জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের রক্তস্নাত পথে দাঁড়িয়ে যে নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেছিল জনগণ, সেই স্বপ্নের আকাশে এখন বড় ধরনের রাজনৈতিক সংকটের মেঘ জমেছে। জাতীয় সংসদের উদ্বোধনী অধিবেশনে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন চুপ্পুর ভাষণ বর্জন এবং তার বিরুদ্ধে বিরোধী দলগুলোর তীব্র ক্ষোভ কেবল একটি সাংবিধানিক আনুষ্ঠানিকতার বিচ্যুতি নয়, বরং এটি রাষ্ট্রপ্রধানের নৈতিক ও রাজনৈতিক বৈধতা নিয়ে দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত ক্ষোভের বিস্ফোরণ।
রাষ্ট্রপতি চুপ্পুর বিরুদ্ধে প্রধান অভিযোগটি কেবল রাজনৈতিক রেষারেষি নয়, বরং এটি জুলাই বিপ্লবে শহীদদের রক্তের পবিত্রতা রক্ষার লড়াইয়ের সাথে যুক্ত। জামায়াতে ইসলামীর আমির ও বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমানসহ অন্যান্য রাজনৈতিক শক্তির মতে, রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিন বিগত ফ্যাসিবাদী আওয়ামী লীগ সরকারের সময়কালজুড়ে নীরব দর্শক ছিলেন। তার শাসনকালে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, আয়নাঘর, গুম এবং ভোটাধিকার হরণের যে মহোৎসব চলেছে, তার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রের অভিভাবক হিসেবে রাষ্ট্রপতি কোনো ভূমিকা রাখেননি।
সমালোচকদের মতে, রাষ্ট্রপ্রধানের চেয়ারে বসে যারা গত দেড় দশকের দুঃশাসনকে পরোক্ষ সমর্থন জুগিয়েছেন, জুলাই বিপ্লবের পরবর্তী নতুন বাংলাদেশে তাদের পদ আঁকড়ে থাকা নৈতিকভাবে অসম্ভব। শফিকুর রহমানের ভাষায়, "এই সংসদ জুলাই শহীদদের রক্তের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। যারা ফ্যাসিস্ট সরকারের দোসর ছিল, তাদের এখানে বক্তব্য দেওয়ার কোন অধিকার নেই।"
রাষ্ট্রপতির নৈতিক অবক্ষয়ের একটি বড় প্রমাণ হিসেবে তার এবং ক্ষমতাচ্যুত স্বৈরাচার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মধ্যকার সম্পর্কের অসংগতিকে তুলে ধরা হচ্ছে। ক্ষমতার বলয়ে থাকার সময় রাষ্ট্রপতি যে হীনম্মন্যতায় ভুগতেন, তা তার নিজের মুখেই ফুটে উঠেছে। হাসিনার প্রতি তার যে অন্ধ আনুগত্য ছিল, তা তিনি নিজেই এক ভিডিও বার্তায় স্বীকার করেছেন। রাষ্ট্রপতি ভিডিওটিতে বলেছেন:
"গত তিন মাস ধরে প্রধানমন্ত্রীকে সালাম করতে গেলে তিনি আমার সালাম নিতেন না। তো আমি দেখতাম, ওনার পায়ের ধুলো আমি পাই না। আমার মিশ্র প্রতিক্রিয়া হচ্ছিলো। যে ওনি কেন আমার সালাম নেন না। না থাক, থাক বলে আমাকে দূরে রাখতেন।"
এই স্বীকারোক্তিটি বাংলাদেশের রাজনীতির এক অন্ধকার দিক উন্মোচন করে। একজন রাষ্ট্রপতি, যিনি রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পদাধিকারী, তিনি যখন নিজেকে প্রধানমন্ত্রীর সামনে ‘পায়ের ধুলো পাওয়ার অযোগ্য’ মনে করেন, তখন রাষ্ট্রীয় মর্যাদার অবস্থান কোথায় গিয়ে ঠেকে? সমালোচকরা প্রশ্ন তুলছেন, যে ব্যক্তি নিজের আত্মসম্মান বিসর্জন দিয়ে হাসিনার দাসত্ব করেছেন, তিনি কীভাবে ৫ আগস্ট পরবর্তী বাংলাদেশে রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করবেন?
ডা. শফিকুর রহমানের অভিযোগ অনুযায়ী, চুপ্পুর অপরাধের তালিকায় কেবল ফ্যাসিবাদকে সমর্থনই নেই, বরং আছে সরাসরি মিথ্যাচার। ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার পদত্যাগের পর রাষ্ট্রপতি জাতির উদ্দেশে ভাষণে বলেছিলেন, তিনি প্রধানমন্ত্রীর পদত্যাগপত্র গ্রহণ করেছেন। কিন্তু পরবর্তীতে বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে তিনি এই তথ্য অস্বীকার করে নতুন করে বিতর্ক সৃষ্টি করেন। এই ‘ইউ-টার্ন’ তাকে জাতির সামনে একজন অবিশ্বস্ত ব্যক্তি হিসেবে দাঁড় করিয়েছে।
দ্বিতীয়ত, সংস্কার পরিষদের অধিবেশন না ডাকা এবং গণভোটের রায়কে অবজ্ঞা করাকে তার আরেকটি বড় অপরাধ হিসেবে দেখা হচ্ছে। ১২ ফেব্রুয়ারি জারি করা অর্ডিনেন্স অনুযায়ী, নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালনের কথা ছিল। কিন্তু সেই শপথের পর পরবর্তী ধাপগুলোতে রাষ্ট্রপতির নিষ্ক্রিয়তা বা অবহেলা বর্তমান সরকারকে সাংবিধানিক সংকটে ফেলেছে।
বৃহস্পতিবারের সংসদ অধিবেশনে বিরোধী দলের সদস্যদের প্লাকার্ড হাতে স্লোগান দেন,
‘কিলার চুপ্পু, হেট হেট’, ‘ফ্যাসিবাদ আর-গণতন্ত্র, একসাথে চলবে না’
এই বার্তা গুলো স্পষ্ট করে দেয় যে, বর্তমান সংসদে রাষ্ট্রপতির গ্রহণযোগ্যতা তলানিতে ঠেকেছে। ডা. শফিকুর রহমান ও ডা. সৈয়দ আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ তাহেরসহ অন্যান্য নেতারা যেভাবে মাইক ছাড়াই প্রতিবাদ জানিয়েছেন, তা ইঙ্গিত দেয় যে রাজপথের ভাষা এখন সংসদ ভবনের ভেতরেও সংক্রমিত হয়েছে।
বিরোধী দলীয় নেতার স্পষ্ট বক্তব্য হলো, তারা ১৮ কোটি মানুষের প্রতিনিধি হিসেবে সংসদে এসেছেন। জনগণের অধিকার আদায়ে তারা কোনো অন্যায়কে প্রশ্রয় দেবেন না। গত দেড় বছর ধরে তারা যে রাষ্ট্রপতির বৈধতা অস্বীকার করে আসছেন, এখন তা একটি জাতীয় ইস্যুতে পরিণত হয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের বর্তমান অবস্থান অত্যন্ত নাজুক। এমন হয়েছে যে তিনি পরগাছার মতো যে কোন কিছু আঁকড়ে ধরে বাঁচার চেষ্টা করছেন। একটি গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে আসা অন্তর্বর্তী সরকার বা পরবর্তী সরকারগুলোর জন্য এমন একজন ধ্বজভঙ্গ রাষ্ট্রপ্রধান বড় বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে, যিনি একই সঙ্গে ফ্যাসিবাদী অতীতের প্রতীক এবং সাংবিধানিক সত্যতা নিয়ে বিতর্কিত।
একজন রাষ্ট্রপতি যখন জাতির সামনে একজন "খুনির পায়ের ধুলো" না পাওয়ার ঘটনা নিয়ে আক্ষেপ করেন, তখন তিনি রাষ্ট্রের সম্মান বাড়ান না, বরং রাজনীতির চরম ব্যক্তিগতকরণের পরিচয় দেন। বর্তমান পরিস্থিতিতে তার বিদায় বা পদত্যাগের দাবি কেবল বিরোধী দলের রাজনৈতিক কৌশল নয়, এটি রাষ্ট্রের শুদ্ধিকরণের একটি অপরিহার্য অংশ বলে মনে করছেন সচেতন নাগরিক সমাজ।
জুলাই বিপ্লব কেবলমাত্র ক্ষমতা পরিবর্তনের লড়াই ছিল না, এটি ছিল রাষ্ট্রের মেরুদণ্ড পুনর্গঠনের অঙ্গীকার। সেই অঙ্গীকার পূরণের পথে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন এখন একটি বড় বাধা। ডা. শফিকুর রহমানের তোলা তিনটি মূল অভিযোগ—ফ্যাসিবাদী খুনের সহায়তা, জাতির সাথে মিথ্যাচার এবং সাংবিধানিক দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতা—একটি গভীর তদন্ত ও আত্মসমালোচনার দাবি রাখে।
বাংলাদেশ এখন এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে,যেখানে পুরোনো জঞ্জাল পরিষ্কার না করলে নতুন সংস্কার সফল হওয়া কঠিন। রাষ্ট্রপতি কি নিজে থেকে সরে দাঁড়িয়ে ইতিহাসের ভুল সংশোধন করবেন, নাকি রাজনৈতিক অস্থিরতার অনলে পুরো রাষ্ট্রযন্ত্রকে আরও দগ্ধ করবেন? উত্তরটি এখন সময়ের হাতে, তবে জনমতের রায় আজ সংসদের টেবিলে পরিষ্কারভাবে ফুটে উঠেছে।

0 Comments