স্বয়ং মন্ত্রীর ছত্রছায়ায় চলছে চাঁদাবাজি: ​সেতুমন্ত্রীর বিতর্কিত মন্তব্য তোলপাড় সারা দেশ

সড়ক পরিবহন মন্ত্রীর ‘সমঝোতা’ মন্তব্যে পরিবহন খাতে চাঁদাবাজির নতুন বৈধতা নিয়ে উঠেছে প্রশ্ন। এটি কি সত্যিই সমঝোতা নাকি সাধারণ মানুষের ওপর প্রাতিষ্ঠানিক
সেতুমন্ত্রীর বিতর্কিত মন্তব্য তোলপাড় সারা দেশ
স্বয়ং মন্ত্রীর ছত্রছায়ায় চলছে চাঁদাবাজি: ​সেতুমন্ত্রীর বিতর্কিত মন্তব্য তোলপাড় সারা দেশ

বিশেষ প্রতিবেদন | ঢাকা
​বাংলাদেশের পরিবহন খাত দীর্ঘকাল ধরেই এক অদৃশ্য সিন্ডিকেটের কবজায় বন্দি। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী শেখ রবিউল আলমের একটি মন্তব্য এই ক্ষতস্থানে নতুন করে নুন ছিটিয়েছে। দেশের সাধারণ মানুষ যখন নিত্যপণ্যের লাগামহীন ঊর্ধ্বগতি আর পরিবহন খাতের নৈরাজ্যে দিশেহারা, তখন নীতিনির্ধারণী পর্যায় থেকে ‘চাঁদাবাজি’র যে নতুন সংজ্ঞা দেওয়া হয়েছে, তা জনমনে কেবল বিস্ময় নয়, বরং তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে।

​মন্ত্রী শেখ রবিউল আলম পরিবহন মালিক-শ্রমিক সংগঠনের নামে রাস্তা থেকে সংগৃহীত অর্থকে ‘চাঁদা’ বলতে নারাজ। তার ভাষায়, যা ‘সমঝোতার’ ভিত্তিতে নেওয়া হয়, তা চাঁদাবাজি নয়। কিন্তু প্রশ্ন উঠছে—এই সমঝোতা আসলে কার সঙ্গে কার? রাস্তার মোড়ে মোড়ে লাঠি হাতে দাঁড়িয়ে থাকা ক্যাডারদের সাথে একজন অসহায় ট্রাক চালক বা ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীর কি আসলেই কোনো দ্বিপাক্ষিক আলোচনা বা সমঝোতা সম্ভব? নাকি এটি এক ধরণের অদৃশ্য পিস্তল মাথায় ঠেকিয়ে পকেট খালি করার প্রাতিষ্ঠানিক রূপান্তর?

​মন্ত্রীর যুক্তি ও বাস্তবতা

​গত ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে এক সংবাদ সম্মেলনে মন্ত্রী শেখ রবিউল আলম সাফ জানিয়েছিলেন, “সমঝোতার ভিত্তিতে নেওয়া অর্থ চাঁদাবাজি নয়; কেবল জোর করে আদায় করাকেই চাঁদাবাজি বলা হয়।” মন্ত্রীর এই তাত্ত্বিক সংজ্ঞায়নের পর মাঠ পর্যায়ের চিত্র রাতারাতি পাল্টে গেছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই বক্তব্যের মাধ্যমে চাঁদাবাজরা কার্যত একটি রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ‘লাইসেন্স’ পেয়ে গেছে।

​আগে যেখানে প্রশাসনের ভয়ে কিছুটা লুকিয়ে বা কৌশল অবলম্বন করে টাকা নেওয়া হতো, এখন সেখানে বুক ফুলিয়ে ‘মন্ত্রীর সমঝোতা’র দোহাই দিয়ে প্রকাশ্যে অর্থ আদায় করা হচ্ছে। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও সমাজ বিশ্লেষকদের মতে, যখন কোনো অপরাধকে শব্দের মারপ্যাঁচে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়, তখন সেই অপরাধ আরও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়। মন্ত্রীর এই ‘নরম’ অবস্থান আসলে কার স্বার্থে? এটি কি সাধারণ ভোক্তার পকেট বাঁচাতে, নাকি সেই সব শক্তিশালী সিন্ডিকেটের স্বার্থ রক্ষায়—যারা বছরের পর বছর ধরে সড়ককে জিম্মি করে নিজেদের আখের গুছিয়ে নিচ্ছে?

​মাঠ পর্যায়ের বীভৎস চিত্র: সমঝোতার আড়ালে জনতার ওপর নিপিড়ন

​রাজবাড়ীর ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী সুরাত আলীর অভিজ্ঞতা শুনলে মন্ত্রীর এই ‘সমঝোতা থিওরি’ তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়বে। সুরাত আলী গ্রাম থেকে ট্রাকে করে কাঁচামাল শহরে পাঠান। তিনি অত্যন্ত আক্ষেপের সাথে জানান:

​“এটা কোনো সমঝোতা না ভাই, এটা হলো গলার ওপর ছুরি চালানো। আমার পণ্যবাহী ট্রাক লোড করা থেকে শুরু করে ঢাকা পৌঁছানো পর্যন্ত অন্তত ১৫টি পয়েন্টে টাকা দিতে হয়। যদি কোনো চালক টাকা দিতে অস্বীকার করে, তবে তার কপালে জোটে অকথ্য গালিগালাজ আর মারধর। এমনকি কৃত্রিম সিরিয়ালে গাড়ি ঘণ্টার পর ঘণ্টা আটকে রাখা হয় যাতে ট্রাকে থাকা কাঁচামাল পচে নষ্ট হয়ে যায়। ব্যবসায়ী হিসেবে আমার লোকসান নিশ্চিত জেনে আমি টাকা দিতে বাধ্য হই। এটাকে মন্ত্রী সাহেব কীভাবে সমঝোতা বলেন?”

​বাস্তবতা হলো, সড়কের এই তথাকথিত অলিখিত নিয়ম না মানলে গাড়ি ভাঙচুর করা এখন নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার। চালকরা বলছেন, তারা এক প্রকার জীবন বাঁচাতে এবং মালিকের গাড়ি রক্ষা করতেই এই টাকা দিয়ে যান। এটাকে ‘সমঝোতা’ বলা আর ডাকাতকে ‘উপহার’ দেওয়া একই কথা।

​জণতার পকেট যেভাবে কাটা হচ্ছে

​একটি বেসরকারি গবেষণা সংস্থার ২০২৬ সালের সাম্প্রতিক জরিপ বলছে, শুধুমাত্র ঢাকা মহানগরে প্রবেশের চারটি প্রধান পয়েন্ট থেকে প্রতিদিন পরিবহন খাত থেকে আদায় করা চাঁদার পরিমাণ কোটি টাকার উপরে। সারা দেশে এই অংক বছরে কয়েক হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যায়। এই বিশাল অংকের টাকার প্রবাহ ও প্রভাব বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়:
  • ​পরিবহন ভাড়ায় কৃত্রিম বৃদ্ধি: একজন ট্রাক চালক যখন এক ট্রিপে ৫ থেকে ১০ হাজার টাকা অতিরিক্ত ‘সমঝোতা ফি’ দেন, তিনি তখন সেই টাকা নিজের পকেট থেকে দেন না। তিনি ট্রাকের ভাড়া বাড়িয়ে দেন। ফলে পরিবহনের খরচ কয়েক গুণ বেড়ে যায়।
  • নিত্যপণ্যের ওপর ‘চাঁদা ট্যাক্স’: ব্যবসায়ী যখন বেশি ভাড়ায় পণ্য আনেন, তখন তিনি সেই খরচ উসুল করেন সাধারণ ক্রেতার কাছ থেকে। চাল, ডাল, আলু কিংবা পেঁয়াজ—প্রতিটি জিনিসের দাম বাজারে ৫ থেকে ১০ টাকা বেশি হওয়ার পেছনে সড়কের এই ‘অদৃশ্য’ খরচের বড় ভূমিকা রয়েছে। অর্থাৎ, দিনশেষে সাধারণ মানুষই এই তথাকথিত সমঝোতার মূল্য দিচ্ছে।
  • শ্রমিক কল্যাণের অন্তরালে লুটতরাজ: শ্রমিকদের উন্নয়নের কথা বলে এই টাকা তোলা হলেও সাধারণ শ্রমিক বা চালকদের জীবনমানের কোনো দৃশ্যমান পরিবর্তন হয়নি। অসুস্থ হলে বা দুর্ঘটনায় পড়লে এই তহবিল থেকে সাধারণ শ্রমিকরা খুব সামান্যই সাহায্য পান। এই টাকার সিংহভাগ চলে যায় প্রভাবশালী মালিক নেতা, স্থানীয় রাজনৈতিক ক্যাডার এবং দুর্নীতির চেইন মাস্টারদের পকেটে।

​প্রশাসনের পর্যবেক্ষণ ও বিকল্প প্রস্তাবনা

​সরকারি উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা আব্দুর নূর নোমান এই বিষয়ে কড়া প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন। তার দীর্ঘদিনের মাঠ পর্যায়ের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, রাজধানীর প্রতিটি প্রবেশমুখে পুলিশ থেকে শুরু করে স্থানীয় প্রভাবশালী গ্রুপকে নিয়মিত মাসোহারা দিতে হয়। তিনি বলেন,

“শ্রমিকদের কল্যাণের যে বুলি আওড়ানো হয়, তার কোনো প্রাতিষ্ঠানিক বা আইনি ভিত্তি আমরা খুঁজে পাইনি। এটি মূলত ক্ষমতার দাপটে সাধারণ মানুষের ওপর চাপিয়ে দেওয়া একটি কর।”

​তিনি এই সংকট উত্তরণে তিনটি বৈপ্লবিক প্রস্তাব দিয়েছেন:

 
সরকারি ডিজিটাল পেমেন্ট: যদি শ্রমিকদের বা সংগঠনের জন্য সত্যিই অর্থের প্রয়োজন হয়, তবে তা রাস্তার মোড়ে মোড়ে লাঠি হাতে কেন তোলা হবে? কেন তা ডিজিটাল পদ্ধতিতে বা টোল প্লাজার মতো সরকারি অ্যাপের মাধ্যমে সরাসরি সংগ্রহ করা হবে না? ​

স্বচ্ছ অডিট ও ডাটাবেজ: প্রতি মাসে কত টাকা তোলা হলো এবং তা দিয়ে কতজন শ্রমিকের বিমা, চিকিৎসা বা সন্তানদের শিক্ষার ব্যবস্থা করা হলো, তার সঠিক ও অডিটকৃত হিসাব জনসম্মুখে প্রকাশ করতে হবে। ​

জিরো টলারেন্স জবাবদিহিতা: কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী যেন রাস্তার মালিক সেজে নিজস্ব বাহিনী দিয়ে অর্থ আদায় করতে না পারে, তা নিশ্চিত করতে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে কঠোর হতে হবে।

​কেন এই সংকটের সমাধান অধরা?

​পরিবহন খাতের এই বিশৃঙ্খলা ও সিন্ডিকেট কয়েক দশকের পুরনো। কিন্তু এবারের সংকটটি গুণগতভাবে ভিন্ন। যখন রাষ্ট্রের একজন গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রী বা নীতিনির্ধারক এই চাঁদাবাজিকে নমনীয় দৃষ্টিতে দেখেন বা বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা করেন, তখন প্রশাসনের মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের হাত-পা কার্যত বাঁধা হয়ে যায়। পুলিশ বা স্থানীয় প্রশাসন তখন মনে করে, ওপর মহলের সায় আছে বলেই এগুলো চলছে।

​বিশেষজ্ঞদের মতে, পরিবহন খাতের নিয়ন্ত্রণকারী অধিকাংশ সংগঠনই রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত প্রভাবশালী। দেখা যায়, বড় বড় রাজনৈতিক নেতারাই এই মালিক ও শ্রমিক সংগঠনগুলোর শীর্ষ পদে আসীন। ফলে রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং দলমতের ঊর্ধ্বে উঠে ব্যবস্থা নেওয়া ছাড়া এই অন্ধকার সাম্রাজ্য ভেঙে ফেলা অসম্ভব। সরকার একদিকে দ্রব্যমূল্য কমানোর জন্য টাস্কফোর্স গঠন করছে, অন্যদিকে সড়কের এই লুটতরাজকে পাশ কাটিয়ে যাচ্ছে—যা একটি স্ববিরোধী অবস্থান।

​জনমানুষের প্রতীক্ষা

​সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে হলে সবার আগে ‘জোরপূর্বক সমঝোতা’র এই সংস্কৃতি সমূলে উপড়ে ফেলতে হবে। যখন একজন মন্ত্রী বলেন এটি চাঁদাবাজি নয়, তখন তিনি পরোক্ষভাবে সেই অদৃশ্য দানবদেরই ঢাল হয়ে দাঁড়ান, যারা সাধারণ মানুষের পকেট কাটছে।

​জনগণের দাবি অত্যন্ত সহজ ও পরিষ্কার—তারা একটি চাঁদামুক্ত, নির্বিঘ্ন এবং স্বচ্ছ সড়ক ব্যবস্থা চান। পণ্য পরিবহনে কোনো অদৃশ্য বাধা থাকবে না, কোনো অতিরিক্ত ‘ফি’ বা ‘টোকেন’ থাকবে না। শ্রমিকদের উন্নয়নের নামে যে লুটতরাজ চলছে, তার অবসান ঘটিয়ে একটি জবাবদিহিমূলক ব্যবস্থা চালু করা এখন গোটা দেশের দাবী।

কারণ সড়ক যদি সিন্ডিকেটের পকেটে থাকে, তবে অর্থনীতির প্রকৃত মুক্তি কখনোই মিলবে না। সাধারণ মানুষের পিঠ দেওয়ালে ঠেকে গেছে, এখন সময় হয়েছে প্রাতিষ্ঠানিক এই জুলুমের অবসান ঘটানোর।