![]() |
| ভিয়েতনাম যুদ্ধ: বিশ্বের শ্রেষ্ঠতম সামরিক শক্তিধর আমেরিকার করুণ পরাজয় |
বিংশ শতাব্দীর ইতিহাসের পাতায় ভিয়েতনাম যুদ্ধ এক অমীমাংসিত বিস্ময়। একদিকে তৎকালীন বিশ্বের সর্বাধুনিক সমরাস্ত্রে সজ্জিত পরাশক্তি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, আর অন্যদিকে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার একটি নবগঠিত রাষ্ট্রের সামান্য গেরিলা যোদ্ধা। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর যে আমেরিকাকে অজেয় মনে করা হতো, সেই দেশটিই টানা আট বছর যুদ্ধের পর বিপুল অর্থ-সম্পদ ও জনবল খুইয়ে ভিয়েতনাম ত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছিল। কিন্তু কেন? কীভাবে সামান্য কিছু গেরিলা যোদ্ধার কাছে নতি স্বীকার করতে হয়েছিল পেন্টাগনকে?
যে ভয়ে আমেরিকা ভিয়েতনাম যুদ্ধ শুরু করে
ভিয়েতনামের সংকটের বীজ বপন করা হয়েছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে থেকেই। ১৯ শতকের মাঝামাঝি থেকে ভিয়েতনাম ছিল ফরাসিদের উপনিবেশ। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জাপান এটি দখল করে নেয়। কিন্তু যুদ্ধের পর যখন ফ্রান্স আবার তার কর্তৃত্ব ফিরে পেতে চায়, তখনই শুরু হয় সংঘাত। হো চি মিনের নেতৃত্বে উত্তর ভিয়েতনামের কমিউনিস্ট বাহিনী (ভিয়েত মিন) ফরাসিদের বিরুদ্ধে লড়াই শুরু করে এবং ১৯৫৪ সালে 'ডিয়েন বিয়েন ফু'-র যুদ্ধে ফরাসিদের চূড়ান্তভাবে পরাজিত করে।এরপর জেনেভা চুক্তির মাধ্যমে ভিয়েতনাম দুই ভাগে বিভক্ত হয়—উত্তর ও দক্ষিণ। উত্তর ছিল কমিউনিস্ট শাসিত এবং দক্ষিণ ছিল মার্কিন সমর্থিত পুঁজিবাদী শাসনের অধীনে। আমেরিকা ভয় পেয়েছিল 'ডমিনো ইফেক্ট' (Domino Theory) নিয়ে; অর্থাৎ ভিয়েতনাম যদি কমিউনিস্টদের দখলে যায়, তবে একে একে পুরো দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া কমিউনিজমের ছায়াতলে চলে যাবে। এই ভয় থেকেই আমেরিকা সরাসরি ভিয়েতনাম যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে।
সামান্য গেরিলা যোদ্ধা বনাম বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী সামরিক বাহিনী
মার্কিন সামরিক বাহিনী তখন বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী। তাদের ছিল অত্যাধুনিক ট্যাংক, বোমারু বিমান এবং শক্তিশালী নৌবাহিনী। কিন্তু ভিয়েতনামের যুদ্ধে এই শক্তি কোনো কাজেই আসেনি। উত্তর ভিয়েতনামের যোদ্ধারা এবং দক্ষিণ ভিয়েতনামের কমিউনিস্ট গেরিলা বাহিনী (ভিয়েত কং) সরাসরি যুদ্ধে না গিয়ে অবলম্বন করে 'হিট অ্যান্ড রান' কৌশল।ভিয়েত কং যোদ্ধারা মাটির নিচে মাইলের পর মাইল সুড়ঙ্গ তৈরি করেছিল। এই সুড়ঙ্গগুলোতে ছিল একধরনের কলোনি, যেখানে ঘর-বাড়ি, রান্নাঘর এমনকি হাসপাতালও ছিলো। মার্কিন সৈন্যরা যখন জঙ্গলে তল্লাশি চালাত, যোদ্ধারা হঠাৎ মাটি ফুড়ে আক্রমণ করত এবং পরক্ষণেই সুড়ঙ্গে অদৃশ্য হয়ে যেত। মার্কিন সৈন্যরা জানত না শত্রু কে। দিনের বেলা যে কৃষক ধান কাটত, রাতে সেই হয়ে যেত ভয়ংকর গেরিলা। এই মনস্তাত্ত্বিক চাপ মার্কিন সৈন্যদের মানসিকভাবে ভেঙে দিচ্ছিলো।
ভৌগোলিক প্রতিকূলতা
ভিয়েতনামের আবহাওয়া এবং ভূ-প্রকৃতি মার্কিনদের জন্য ছিল চরম প্রতিকূল। অতিরিক্ত আর্দ্রতা, কর্দমাক্ত পথ, গহিন জঙ্গল এবং বিষধর সাপ ও পোকার আক্রমণ সৈন্যদের মনোবল কমিয়ে দিচ্ছিল। যে কারণে মার্কিন বিমানবাহিনী জঙ্গল ধ্বংস করে দেওয়ার জন্য 'এজেন্ট অরেঞ্জ' নামক এক বিষাক্ত রাসায়নিক ব্যবহার করেছিল, যা পরিবেশের দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি করে এবং পরবর্তীতে বহু মানুষের বিকলাঙ্গ হয়ে যায়। কিন্তু এত কিছুর পরেও মার্কিন বাহিনী জঙ্গলের নিয়ন্ত্রণ নিতে ব্যর্থ হয়।মার্কিন ভাড়াটে যুদ্ধা বনাম অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই
আমেরিকা এই যুদ্ধকে দেখেছিল কেবলমাত্র কমিউনিজম ঠেকানোর লড়াই হিসেবে। কিন্তু ভিয়েতনামিদের কাছে এটি ছিল তাদের অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই, নিজেদের ভূমিকে একত্রিত করার লড়াই। হো চি মিন ছিলেন তাদের কাছে এক মহান নেতা। ভিয়েতনামের জনগণের মধ্যে যে দেশপ্রেম ও ত্যাগের মানসিকতা ছিল, তা অর্থের বিনিময়ে যুদ্ধে জড়ানো মার্কিন ভাড়াটে সৈন্যদের মধ্যে থাকা অসম্ভব ছিল। ইতিহাস বলে, যখন কোন একটি জাতি তাদের স্বাধীনতার জন্য মরণপণ লড়াই করে, তখন বিশ্বের কোনো অস্ত্রই তাদের দমাতে পারে না।দক্ষিণ ভিয়েতনাম সরকারের অযোগ্যতা ও অভ্যন্তরীণ কোন্দল
এদিকে আমেরিকা দক্ষিণ ভিয়েতনাম সরকারকে সমর্থন দিচ্ছিল, তারা ছিল মূলত পুতুল সরকার। নগ ডিন ডিয়েম এবং পরবর্তী শাসকেরা দুর্নীতির চ্যাম্পিয়ন ছিল। যে তাদের কোন জনসমর্থন ছিলোনা। এছাড়া বৌদ্ধদের ওপর নির্যাতন এবং অগণতান্ত্রিক শাসন সাধারণ ভিয়েতনামিদের উত্তর ভিয়েতনামের কমিউনিস্টদের প্রতি আরও সহানুভূতিশীল করে তুলেছিলো। যেমনটা বাংলাদেশী মানুষের পাকিস্তানের প্রতি।সে সময় ভিয়েতনাম যুদ্ধ কেবল ভিয়েতনাম আর আমেরিকার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। উত্তর ভিয়েতনাম সরাসরি সাহায্য পাচ্ছিল তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং চীন থেকে। সোভিয়েত ইউনিয়ন তাদের উন্নত আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা (S-75 Dvina) সরবরাহ করেছিল, যা মার্কিন বি-৫২ বোমারু বিমানগুলোকে ভূপাতিত করতে সক্ষম ছিল। চীন থেকে আসত বিপুল পরিমাণ খাদ্য এবং হালকা অস্ত্রশস্ত্র। আমেরিকা সবসময় এই আশঙ্কায় ছিল যে, যদি তারা উত্তর ভিয়েতনামে বড় ধরনের স্থল হামলা চালায়, তবে চীন সরাসরি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়বে (যেমনটি হয়েছিল কোরিয়া যুদ্ধে)। এই সীমাবদ্ধতা মার্কিনদের হাত-পা বেঁধে দিয়েছিল।
একটি রাস্তায় পুরা যুদ্ধের গতিপথ ঘুরিয়ে দেয়
উত্তর ভিয়েতনাম থেকে দক্ষিণে যুদ্ধের রসদ পাঠানোর জন্য তারা ব্যবহার করত 'হো চি মিন ট্রেইল' রোড। এটি শুধু একটি রাস্তা নয়, বরং জঙ্গল ও পর্বতময় পথে তৈরি হাজার হাজার কিলোমিটার দীর্ঘ রাস্তা, ট্রেইল ও টানেলের একটি জটিল নেটওয়ার্ক। এটি লাওস এবং কম্বোডিয়ার মধ্য দিয়ে যাওয়া ঘন জঙ্গলের এক রাস্তা। আর আমেরিকা হাজার হাজার টন বোমা ফেলে এই রাস্তা ধ্বংস করতে পারেনি। যদি কখনো রাস্তা ক্ষতিগ্রস্ত হতো রাতারাতি ভিয়েতনামিরা সেই রাস্তা মেরামত করে ফেলত। এই নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ ব্যবস্থা যুদ্ধের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিল।বিশ্বের প্রথম টেলিভিশন যুদ্ধ
ভিয়েতনাম যুদ্ধই ছিল বিশ্বের প্রথম টেলিভিশন যুদ্ধ (Televised War)। যুদ্ধের বিভীষিকা যখন আমেরিকার সাধারণ মানুষের ঘরে ঘরে পৌঁছাতে শুরু করলো, তখন তারা শিউরে উঠল। 'মাই লাই ম্যাসাকার' (My Lai Massacre)-এর মতো নৃশংস হত্যাকাণ্ডের খবর ফাঁস হওয়ার পর মার্কিনদের নৈতিক ভিত্তি ধসে পড়তে থাকলো।আমেরিকার বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে যুদ্ধের বিরুদ্ধে তুমুল বিক্ষোভ শুরু হলো। তখন হাজার হাজার তরুণ যুদ্ধে যেতে অস্বীকার করে। অপরদিকে যুদ্ধের কারণে মার্কিন অর্থনীতিতে মুদ্রাস্ফীতি দেখা দিলো। তখন সাধারণ মানুষ প্রশ্ন তুলতে শুরু করলো—নিজেদের দেশে এত সমস্যা থাকতে কেন ভিয়েতনামের জঙ্গলে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার খরচ করা হচ্ছে? মার্কিনীদের এই চাপ, যুদ্ধের প্রতিকূলতা, আর সেনাদের ভঙ্গুর মনোবল নিয়ে আর বেশি দিন টিকতে পারলো না বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী সামরিক বাহিনী।
যে আঘাত পরাজিত করেছিল আমেরিকাকে
১৯৬৮ সালের জানুয়ারিতে উত্তর ভিয়েতনাম এবং ভিয়েত কং বাহিনী এক বিশাল আক্রমণ চালায় মার্কিন বাহিনীর ওপর, যা ইতিহাসে 'টেট অফেনসিভ' নামে পরিচিত। তখন সামরিকভাবে তারা সফল না হলেও রাজনৈতিক ও মানসিকভাবে এটি আমেরিকাকে গুঁড়িয়ে দেয়। আমেরিকানরা বিশ্বাস করতে শুরু করে যে, এই যুদ্ধে জেতা সম্ভব নয়। ওয়াশিংটনের নীতিনির্ধারকরা বুঝতে পারেন, ভিয়েতনামের কাদামাটি থেকে বেরিয়ে আসার সময় হয়েছে।এই যুদ্ধে প্রায় ৫৮,০০০ মার্কিন সৈন্য প্রাণ হারায়। অন্যদিকে ভিয়েতনামের প্রায় ৩০ লক্ষ মানুষ নিহত হয়, যাদের বেশিরভাগই ছিল বেসামরিক নাগরিক। এই যুদ্ধের ফলে বিশ্বের সামনে আমেরিকার সামরিক সক্ষমতার দম্ভ চূর্ণ হয়ে যায় এবং বিশ্বব্যাপী আমেরিকার ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ ধুলোয় মিশে যায়। একে বলা হয় 'ভিয়েতনাম সিনড্রোম', যা পরবর্তী কয়েক দশক আমেরিকার জনমতকে যুদ্ধের বিরুদ্ধে এবং সরকারের সিদ্ধান্তের প্রতি আস্থাহীন করে তুলে।
ভিয়েতনাম যুদ্ধের পরাজয় আমাদের শেখায় যে, কেবল প্রযুক্তিতে শ্রেষ্ঠত্ব থাকলেই যুদ্ধে জয় নিশ্চিত নয়। যুদ্ধের জয়-পরাজয় নির্ধারিত হয় জনসমর্থন এবং সঠিক লক্ষ্যস্থির করার ক্ষমতার ওপর। ভিয়েতনামের মানুষ প্রমাণ করেছিল যে, বাঁশের লাঠি আর মাটির নিচের সুড়ঙ্গ দিয়েও এক বিশ্বজয়ী সেনাবাহিনীকে পরাজিত করা সম্ভব যদি হৃদয়ে স্বাধীনতার প্রবল বাসনা থাকে।

