলম্বে মুক্তি দেওয়া। যদি সংবিধানের আক্ষরিক প্রয়োগ হতো, তবে সেই মুহূর্তে তার মুক্তি আইনি জটিলতায় আটকে যেত। জনরায়ের ভিত্তিতেই বেগম জিয়া কারামুক্ত হয়েছেন।
মাননীয় সংসদ সদস্য হাসনাত আব্দুল্লাহর বক্তব্য হুবহু তুলে ধরা হলো:
"আন্দালিব রহমান পার্থ সাহেব যে বক্তব্য দিয়েছেন, আমরা ক্লাস এইট-নাইনে যে ডিবেট করতাম—এটি রিভার্টাল দিলে ২০ মিনিট সময় লাগবে, মাননীয় স্পিকার। মাননীয় স্পিকার, কিছুক্ষণ আগে আমাদের সর্বশ্রদ্ধেয় মাননীয় সংসদ আন্দালিব রহমান পার্থ যখন বক্তব্য দিচ্ছিলেন, উনি যখন বললেন সংবিধান যারা ছুড়ে ফেলতে চায় তাদেরকে স্বাধীনতা বিরোধীর সাথে উনি এলাইন করলেন, ট্যাগ করলেন মাননীয় স্পিকার। এবং তখন ট্রেজারি বেঞ্চের সম্মানিত মাননীয় মন্ত্রী যারা ছিলেন, তারা সেটাকে টেবিল চাপড়িয়ে সেটাকে সমর্থন দিলেন।
মাননীয় স্পিকার, গণতন্ত্রের জন্য যিনি আপসহীন লড়াই করে গিয়েছেন, বেগম জিয়া—উনি বলেছিলেন, যেদিন জনতার সরকার প্রতিষ্ঠিত হবে, যেদিন এই পার্লামেন্ট জনতার সরকারের কাছে যাবে, সেদিন এই সংবিধানকে ছুড়ে ফেলা হবে। ট্রেজারি বেঞ্চের যে মন্ত্রীরা ছিলেন, তারা দীর্ঘদিন—তাদের সারাজীবন তারা বেগম জিয়ার সাথে রাজনীতি করেছেন। এই সংবিধান ছুড়ে ফেলার সাথে স্বাধীনতা যুদ্ধাপরাধীর এলাইন করার যেটার হাততালি তারা দিয়েছেন, সেটির মধ্য দিয়ে বেগম জিয়াকে তারা মূলত হচ্ছে অপমান করেছেন কিনা, তারা সেটা ভেবে দেখবেন।
মাননীয় স্পিকার, আমি বক্তব্য দেয়ার জন্য অনেক কিছু রেডি করে নিয়ে এসেছিলাম। আমাদের আইনমন্ত্রী বলেছেন রুশো পড়ার জন্য, তারপরে হচ্ছে হবস পড়ার জন্য, মদিনা সনদ পড়ার জন্য—পড়েছিলাম। কিন্তু আন্দালিব রহমান পার্থ সাহেব যে বক্তব্য দিয়েছেন, আমরা ক্লাস এইট-নাইনে যে ডিবেট করতাম, এটি রিভার্টাল দিলে ২০ মিনিট সময় লাগবে মাননীয় স্পিকার।
আমি উনার বক্তব্যের রিভার্টাল দিচ্ছি। উনি বলেছেন—উনাকে আমি কোট করছি—উনি বলেছেন, ৭২-এর সংবিধানের কিছু কিছু বিষয়কে উনারা সম্মান দিয়েছেন। তার মানে কিছু কিছু বিষয়কে উনারা সম্মান দেন নাই। তার মানে এই অভ্যুত্থানের পরে এই সংবিধানের কিছু অংশ উনারা মেনেছেন, কিছু অংশ উনারা মানেন নাই। উনারা কেবল ওই অংশটাই মেনেছেন যেই অংশটা উনাদের পক্ষে গিয়েছে। যে অংশটা উনাদের বিপক্ষে গিয়েছে, এ অংশটা উনাদের মানেন নাই।
মাননীয় স্পিকার, এই ধরনের প্রকৃতিসম্পন্ন যারা আছে, বাংলাদেশের পার্লামেন্ট যারা দেখছেন তারা সিদ্ধান্ত নিবেন—যারা কখনো কখনো কনফার্মিস্ট, যারা কখনো কখনো রিফর্মিস্ট, তারা মূলত হচ্ছে অপরচুনিস্ট। এখন আমি সংবিধানের কিছু কিছু ধারা মানবো, কিছু কিছু ধারা মানবো না; আমি কখনো কখনো সাংবিধানিক, কখনো কখনো আমি অসাংবিধানিক!
মাননীয় স্পিকার, যখন ‘ডক্ট্রিন অফ নেসেসিটি’-র প্রশ্ন আসে মাননীয় স্পিকার, এই এক্সিস্টিং সংবিধান অনুযায়ী তখন সেভেন-এ (7A) এবং সেভেন-বি (7B) বলবৎ থাকে। এই জায়গা থেকে আইনজ্ঞরা... মাননীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী উনি থাকলে ভালো হতো। ডক্ট্রিন অফ নেসেসিটি মাননীয় স্পিকার, ৪৮-এর ৩ অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি সুপ্রিম কোর্টের মাধ্যমে একটা—এই ১০৬-এর অ্যাডভাইজারি একটা রুল আছে মাননীয় স্পিকার। এই অ্যাডভাইজারি রুলের মাধ্যমে সংবিধানের ফান্ডামেন্টাল কোন বিষয় কম্প্রমাইজ করা যায় না। মাননীয় স্পিকার, যদি আমি এই সংবিধান মানি, তাহলেই অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের বৈধতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়।
মাননীয় স্পিকার, মাননীয় স্পিকার, যদি এই সংবিধানকে আমি ধারণ করতে চাই, মেনে চলতে চাই—সেদিন ৬৪ বিধি অনুযায়ী অ্যাটর্নি জেনারেল নিয়োগ দেয়া হয়েছিল ৬ই আগস্ট। মাননীয় স্পিকার, এই সংসদে প্রশ্ন রাখতে চাই—তৎকালীন বর্তমান রাষ্ট্রপতি চুপ্পু, তখন বলা হয়েছে অ্যাটর্নি জেনারেল নিয়োগ দেয়ার ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রীর সাথে আলোচনা করতে হবে। সেদিন কোন প্রধানমন্ত্রীর সাথে আলোচনা করা হয়েছিল, সেটা আমাদেরকে অ্যাটর্নি জেনারেল জানাবেন। আমাদেরকে অ্যাটর্নি জেনারেল জানাবেন, এই হেয়ারিংটা হয়েছিল—এই হেয়ারিংয়ে উনি উপস্থিত কি না? তখনকার সময়ের যিনি প্রধান বিচারপতি ছিলেন ওবায়দুল হাসান, তিনি তখন কোথায় ছিলেন? সেই রায়ের কপিটা আমরা দেখতে চাই মাননীয় স্পিকার।
মাননীয় স্পিকার, আপনি যখন বেগম জিয়াকে... ছয় আগস্ট? সর্বপ্রথম ছাত্রজনতা যখন সিদ্ধান্ত নিয়েছিল আর এক মুহূর্ত বেগম জিয়াকে কারাগারে থাকতে দিবে না। বেগম জিয়াকে রাষ্ট্রপতির আদেশের মধ্য দিয়ে—বেগম জিয়াকে সেদিনই হচ্ছে কারাগার থেকে, এই জুলুমের মাধ্যমে রাখা, মধ্যে রাখা হয়েছিল, সেটা থেকে ছাত্রজনতার রায়ের মধ্য দিয়ে সেখান থেকে বের করে আনা হয়েছিল মাননীয় স্পিকার। যদি এই সংবিধানকে বাইবেল ধরে নেই, এই সংবিধানকে যদি গসপেল ধরে নেই, এই গসপেলের পুরোহিত অনুযায়ী যেভাবে ভ্যাটিকান সিটি চলে সেটা যদি আমরা ধরে নেই, তাহলে মাননীয় স্পিকার, সেদিন বেগম জিয়া জেল থেকে বের হতে পারেন না মাননীয় স্পিকার।
মাননীয় স্পিকার, সেদিন বেগম জিয়া জেল থেকে বের হয়েছিল অভ্যুত্থানের জনরায়ের ভিত্তিতে মাননীয় স্পিকার। মাননীয় স্পিকার, আপনারা বলছেন আপনারা ঠিক সেই সেই জায়গায় আপনারা সংবিধানকে আপনারা মানছেন যেই যেই জায়গায় সংবিধান থেকে আপনারা বেনিফিটেড হবেন মাননীয় স্পিকার। গ্রামের ভাষায় কথা আছে বলতে চাই না—‘গাঙ পার হইলে মাঝি কোন দুলাভাই?’ ছাত্ররা, আপনাদের নেতাকর্মীরা গত ১৭ বছর ধান খেতে ঘুমাইতে হইছে, ত্যাগ-তিতিক্ষার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। মহাসচিব কান্না করে বলেছে তাদের নেতাকর্মীরা ঢাকায় এসে রিকশা চালিয়ে জীবন নির্বাহ করে। মাইক অফ
মাননীয় স্পিকার। আজকে দেখেন, আজকে লক্ষ লক্ষ নেতাকর্মী তাদের রক্ত দিয়েছে। ফ্যাসিবাদ বিরোধী প্রত্যেকটি রাজনৈতিক দল—কোন রাজনৈতিক দলকে বিশেষভাবে আমি আলাদা করতে চাই না—ফ্যাসিবাদ বিরোধী প্রত্যেকটি রাজনৈতিক দলের রক্ত, শ্রম, ঘামের মধ্য দিয়ে এই হাসিনার পতন হয়েছে। হাসিনার পতনের পরে যখন জনরায় মাননীয় স্পিকার, তখন জনরায় কখনো কিতাবের কাছে মাথা নত করে না। এটা ভ্যাটিকান সিটি নয় যে গসপেল অনুযায়ী হচ্ছে দেশ পরিচালিত হবে। ৬৮% জনগণ তারা সিদ্ধান্ত জানিয়ে দিয়েছে এই সংবিধানের যেই বেসিক স্ট্রাকচারাল জায়গায় কোন জায়গাগুলোতে রিফর্মেশন আনতে হবে মাননীয় স্পিকার।
মাননীয় স্পিকার, আন্দালিব রহমান পার্থ সাহেব বলেছেন যে, অর্ডারে নাকি হচ্ছে সংবিধান সংস্কার পরিষদের গঠনটা নাই। উনি যদি একটু পরিশ্রম করতেন, জাস্ট একটা পাতা উল্টাইতেন—একটা পাতা পরেই বলা হয়েছে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন।
যদি হে জলযুক্ত... ধন্যবাদ মাননীয় সদস্য, ধন্যবাদ।"
মাইক অফ.....
3/related/default

