ফ্যামিলি কার্ড নিয়ে চলছে রমরমা ব্যবসা: তদন্তে মিললো সত্যতা

family card bnp
ময়মনসিংহের ফুলবাড়ীয়া উপজেলার আছিম পাটুলী ইউনিয়ন। সাধারণ মানুষের সহজ-সরল জীবন আর কৃষিপ্রধান এই জনপদে সম্প্রতি একটি চাঞ্চল্যকর ঘটনা নাড়িয়ে দিয়েছে স্থানীয় প্রশাসন ও সাধারণ মানুষকে। ঘটনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ইমরুল কায়েস। অভিযোগটি যতটা না রাজনৈতিক, তার চেয়ে বেশি মানবিক। দরিদ্র নারীদের জন্য ঘোষিত সরকারের একটি জনকল্যাণমূলক প্রকল্পের সুযোগ নিয়ে ডিজিটাল কায়দায় অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার এক নিখুঁত পরিকল্পনার ফাঁদ ছিলো এটি, যা শেষ পর্যন্ত তদন্ত কমিটির হাতে ধরা পড়েছে।

ঘটনার গভীরে যেতে হলে আমাদের একটু পেছনে ফিরে তাকাতে হবে। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ বা পারিবারিক কার্ডের বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে প্রচার করেছিল। বর্তমানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ঘোষিত এই কর্মসূচিটি মূলত দেশের অতিদরিদ্র ও নিম্নবিত্ত পরিবারগুলোর সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার একটি মাধ্যম। এই কার্ডের মাধ্যমে দুস্থ পরিবারগুলো রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা ও খাদ্য সহায়তা পাবে বলে দাবি করে আসছি দলটি।

সরকার গঠন করার পর এই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের লক্ষে ময়মনসিংহের নান্দাইলসহ মোট ১৪টি উপজেলায় পাইলট প্রকল্প (পরীক্ষামূলক কার্যক্রম) শুরু করার ঘোষণা দেওয়া হয়। নিয়ম অনুযায়ী, এই নির্দিষ্ট এলাকাগুলোর বাইরে আপাতত এই কার্যক্রম শুরু হওয়ার কথা ছিলো না। কিন্তু আছিম পাটুলী ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ইমরুল কায়েস তার ব্যক্তিগত ফেসবুকে একটি ঘোষণা দেন। সেখানে তিনি অত্যন্ত আকর্ষণীয়ভাবে ফ্যামিলি কার্ডের অনলাইন আবেদনের কথা প্রচার করেন। পোস্টটিতে বলা হয়েছিল—আবেদন করতে কোনো নমিনির প্রয়োজন হবে না; শুধু এনআইডি কার্ড, এক কপি পাসপোর্ট সাইজ ছবি, আর মোবাইল নম্বর এবং একটা স্বাক্ষর করতে হবে। শর্ত ছিল—আবেদনকারীকে অবশ্যই নারী হতে হবে।

সহজ-সরল গ্রাম্য নারীদের কাছে এটি ছিল আকাশের চাঁদ হাতে পাওয়ার মতো। তারা ভেবেছিলেন, চেয়ারম্যান যেহেতু নিজে ঘোষণা দিয়েছেন, সেহেতু এটি সরকারি নিয়মেই হচ্ছে। ২৬ ফেব্রুয়ারি ইউপি কার্যালয়ে ঢল নামে শত শত নারীর। রোদে পুড়ে, দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে তারা যখন ফরম পূরণ করতে যান, তখনই তাদের জানানো হয় আবেদন ফি বাবদ ১০০ টাকা করে দিতে হবে। সরকারি কোনো প্রকল্পে বা জনকল্যাণমূলক আবেদনের ক্ষেত্রে যেখানে কোনো ফি নির্ধারিত নেই, সেখানে কেন ১০০ টাকা করে নেওয়া হচ্ছে—এই প্রশ্নটি সাধারণ মানুষের মনে দানা বাঁধতে শুরু করে। আবেদন করতে আসা দরিদ্র নারীদের অনেকের কাছেই এই ১০০ টাকা অনেক বড় অংক। তবুও কার্ড পাওয়ার আশায় তারা সেই টাকা পরিশোধ করেন।

টাকা আদায়ের এই দৃশ্যটি কেউ একজন মোবাইল ফোনে ধারণ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেন। মুহূর্তেই ভিডিওটি ভাইরাল হয়ে যায়। সাধারণ মানুষ এবং নেটিজেনদের মধ্যে শুরু হয় তীব্র সমালোচনা। প্রশ্ন ওঠে, যেখানে ফুলবাড়ীয়া উপজেলা এই পাইলট প্রকল্পের তালিকার মধ্যেই নেই, সেখানে চেয়ারম্যান কীভাবে আবেদন গ্রহণ করছেন এবং কিসের ভিত্তিতে টাকা নিচ্ছেন? ঘটনাটি উপজেলা প্রশাসনের নজরে এলে ২৮ ফেব্রুয়ারি ফুলবাড়ীয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. আরিফুল ইসলাম একটি তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেন। উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা মোজাম্মেল হককে এই কমিটির প্রধান করা হয় এবং তাকে মাত্র তিন কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়।

তদন্ত কমিটি যখন সরেজমিনে আছিম পাটুলী ইউনিয়নে যায়, তখন থলের বিড়াল বেরিয়ে আসতে শুরু করে। কমিটির সদস্যরা গ্রামের সাধারণ নারীদের সাথে কথা বলেন, যারা টাকা দিয়েছেন তাদের জবানবন্দি গ্রহণ করেন এবং ভাইরাল হওয়া ভিডিওর সাথে বাস্তবতার মিল খুঁজে পান। তদন্ত শেষে কমিটির প্রধান মোজাম্মেল হক গণমাধ্যমকে স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেন যে, ফ্যামিলি কার্ডের নামে অর্থ আদায়ের অভিযোগটি শতভাগ সত্য। দরিদ্র নারীদের অসহায়ত্বকে পুঁজি করে এই অর্থ হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে।

স্থানীয় বাসিন্দাদের সাথে কথা বলে জানা যায়, ফ্যামিলি কার্ড ছিল বিএনপির ইশতেহারের অন্যতম অলঙ্কার। প্রধানমন্ত্রীর একটি সদিচ্ছামূলক প্রকল্প যখন একদম তৃণমূল পর্যায়ে এসে এভাবে কালিমালিপ্ত হয়, তখন তার দায়ভার শেষ পর্যন্ত দলের ওপরই বর্তায়। আছিম পাটুলী ইউনিয়নের এই ঘটনাটি প্রমাণ করে যে, ওপরের স্তরে যত ভালো পরিকল্পনা নেওয়া হোক না কেন, মাঠপর্যায়ে তদারকি না থাকলে তার সুফল জনগণের কাছে পৌঁছানোর বদলে কিছু অসাধু ব্যক্তির পকেটে চলে যায়।

Post a Comment

0 Comments