দেশে জ্বালানি সংকট নাই: সন্ধ্যা ৬টায় বন্ধ করতে হবে ব্যবসা-বানিজ্য

Khomota
0
দেশব্যাপী চলমান জ্বালানি সংকট
রাজধানী সহ দেশব্যাপী চলমান জ্বালানি সংকট মোকাবিলা এবং বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের লক্ষ্য নিয়ে সরকারি সিদ্ধান্ত অনুযায়ী রাজধানীর অভিজাত শপিংমলসহ দেশের সব বিপণিবিতান সন্ধ্যা ৬টার মধ্যে বন্ধের নির্দেশনা কার্যকর শুরু হয়েছে। শুক্রবার থেকে কার্যকর হওয়া এই সিদ্ধান্তের ফলে রাজধানীসহ সারা দেশের বাণিজ্যিক এলাকায় এক অভূতপূর্ব পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।

একদিকে সরকারের জ্বালানি সাশ্রয়ের উদ্যোগ, অন্যদিকে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন ভোগান্তি ও ব্যবসায়ীদের অনিশ্চয়তা—সব মিলিয়ে এক মিশ্র পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে অতিবাহিত হচ্ছে সময়। এই সিদ্ধান্তের ফলে আগামী দিনগুলোতে আরও কী কী জটিল সমস্যা তৈরি হতে পারে এবং অর্থনীতির চাকা কতটা সচল থাকতে পারে, তা নিয়ে জনমনে বড় ধরনের প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

সরকারের এই সিদ্ধান্তে জনজীবনে বড় ধরণের পরিবর্তনের আভাস।

আমাদের দেশের প্রচলিত জীবনযাত্রায় কেনাকাটা এবং বিনোদন অনেকটাই সন্ধ্যা-নির্ভর। বিশেষ করে রাজধানী ঢাকার মতো ব্যস্ত শহরে মানুষ সারাদিন অফিস বা কর্মব্যস্ততা শেষ করে সন্ধ্যার পর পরিবার নিয়ে কেনাকাটা বা ঘরের প্রয়োজনীয় সামগ্রী সংগ্রহ করতে বের হন। সন্ধ্যা ৬টায় মার্কেট বন্ধ হয়ে যাওয়ার ফলে সবচেয়ে বড় সংকটে পড়বেন কর্মজীবী মানুষ। দিনের বেলা কর্মস্থলে থাকায় তাদের পক্ষে এই নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে বাজারঘাট করা অসম্ভব হয়ে পড়বে।

এর ফলে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য কেনাকাটায় দেখা দিতে পারে অস্থিরতা। ছুটির দিনে যে একটু স্বস্তির কেনাকাটা ছিল, তাও এখন সময়ের অভাবে দুঃসাধ্য হয়ে উঠবে। বিশেষ করে শিশুদের নিয়ে বাইরে বের হওয়া পরিবারগুলো চরম বিড়ম্বনার শিকার হতে পারে, যার প্রভাব পরবে মানুষের শারিরীক ও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর। দীর্ঘমেয়াদে এটি মানুষের সামাজিক জীবন এবং পারিবারিক বিনোদনের পরিধিকে সংকুচিত করে ফেলতে পারে।

সরকারের এই সিদ্ধান্তে সবচেয়ে ঝুঁকিতে পড়তে যাচ্ছে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা

বাংলাদেশি শপিংমল গুলোর কেনাকাটার আসল সময় শুরু হয় বিকেল ৩টার পর থেকে এবং তা জমে ওঠে রাত ১০টা পর্যন্ত। দিনের প্রখর রোদ আর গরমের কারণে সাধারণ ক্রেতারা সন্ধ্যার পর বের হতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন। এখন ৬টার মধ্যে দোকান বন্ধ করে দেওয়ার অর্থ হলো বিক্রির ‘পিক আওয়ার’ পুরোপুরি হারিয়ে ফেলা। এদিকে অধিকাংশ ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীরা সাধারণত ব্যাংক ঋণ বা এনজিও ঋণের মাধ্যমে তাদের ব্যবসা পরিচালনা করেন।

বিক্রি কমে যাওয়া মানে তাদের রুটিরুজির উপর চরম আঘাত। ফলে তাদের পক্ষে দোকানের ভাড়া, কর্মচারীর বেতন এবং ঋণের কিস্তি পরিশোধ করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়বে। তাছাড়া অনেক ছোট উদ্যোক্তারা ব্যবসা গুটিয়ে নিতে বাধ্য হতে পারেন, যা দেশের সামগ্রিক কর্মসংস্থানে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে ঈদ বা উৎসবের মৌসুমে এই কড়াকড়ি বজায় থাকলে ব্যবসায়িক খাতে ধস নামার আশঙ্কা প্রবল।

নিরাপত্তা ঝুঁকি ও অপরাধ প্রবণতা বেড়ে যাওয়ার আশংকা

শহরের ব্যস্ততম বিপণিবিতানগুলো সন্ধ্যা ৬টার মধ্যে অন্ধকার হয়ে গেলে সংশ্লিষ্ট এলাকার নিরাপত্তা নিয়ে বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। সাধারণত মার্কেট গুলো খোলা থাকলে আশপাশের এলাকা আলোকিত থাকে এবং মানুষের আনাগোনা থাকে। কিন্তু মার্কেট বন্ধ হয়ে গেলে রাস্তাগুলো জনশূন্য ও অন্ধকারাচ্ছন্ন হয়ে পড়বে। যেকারণে চুরি-ডাকাতির, ছিনতাই এবং পকেটমারদের তৎপরতা বেড়ে যেতে পারে।

বিশেষ করে নারী ও একা চলাচলকারী পথচারীরা চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগবেন। তাছাড়া মার্কেটের আশপাশে যে ভাসমান ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী বা ফুটপাতের দোকানদাররা জীবনধারণ করতেন, তাদের আয়ের উৎস বন্ধ হয়ে যেতে পারে। এতে সামাজিক অস্থিরতা এবং নানারকম অপরাধের প্রবণতা বাড়ার সম্ভাবনা দেখছেন বিশেষজ্ঞরা।

ক্ষতিগ্রস্ত হবে খাদ্য ও রেস্তোরাঁ খাত গুলো

ছোট বড় শপিংমলগুলোর আয়ের একটি বড় অংশ আসে ফুড কোর্ট এবং রেস্তোরাঁ ব্যবসা থেকে। মানুষ কেনাকাটা করতে এসে সপরিবারে রাতের খাবার বা নাশতা করেন। ৬টায় মার্কেট বন্ধ হয়ে যাওয়া মানে রেস্তোরাঁগুলোর রাতের ব্যবসায় লাল বাতি জ্বলে ওঠা। এই খাতের সাথে জড়িত হাজার হাজার শেফ, ওয়েটার এবং পরিচ্ছন্নতা কর্মীর চাকরি ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।

রাজধানীর চকবাজার এলাকায় কথা হচ্ছিল শাওন (ছদ্মনাম) নামের একটা ছেলের সাথে। শাওন আপসোস করে বলছিলেন, দিনে সে একটা মাদ্রাসায় পড়াশোনা করেন, আর বিকেলে একটা হালিমের দোকানে কাজ করেন। তার উপার্জিত অর্থের ওপর ফ্যামিলির একটা অংশ নির্ভরশীল। কিন্তু সরকারের এই সিদ্ধান্তের ফলে তার চোখেমুখে এখন দুশ্চিন্তার ছাপ স্পষ্ট।

আবার রেস্তোরাঁগুলোতে প্রতিদিন প্রচুর পরিমাণে কাঁচামাল এবং পচনশীল খাদ্যসামগ্রী মজুদ থাকে। হঠাৎ দোকান বন্ধের সিদ্ধান্তে অবিক্রিত খাবারের অপচয় বাড়তে পারে, যা জাতীয় সম্পদের অপচয় হিসেবেই বিবেচিত হবে। বিনোদন কেন্দ্র গুলোও এই সিদ্ধান্তের ফলে দর্শকহীন হয়ে পড়বে, যা সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডকে স্থবির করে দেবে।

সরকারের এই সিদ্ধান্তে ঢাকার যানজট আরো তিব্র হওয়ার আশংকা

মার্কেট বন্ধের সময় ৬টা নির্ধারিত হওয়ায় অফিস ফেরত যাত্রী এবং মার্কেট থেকে ফেরা ক্রেতারা একই সময়ে রাস্তায় নামবেন। এর ফলে ৫টা থেকে ৭টা পর্যন্ত রাজধানীসহ বড় শহরগুলোর রাস্তায় ব্যাপক যানজটের সৃষ্টি হতে পারে। সবাই একসাথে গন্তব্যে পৌঁছানোর চেষ্টা করায় গণপরিবহনে তিল ধারণের জায়গা থাকবে না। এতে বৃদ্ধ, নারী এবং অসুস্থ ব্যক্তিদের যাতায়াত দুর্বিষহ হয়ে উঠবে।

ট্রাফিক পুলিশ এবং আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষে এই বিশাল জনস্রোত নিয়ন্ত্রণ করা চ্যালেঞ্জিং হয়ে উঠতে পারে। পাশাপাশি যানবাহন গুলোএই সুযোগে কয়েক গুণ বেশি ভাড়া আদায় করতে পারে, যা দিনশেষে সাধারণ মানুষের পকেটে টান দেবে।

জাতীয় অর্থনীতি ও রাজস্ব আয়ের ওপর নেতিবাচক প্রভাব

মার্কেট এবং বিপণিবিতানগুলো রাষ্ট্রকে ভ্যাট এবং ট্যাক্স প্রদানের অন্যতম বড় উৎস। ব্যবসার পরিধি কমে গেলে সরকারের রাজস্ব আয়ে ঘাটতি দেখা দিতে পারে। বাণিজ্যিক বিদ্যুৎ ব্যবহারের হার কমে গেলে বিদ্যুৎ বিভাগ যে রাজস্ব হারাবে, তা আবাসিক খাতের ওপর বাড়তি চাপের সৃষ্টি করতে পারে। দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতির প্রবাহ সচল রাখতে যেখানে বেচাকেনা বাড়ানো প্রয়োজন, সেখানে সময় কমিয়ে দেওয়া উৎপাদনমুখী শিল্পের ওপরও পরোক্ষ চাপ তৈরি করবে। কারণ, পণ্য বিক্রি না হলে কলকারখানায় নতুন উৎপাদনের অর্ডার কম আসবে, যা দীর্ঘমেয়াদে জিডিপি প্রবৃদ্ধিতে বাধার কারণ হতে পারে।

বিশেষজ্ঞর ও জনগণের ভাবনা

বিদ্যুৎ সাশ্রয় বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে একটি অনিবার্য বাস্তবতা। তবে জনজীবন ও অর্থনীতিকে থমকে দিয়ে নয়, বরং বিকল্প পন্থায় এই সাশ্রয় নিশ্চিত করা সম্ভব। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, ৬টার পরিবর্তে রাত ৮টা পর্যন্ত সময়সীমা নির্ধারণ করা হলে ব্যবসায়িক ক্ষতি যেমন কম হতো, তেমনি বিদ্যুৎ সাশ্রয়ও দৃশ্যমান হতো। এছাড়া মার্কেটের এসি বা এসকেলেটর ব্যবহারে মিতব্যয়ী হওয়া এবং অপ্রয়োজনীয় আলোকসজ্জা বন্ধ করেও বড় ধরনের সাশ্রয় সম্ভব। জনগণের ভোগান্তি কমাতে এবং অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে সরকারের উচিত সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সাথে আলোচনা করে সময়সীমার পুনঃনির্ধারণ করা।
Tags

Post a Comment

0 Comments

Post a Comment (0)

#buttons=(Ok, Go it!) #days=(20)

Our website uses cookies to enhance your experience. Check Now
Ok, Go it!