সাশ্রয়ী জনগণ, বিলাসী প্রধানমন্ত্রী: দেশের ভবিষ্যৎ আসলে কোনদিকে?

Khomota
0
arique Rahman Cinema Hall
হলিউড সিনেমা উপভোগ করতে মেয়েকে নিয়ে ধানমন্ডির সীমান্ত সম্ভারে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান
গতকাল শুক্রবার রাজধানীর একটি অভিজাত প্রেক্ষাগৃহে মেয়ে জাইমা রহমানকে নিয়ে সায়েন্স ফিকশন চলচ্চিত্র ‘প্রজেক্ট হেইল মেরি’ উপভোগ করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। শুক্রবার (৩ এপ্রিল) সন্ধ্যায় ধানমন্ডির সীমান্ত সম্ভারে তাদের এই উপস্থিতি বিনোদন জগতে সাড়া ফেললেও, দেশের বর্তমান আর্থ-সামাজিক ও জাতীয় সংকটের প্রেক্ষাপটে এটি নিয়ে তৈরি হয়েছে তীব্র বিতর্ক ও সমালোচনা। যখন দেশ এক বহুমুখী সংকটের মধ্য দিয়ে অতিবাহিত হচ্ছে, তখন রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পদের ব্যক্তির এমন আচরণকে অনেকেই মনে করছেন তিনি সাধারণ মানুষের দুঃখ-দুর্দশা বুঝতে পারছেন না।

দেশের সকল আইন এবং নিয়মনীতি শুধুই কি সাধারণ জনগণের জন্য?

বর্তমান সরকার দেশজুড়ে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের লক্ষ্যে কঠোর নির্দেশনা জারি করেছেন। সন্ধ্যা ৬টার পর দোকানপাট, শপিং মল ও ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে যাতে জাতীয় গ্রিডের ওপর চাপ কমানো যায়। অথচ প্রধানমন্ত্রী নিজেই সেই নির্ধারিত সময়ের পর অর্থাৎ সন্ধ্যা ৭টা ১০ মিনিটে সিনেমাটি শুরু হয় আর ১০টা ১০ মিনিট পর্যন্ত প্রেক্ষাগৃহে সিনেমাটি চলে। এদিকে ​সাধারণ ব্যবসায়ীরা যখন বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের জন্য আয়ের প্রধান সময়ে দোকান বন্ধ করে লোকসান গুনছেন, তখন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এই সিনেমা দর্শন সরকারি নির্দেশনার নৈতিক অবস্থানকে দুর্বল করে দেয়। প্রশ্ন উঠছে, আইন ও সাশ্রয় কি কেবলমাত্র সাধারণ জনগণের জন্য?

তেল সংকটে ধুঁকছে দেশ। কর্মঘণ্টার পুরোটাই নষ্ট হচ্ছে পাম্পের লাইনে।

দেশের পরিবহন ও কৃষি খাত বর্তমানে তেলের অভাবে ধুঁকছে। রাজধানীসহ সারা দেশের তেল পাম্পগুলোতে তেলের জন্য সাধারণ মানুষ এবং চালকদের ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে। অনেকে নিজের কর্মঘণ্টার পুরোটা সময় ব্যয় করছেন শুধু কয়েক লিটার জ্বালানি তেল সংগ্রহের আশায়। ​এই হাহাকারের মাঝে প্রধানমন্ত্রীর প্রটোকল ও বিশাল নিরাপত্তা বহরে যে বিপুল পরিমাণ জ্বালানি ব্যয় হয়েছে, তা দেশের বর্তমান পরিস্থিতির সাথে অত্যন্ত বেমানান। যেখানে এক ফোঁটা তেলের জন্য সাধারণ মানুষের জীবন নাভিশ্বাস হয়ে উঠেছে, সেখানে বিনোদনের উদ্দেশ্যে সরকারি জ্বালানি খরচ করাকে জনস্বার্থবিরোধী ও চরম সংবেদনহীনতা বলে মনে করছেন দেশের সাধারণ জনগণ।

হামের টিকার অভাবে হসপিটাল গুলোর হাহাকার অবস্থা

বর্তমানে আরো মর্মান্তিক চিত্রটি ফুটে উঠেছে দেশের স্বাস্থ্য খাতে। রাজধানী সহ সারা দেশজুড়ে শিশুদের মধ্যে হামের প্রকোপ মহামারি আকার ধারণ করেছে। অভিযোগ উঠেছে, সরকারি হাসপাতালগুলোতে পর্যাপ্ত টিকার সরবরাহ নেই। টিকার অভাবে ছোট ছোট শিশুদের মৃত্যু সংবাদ গণমাধ্যমে শিরোনাম হচ্ছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে সারা দেশে ডাক্তার ও নার্সদের ছুটি পর্যন্ত বাতিল করে দেওয়া হয়েছে। অথচ রাষ্ট্রের অভিভাবক হিসেবে যখন প্রধানমন্ত্রীর হাসপাতাল পরিদর্শন কিংবা স্বাস্থ্য সংকট মোকাবিলায় জরুরি তদারকিতে থাকার কথা, তখন তিনি প্রেক্ষাগৃহে সিনেমা দেখতে যাওয়া ঘণ্টা সংবেদনশীলতার অভাবকেই ফুটিয়ে তোলে। জনমনে প্রশ্ন উঠেছে—শিশুর জীবনের চেয়ে কি হলিউডের সায়েন্স ফিকশন বড় হয়ে গেলো?

লোডশেডিং সারা দেশ: সিনেমা হলে জাঁকজমক ভাবে হলিউড সিনেমা উপভোগ করলেন প্রধানমন্ত্রী

ভ্যাপসা গরম আর লোডশেডিংয়ে যখন জনজীবন অতিষ্ঠ, গ্যাস, বিদ্যুৎ এর অভাবে কলকারখানা গুলোর উৎপাদন যেখানে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, তখন প্রেক্ষাগৃহের এসির ঠান্ডা হাওয়ায় সিনেমা দেখা বিলাসিতার নামান্তর। দেশের গ্রামীণ জনপদ তো বটেই, খোদ রাজধানীতেও মানুষ রাতে শান্তিতে ঘুমাতে পর্যন্ত পারছে না বিদ্যুতের অভাবে। এই অন্ধকার আর অসহ্য গরমের মাঝে প্রধানমন্ত্রীর সিনেমার রঙিন দুনিয়া জনগণের দুঃখের প্রতি এক প্রকার উপহাস বলে প্রতীয়মান হচ্ছে।

নেতৃত্ব এবং দায়বদ্ধতার ঘাটতি কোথায়?

নেতৃত্ব মানে কেবল শাসন করা নয়, বরং সংকটে জনগণের পাশে থাকা এবং ত্যাগের দৃষ্টান্ত স্থাপন করা হলো একজন প্রকৃত শাসককের কাজ। ‘প্রজেক্ট হেইল মেরি’ চলচ্চিত্রে হয়তো মানবসভ্যতা রক্ষার গল্প দেখানো হয়েছে, কিন্তু আজ বাংলাদেশের মানুষ তাদের বাস্তব জীবনে জীবনযাত্রার মান রক্ষার লড়াইয়ে ব্যস্ত হয়ে আছে।

এর আগে গুঞ্জন উঠেছিল যে তিনি দেশি সিনেমা ‘বনলতা এক্সপ্রেস’ দেখতে গিয়েছেন, যা কিছুটা হলেও দেশি শিল্পের প্রতি মমত্ববোধের পরিচয় দিত। কিন্তু হলিউডের সায়েন্স ফিকশন দেখার এই খবরটি নিশ্চিত হওয়ার পর সমালোচনার মাত্রা আরও বেড়েছে। কারণ, যখন দেশীয় অর্থনীতি ডলার সংকটে ধুঁকছে আবার অন্যদিকে জনগণকে বিলাসিতা বর্জনের ডাক দেওয়া হচ্ছে, তখন বিদেশি সংস্কৃতি ও বিনোদনে রাষ্ট্রের মনোযোগ কাম্য নয়।

এ ব্যাপারে বাংলাদেশের সাধারণ জনগণ ও বিশেষজ্ঞদের ভাবনা কি?


বাংলাদেশের সাধারণ জনগণ ও বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত জীবন বা পারিবারিক বিনোদনের অধিকার নিশ্চয়ই আছে। কিন্তু সেই অধিকার যখন দেশের জাতীয় সংকটের সাথে সাংঘর্ষিক হয়, তখন তা আর ব্যক্তিগত থাকে না। তখন তা হয়ে ওঠে রাজনৈতিক ও নৈতিক আলোচনার বিষয়।

জ্বালানি সাশ্রয়, টিকার অভাব পূরণ এবং বিদ্যুৎ সমস্যার সমাধানে যেখানে সরকারের প্রতিটি মুহূর্ত ব্যয় হওয়া দরকার ছিল, সেখানে প্রধানমন্ত্রীর এই সিনেমা হলের যাত্রা সাধারণ মানুষের মনে এক গভীর ক্ষত সৃষ্টি করেছে। জনগণের প্রত্যাশা, সরকার দ্রুত এই সংকটগুলো সমাধানে কার্যকর পদক্ষেপ নেবে এবং দায়িত্বশীল নেতৃত্বের মাধ্যমে এমন এক দৃষ্টান্ত স্থাপন করবে যেখানে শাসকের আরামের চেয়ে জনগণের মৌলিক চাহিদাই প্রাধান্য পাবে।
এনপির পতন কি আসন্ন? বিএনপি কি পারবে ক্ষমতার পূর্ণ মেয়াদ শেষ করতে?
আরও পড়ুন →

Post a Comment

0 Comments

Post a Comment (0)

#buttons=(Ok, Go it!) #days=(20)

Our website uses cookies to enhance your experience. Check Now
Ok, Go it!