সচ্ছলতার নতুন মডেল হাসনাতের। অগ্নিপরীক্ষায় বাকি এমপিরা

Hasnat Abdullah
গতানুগতিক রাজনীতির বলয় ভেঙে এক নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করলেন নবনির্বাচিত সংসদ সদস্য হাসনাত আব্দুল্লাহ। দায়িত্ব গ্রহণের মাত্র ২১ দিনের মাথায় নিজের নির্বাচনী এলাকা দেবীদ্বারের উন্নয়ন বরাদ্দ ও ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লাইভে এসে যে স্বচ্ছতা তিনি প্রদর্শন করেছেন, তা দেশজুড়ে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

সাধারণত সংসদীয় আসনের উন্নয়ন বরাদ্দ, বিশেষ করে ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র আইটেম যেমন—ত্রাণের চাল বা উৎসবের খেজুরের হিসাব সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরেই থেকে যায়। কিন্তু হাসনাত আব্দুল্লাহর সাম্প্রতিক লাইভ সেশনটি কেবল তথ্যের আদান-প্রদান নয়, বরং বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে ‘স্বচ্ছতা’ ও ‘জবাবদিহিতা’র এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন।

হাসনাত আব্দুল্লাহর লাইভে সবচেয়ে চমকপ্রদ অংশ ছিল দেবীদ্বারের জন্য বরাদ্দ হওয়া ৮ কেজি ওজনের ৩৯ বক্স খেজুরের নিখুঁত হিসাব। কোন মাদরাসা কয় বক্স পাবে এবং কেন পাবে, তার মানদণ্ড তিনি স্পষ্টভাবে জনগণের সামনে তুলে ধরেন।

এই ক্ষুদ্র হিসাবটি কেন গুরুত্বপূর্ণ? বিশ্লেষকদের মতে, অতীতে এ ধরনের ছোটখাটো বরাদ্দগুলো স্থানীয় প্রভাবশালী নেতা বা রাজনৈতিক ক্যাডারদের পকেটে যেতো। সাধারণ জনগণ জানতেই পারত না যে তাদের জন্য রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে কী বরাদ্দ এসেছে। হাসনাত প্রমাণ করলেন, সামান্য কয়েক বক্স খেজুরের হিসাবও যদি জনসমক্ষে আনা যায়, তবে বড় প্রকল্পের দুর্নীতির টুটি চেপে ধরা সম্ভব।

নির্বাচনের আগে হাসনাত আব্দুল্লাহ বলেছিলেন, তিনি সংসদে গেলে বাকি এমপিদের ঘুম হারাম করে দেবেন। অনেকে একে পেশিশক্তির লড়াই ভেবেছিলেন। কিন্তু দেবীদ্বারের এই লাইভ সেশনটি পরিষ্কার করে দিয়েছে তার কৌশলের ধরণ। একজন এমপি যখন প্রকাশ্যে সব হিসাব দিয়ে দেন, তখন অন্যান্য আসনের ভোটাররা স্বাভাবিকভাবেই তাদের জনপ্রতিনিধির কাছে একই স্বচ্ছতা দাবি করবেন।

হাসনাত আব্দুল্লাহর এই উদ্যোগ কেবল নিজেকে সৎ প্রমাণ করা নয়, বরং একটি ‘প্রশ্নকারী জনতা’ তৈরি করা। মানুষ যখন জানবে বরাদ্দের পরিমাণ কত, তখন তারা স্থানীয় উন্নয়ন প্রকল্পে দুর্নীতির বিরুদ্ধে মুখ খোলার সাহস পাবে। মানুষ প্রশ্ন করা শিখবে।

রাস্তাঘাট ও জনস্বার্থ রক্ষায় হাসনাত আব্দুল্লাহর পরিকল্পনাগুলো ছিল অসাধারণ। কেউ যদি রাস্তার ধার ঘেষে পুকুর কেটে রাস্তার ক্ষতি করে, তবে সেই পুকুরের মাছ বিক্রি করে রাস্তা মেরামতের যে হুঁশিয়ারি তিনি দিয়েছেন, তা বাংলাদেশে বিরল। এটি মূলত সরকারি সম্পদের ওপর ব্যক্তিগত দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে এক শক্ত বার্তা।

এছাড়া কোন রাস্তা কোন কোম্পানি করছে, বরাদ্দের পরিমাণ কত এবং নির্দিষ্ট সময়সীমা—সবই তিনি জনসমক্ষে প্রকাশ করেছেন। এতে করে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের পক্ষে কাজে ফাঁকি দেওয়া বা নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহার করা কঠিন হয়ে পড়বে।

বিশেষজ্ঞদের মতে হাসনাত আব্দুল্লাহর এই কর্মকাণ্ড কেবল দেবীদ্বারের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এটি একটি দীর্ঘমেয়াদী রাজনৈতিক প্রভাবের ইঙ্গিত দিচ্ছে। তিনি যেমন ‘ছাত্রদের ক্লাস নেওয়ার মতো’ করে হাতে-কলমে শিখিয়ে দিচ্ছেন কীভাবে একজন জনপ্রতিনিধিকে জনগণের সেবক হতে হয়।

বাংলাদেশে সৎ নেতা তৈরি করা যতটা কঠিন, তার চেয়েও কঠিন সৎ ও সচেতন জনতা তৈরি করা। হাসনাত আব্দুল্লাহ সেই কঠিন কাজটিই শুরু করেছেন। তিনি প্রমাণ করছেন যে, স্বচ্ছতা কোনো বিলাসী শব্দ নয়, বরং এটি একজন রাজনীতিবিদের প্রধান হাতিয়ার। যদি দেশের বাকি এমপিরা এই মডেল অনুসরণ করতে বাধ্য হন, তবে দেশের শাসনব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন আসতে বাধ্য।

দেবীদ্বারের এই 'স্বচ্ছতা মডেল' এখন সারা দেশের মানুষের কাছে আলোচনার বিষয়। এখন প্রশ্ন একটাই—দেশের বাকি ৩০০ আসনের জনপ্রতিনিধিরা কি এই লাইভ জবাবদিহিতার চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করতে পারবেন?

Post a Comment

0 Comments