২০২৪ সালের জুলাইয়ে যখন কোটা সংস্কার আন্দোলন এক দফার গণঅভ্যুত্থানে রূপ নিচ্ছিল, তখন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের একটি বক্তব্য আজ দুই বছর পর ইতিহাস বিকৃতির মুখোশ নগ্নভাবে উন্মোচিত করেছে।২০২৪ সালের জুলাই মাস। বাংলাদেশের রাজপথ তখন সাধারণ ছাত্র-ছাত্রীদের রক্তে রঞ্জিত। কোটা সংস্কারের দাবিতে শুরু হওয়া একটি শান্তিপূর্ণ আন্দোলন ততক্ষণে দানা বেঁধেছে এক অভূতপূর্ব গণঅভ্যুত্থানে। ঠিক সেই মাহেন্দ্রক্ষণে, ১৭ জুলাই ২০২৪ তারিখে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এক সংবাদ সম্মেলনে ঘোষণা করেছিলেন— “কোটা সংস্কার আন্দোলনের সঙ্গে বিএনপি জড়িত নয়।”
মির্জা ফখরুলের সেই বক্তব্যে আহত হয়েছিল পুরো বাংলাদেশের মানুষ। কেননা সারা বাংলাদেশ তখন বিএনপির দিকে চাতক পাখির মতো চেয়ে ছিলো। বাংলাদেশের মানুষ বিশ্বাস করে বিএনপি যদি আরো আগে ঘোষণা দিয়ে আন্দোলনের পক্ষে অবস্থান নিতো তবে এই বিজয় আরো অনেক আগেই অর্জন হতো। আরো অনেক জীবন আজ বেঁচে থাকতো। আজ সময়ের পরিক্রমায় যখন সেই আন্দোলন 'জুলাই বিপ্লব' হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, আজ সেই আন্দোলন সফল হওয়ার পর যখন কৃতিত্ব নেওয়ার পালা এসেছে, তখন বিএনপি নেতারা দাবি করছেন—লন্ডন থেকে আসা নির্দেশেই নাকি সব হয়েছে এবং তারাই এই বিপ্লবের আসল 'মাস্টারমাইন্ড'।
জুলাইয়ের সেই উত্তাল দিনগুলোতে যখন সাধারণ শিক্ষার্থীরা রাষ্ট্রীয় গুন্ডা বাহিনীর বুলেটের সামনে বুক পেতে দিচ্ছিলো, তখন দৃশ্যপট ছিল অত্যন্ত ভয়াবহ। ১৬ জুলাই রংপুরে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের ছাত্র আবু সাইদ পুলিশের বন্দুকের সামনে সিনা টান করে দাড়িয়ে ছিলেন। এবং খুব কাছ থেকে পুলিশ তার বুকে গুলি চালিয়ে হত্যা করে। এতে শহিদ হন আবু সাঈদ। ১৭ জুলাই পর্যন্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ সারা দেশের ক্যাম্পাসগুলোতে ছাত্রলীগ, হেলমেট বাহিনী, ও পুলিশ বাহিনী যৌথভাবে তান্ডব চালায়। তখন ছাত্রদের সাথে দফায় দফায় ধাওয়া পাল্টা ধাওয়া হয়। আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের পিছু হটাতে হেলমেট বাহিনীর রামদা আর পুলিশের ছররা গুলিতে শত শত শিক্ষার্থী আহত হতে থাকে। ছাত্ররা যখন হাসপাতালের বেডে কাতরাচ্ছিলেন, তখন বিএনপি ব্যস্ত ছিল নিজেদের গা বাঁচিয়ে চলতে।
আন্দোলনের শুরুতে যখন ঝুঁকি বেশি ছিল, গ্রেফতার ও মামলা হামলার ভয় ছিল, তখন বিএনপি নিজেদের 'নির্দোষ' প্রমাণ করতে মরিয়া ছিল। এটি কি এক ধরণের রাজনৈতিক কাপুরুষতা ছিলো না? আজ সেই বিএনপি লাশের পাহাড় ডিঙিয়ে যখন ক্ষমতার মসনদে বসেছে। তখন তারা নিজেদের সকাল সন্ধ্যা 'মাস্টারমাইন্ড' দাবি করছে। বাংলাদেশের কোটি কোটি মানুষ আজো বিশ্বাস করে, এই আন্দোলন ছিল স্বতঃস্ফূর্ত এবং অরাজনৈতিক। কোনো রাজনৈতিক দলের ইশারায় ছাত্ররা বুকের তাজা রক্ত রাজপথে ঢেলে দেয়নি। কোন রাজনৈতিক দলের প্রেসক্রিপশনে ছাত্ররা আবাবিল পাখির মতো নিজের জীবনকে উৎসর্গ করেনি। এখন বিএনপি এর কৃতিত্ব এককভাবে নিতে চায়।
তবে বাংলাদেশের কোটি জনতা মনে করে জুলাই কারো ব্যক্তিগত সম্পদ নয়। তাই বিএনপির এই ইতিহাস বিকৃতি তরুণ প্রজন্মের সেই পবিত্র আবেগকে ছোট করে দেখার শামিল। আন্দোলনের সময় রাজপথে বিএনপির কোনো সাংগঠনিক সক্রিয়তা বা নির্দেশনার লেশমাত্র ছিল না। এখন 'লন্ডন থেকে নির্দেশ' আসার যে গল্প ফাঁদা হচ্ছে তা মূলত সাধারণ মানুষের চোখে ধুলো দেওয়ার অপচেষ্টা মাত্র।
জুলাই বিপ্লবের সময়ের মির্জা ফখরুল আর বর্তমানের মির্জা ফখরুলের বক্তব্যের মধ্যে যে আকাশ-পাতাল পার্থক্য, তা প্রমাণ করে যে বাংলাদেশের বড় দলগুলোর কাছে সাধারণ মানুষের জীবনের চার পয়সারও কোন মূল্য নাই। যারা আবু সাঈদ বা মুগ্ধ আনাসদের আত্মত্যাগকে পুঁজি করে নিজেদের ক্ষমতার সিঁড়ি বানাতে চায়, তাদের মনে রাখা উচিত—জুলাই বিপ্লব কোনো দলের এজেন্ডা ছিল না, এটি ছিল একটি জাতির মুক্তির লড়াই। দ্বিতীয় স্বাধীনতার লড়াই। রাজনীতির এই নির্লজ্জ ভোলবদল প্রমাণ করে যে, বিএনপি আসলে বিপ্লবের সারথি নয়, বরং তারা কেবল সুযোগসন্ধানী এক রাজনৈতিক শক্তি।
ইতিহাসের নগ্ন বিকৃতি: গা বাঁচানো বিএনপি এখন কৃতিত্বের ‘মাস্টারমাইন্ড’
March 31, 2026
0
Tags

