![]() |
| সংবাদ সম্মেলনে জামায়াতে ইসলামীর আমীর |
বিরোধী দল ও জামায়াতে ইসলামীর আমির অভিযোগ করে বলেন—রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা, দুর্নীতি দমন এবং জনগণের মৌলিক অধিকারের সাথে সংশ্লিষ্ট প্রতিটি বিল সংসদে যথাযথ আলোচনার মাধ্যমে পাস করতে হবে। লুকোচুরির মাধ্যমে বা বিশেষ কোনো গোষ্ঠীর ক্ষমতা কুক্ষিগত করার হীন উদ্দেশ্যে কোনো আইন পাস করা হলে তা হবে জনগণের সাথে বড় ধরনের 'ব্রিচ অফ ট্রাস্ট' বা 'বিশ্বাসঘাতকতা’।
বিএনপির বিরুদ্ধে বিশ্বাসঘাতকতার অভিযোগ বিরোধী দলের
সংসদীয় কার্যক্রমের শুরুতে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের রেখে যাওয়া ১৩৩টি অধ্যাদেশ পর্যালোচনার জন্য একটি বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়েছিল। নিয়ম অনুযায়ী, অধ্যাদেশ উত্থাপনের ৩০ ক্যালেন্ডার দিবসের মধ্যে এগুলোর নিষ্পত্তি করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। সরকারি ও বিরোধী দলের সদস্যদের সমন্বয়ে গঠিত এই কমিটির মূল লক্ষ্য ছিল জাতীয় ঐকমত্যের ভিত্তিত আইনগুলোকে চূড়ান্ত রূপ দেওয়া। তবে বিরোধী দলের অভিযোগ, এই কমিটিতে সরকারি দল একতরফা আধিপত্য বিস্তার করেছে। বিরোধী দলীয় মেম্বারদের বাদ রেখেই সরকারি দলের সদস্যরা গোপনে একটি ‘ফাইনাল শেপ’ বা চূড়ান্ত রূপ তৈরি করেছেন।বিরোধী দলের অভিযোগ:
"এটি স্পষ্টত একটি ব্রিচ অফ ট্রাস্ট। একটি সুস্থ সংসদীয় ধারায় যেখানে সরকারি ও বিরোধী দলের সম্মিলিত আলোচনার কথা ছিল, কিন্তু সেখানে সরকারি দলের একপক্ষীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ সংসদীয় গণতন্ত্রের আদর্শকে ক্ষুণ্ণ করেছে।"
যেভাবে ফ্যাসিবাদ প্রতিষ্ঠার পথে বিএনপি
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারে ১৩৩টি অধ্যাদেশ যখন সংসদে উত্থাপিত হয়, তখন তা আর কোনো দলের ব্যক্তিগত সম্পদ থাকে না, বরং তা হয়ে ওঠে 'সংসদের প্রপার্টি'। বিরোধী দলের দাবি ছিল, এই ১৩৩টি অধ্যাদেশের প্রতিটি নিয়ে সংসদে বিস্তারিত আলোচনা হতে হবে। কোনো একটিকেও বাদ দেওয়ার বা এড়িয়ে যাওয়ার অধিকার বিশেষ কমিটির নেই।এই দাবির পরিপ্রেক্ষিতে স্পিকারের রুলিং এবং কার্য উপদেষ্টা কমিটির সিদ্ধান্ত ছিল ইতিবাচক। এমনকি জনগণের স্বার্থে ছুটির দিনে (শুক্রবার) এবং রাত ১২টা পর্যন্ত সংসদ চালিয়ে এই অধ্যাদেশগুলো নিষ্পত্তির কথা ছিল। কিন্তু অভিযোগ উঠেছে, শেষ মুহূর্তে গুরুত্বপূর্ণ বিলগুলোকে আলোচনার বাইরে রেখে ‘লেপস’ বা বাতিলের খাতায় ফেলার পায়তারা চলছে।
বাতিল হতে যাওয়া অধ্যাদেশ গুলো কেন এতো গুরুত্বপূর্ণ?
বাতিল হতে যাওয়া অধ্যাদেশ গুলো সরাসরি জনগণের নিরাপত্তা এবং রাষ্ট্র সংস্কারের সাথে জড়িত। এ নিয়ে বিরোধী দল চরম উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, এই বিলগুলো পাস হওয়া একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের জন্য অপরিহার্য।বিল গুলো হলো:
দুদক (দুর্নীতি দমন কমিশন) বিল: যা রাষ্ট্র থেকে দুর্নীতি নির্মূলের প্রধান হাতিয়ার।
পুলিশ সংস্কার কমিশন বিল: পুলিশেকে জনবান্ধব হিসেবে গড়ে তুলা এবং রাজনৈতিক ভাবে ব্যবহার হওয়া রোধ করা।
গুম কমিশন বিল: বিগত সময়ের মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিচার নিশ্চিত করতে এই বিলের বিকল্প নেই।
পিএসসি (পাবলিক সার্ভিস কমিশন) বিল: এটি শিক্ষিত যুবসমাজের মেধাভিত্তিক নিয়োগ নিশ্চিত করণের চাবিকাঠি।
গণভোট অধ্যাদেশ: এটি জনগণের সরাসরি মতামতের মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া।
বিরোধী দলের অভিযোগ, সরকার কেবল সেই বিলগুলোই বাস্তবায়ন করার পথে হাঁটছে যেগুলো তাদের ক্ষমতাকে টিকিয়ে রাখতে বা 'ফ্যাসিবাদ' বহাল রাখতে সহায়তা করবে। পক্ষান্তরে, জনগণের ভাগ্যের সাথে জড়িত বিলগুলোকে কৌশলে এড়িয়ে যাওয়া হচ্ছে। এ ছাড়া সংবাদ সম্মেলনে নির্বাচনের স্বচ্ছতা এবং পর্দার আড়ালের সমঝোতা নিয়ে বিস্ফোরক মন্তব্য করেন জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান।
জামায়াতে ইসলামীর আমিরের বক্তব্যটি হুবহু তুলে ধরা হলো
এই সংসদ তার ফাংশন শুরু করেছে মার্চ মাসের ১২ তারিখ থেকে। মার্চ মাসের ১২ তারিখে বিধি মোতাবেক বিগত সরকারের, অর্থাৎ অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ১৩৩টা জারি করা অধ্যাদেশগুলো উত্থাপিত হয়; এবং এটা বিধি মোতাবেকই হয়েছে। এটাই নিয়ম। উত্থাপনের ৩০ দিনের ভিতরে, ৩০ ক্যালেন্ডার দিয়ে পঞ্জিকা দিবসের ভিতরে এটা নিষ্পত্তি করতে হবে।
ওই দিনই সংসদ থেকে একটা বিশেষ কমিটি করে দেওয়া হয়। এই বিশেষ কমিটি সরকারি দলের সম্মানিত সংসদ সদস্য জনাব এডভোকেট জয়নুল আবেদিনের নেতৃত্বে করা হয়। সেখানে সরকারি দল ছিল, বিরোধী দল ছিল। আলাপ-আলোচনা হয়েছে, বিভিন্ন সেশন হয়েছে। বিভিন্ন সেশনের পরে হঠাৎ করে দেখা গেল যে একটা রিপোর্ট তৈরি হয়ে গেছে। আমরা বিরোধী দলের যারা মেম্বার ছিলাম তাদেরকে জিজ্ঞেস করলাম—এই যে বিশেষ কমিটির রিপোর্ট তৈরি হয়েছে, এটাকে আপনারা একসাথে বসে ফাইনাল করেছেন? তারা বললেন, না; এই ধরনের তো চূড়ান্তকরণ কোনো বৈঠকেই হয়নি।
আমরা তখন বললাম যোগাযোগ করেন। তারা যোগাযোগ করলেন। যোগাযোগ করে দেখা গেল যে, শুধু সরকারি দলের সদস্যরা মিলে এটাকে একটা ফাইনাল শেপ দিয়ে ফেলেছে। এইখানেই প্রথমে আমি বলব যে, 'ব্রিচ অফ ট্রাস্ট' হয়েছে। উচিত ছিল সবাই মিলেই ফাইনাল করা, অথবা ওখান থেকে দুই-তিনজনকে বা চারজনকে দায়িত্ব দিয়ে দেওয়া, যেখানে সরকারি দল থাকবে, বিরোধী দল থাকবে যে—এটাকে একটা ফাইনাল শেপ আপনারা দেন। তার কোনোটিই করা হয়নি।
এরপরে আমাদের আপত্তির মুখে কিছু কিছু জিনিস সংযোজন করা হয়েছে। এটা তো সঠিক সুস্থ ধারা হলো না। ওখান থেকেই শুরু হয়ে গেল সমস্যা। তারপরে বিলগুলো একে একে আসতে যখন শুরু করল, আমরা দেখলাম যে ওই রিপোর্টে একটা জায়গায় ক, খ, গ ইত্যাদি ভাগ করা হয়েছে। আমরা এটা দেখে পরবর্তী কার্য উপদেষ্টা কমিটির যে মিটিং ছিল, সেই মিটিংয়ে আমরা বললাম যে—১৩৩টা অধ্যাদেশ এই মহান সংসদে উত্থাপিত হয়েছে।
এখন সেই অধ্যাদেশগুলোর উপর যে বিশেষ কমিটি করা হয়েছে, সেই কমিটির ফাংশন হলো আবার তারা এটার উপরে কাজ করে এটাকে সংসদে এনে উত্থাপন করবে। তারা তো এখান থেকে বাদ দেওয়ার কিছু, রাখার কিছু বা ছাড়ার অধিকার রাখে না। এটা সংসদের প্রপার্টি। কাজেই আমাদের দাবি হচ্ছে, ১৩৩টির মধ্যে ১৩৩টি অধ্যাদেশই এখানে আলোচনা হতে হবে। এটা নিয়ে দীর্ঘ সময় কার্য উপদেষ্টা কমিটির মিটিংয়ে এটার আইনি দিক, এটার সুবিধা ও অসুবিধা নিয়ে অনেকে, অনেক মন্ত্রীরা অনেক কথা এনেছেন।
শেষ পর্যন্ত আমাদের যুক্তির সাথেই একমত হয়ে স্পিকার বলেছেন—হ্যাঁ, প্রত্যেকটাই আলোচনার জন্য আসবে, আনতে হবে। এবং এর জন্যে আমরা শুক্রবার দিন সরকারি ছুটির দিনও আমাদের সংসদ বসার দরকার পড়বে, আমরা বলেছি আমরা এগ্রি। উনি বলেছেন রাত ১২টা হলেও সবকিছু আলোচনা করে আমরা নিষ্পত্তি করব। এটাই ছিল কথা।
কিন্তু আজকে কী হলো? আজকে শেষ দিন আমরা একটার পর একটা মেমোর জন্য অপেক্ষা করছি। যে স্পিকারের দেওয়া রুলিং, তাঁর সিদ্ধান্ত, কার্য উপদেষ্টা কমিটির সিদ্ধান্ত—এটাই তো বাস্তবায়ন হবে। এগুলো জাতির নিরাপত্তার সাথে জড়িত, একান্ত স্বার্থের সাথে জড়িত, প্রত্যেকটি নাগরিকের জীবনের সাথে জড়িত। এই সবগুলোকে উপেক্ষা করা হয়েছে। এই সবগুলোকে উপেক্ষা করে এটাকে লেপসের খাতায় ফেলে দেওয়া হয়েছে। তারা আজকে এগুলো উত্থাপনই করবেন না।
এরপরে যখন আমরা সুস্পষ্টভাবে বললাম—মাননীয় স্পিকার, আপনি তো এই সংসদের সর্বোচ্চ ব্যক্তি, আপনি এখানকার সভাপতি। আপনার সভাপতিত্বে যে বৈঠক হলো, আপনি যে রুলিংটা দিলেন যে প্রত্যেকটা বিল আকারে এখানে সবগুলো অধ্যাদেশ আসবে, আমরা স্পষ্ট জানতে চাই এগুলো আসবে কিনা। বিশেষভাবে আমরা জানতে চাই—দুদকের বিল আসবে কিনা? পুলিশ সংস্কার কমিশন বিল আসবে কিনা? গুম কমিশনের বিল আসবে কিনা? পিএসসির বিল আসবে কিনা? যেগুলোর সাথে প্রত্যেকটি নাগরিকের ভাগ্য জড়িত, তার নিরাপত্তা জড়িত। যেগুলো দিয়ে অতীতে ফেসিজম কায়েম করা হয়েছে দফায় দফায় বাংলাদেশে, অসংখ্য মানুষকে হত্যা করা হয়েছে। গণভোট অধ্যাদেশ আছে—এগুলো তারা আনবেন না। তারা আনবেন কোনগুলো? যেগুলোতে ফেসিজম বহাল থাকবে, আনলে কোনো সমস্যা নাই, যেগুলো ক্ষমতাকে কুক্ষিগত করার জন্য যে গুলো দরকার সেগুলো তারা আনবেন।
স্থানীয় সরকার বিল তারাই তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে বলেছেন, তারাই তাদের ৩১ দফা সংস্কারের প্রস্তাবে বলেছেন যে, কোনো স্তরে তারা অনির্বাচিত কোনো প্রতিনিধি দেখতে চান না। তারা নিজেদের সাথেই নিজেরা তাদের কথা রক্ষা করেন নাই, জাতির সাথে রক্ষা করেন নাই। এই আচরণ স্ববিরোধী আচরণ। আস্থাহীনতার এই যে পরিবেশ তারা সৃষ্টি করেছেন, আমরা এটার জন্য নিন্দা জানাই।
এই পার্লামেন্ট আমরা মেনে নিয়েছি। এই পার্লামেন্ট নিয়ে অনেক কথা আছে, এই নির্বাচন নিয়ে অনেক কথা আছে। এবং সেই নির্বাচনের পক্ষে মিনিমাম দুইজন রাজসাক্ষী পাওয়া গেছে ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ব্যাপারে। একজন সাবেক উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য, আর অন্যজন বর্তমান সরকারি দলের একজন স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী। উনি বলেছেন যে আন্দোলন করেছে ছাত্ররা, আমরাও ছিলাম; তবে ক্যাপ্টেনের হাতে প্রফেসর ডক্টর ইউনুস লন্ডনে গিয়ে ট্রফি তুলে দিয়ে এসেছেন। শেম, শেম, শেম। ট্রফি যদি ওখানেই দিয়ে থাকেন, তাহলে কিসের নির্বাচন? তাহলে তো নির্বাচনের ভাগ্য যোগাযোগ করে পর্দার আড়ালে ঠিক করে জাতিকে ব্ল্যাকমেইলিং করা হয়েছে। যার প্রমাণ আপনারা গতকাল দেখেছেন।
সম্মানিত সাংবাদিক বন্ধুগণ, আপনাদের মাধ্যমে আমরা দেশবাসীকে আবারো কথা দিচ্ছি—জনগণের অধিকারের পক্ষে লড়াই করতে গিয়ে আমরা কোনো জায়গায় চুল পরিমাণ কোনো ছাড় দেব না। আমাদের অবস্থান অক্ষুণ্ন থাকবে ইনশাআল্লাহ। আমাদের এই লড়াই জনগণের অধিকার আদায়ের লড়াই। জনগণের গণরায় ও গণভোটের রায় বাস্তবায়ন হলেই আমরা মনে করি যে এই সবগুলোর সমাধানের রাস্তা খুলে যাবে। সংসদে আমরা তার সুবিচার পাই নাই, ইনশাআল্লাহ জনগণের কাছে আমরা সুবিচার পাব। আমরা জনগণকে নিয়েই সেই দাবি আদায় করে ছাড়ব।
অতীতেও সেদিন আমি বলেছি—অতীতেও এই ধরনের সংসদে কিছু কিছু বিলকে পাত্তাই দেওয়া হয়নি, পরে তারা নিজেরাই বাধ্য হয়েছেন সেগুলোকে নিজেরা শেপ দিতে। ঠিক তেমনি গণভোটের গণরায়, ৭০% মানুষের রায়কে অগ্রাহ্য করার মানে হচ্ছে গণতন্ত্রকে এবং জনগণকে অপমান করা। ইনশাআল্লাহ সব দাবি আদায় হবে। এবং সেই দাবি আদায় করতে গিয়ে যত ত্যাগ স্বীকার করতে হয়, ইনশাআল্লাহ আমরা প্রস্তুত। প্রিয় দেশের জন্য প্রস্তুত, প্রিয় জনগণের জন্য প্রস্তুত। প্রিয় জনগণ, আপনাদের ও আমাদের সকলের ভালোবাসার বাংলাদেশের জন্য আমাদের এই লড়াই। ইনশাআল্লাহ অধিকার আদায় না হওয়া পর্যন্ত এ লড়াই অব্যাহত থাকবে। ইনশাআল্লাহ।

