একটি রাষ্ট্রের সার্বভৌম ক্ষমতা যখন কেবল 'আকুল আবেদনে' পর্যবসিত হয়, তখন বুঝতে হবে শাসনের কাঠামোগত ভিত্তি কোনো এক গভীর সংকটে নিমজ্জিত। প্রধানমন্ত্রী যখন বারবার দেশের ব্যবসায়ী সম্প্রদায়কে দ্রব্যমূল্য সহনীয় রাখার অনুরোধ জানান, তখন সাধারণ মানুষের মনে প্রশ্ন জাগে—রাষ্ট্র কি এখন অনুরোধের সংস্থায় পরিণত হয়েছে? নাকি রাষ্ট্রের সেই দণ্ডমুণ্ডের ক্ষমতা কোনো এক ‘অদৃশ্য ছায়া’ বা ‘নিভৃত বলয়ে’ আটকা পড়েছে?
জনগণের মধ্যে প্রচলিত একটি ধারণা—প্রধানমন্ত্রীকে একটি সুশোভিত ‘প্রতীক’ হিসেবে দাঁড় করিয়ে রাখা হয়েছে এবং কোনো এক অদৃশ্য শক্তি তাকে নিয়ন্ত্রণ করছে। রাজনৈতিক বিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় 'Deep State' বা রাষ্ট্রের ভেতরে আরেক রাষ্ট্র। যখন প্রশাসনিক আদেশ মাঠপর্যায়ে অকার্যকর হয়ে পড়ে, তখন সাধারণ মানুষের এই সন্দেহ অমূলক থাকে না। যদি ক্ষমতার উৎস কেবল সংসদ বা জনগণের কাছে দায়বদ্ধ থাকত, তবে বাজারের সিন্ডিকেট বা রাজপথের অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীরা প্রধানমন্ত্রীর 'আকুল আবেদন' উপেক্ষা করার সাহস পেত না। এই উপেক্ষা প্রমাণ করে যে, প্রকৃত ক্ষমতার চাবিকাঠি সম্ভবত অন্য কারো হাতে, যারা জনস্বার্থের চেয়ে গোষ্ঠীস্বার্থকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে।
সিন্ডিকেট যখন সমান্তরাল সরকার
অর্থনীতির ভাষায় বাজার একটি স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা হলেও বাংলাদেশের বাজারে তা কাজ করে মাফিয়াতান্ত্রিক মডেলে। প্রধানমন্ত্রী যখন আবেদন জানান, তখন সিন্ডিকেটগুলো একে তাদের 'দুর্বলতা' হিসেবে গণ্য করে। কারণ তারা জানে, তাদের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিনিয়োগ এতই গভীর যে, রাষ্ট্র তাদের গায়ে হাত দেওয়ার সাহস পাবে না। এর ফলে চাল, ডাল বা তেলের দাম কেবল বাড়ে না, বরং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মানকে পরিকল্পিতভাবে নিংড়ে নেওয়া হয়। এটি কোনো সাধারণ মুদ্রাস্ফীতি নয়; এটি একটি কাঠামোগত লুণ্ঠন।মহামারীরূপে ধর্ষণ ও সন্ত্রাস স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের "পরিস্থিতি স্বাভাবিক" দাবির আড়ালে ঢাকা পড়ে যাচ্ছে দেশের ক্ষতবিক্ষত আইনশৃঙ্খলা চিত্র। চাঁদাবাজি, অস্ত্র মহড়া এবং প্রকাশ্য দিবালোকে গোলাগুলি এখন কেবল অপরাধ নয়, বরং এটি ক্ষমতার এক প্রদর্শনী। বিশেষ করে ধর্ষণের মহামারী আকার ধারণ করা প্রমাণ করে যে, সমাজে অপরাধীদের মধ্যে কোনো 'ভয়' কাজ করছে না।
এই ব্যাপারে সরেজমিনে জনগণের সাথে কথা বলে ক্ষমতা.কম। নাম প্রকাশ্যে অনিচ্ছুক একজন চিন্তাশীল নাগরিকের ভাষ্য: "রাষ্ট্র যখন তার নাগরিকদের জীবনের নিরাপত্তা দিতে পারে না, তখন সেই রাষ্ট্র কেবল নামমাত্র টিকে থাকে। আমরা এখন এক 'অদৃশ্য অভিভাবকহীন' সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি, যেখানে প্রধানমন্ত্রীকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে একদল সুবিধাভোগী দেশ লুটছে। পুলিশ বা প্রশাসন এখন আর অপরাধীর পেছনে ছোটে না, তারা ব্যস্ত থাকে অদৃশ্য শক্তির ইশারা বুঝতে। ফলে সাধারণ মানুষ ডাকাত বা সন্ত্রাসীর হাতে অসহায়।"
মোজাম্মেল হক নামের একজন কলেজ শিক্ষক বলেন, চুরি, ডাকাতি ও চাঁদাবাজি বর্তমানে পেশাদার অপরাধ ছাড়িয়ে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নিয়েছে। এর প্রধান কারণ ‘আইনের শাসন’ এর বদলে ‘ব্যক্তির শাসন’ বা ‘পর্দার আড়ালের শক্তির’ প্রতি আনুগত্য। যখন কোনো অপরাধী জানে যে তার রাজনৈতিক বা অদৃশ্য খুঁটির জোর আছে, তখন অস্ত্র হাতে মহড়া দেওয়া তার জন্য বীরত্বের কাজ হয়ে দাঁড়ায়।
তিনি মনে করেন, এই অচলাবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য দেশকে এই অন্ধকার গহ্বর থেকে টেনে তুলতে হলে কেবল তদারকি নয়, প্রয়োজন একটি 'পদ্ধতিগত সার্জারি' (Systemic Surgery)।
ক. দ্বৈত ক্ষমতার অবসান (End of Dual Power): প্রধানমন্ত্রী যদি সত্যিই জনগণের সেবক হতে চান, তবে তাকে সেই 'অদৃশ্য বলয়' থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। ক্ষমতার উৎস হতে হবে সরাসরি সংবিধান এবং সাধারণ মানুষের জনমত। যদি কোনো অদৃশ্য শক্তি তাকে বাধা দেয়, তবে তা জনগণের সামনে প্রকাশ করাই হবে প্রকৃত নেতৃত্বের পরিচয়। ‘পুতুল’ অপবাদ ঘুচাতে হলে দৃশ্যমান কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে।
খ. ব্যবসায়ী ও রাজনীতিকের যে অশুভ সংমিশ্রণ ঘটেছে, তা বিচ্ছিন্ন করতে হবে। বাজার নিয়ন্ত্রণে কোনো অনুরোধ নয়, বরং 'এন্টি-কার্টেল আইন' প্রয়োগ করে বড় বড় রাঘববোয়ালদের আইনের আওতায় আনতে হবে। তাদের সম্পদ বাজেয়াপ্ত করার মতো কঠোর বার্তা না দিলে বাজার স্বাভাবিক হবে না।
গ. কমান্ড স্ট্রাকচারের পুনর্গঠন: স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সরাসরি জবাবদিহিতার আওতায় আনতে হবে। প্রতিটি অস্ত্র মহড়া বা গোলাগুলির ঘটনায় সংশ্লিষ্ট এলাকার প্রশাসনিক প্রধানকে বরখাস্ত বা শাস্তির আওতায় আনতে হবে। অপরাধীকে ‘রাজনৈতিক কর্মী’ হিসেবে দেখার চশমা প্রশাসনকে খুলে ফেলতে হবে।
ঘ. অপরাধের বিচার (Summary Justice): ধর্ষণ ও ডাকাতির মতো ঘটনায় দীর্ঘসূত্রিতা অপরাধীদের সুবিধা দেয়। বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন করে ১৫ থেকে ৩০ দিনের মধ্যে বিচার সম্পন্ন করে জনসম্মুখে তা প্রচার করতে হবে। ভয়ের সংস্কৃতি অপরাধীর মনে গেঁথে দিতে না পারলে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা ফিরবে না।
সাধারণ জনগন ও বিশেষজ্ঞদের সাথে কথা বলে আমরা যা জানতে পেরেছি দেশ এখন এক চরম ক্রান্তিলগ্নে দাঁড়িয়ে। একদিকে প্রধানমন্ত্রীর অসহায় আবেদন, অন্যদিকে জনগণের নাভিশ্বাস ও অদৃশ্য শক্তির দাপট। এই তিনের সংঘাত দেশকে এক অরাজক পরিস্থিতির দিকে ঠেলে দিচ্ছে। জনগণের কাছে প্রধানমন্ত্রীর গ্রহণযোগ্যতা এখন খাদের কিনারায়। ইতিহাস সাক্ষী, যখন রাষ্ট্রযন্ত্র স্থবির হয়ে যায় এবং শাসক ‘পুতুল’ হিসেবে পরিচিতি পান, তখন বড় কোনো জনবিস্ফোরণ বা পরিবর্তন অনিবার্য হয়ে পড়ে। সময় এসেছে রাষ্ট্রের খোলস থেকে বেরিয়ে এসে প্রকৃত জনবান্ধব শাসন প্রতিষ্ঠা করার।

0 Comments