সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী শেখ রবিউল আলমের আবারও একটি মন্তব্য দেশজুড়ে নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। আবারও পরিবহন মালিক-শ্রমিক সংগঠনের নামে সংগৃহীত অর্থকে 'চাঁদা' বলতে নারাজ তিনি। এর আগেও গত ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেছিলেন, "সমঝোতার ভিত্তিতে নেওয়া অর্থ চাঁদাবাজি নয়; কেবল জোর করে আদায় করাকেই চাঁদাবাজি বলা হয়।" মন্ত্রীর এই সংজ্ঞায়ন সাধারণ মানুষের মনে যেমন ক্ষোভ তৈরি করেছে, তেমনি মাঠ পর্যায়ে এর প্রভাব হয়েছে ভয়াবহ। অভিযোগ উঠছে, মন্ত্রীর এমন 'নরম' অবস্থানের সুযোগ নিয়ে সড়কে অরাজকতা ও অর্থ আদায়ের মহোৎসব শুরু হয়েছে।
মাঠ পর্যায়ের চিত্র: 'সমঝোতা' যখন মরণফাঁদ
মন্ত্রীর দাবি অনুযায়ী এটি 'সমঝোতা' হলেও রাজবাড়ীর ব্যবসায়ী সুরাত আলীর অভিজ্ঞতা একেবারেই ভিন্ন। তার ভাষায়, এটি এক ধরণের প্রাতিষ্ঠানিক জুলুম। তিনি জানান, ট্রাক লোড করা থেকে শুরু করে ঢাকা পর্যন্ত প্রতিটি মোড়ে মোড়ে টাকা গুনতে হয়। "চান্দা দিতে অস্বীকার করলে মালামাল লোডিং-আনলোডিং বন্ধ করে দেওয়া হয়। অথবা লম্বা সিরিয়ালে গাড়ি আটকে রাখা হয়। এমনকি মারধর পর্যন্ত করা হয়। এটাকে আপনি কীভাবে সমঝোতা বলবেন?" — ক্ষোভের সাথে প্রশ্ন করেন সুরাত আলী। বাস্তবতা হলো, সড়কে এই তথাকথিত 'সমঝোতা' না মানলে গাড়ি ভাঙচুর, মারামারি এবং এমনকি প্রাণহানির মতো ঘটনাও অহরহ ঘটছে। ফলে চালক ও ব্যবসায়ীরা এক প্রকার বাধ্য হয়েই এই অর্থ দিয়ে যাচ্ছেন।বেসরকারি একটি সংস্থার সাম্প্রতিক জরিপ বলছে, শুধুমাত্র রাজধানী ঢাকাতেই প্রতিদিন পরিবহন খাত থেকে আদায় করা চাঁদার পরিমাণ কোটি টাকার উপরে। এই বিপুল পরিমাণ অর্থের উৎস কী এবং শেষ গন্তব্য কোথায়, তা নিয়ে রয়ে গেছে ধোঁয়াশা। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ট্রাক চালক আমাদের জানালেন এই চক্রের প্রভাব। তার মতে, রোডের বিভিন্ন পয়েন্টে মালিক সমিতির নামে যে চাঁদা দিতে হয়, তার জোগান দিতে তারা একপ্রকার বাধ্য হয়েই ভাড়া বাড়িয়ে দেন। ফলে অতিরিক্ত চাঁদার কারণে পরিবহন সহ অন্য সকল খাতে মূল্য বৃদ্ধি পায়। ব্যবসায়ীরা যখন বেশি ভাড়ায় পণ্য আনেন, তখন তিনি সেই খরচ উসুল করেন সাধারণ ক্রেতার কাছ থেকে। ফলে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে।
পরিবহন মালিকদের দাবি, এই অর্থ শ্রমিকদের কল্যাণে ও উন্নয়নের কাজে ব্যয় করা হয়। কিন্তু সাধারণ শ্রমিক বা চালকদের সাথে কথা বলে এর কোনো প্রতিফলন পাওয়া যায়নি। একজন সরকারি কর্মকর্তা আব্দুর নূর নোমান এই দাবিকে সম্পূর্ণ নাকচ করে দিয়ে বলেন। তার পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, রাজধানীর প্রবেশমুখে পুলিশ থেকে শুরু করে বিভিন্ন ক্যাডার গ্রুপকে নিয়মিত চাঁদা দিতে হয়। তিনি মনে করেন, শ্রমিকদের উন্নয়নের নামে যে টাকা তোলা হচ্ছে, তার বড় অংশই চলে যাচ্ছে প্রভাবশালী কোনো বিশেষ গোষ্ঠীর পকেটে। শ্রমিকদের উন্নয়নের জন্য যদি সত্যিই অর্থের প্রয়োজন হয়, তবে সেটি সরকারি তত্ত্বাবধানে তোলা হোক। এতে করে:
১. আয়ের সঠিক হিসাব থাকবে। ২. ব্যয়ের স্বচ্ছতা নিশ্চিত হবে। ৩. সাধারণ মানুষের ওপর জুলুম কমবে। ক্ষোভ নিয়ে বলেন এই কর্মকর্তা।
কেন এই সংকটের সমাধান হচ্ছে না?
পরিবহন খাতের এই বিশৃঙ্খলা শুধু আজকের নয়, তবে মন্ত্রীর সাম্প্রতিক বক্তব্য একে এক ধরণের 'বৈধতা' দেওয়ার চেষ্টা করেছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। যখন রাষ্ট্রের একজন দায়িত্বশীল ব্যক্তি জোরপূর্বক চাঁদা আদায়কে 'সমঝোতা' হিসেবে ব্যাখ্যা করেন, তখন চাঁদাবাজরা আরও বেশি বেপরোয়া হয়ে উঠবে এটাই স্বাভাবিক। তাছাড়া পরিবহন খাতের অধিকাংশ নিয়ন্ত্রণকারী সংগঠন রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী। ফলে এদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া প্রশাসনের জন্য কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। প্রতিদিন যে কোটি কোটি টাকা চাঁদা আদায় হচ্ছে, তার কোনো অডিট বা নিরীক্ষা হয় না। শ্রমিকদের স্বাস্থ্য বীমা বা বাসস্থানের কোনো উন্নয়নও চোখে পড়ে না।সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে হলে সবার আগে এই 'জোরপূর্বক সমঝোতা' বন্ধ করতে হবে বলে। মন্ত্রী যখন বলেন এটি চাঁদাবাজি নয়, তখন তিনি পরোক্ষভাবে সেই সিন্ডিকেটকেই শক্তিশালী করছেন বলে মনে করেন সাধারণ জনগণ। জনগণের দাবি—সড়ক হবে নির্বিঘ্ন এবং পণ্য পরিবহন হবে চাঁদামুক্ত। অন্যথায়, সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় কমানো কোনোভাবেই সম্ভব হবে না। শ্রমিকদের উন্নয়নের দোহাই দিয়ে যে লুটতরাজ চলছে, তার অবসান ঘটিয়ে একটি স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক ব্যবস্থা চালু করার দাবি জানান বিশেষজ্ঞরা।

