![]() |
| সংস্কারমূলক অধ্যাদেশগুলো বাস্তবায়নে বর্তমান সরকারের 'সরে আসায়' টিআইবির সংবাদ সম্মেলন |
বিশেষ করে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যাদেশগুলো আইনে রূপান্তরের ক্ষেত্রে সরকারের বর্তমান নীতিকে ‘পেছু হটা’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। সংস্থাটির মতে, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, মানবাধিকার সুরক্ষা, দুর্নীতি দমন এবং গুমের মতো জঘন্য অপরাধ প্রতিরোধের ক্ষেত্রে সরকার যে রহস্যজনক অবস্থান নিয়েছে, তা জুলাই বিপ্লবের মূল চেতনার পরিপন্থি। সোমবার এক সংবাদ সম্মেলনে টিআইবি প্রধান ইফতেখারুজ্জামান সরকারের এই দ্বিমুখী আচরণের কঠোর সমালোচনা করে বলেন, সরকারের ওপর আস্থা রাখা এখন কঠিন হয়ে পড়ছে।
জুলাই বিপ্লবের আকাঙ্খা ও সংস্কার কি তবে মুখ থুবড়ে পড়ছে?
অন্তর্বর্তী সরকারের ১৮ মাস মেয়াদে রাষ্ট্র সংস্কারের উদ্দেশ্যে মোট ১৩৩টি অধ্যাদেশ জারি করা হয়েছিল। গণতান্ত্রিক রীতি অনুযায়ী, নির্বাচিত সরকারের প্রথম সংসদ অধিবেশনে এই অধ্যাদেশগুলো উত্থাপন করা হয়। এগুলো যাচাইয়ের জন্য গঠিত ১৪ সদস্যের বিশেষ কমিটি ৯৮টি অধ্যাদেশ হুবহু পাসের সুপারিশ করলেও বাকি ৩৫টি নিয়ে দেখা দিয়েছে ধোঁয়াশা।টিআইবি বলছে, যে অধ্যাদেশগুলো গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করতে পারত, সরকার কৌশলে সেগুলোকেই ঝুলিয়ে রাখছে, অথবা বাতিলের পথে হাঁটছে। এটি কি নিছক প্রশাসনিক প্রক্রিয়া, নাকি এর পেছনে রয়েছে ক্ষমতা কুক্ষিগত করার সুদূরপ্রসারী রাজনৈতিক অভিলাষ—সেই প্রশ্নটিই এখন জোরালো হচ্ছে।
বিচার বিভাগের স্বাধীনতা: আবারো কি রাজনৈতিক শৃঙ্খলে বন্দী?
একটি রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক স্তম্ভের সবচেয়ে বড় ভরসাস্থল হলো বিচার বিভাগ। বিগত অন্তর্বর্তী সরকার বিচার বিভাগকে নির্বাহী বিভাগের নিয়ন্ত্রণমুক্ত করতে যে তিনটি অধ্যাদেশ এনেছিল, বর্তমান সরকার সেগুলো সরাসরি রহিত বা বাতিল করার উদ্যোগ নিয়েছে। কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা ছাড়াই এই বাতিলকরণ বিচারিক স্বাধীনতার কফিনে শেষ পেরেক মেরে দেওয়ার সমান বলে মনে করছে টিআইবি।সরকার বলছে তারা এগুলো আরও 'যুগোপযোগী' করবে, কিন্তু বাস্তবে কোনো রোডম্যাপ না থাকা জনমনে সংশয় তৈরি করেছে। বিচার বিভাগ যদি আবারো রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণে চলে যায়, তবে জুলাই অভ্যুত্থানের অন্যতম প্রধান অঙ্গীকার 'ইনসাফ' বৈষম্যহীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা সপ্নই থেকে যাবে।
আইনি মারপ্যাঁচে গুম-খুন ও আয়না ঘরের পুনরাবৃত্তি কি ঘটতে চলছে?
গুমের মতো মানবতাবিরোধী অপরাধ রোধে অন্তর্বর্তী সরকারের অধ্যাদেশটি ছিল এক ঐতিহাসিক পদক্ষেপ। তবে বর্তমান আইনমন্ত্রীর বক্তব্য এই প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করছে। মন্ত্রী দাবি করেছেন, অধ্যাদেশটি সরাসরি আইনে পরিণত করলে ভুক্তভোগীরাই অন্যায়ের শিকার হতে পারেন। সরকারের এই যুক্তিকে 'ভিত্তিহীন' বলে মনে করছেন মানবাধিকার কর্মীরা।টিআইবি প্রধান ইফতেখারুজ্জামান প্রশ্ন তুলেছেন, একদিকে ক্ষমতাসীন দলের মহাসচিব জুলাই সনদ বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন, অন্যদিকে নীতিনির্ধারকরা মানবাধিকার সংক্রান্ত অধ্যাদেশগুলো পাশ কাটাতে আইনি জটিলতার দোহাই দিয়ে এড়িয়ে যাচ্ছেন। এই বিপরীতমুখী আচরণ কি গুম হওয়া ব্যক্তিদের পরিবারগুলোর সাথে এক ধরনের তামাশা নয়?
কেন ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ নিয়ে সংকট?
তৃণমূল পর্যায়ে গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করতে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার সংস্কার করা অত্যন্ত জরুরি। অন্তর্বর্তী সরকার বিশেষ পরিস্থিতির প্রয়োজনে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সরিয়ে প্রশাসক নিয়োগের যে সাময়িক নিয়ম করেছিল, বর্তমান সরকার এখন সেটাকেই স্থায়ী আইন হিসেবে গ্রহণ করতে চাইছে। একটি নির্বাচিত সরকার যদি নিজের ইচ্ছামতো জনগণের ভোটে জেতা প্রতিনিধিদের পদ থেকে সরিয়ে দেওয়ার ক্ষমতা হাতে রাখে, তবে তা জনগণের মতের অবমাননা ছাড়া আর কিছুই নয়। এতে স্থানীয় পর্যায়ে প্রশাসনিক স্বৈরাচার তৈরি হওয়ার ঝুঁকি থাকে। টিআইবির মতে, সরকারের এই সিদ্ধান্ত স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর নিজস্ব স্বাধীনতাকে পুরোপুরি নষ্ট করে দেবে, যা গণতন্ত্রের জন্য একটি বড় সংকট।সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে দলীয়করণ: দূর্নীতি কি আইনে পরিনত হচ্ছে?
পুলিশ বাহিনীকে একটি স্বাধীন ও জনসেবামূলক প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তোলার জন্য একটি শক্তিশালী 'পুলিশ কমিশন' গঠনের দাবি দীর্ঘদিনের। কিন্তু সরকার এখন যে নতুন আইনটি আনার পরিকল্পনা করছে, সেখানে জনগণের নিরাপত্তার চেয়ে পুলিশের ওপর সরকারের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখার সুযোগই বেশি রাখা হয়েছে। একইভাবে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এবং সরকারি হিসাব নিরীক্ষকের (CAG) মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বাধীনতা কমিয়ে দেওয়ার চেষ্টা চলছে। একটি স্বাধীন দেশে যদি এই ধরনের সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোই পরাধীন করে রাখা হয় বা সরকারের চাপে রাখা হয়, তবে দেশ থেকে দুর্নীতি দূর করা অসম্ভব হয়ে পড়বে। মূলত প্রতিষ্ঠানগুলোকে দুর্বল করে রাখা মানেই হলো দুর্নীতির পথকে আরও প্রশস্ত করা।জুলাই সনদের প্রতিশ্রুতি ও গণমানুষের আকাঙ্খাকে কি বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখানো হচ্ছে?
জুলাই অভ্যুত্থানের পর যে ‘জুলাই সনদ’ তৈরি হয়েছিল, তার প্রতিটি অক্ষরের পেছনে ছিল অসংখ্য মানুষের ত্যাগ ও আকাঙ্খা। ক্ষমতাসীন দল সেই সনদ বাস্তবায়নের কথা বললেও তাদের কর্মকান্ডে তার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না। টিআইবির সংবাদ সম্মেলনে উঠে আসা তথ্য বলছে, সরকার ১৬টি অধ্যাদেশকে 'শক্তিশালী' করার নামে অনির্দিষ্টকালের জন্য ঝুলিয়ে রেখেছে। এই দীর্ঘসূত্রতা আসলে সংস্কারকে বাধাগ্রস্ত করার এক সুপরিকল্পিত পদ্ধতি।সাধারণ জনগণ ও বিশেষজ্ঞরা কি মনে করেন?
একটি নির্বাচিত সরকারের প্রথম কাজ হওয়া উচিত ছিল অন্তর্বর্তী সরকারের ইতিবাচক সংস্কারগুলোকে পূর্ণতা দেওয়া। কিন্তু বর্তমান প্রেক্ষাপট বলছে উল্টো কথা। বিচার বিভাগ থেকে শুরু করে স্থানীয় সরকার—প্রতিটি ক্ষেত্রেই ক্ষমতার কেন্দ্রীভূত করণের এক নিরব চেষ্টা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। টিআইবি স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছে, গুম প্রতিরোধ, মানবাধিকার রক্ষা এবং দুর্নীতি দমনের মতো ইস্যুতে পিছু হটা মানেই হলো রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক রূপান্তরের সম্ভাবনাকে নস্যাৎ করা।দেশের আপামর সাধারণ জনগণ মনে করেন, সরকারের উচিত হবে বিশেষজ্ঞদের এই পর্যবেক্ষণগুলোকে গুরুত্ব দিয়ে অবিলম্বে একটি স্বচ্ছ সময়সীমা ঘোষণা করা। জনগণের ম্যান্ডেট নিয়ে ক্ষমতায় এসে জনগণেরই আকাঙ্ক্ষাকে পাশ কাটিয়ে যাওয়ার পরিণতি কখনো শুভ হয় না। জুলাই বিপ্লবের চেতনা রক্ষায় সরকারকে অবশ্যই 'দ্বিমুখী নীতি' ত্যাগ করে সংস্কারের পথে ফিরে আসতে হবে।

