দেশে আর কতদিনের তেল আছে?

Khomota
0

মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে হঠাৎ তৈরি হওয়া অস্থিরতা আর যুদ্ধের কারণে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ জ্বালানি বাজারে এক প্রবল ঢেউ তুলেছে। বৈশ্বিক তেলের বাজারের কেন্দ্রবিন্দুতে অস্থিরতা শুরুর পর থেকেই দেশের সাধারণ মানুষ ও যানবাহন চালকদের মধ্যে তৈরি হয়েছে ‘জ্বালানি ফুরিয়ে যাওয়ার’ আতঙ্ক। যদিও সরকারের পক্ষ থেকে বারবার বলা হচ্ছে যে মজুদ পর্যাপ্ত আছে, তবুও মাঠ পর্যায়ের চিত্র কিছুটা ভিন্ন। পেট্রোল পাম্পগুলোর সামনে দীর্ঘ সারি, গ্রাহক-বিক্রেতা বাকবিতণ্ডা এবং অবৈধ মজুদের বিরুদ্ধে প্রশাসনের কঠোর অভিযান—সব মিলিয়ে এক অস্বস্তিকর সময় পার করছে বাংলাদেশ।

দেশে আর মাত্র ১০ থেকে ১১ দিনের তেল মজুদ আছে

জ্বালানি তেলের নিরাপত্তা নিয়ে যখন সাধারণ মানুষের মনে প্রশ্ন দানা বাঁধছে, তখন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় সর্বশেষ তথ্য প্রকাশ করেছে। ৩১ মার্চ ২০২৬ পর্যন্ত পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের হাতে বর্তমান জ্বালানি মজুদের পরিমাণ নিম্নরূপ:
​ডিজেল: ১,২৮,৯৩৯ মেট্রিক টন ​অকটেন: ৭,৯৪০ মেট্রিক টন ​পেট্রোল: ১১,৪৩১ মেট্রিক টন ​জেট ফুয়েল: ৪৪,৬০৯ মেট্রিক টন

জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশে ডিজেলে প্রতিদিনের গড় চাহিদা প্রায় ১২ হাজার মেট্রিক টন। সেই হিসেবে বর্তমানে যে পরিমাণ ডিজেল মজুদ আছে, তা দিয়ে পরবর্তী ১০ থেকে ১১ দিনের চাহিদা মেটানো সম্ভব। তবে সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, এই মজুদ শেষ হওয়ার আগেই নতুন চালান পাইপলাইনে রয়েছে। সম্প্রতি মালয়েশিয়া থেকে ৩০ হাজার মেট্রিক টন এবং ভারত থেকে পাইপলাইনের মাধ্যমে ২২ হাজার মেট্রিক টন ডিজেল দেশে এসে পৌঁছেছে, যা জাতীয় গ্রিডে স্বস্তি ফেরাবে।

বাংলাদেশ প্রতি বছর প্রায় ৬৫ থেকে ৬৮ লাখ টন জ্বালানি তেল আমদানি করে। এর বড় একটি অংশ আসে সৌদি আরব এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো থেকে। এ ছাড়া ভারত, মালয়েশিয়া এবং সিঙ্গাপুর থেকেও নিয়মিত ডিজেল আমদানি করা হয়। ​বাংলাদেশের স্টোরেজ বা সংরক্ষণ সক্ষমতা চাহিদার তুলনায় সীমিত হওয়ায় একসাথে পুরো বছরের তেল মজুদ করার সুযোগ নেই। সাধারণত চাহিদার ওপর ভিত্তি করে নিয়মিত বিরতিতে জাহাজ আসে এবং তা ব্যবহার করা হয়। এই ‘চক্রাকার’ প্রক্রিয়ার কারণেই বৈশ্বিক অস্থিরতা শুরু হলে সরবরাহ চেইনে বিঘ্ন ঘটার শঙ্কা তৈরি হয়।

মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে গত মার্চ মাস থেকেই সরকার জ্বালানি ব্যবহারে ‘রেশনিং’ বা সাশ্রয়ী ব্যবহারের কৌশল গ্রহণ করেছে। গত বছরের এপ্রিল মাসের চাহিদাকে মানদণ্ড ধরে এ বছরও সমপরিমাণ সরবরাহ নিশ্চিত করার পরিকল্পনা করা হয়েছে। জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ও যুগ্মসচিব মনির হোসেন চৌধুরী জানিয়েছেন, সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে এবং এপ্রিল মাসে কোনো বড় ধরনের সংকটের আশঙ্কা নেই। ​সরকারের মতে, পাম্পগুলোতে যে ভিড় দেখা যাচ্ছে তা মূলত ‘মনস্তাত্ত্বিক’। মানুষ আতঙ্কিত হয়ে প্রয়োজনের অতিরিক্ত তেল সংগ্রহ করার চেষ্টা করছে (যাকে অর্থনীতিতে 'প্যানিক বায়িং' বলা হয়), যা বাজারে কৃত্রিম চাপ তৈরি করছে।

রাজধানীর সাভার, মিরপুর, বাড্ডা বা গাবতলীর মতো জায়গার পাম্পগুলোতে গেলে দেখা যায় এক ভিন্ন চিত্র। মিরপুরের বাসিন্দা মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম। পেশায় একজন পাঠাও চালক। তার মতে হাজারো মানুষ ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়েও চাহিদামতো তেল পাচ্ছেন না। দৈনন্দিন ফ্যামিলির খরচ যোগান দেওয়ায় অসম্ভব হয়ে যাচ্ছে। সারাদিন তেলের লাইনে দাঁড়িয়ে সময় চলে যায়। আর দিনশেষে একপ্রকার খালি হাতেই বাসায় ফিরতে হয়। আবার ঘন্টার পর ঘন্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকার পর অনেক পাম্প থেকে তেল নাই বলে ফিরিয়ে দেওয়া হচ্ছে, যা সাধারণ মানুষের মনে ক্ষোভ সৃষ্টি করছে, বলছিলেন ম. জাহাঙ্গীর।

অন্যদিকে, পেট্রোল পাম্প মালিকরাও আছেন চরম বিপাকে। ‘পেট্রোল পাম্প ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন’ জানিয়েছে, সরবরাহ সীমাবদ্ধতার কারণে তারা সব গ্রাহককে খুশি করতে পারছেন না এবং অনেক সময় উগ্র আচরণের শিকার হতে হচ্ছে। সম্প্রতি তেল না পেয়ে হত্যাকান্ডের মতো ঘটনাও ঘটেছে। এমন অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে তারা রাতে পেট্রোল ও অকটেন বিক্রি বন্ধ রাখার জন্য সরকারের কাছে আবেদনও করেছেন।

এদিকে বাজার স্থিতিশীল রাখতে সরকার কঠোর অবস্থান নিয়েছে। জ্বালানি তেলের সঠিক ব্যবস্থাপনা ও পাচার রোধে সারাদেশে ১১৬ জন ‘ট্যাগ অফিসার’ নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ে তারা সরাসরি পাম্পগুলোর তদারকি করছেন। গত ৩০ মার্চ একদিনেই সারাদেশে ৩৯১টি মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হয়েছে। অভিযানে অবৈধভাবে মজুদ করা প্রায় ৬৮ হাজার লিটার ডিজেল এবং বিপুল পরিমাণ পেট্রোল ও অকটেন উদ্ধার করা হয়েছে।

তবে সরকারি আশ্বাসের পাশাপাশি জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের কণ্ঠে কিছুটা ভিন্ন সুর শোনা যাচ্ছে। জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ম. তামিম মনে করেন, বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো ‘কৌশলগত মজুদ’ বা স্ট্রেটেজিক রিজার্ভের সক্ষমতা কম থাকা। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী, একটি দেশের হাতে অন্তত ৯০ দিনের জ্বালানি মজুদ থাকা উচিত। অথচ বাংলাদেশের স্টোরেজ সক্ষমতা সর্বোচ্চ ৩০ থেকে ৪০ দিনের। ম. তামিম বলেন, "সিঙ্গাপুর বা মালয়েশিয়ার সঙ্গে আমাদের জুন মাস পর্যন্ত চুক্তি থাকলেও, তারাও অপরিশোধিত তেল মূলত মধ্যপ্রাচ্য থেকেই সংগ্রহ করে। ফলে মূল উৎসে দীর্ঘমেয়াদী সমস্যা হলে তার প্রভাব বাংলাদেশেও পড়বে।"

তবে সাধারণ জনগণ ও বিশেষজ্ঞদের মতে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বাংলাদেশের প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদী স্টোরেজ সুবিধা বাড়ানো এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে আরও দ্রুত অগ্রসর হওয়া। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ যদি দীর্ঘস্থায়ী হয়, তবে বর্তমান ১০-১২ দিনের মজুদ ব্যবস্থার ওপর বড় ধরণের চাপ সৃষ্টি হতে পারে। তাই এখনই সাশ্রয়ী ব্যবহার এবং নতুন নতুন আমদানিকারকের সাথে কার্যকর চুক্তি সম্পাদন করা জরুরি।

Post a Comment

0 Comments

Post a Comment (0)

#buttons=(Ok, Go it!) #days=(20)

Our website uses cookies to enhance your experience. Check Now
Ok, Go it!