যে কারণে গ্রেফতার হলো ওসমান বিন হাদি হত্যার প্রধান আসামি: ফয়সাল করিম মাসুদ

গত বছরের ১২ ডিসেম্বর বাংলাদেশের রাজনীতির এক উত্তাল সময়ে রাজধানীর বিজয়নগরে দিনে-দুপুরে চলন্ত রিকশায় গুলিবিদ্ধ হয়েছিলেন জুলাই আন্দোলনের পরিচিত মুখ এবং ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরীফ ওসমান হাদি। সিঙ্গাপুরে চিকিৎসারত অবস্থায় ১৮ ডিসেম্বর তার মৃত্যুর পর যে ক্ষোভ ও বিচারহীনতার শঙ্কা দানা বেঁধেছিল, তার একটি বড় জট এবার খুলতে চলছে। দীর্ঘ কয়েক মাসের আত্মগোপন শেষে ভারতের সীমান্ত লাগোয়া উত্তর ২৪ পরগনা জেলার বনগাঁ থেকে গ্রেফতার হয়েছেন এই হত্যাকাণ্ডের মূল হোতা ফয়সাল করিম মাসুদ ওরফে রাহুল এবং তার ঘনিষ্ঠ সহযোগী আলমগীর হোসেন।

পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের স্পেশাল টাস্ক ফোর্স (এসটিএফ) কর্তৃক গত ৭ ও ৮ মার্চের মধ্যবর্তী রাতে পরিচালিত এই সফল অভিযান কেবল এক চাঞ্চল্যকর হত্যার আসামিদের ধরা পড়ার গল্প নয়; বরং এটি আন্তঃসীমান্ত অপরাধ, অবৈধ অনুপ্রবেশ এবং বড় ধরনের আর্থিক কেলেঙ্কারির এক অন্ধকার অধ্যায়কেও সামনে নিয়ে এসেছে। কলকাতা পুলিশের স্পেশাল টাস্ক ফোর্স সূত্রে জানা যায়, গোপন তথ্যের ভিত্তিতে বনগাঁ এলাকায় অভিযান চালিয়ে রাহুল ওরফে ফয়সাল করিম মাসুদ (৩৭) এবং আলমগীর হোসেনকে (৩৪) আটক করা হয়। গোয়েন্দাদের তথ্যমতে, এই দুষ্কৃতীরা দীর্ঘদিন ধরে ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে—বিশেষ করে মেঘালয় হয়ে ভারতে প্রবেশের পর থেকে—নিজেদের পরিচয় গোপন করে অবস্থান করছিল।

এসটিএফের বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, আসামিরা মেঘালয় সীমান্ত দিয়ে অবৈধভাবে ভারতে প্রবেশ করে গত কয়েক মাস ধরে আত্মগোপন করেছিল। তবে তাদের পরিকল্পনা ছিল পুনরায় বাংলাদেশে ফিরে আসা। বনগাঁ সীমান্তে যখন তারা বাংলাদেশে ঢোকার জন্য চূড়ান্ত প্রস্তুতির অপেক্ষায় ছিল, ঠিক তখনই ভারতীয় গোয়েন্দাদের হাতে আটকা পড়ে। গত রোববার তাদের বিধাননগর আদালতে তোলা হলে আদালত তাদের জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ১৪ দিনের পুলিশ রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে আসামিরা ওসমান হাদিকে হত্যার কথা স্বীকার করেছে বলে দাবি করছে এসটিএফ।

ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ডের প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এটি ছিল অত্যন্ত পরিকল্পিত একটি 'টার্গেট কিলিং'। ১২ ডিসেম্বর বিজয়নগর এলাকায় চলন্ত রিকশায় মোটরসাইকেলে আসা দুই জন দুর্বৃত্ত তাকে লক্ষ্য করে খুব কাছ থেকে মাথায় গুলি করে। রক্তাক্ত অবস্থায় তাকে সাথে সাথে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। পরিস্থিতির অবনতি হলে তাকে এভার কেয়ার হসপিটালে নেওয়া হয়। পরবর্তীতে উন্নত চিকিৎসার জন্য সরকারি উদ্যোগে তাকে সিঙ্গাপুরে পাঠানো হয়। টানা ৬ দিন মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ে ১৮ ডিসেম্বর তিনি না ফেরার দেশে চলে যান। তার মৃত্যুতে সারা বাংলাদেশে শোকের ছায়া নেমে আসে এবং অন্তর্বর্তীকালীন সরকার রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা করে। হাদি ছিলেন জুলাই বিপ্লবের একজন সাহসী সৈনিক, যার বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বর ছিল দুর্নীতির বিরুদ্ধে আপসহীন।

এই হত্যাকাণ্ডের পেছনে কেবল রাজনৈতিক আক্রোশ ছিল নাকি বিশাল কোনো আর্থিক স্বার্থ নিহিত ছিল, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে শুরু থেকেই। বাংলাদেশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) ফয়সাল করিম মাসুদের ব্যাংক হিসাবে অস্বাভাবিক লেনদেনের প্রমাণ পেয়েছে। তদন্তে দেখা গেছে, ফয়সাল ও তার স্বার্থসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ব্যাংক হিসাবে ১২৭ কোটি টাকারও বেশি রহস্যজনক লেনদেন হয়েছে। হত্যাকাণ্ডের ঠিক পরপরই অর্থাৎ ২৩ ডিসেম্বর আদালত তার ব্যাংক হিসাবগুলো অবরুদ্ধ (ফ্রিজ) করার আদেশ দেন এবং তার দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা জারি করেন। সিআইডির ধারণা, এই বিপুল পরিমাণ অর্থ বিশেষ কোন মিশন বাস্তবায়নের জন্যই তার একাউন্টে লেনদেন হয়েছে। বর্তমানে সিআইডি এই অর্থ পাচারের বিষয়ে পৃথক একটি অনুসন্ধান কার্যক্রম পরিচালনা করছে।

ফয়সাল করিম মাসুদের ভারতে পলায়ন এবং দীর্ঘ সময় সেখানে অবস্থান করার বিষয়টি দুই দেশের সীমান্ত নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে ভাবনার উদ্রেক করেছে। মেঘালয় সীমান্ত দিয়ে তারা কীভাবে প্রবেশ করল এবং বনগাঁর মতো স্পর্শকাতর এলাকায় কীভাবে মাসের পর মাস কাটিয়ে দিল, তা এখন ভারতের অভ্যন্তরীণ গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর জন্যও তদন্তের বিষয়। বাংলাদেশের সিআইডি ইতিমধ্যে ভারতের সাথে যোগাযোগ শুরু করেছে এবং আসামিদের দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া (Extradition process) শুরু হয়েছে। আইনি বিশ্লেষকদের মতে, যেহেতু এটি একটি হাই-প্রোফাইল হত্যা মামলা এবং আসামিরা ইতিমধ্যে অপরাধ স্বীকার করেছে, তাই বন্দিবিনিময় চুক্তির আওতায় তাদের ফিরিয়ে আনা সময়ের ব্যাপার মাত্র।

শরীফ ওসমান হাদি শুধু একজন মুখপাত্র ছিলেন না, তিনি ছিলেন জুলাই আন্দোলনের স্পিরিটের এক জীবন্ত প্রতিচ্ছবি। ইনকিলাব মঞ্চের মাধ্যমে তিনি যে সংস্কারের ডাক দিয়েছিলেন, তা অনেক প্রভাবশালী মহলের মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। তার এই হত্যাকাণ্ডের মধ্য দিয়ে আন্দোলনকে স্তিমিত করার একটি চেষ্টা ছিল বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা। ফয়সালের মতো একজন 'পেশাদার' অপরাধীর হাতে এমন একজন আদর্শিক কর্মীর মৃত্যু দেশকে নতুন করে অস্থিতিশীল করার একটি নীল নকশা ছিল বলেই সাধারণ জনগণের ধারণা।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন জুলাই যোদ্ধা ক্ষমতা.কমকে বলেন, "হাদি হত্যার প্রধান আসামিরা কখনোই প্রশাসনের ধরাছোঁয়ার বাইরে ছিলোনা। এখন প্রয়োজনের তাগিদেই তাদেরকে গ্রেফতার দেখানো হচ্ছে। যেন বর্তমান ভোট ইন্জিনিয়ারিং করে ক্ষমতায় যাওয়া সরকার জনগণের কাছে বৈধতা অর্জন করতে পারে।"

তবে ভারতের এসটিএফের হেফাজতে থাকা এই দুই আসামিকে জিজ্ঞাসাবাদে আরও চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে আসবে বলে আশা করা হচ্ছে। বিশেষ করে তারা ভারতের আর কোনো এলাকায় সহায়তা পেয়েছে কি না বা সেখানে কোনো স্লিপার সেলের সাথে যুক্ত ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখছে পশ্চিমবঙ্গ পুলিশ।

সাধারণ জনগণ মনে করছেন, জুলাই আন্দোলনের এই বীর সেনানির বিদেহী আত্মা তখনই শান্তি পাবে, যখন তার খুনিদের নেপথ্যের কুশীলবদের জনসমক্ষে ুনে বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হবে।

Post a Comment

0 Comments