লুটপাটে দিশাহারা বিদ্যুৎ খাত, গ্রাহকদের সাথে সমন্বয়ের চিন্তা সরকারের

আদানির উচ্চমূল্যের বিদ্যুৎ ও লুটপাটের খেসারত দিচ্ছে জনগণ। ৫৬ হাজার কোটি টাকা ঘাটতি মেটাতে ফের বাড়ছে বিদ্যুতের দাম। বিস্তারিত পড়ুন আমাদের প্রতিবেদনে।
Electric Crisis in Bangladesh
লুটপাটে দিশাহারা বিদ্যুৎ খাত, গ্রাহকদের সাথে সমন্বয়ের চিন্তা সরকারের
দেশের বিদ্যুৎ খাত এখন এক গভীর খাদের কিনারায়। একদিকে মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিতিশীল পরিস্থিতির কারণে জ্বালানি সংকট, অন্যদিকে বিগত দেড় দশকের ‘অলিগার্ক ও লুটেরা’ শ্রেণির সীমাহীন দুর্নীতির বোঝা—এই দুইয়ের যাঁতাকলে পিষ্ট হয়ে আবারো বিদ্যুৎ বিপর্যয়ের মুখে সাধারণ জনগণ। বিশাল অংকের ভর্তুকি আর ক্রমাগত লোকসানের দোহাই দিয়ে সরকার এখন গ্রাহক পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর চূড়ান্ত প্রস্তুতি নিচ্ছে। পিডিবির সাম্প্রতিক প্রতিবেদন এবং সরকারি নীতিনির্ধারকদের বক্তব্যে স্পষ্ট যে, গত ১৫ বছরের দায় এখন সাধারণ জনগণের পকেট কেঁটে মেটানো হবে।

পিডিবির ভয়াবহ পরিসংখ্যান

বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি)-এর সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, বিদ্যুৎ খাতের অর্থনৈতিক চিত্র রীতিমতো ভীতিকর। বর্তমানে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের গড় উৎপাদন ব্যয় দাঁড়িয়েছে প্রায় ১২ টাকা (সঠিকভাবে ১১.৮৩ টাকা), অথচ পাইকারি পর্যায়ে তা বিক্রি হচ্ছে ৭ টাকার কিছু বেশি দামে। অর্থাৎ, প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ বিক্রিতে সরকারকে প্রায় ৫ টাকা লোকসান গুণতে হচ্ছে।

২০২৪-২৫ অর্থবছরের হিসাব বলছে, সরকার এ খাতে ৩৮ হাজার ৬৩৭ কোটি টাকা বিশাল অংকের ভর্তুকি দেওয়ার পরও ১৭ হাজার ২১ কোটি টাকা নিট লোকসান হয়েছে। পিডিবির আশঙ্কা, চলতি অর্থবছর শেষে এই ঘাটতির পরিমাণ ৫৬ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে। তাই এই বিশাল ঘাটতি মেটানোর ‘সহজ সমাধান’ হিসেবে সরকার এখন গ্রাহকদের ওপর মূল্যবৃদ্ধির পথ বেছে নিয়েছে।

ক্যাপাসিটি চার্জের নামে হাজার হাজার কোটি টাকা লুটপাট

বিদ্যুৎ খাতের এই অবস্থার পেছনে মূলত গত সাড়ে ১৫ বছরের স্বৈরতান্ত্রিক শাসনামলে গড়ে ওঠা একটি বিশেষ গোষ্ঠীর লুটপাটকে দায়ী করছেন বিশেষজ্ঞরা। অভিযোগ উঠেছে যে, বিদ্যুৎ খাতের উন্নয়নের নামে শেখ হাসিনা সরকারের আমলে প্রায় ১ লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকা পাচার ও লুটপাট হয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই দুর্নীতির তিনটি প্রধান খাত ছিল:
  • ক্যাপাসিটি চার্জ: বিদ্যুৎ উৎপাদন না করেও কেন্দ্র বসিয়ে রেখে হাজার হাজার কোটি টাকা অলিগার্কদের পকেটে দেওয়া হয়েছে।
  • কমিশন বাণিজ্য: নতুন বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের অনুমোদন পেতে প্রভাবশালী মহলের বিশাল অংকের কমিশন।

  • অতিরিক্ত মুনাফা: রেন্টাল ও কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের নামে নিয়মবহির্ভূতভাবে উচ্চমূল্যে বিদ্যুৎ কেনা।

    একজন ব্যবসায়ীর নাম উল্লেখ না করে পিডিবির প্রতিবেদনে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে যে, বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতের লুটের টাকা দিয়ে তিনি সিঙ্গাপুরের শীর্ষ ধনীদের তালিকায় স্থান করে নিয়েছেন। এই "লুটেরা অর্থনীতি"র কারণেই আজ বিদ্যুৎ উৎপাদন খরচ আকাশচুম্বী, যার দায়ভার এখন সাধারণ ভোক্তাদের ওপর চাপানো হচ্ছে।

    কত বাড়তে পারে বিদ্যুতের দাম?

    সরকারি উচ্চপর্যায়ের সূত্রমতে, দাম সমন্বয়ের জন্য ইতিমধ্যে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীকে আহ্বায়ক করে একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করা হয়েছে।
    কমিটির প্রাথমিক আলোচনা অনুযায়ী:

    • গ্রাহক পর্যায়ে: ইউনিটপ্রতি ৭০ পয়সা থেকে ১ টাকা ৮০ পয়সা পর্যন্ত দাম বাড়তে পারে
    • পাইকারি পর্যায়ে: ৫০ পয়সা থেকে ১ টাকা ২০ পয়সা পর্যন্ত বৃদ্ধির প্রস্তাব রয়েছে।
    • শতাংশের হিসেবে: বিদ্যুতের দাম ৭ শতাংশ থেকে ২০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেতে পারে।

    তবে একটি স্বস্তির খবর হলো, শূন্য থেকে ৭০ ইউনিট পর্যন্ত ব্যবহারকারী প্রান্তিক গ্রাহকদের ক্ষেত্রে দাম অপরিবর্তিত রাখার চিন্তা করা হচ্ছে। কিন্তু শিল্প ও বাণিজ্যিক খাতে দাম বাড়লে তার পরোক্ষ প্রভাব নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ওপর পড়বে, যা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় আরও বাড়িয়ে দেবে।

    জ্বালানি সংকট ও মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ

    আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতিও বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতের জন্য কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে ইরান, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের উত্তেজনার ফলে জ্বালানি তেলের সাপ্লাই চেইন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। যেহেতু আমাদের তেলের একটি বড় অংশ মধ্যপ্রাচ্য থেকে আসে, তাই বিশ্ববাজারে তেলের চড়া মূল্য দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ এবং বাজেটের ওপর বিশাল চাপ সৃষ্টি করছে।

    অর্থমন্ত্রী স্বয়ং স্বীকার করেছেন যে, উচ্চমূল্যে তেল-গ্যাস কিনতে গিয়ে সরকারি তহবিলে টান পড়েছে। এর ফলে উন্নয়ন কর্মকাণ্ড এবং সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিগুলোও হুমকির মুখে পড়তে পারে।

    বিপিসির লাভ বনাম পিডিবির লোকসান

    একটি অদ্ভুত বৈপরীত্য লক্ষ্য করা গেছে জ্বালানি খাতের দুই সংস্থার মধ্যে। পিডিবি যখন লোকসানের কথা বলে দাম বাড়ানোর দাবি করছে, তখন বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন (বিপিসি) তেল বিক্রি করে লাভ করছে। পিডিবির তথ্যমতে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বিপিসি তেল বিক্রি করে ৪ হাজার ৩১৬ কোটি টাকা লাভ করেছে, অথচ সেই তেল কিনেই পিডিবি দেউলিয়া হওয়ার পথে। সরকারি সংস্থাগুলোর মধ্যে এই সমন্বয়হীনতা এবং এক সংস্থার লাভ অন্য সংস্থার কাঁধে চাপানোর নীতি নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন বিশ্লেষকরা।

    এক নজরে বিদ্যুতের উৎপাদন ও ব্যয়ের হিসেব

    বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যবহৃত বিভিন্ন উৎসের খরচ বিশ্লেষণে দেখা যায়, পদ্ধতিগত ত্রুটি ও ভুল পরিকল্পনার কারণে খরচ বেড়েছে।
    জ্বালানির উৎস উৎপাদন ক্ষমতা (%) প্রতি ইউনিট উৎপাদন খরচ (টাকা)
    গ্যাসভিত্তিক ৪৩% ৭.০৯
    কয়লাভিওিক ২২% ১৩.২০
    ফার্নেস অয়েল ১৯% ২৭.৩৯
    সৌর বিদ্যুৎ ৩% ১৫.৪৬
    ভারত (আমদানি) - ১৪.৮৬
    ভারত (সরকারি) - ৮.৭১
    তথ্যমতে, ফার্নেস অয়েল এবং আদানির বিদ্যুৎ আমদানিতে যে পরিমাণ উচ্চমূল্য পরিশোধ করতে হচ্ছে, তা সামগ্রিক গড় উৎপাদন খরচ বাড়িয়ে দিচ্ছে।

    আগে বিচার, পরে দাম সমন্বয়

    জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও ক্যাবের উপদেষ্টা অধ্যাপক এম শামসুল আলম এই মূল্যবৃদ্ধির উদ্যোগের তীব্র সমালোচনা করেছেন। তার মতে, বিদ্যুৎ খাতের বিশাল ঘাটতির পেছনে মূলত লুটপাট ও অপচয় দায়ী। তিনি বলেন, "আগে এই ঘাটতির বৈধতা নিরূপণ করতে হবে। অপ্রয়োজনীয় খরচ এবং দুর্নীতির টাকা বাদ দিয়ে তারপরও যদি ঘাটতি থাকে, তবেই দাম বাড়ানোর প্রশ্ন আসতে পারে। লুটপাটের দায় সাধারণ ভোক্তারা কেন নেবে?"

    তিনি আরও যোগ করেন যে, বিগত সরকারের সময় বিদ্যুৎ খাতে যে ভয়াবহ দুর্নীতি হয়েছে, তার বিচার না করে দাম বাড়ানো মানে হলো পরোক্ষভাবে লুটপাটকারীদের রেহাই দেওয়া। জনস্বার্থে এই লুটপাটের বিচার হওয়া অপরিহার্য।

    দেশের জনগণের ও বিশেষজ্ঞদের মতে

    বিদ্যুতের দাম বাড়ানো সরকারের জন্য এখন একটি সহজ অস্ত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু দুর্নীতিবাজ অলিগার্কদের পাচার করা টাকা উদ্ধার না করে কিংবা বিদ্যুৎ খাতের অব্যবস্থাপনা দূর না করে বারবার দাম বাড়ানো কেবল লুটেরাদের চুরি করার রাস্তা প্রসস্থ করবে। উচ্চপর্যায়ের কমিটি যদি কেবলমাত্র দাম বাড়ানোর ফরমুলা দেয় এবং লুটপাটকারীদের বিচার নিশ্চিত না করে, তবে বিদ্যুৎ খাতের এই সংকট দীর্ঘস্থায়ী হবে। সাধারণ মানুষের দাবি—আগে দুর্নীতির বিচার হোক, লুটপাটের অর্থ ফিরত আনার কার্যকরী পদক্ষেপ নেওয়া হোক। দাম বাড়ানো এটা কোন সমাধান হতে পারেনা।
    দায় চাপানো রাজনীতি কবে বন্ধ হবে?
    আরও পড়ুন →