​মির্জা আব্বাস: রহস্যময় নীরবতা নাকি রাজনৈতিক মহলে নতুন মেরুকরণ?

​ঢাকা-৮ আসনে আধিপত্য বিস্তার, রেলওয়ের জমি আত্মসাৎ এবং চাঁদাবাজি ও দখলদারির চাঞ্চল্যকর তথ্য। জনমুখে কেন তিনি ‘চান্দাব্বাস’ নামে পরিচিত? জানুন তার....
ির্জা আব্বাস কোথায়?ঢাকা-৮ আসনে আধিপত্য বিস্তার, রেলওয়ের জমি আত্মসাৎ এবং চাঁদাবাজি ও দখলদারির চাঞ্চল্যকর তথ্য

​ভাইরাল ভিডিও ও ‘ঘুম’ বিতর্ক

​সম্প্রতি সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাক্টিভিস্ট পিনাকী ভট্টাচার্যের ফেসবুক পেজ থেকে একটি ভিডিও ক্লিপ ছড়িয়ে পড়ে। সেখানে দেখা যায়, বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের পাশে একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে বসে আছেন মির্জা আব্বাস। ভিডিওতে তাকে চোখ বন্ধ করে নিচের দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখা যায়। ​ক্যাপশনে তাকে "চান্দাব্বাস" হিসেবে সম্বোধন করে দাবি করা হয়েছে যে, দেশের এই গুরুত্বপূর্ণ ক্রান্তিলগ্নে তিনি মিটিংয়ে ঘুমিয়ে পড়েছেন। এই পোস্টটি মুহূর্তেই ভাইরাল হয় এবং নেটিজেনদের মধ্যে দুই ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখা যায়:

​সমালোচকদের মতে দেশের এই ক্রান্তিলগ্নে তিনি ঘুমিয়ে আছেন, আবার তার সমর্থকদের মতে মির্জা আব্বাসের বয়স এবং শারীরিক অবস্থা বিবেচনায় এটি ক্লান্তি হতে পারে। অনেক সময় গভীর মনোযোগ দিয়ে কিছু পড়ার সময় বা গভির কোন ভাবনায় থাকার মুহূর্তকে এডিট করে ‘ঘুম’ হিসেবে চালিয়ে দেওয়া হয়।

​ঢাকা-৮ আসন: ওসমান হাদী হত্যাকাণ্ড ও মির্জা আব্বাসের উত্থান

​মির্জা আব্বাসের রাজনৈতিক জীবনের অন্যতম বিতর্কিত অধ্যায় হলো ঢাকা-৮ আসনে তার আধিপত্য বিস্তার। স্থানীয় রাজনীতিতে অত্যন্ত জনপ্রিয় নেতা ছিলেন ওসমান হাদী। অভিযোগ রয়েছে, ঢাকা-৮ আসনে মির্জা আব্বাসের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হওয়ার কারণেই ওসমান হাদিকে সন্ত্রাসীদের মাধ্যমে গুলি করে হত্যা করা হয়। ​জনমনে দীর্ঘদিনের গুঞ্জন যে, এই হত্যাকাণ্ডের পেছনে পরোক্ষ বা প্রত্যক্ষভাবে মির্জা আব্বাসের হাত ছিল।

ওসমান হাদীর মৃত্যুর পর ওই এলাকায় মির্জা আব্বাসের একচ্ছত্র আধিপত্য তৈরি হয়। চাঁদাবাজি, দখলদারি এবং জমি দখলের মাধ্যমে তিনি নিজের বিশাল সাম্রাজ্য গড়ে তোলেন বলে অভিযোগ রয়েছে। সাধারণ মানুষের মুখে মুখে তিনি ‘চাঁদাবাজ’ থেকে ‘চান্দাবাস’ হিসেবে পরিচিতি পান।

​নির্বাচন ইঞ্জিনিয়ারিং হয়েছে দাবী এনসিপি নেতা নাসির উদ্দিন পাটোয়ারীর

​ওসমান হাদী হত্যাকাণ্ডের পর ঢাকা-৮ আসনের রাজনৈতিক সমীকরণ একদম বদলে যায়। পরবর্তীতে এনসিপি (NCP) নেতা নাসির উদ্দিন পাটোয়ারী মির্জা আব্বাসের বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান নেন। নির্বাচনের ফলাফল এবং সাধারণ ভোটারদের ভাষ্যমতে, ওই নির্বাচনে নাসির উদ্দিন পাটোয়ারীই জয়ী হওয়ার পথে ছিলেন। ​কিন্তু অভিযোগ রয়েছে, ক্ষমতার দাপট এবং নির্বাচন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের মাধ্যমে ফলাফল নিজের পক্ষে নিয়ে আসেন মির্জা আব্বাস। দেশবাসীর বড় একটি অংশের ধারণা, জনগণের ভোটে নয় বরং কৌশলের মাধ্যমেই তিনি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন।

মির্জা আব্বাসের দখলদারি

২০০৬ সালে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের শেষ সময়ে গৃহায়ণ ও গণপূর্তমন্ত্রী থাকাকালীন তিনি রেলওয়ের ২ একর জমি (যার তৎকালীন বাজারমূল্য ছিল প্রায় ৫১ কোটি টাকা) নামসর্বস্ব একটি সমবায় সমিতিকে মাত্র ১৪ দিনে লিজ দিয়ে দেন। নিয়ম অনুযায়ী রেলওয়ের জমি গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের অধীনে নয়, তবুও তিনি ক্ষমতার অপব্যবহার করে টেন্ডার ছাড়াই ‘পূর্বাচল সমবায় সমিতি’ নামক একটি অস্তিত্বহীন সংস্থাকে ৯৯ বছরের জন্য এই লিজ প্রদান করেন।

এছাড়া ২০২১ সালে দুদক মির্জা আব্বাসের বিরুদ্ধে প্রায় ২০০ কোটি টাকার সরকারি সম্পত্তি আত্মসাতের আরেকটি নতুন অনুসন্ধান শুরু করে। এতে বনানীসহ ঢাকার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় সরকারি জমি ও বাড়ি দখলের অভিযোগ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

বিভিন্ন প্রতিবেদনে দাবি অনুযায়ী, মির্জা আব্বাস ঢাকার রাজনীতিতে নিজের আধিপত্য বজায় রাখতে শীর্ষ সন্ত্রাসীদের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করতেন। স্থানীয় পর্যায়ে জমি দখল, ব্যবসায়ীদের থেকে চাঁদাবাজি এবং রাজনৈতিক বিরোধীদের দমনে তিনি এই সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোকে ব্যবহার করতেন বলে অভিযোগ রয়েছে। বিশেষ করে 'চান্দাব্বাস' নামটি তার এই চাঁদাবাজি ও দখলদারির সংস্কৃতির প্রতিফলন হিসেবেই লোকমুখে ছড়িয়ে পড়ে।

মির্জা আব্বাস কোথায়?

​সাংসদ হিসেবে দায়িত্ব পালনের কিছুদিনের মধ্যেই মির্জা আব্বাস গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন। তাকে প্রথমে ঢাকার এভারকেয়ার হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরবর্তীতে উন্নত চিকিৎসার জন্য সিঙ্গাপুরে নেওয়া হয়। তবে এরপর থেকেই তার শারীরিক অবস্থা নিয়ে এক রহস্যজনক নীরবতা পালন করছে তার পরিবার ও দল। ​বর্তমানে মিডিয়া এবং অনলাইন অ্যাক্টিভিস্টদের মধ্যে তাকে নিয়ে তিনটি প্রধান তত্ত্ব জোরালো হচ্ছে:

​মৃত্যুর গুজব: অনেক অ্যাক্টিভিস্ট দাবি করছেন, মির্জা আব্বাস মারা গেছেন কিংবা তাকে সুপরিকল্পিতভাবে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। যদিও এর পক্ষে কোনো দাপ্তরিক প্রমাণ মেলেনি।

ভারতে অবস্থান: আরেকটি পক্ষ দাবি করছে, রাজনীতি থেকে তাকে দূরে রাখতে গোপনে চিকিৎসার নামে তাকে ভারতে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে।

ধোঁয়াশা: তবে দল বা পরিবারের পক্ষ থেকে কোনো সুনির্দিষ্ট মেডিকেল বুলেটিন বা ভিডিও বার্তা না আসায় এই ধোঁয়াশা আরও ঘনীভূত হচ্ছে।

​মির্জা আব্বাস কি আসলেই অসুস্থ, নাকি রাজনৈতিক কোনো চালের কারণে তাকে আড়ালে রাখা হয়েছে? ওসমান হাদী হত্যাকাণ্ডের বিচার কি কোনোদিন হবে? এই প্রশ্নগুলো আজ ঢাকা-৮ আসনের মানুষের মুখে মুখে। সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হওয়া ভিডিওটি কেবল একটি মুহূর্তের ভিডিও হতে পারে, কিন্তু মির্জা আব্বাসের দীর্ঘ রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের বিতর্কগুলো এত সহজে মুছে যাওয়ার নয়। সত্য উদঘাটনের জন্য দেশবাসী এখন সঠিক তথ্যের অপেক্ষায় দিন গুনছে।