প্রথম আলো ও ডেইলি স্টার নিয়ে জনগণ এতো ক্ষিপ্ত কেন?

Khomota
0
প্রথমআলো,ডেইলিস্টার
প্রথম আলো ও ডেইলি স্টারের বিতর্কিত ভূমিকায় বিক্ষুব্ধ জনতার আগুন
৫ই আগস্টের ছাত্র-জনতার মহাবিপ্লবের মধ্য দিয়ে দীর্ঘ দেড় দশকের স্বৈরাচারী ও ফ্যাসিস্ট আওয়ামী শাসনের অবসান ঘটেছে। এই পতন কেবল একটি রাজনৈতিক দলের পতন ছিল না, বরং এটি ছিল একটি সুসংগঠিত মাফিয়া তন্ত্রের পতন। আর এই তন্ত্রকে যারা বুদ্ধিবৃত্তিক রসদ জুগিয়েছিলো, যারা দীর্ঘ সময় ধরে শেখ হাসিনার গুম, খুন এবং ‘জঙ্গি নাটক’-এর নির্লজ্জ ন্যারিটিভ বা বয়ান তৈরি করে জনমতকে বিভ্রান্ত করেছিলো, তাদের অন্যতম প্রধান কারিগর হিসেবে অভিযুক্ত হয়েছে দেশের দুই প্রভাবশালী গণমাধ্যম— প্রথম আলো ও ডেইলি স্টার।

গত ১৮ই ডিসেম্বর শরিফ ওসমান বিন হাদির মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার পর উত্তেজিত জনতা এই দুটি পত্রিকা কার্যালয়ে যে অগ্নিসংযোগ ও ভাঙচুর চালিয়েছে, তা মূলত দীর্ঘদিনের জমে থাকা পুঞ্জীভূত ক্ষোভেরই বহিঃপ্রকাশ। তবে এই পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে যেন কোনো নিরপরাধ মানুষ বা আলেমকে বিচারের নামে হেনস্তার শিকার না হতে হয়, সেটি নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি।

প্রথম আলো ও ডেইলি স্টারের মিডিয়া ট্রায়াল ও ‘জঙ্গি’ নাটকের ন্যারিটিভ

আওয়ামী লীগের ফ্যাসিবাদী শাসনের সবচেয়ে বড় অস্ত্র ছিল ভীতি প্রদর্শন এবং পরিকল্পিতভাবে বিরোধী পক্ষকে দমনের জন্য ‘উগ্রবাদ’ বা ‘জঙ্গিবাদ’-এর তকমা দেওয়া। অভিযোগ রয়েছে, প্রথম আলো ও ডেইলি স্টার অত্যন্ত সুচারুভাবে এই প্রোপাগান্ডা বা অপপ্রচারকে জনমনে প্রতিষ্ঠিত করেছিলো। যখনই কোনো ভিন্নমতাবলম্বী বা ইসলামী ভাবাদর্শের মানুষ সরকারের অন্যায়ের প্রতিবাদ করেছে, তখনই এই পত্রিকাগুলো তাদের সম্পাদকীয় নীতি ও রিপোর্টিংয়ের মাধ্যমে তাদের ‘মৌলবাদী’ বা ‘জঙ্গি’ হিসেবে চিত্রিত করেছে।

হাসিনার গুম এবং বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের প্রেক্ষাপট তৈরিতে এই পত্রিকাগুলোর ভূমিকা ছিল চাটুকারিতার চূড়ান্ত পর্যায়। তারা কেবল সংবাদ পরিবেশন করেনি, বরং ফ্যাসিস্ট সরকারের অঘোষিত মুখপাত্র হিসেবে কাজ করেছে। বিশেষ করে ২০১৩ সালের শাপলা চত্বরের গণহত্যা থেকে শুরু করে ২০২১ সালের মোদিবিরোধী আন্দোলনে আলেমদের দমনে এই গণমাধ্যম দুটি যে 'সম্মতি উৎপাদন' (Manufacturing Consent) করেছে, তা বাংলাদেশের ইতিহাসে কালো অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে।

প্রথম আলো ও ডেইলি স্টার অফিসে অগ্নি সংযোগ এটি একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা।

গত ১৮ই ডিসেম্বর শরিফ ওসমান বিন হাদির মৃত্যুর খবরটি জনমনে দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে। আন্দোলনকারী এবং সাধারণ মানুষের অভিযোগ, শরিফ ওসমান বিন হাদির ঘটনাটা এই পত্রিকা গুলো নরমালাইজড করার চেষ্টা করেছে। যে কারণে উত্তেজিত জনতা কারওয়ান বাজার ও আজিমপুরে প্রথম আলো ও ডেইলি স্টার কার্যালয়ে চড়াও হয়েছে, সাধারণ মানুষের অভিযোগ, এটি তখন কেবল কোনো ভবনের ওপর আক্রমণ ছিল না, বরং তা ছিল সত্য গোপনকারী ও ফ্যাসিবাদী বয়ান তৈরিকারীদের বিরুদ্ধে গণমানুষের ঘৃণার বহিঃপ্রকাশ।
প্রথম আলো office
আগুন নিয়ন্ত্রণের পর প্রথম আলো অফিস 
মানুষ বিশ্বাস করে, এই পত্রিকাগুলো সাংবাদিকতার লেবাসে দিনকে দিন নির্দিষ্ট এজেন্ডা বাস্তবায়ন করে আসছিল, যেখানে সাধারণ মানুষের আবেগ ও দেশের সার্বভৌমত্বের চেয়ে বিদেশি প্রভুদের সন্তুষ্টিই ছিল বড়। তাদের 'ইসলামোফোবিক' এডিটোরিয়াল পলিসি দেশের মাদ্রাসা শিক্ষার্থী ও ধর্মপ্রাণ নাগরিকদের জন্য এক ভীতিকর পরিবেশ তৈরি করেছিল। এবং সেই ক্ষোভ থেকেই সাধারণ জনগণ এই পত্রিকা দু’টির ওপর চড়াও হয়েছে।

নিরপরাধ আলেমদের মুক্তি দিতে হেফাজতে ইসলামের আলটিমেটাম

প্রথম আলো ও ডেইলি স্টার কার্যালয়ে ভাঙচুরের ঘটনায় দায়েরকৃত মামলায় বর্তমানে অনেক নিরপরাধ সাধারণ মানুষ ও আলেম কারাবন্দি রয়েছেন। এই প্রেক্ষাপটে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ কঠোর অবস্থান ব্যক্ত করেছে। সংগঠনটির যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা আজিজুল হক ইসলামাবাদী এক বিবৃতিতে জানিয়েছেন, প্রথম আলো অফিস ভাঙচুরের মামলায় কারাবন্দি আলেম মাওলানা আইনুল হক কাসেমী গত ১০০ দিন ধরে বিনা বিচারে কারাগারে আছেন। হেফাজতে ইসলামের দাবি অনুযায়ী, মাওলানা কাসেমী এই ভাঙচুরের ঘটনার সাথে কোনোভাবেই সম্পৃক্ত ছিলেন না। তাকে কেবল তার ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে এবং পূর্ব শত্রুতার জের ধরে ষড়যন্ত্রমূলকভাবে এই মামলায় ফাঁসানো হয়েছে।
হেফাজতে ইসলামের
হেফাজতে ইসলামের বিবৃতি

বিবৃতিতে আরও বলা হয়, ওয়ান-ইলেভেনের সময় বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এবং মরহুমা বেগম খালেদা জিয়ার চরিত্র হননে প্রথম আলো ও ডেইলি স্টার পত্রিকা দুটি যে মিথ্যা সংবাদ প্রচার করেছিল, তার বিচার আজও হয়নি। অথচ একজন নিরপরাধ আলেমকে কেবল সন্দেহের বশে মাসের পর মাস আটকে রাখা হয়েছে, যা মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন। হেফাজতের নেতারা স্পষ্ট হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, গণমাধ্যমের সংস্কার করতে হলে আগে তাদের অতীত অপরাধের হিসাব নিতে হবে, কিন্তু তার পরিবর্তে কোনো নিরীহ আলেম বা নাগরিককে বলির পাঁঠা বানানো যাবে না।

সুশাসন এবং প্রথম আলো ও ডেইলি স্টার নিয়ে জনগণের চাওয়া

দেশের আপামর সাধারণ জনগণ মনে করেন,
প্রথম আলো ও ডেইলি স্টার দীর্ঘকাল ধরে যেভাবে ‘সুশীল সমাজ’ এবং ‘প্রগতিশীলতা’র আড়ালে ফ্যাসিবাদকে সুরক্ষা দিয়েছে, তার জন্য তাদের জাতির কাছে ক্ষমা চাওয়া উচিত। একটি দেশের মেরুদণ্ড হিসেবে গণমাধ্যমকে হতে হবে নিরপেক্ষ এবং গণমুখী। কিন্তু এই পত্রিকাগুলো করপোরেট স্বার্থ ও আধিপত্যবাদী শক্তির পদলেহন করে সাংবাদিকতাকে কলঙ্কিত করেছে। তাদের বিরুদ্ধে সমালোচনা অব্যাহত রাখতে হবে এবং আইনি প্রক্রিয়ায় তাদের জবাবদিহিতার আওতায় আনতে হবে।

তবে দেশের জনগণ ও বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এই আইনি লড়াই যেন হয় স্বচ্ছ ও প্রকৃত অপরাধীদের বিরুদ্ধে। কোনো নিরপরাধ মানুষ যেন সাজা না পায় এবং ন্যায়বিচারের দাবি কলঙ্কিত না হয়। মাওলানা আইনুল হক কাসেমীর মতো ব্যক্তিদের মুক্তি দিয়ে রাষ্ট্রকে প্রমাণ করতে হবে যে, এটি প্রতিশোধের নয়, বরং ইনসাফের বাংলাদেশ।

Post a Comment

0 Comments

Post a Comment (0)

#buttons=(Ok, Go it!) #days=(20)

Our website uses cookies to enhance your experience. Check Now
Ok, Go it!