![]() |
| তেলের দাম বৃদ্ধিতে পাম্প মালিক সমিতি সরকারকে ‘সাধুবাদ’ জানিয়েছে |
সরকারের মন্ত্রীরা যখন বলছেন ‘দেশে তেলের কোনো সংকট নেই’, অথচ মাঠপর্যায়ে পাম্পগুলোতে মাইলের পর মাইল লম্বা সিরিয়াল। আবার দিন শেষে গ্রাহকরা তেল না পেয়ে মনে কষ্ট নিয়ে বাড়ি ফিরছেন। এই বৈপরীত্য আর সমন্বয়হীনতার জাঁতাকলে পিষ্ট হচ্ছে সাধারণ মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত মানুষ। তবে তেলের দাম বৃদ্ধির ফলে পাম্প গুলোতে আর আগের মতো সংকট থাকবেনা বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
তেলের সংকট কেঁটে গেলে এই বাড়তি দাম কি আর কমবে?
গত ১৮ এপ্রিল মধ্যরাত থেকে জ্বালানি তেলের নতুন দাম কার্যকর হয়েছে। নতুন দর অনুযায়ী, প্রতি লিটার ডিজেল ১০০ টাকা থেকে বেড়ে ১১৫ টাকা, কেরোসিন ১১২ থেকে ১৩০ টাকা, পেট্রোল ১১৬ থেকে ১৩৫ টাকা এবং অকটেন ১২০ থেকে ১৪০ টাকা করা হয়েছে। এই দাম বৃদ্ধি বাংলাদেশে কোনো সাধারণ ঘটনা নয়। তবে এই মুহুর্তে তেলের দাম বাড়ানো মানে প্রতিটি নিত্যপণ্যের বাজারে আগুন জ্বালানোর শামিল।কেননা ডিজেলের দাম বৃদ্ধি মানেই পরিবহন খরচ বৃদ্ধি, আর পরিবহন খরচ বৃদ্ধি মানেই চাল, ডাল, সবজিসহ প্রতিটি নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্যের দাম বৃদ্ধি। যা সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাবে। তবে অবাক করার বিষয় হলো, যেখানে সরকার দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি নিয়ন্ত্রণে হিমশিম খাচ্ছে, সেখানে এক রাতেই জনজীবনে এই চরম বিপর্যয় নামিয়ে আনা হচ্ছে।
যদিও সরকার বলছে ভর্তুকির চাপ কমাতে এই পদক্ষেপ, কিন্তু জনগণের প্রশ্ন—ভর্তুকির বোঝা কি কেবল সাধারণ মানুষের ঘাড়েই আসবে? সিস্টেম লস, দুর্নীতি আর অব্যবস্থাপনা রোধ না করে জনগণের পকেট কাটাই কি একমাত্র সমাধান?
তবে কি দাম বৃদ্ধির জন্য এই সংকট তৈরি করা হয়েছিল?
জাতীয় সংসদে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ দাবি করেছেন যে, দেশে জ্বালানি তেলের কোনো ঘাটতি নেই। তার মতে, কিছু অসাধু ব্যবসায়ীর অবৈধ মজুদ ও কালোবাজারির কারণে এই কৃত্রিম সংকট তৈরি হয়েছে। মন্ত্রীর এই বক্তব্য যদি সত্য হয়, তবে প্রশ্ন ওঠে—এই ‘অসাধু ব্যবসায়ীরা’ কারা? তারা কি সরকারের চেয়েও শক্তিশালী?মাঠপর্যায়ে দেখা যাচ্ছে, পাম্পগুলো ২০০ টাকার বেশি তেল দিচ্ছে না, মোটরসাইকেলে রঙ দিয়ে চিহ্নিত করা হচ্ছে। অথচ মন্ত্রী বলছেন এমন কোনো সরকারি নির্দেশনা নেই। তাহলে প্রশ্ন থেকে যায়, সরকারের নাকের ডগায় বসে কারা এই সমান্তরাল শাসনব্যবস্থা চালাচ্ছে? কেন ৯ হাজারের বেশি অভিযান চালিয়েও এই মজুদদারি ঠেকানো যাচ্ছে না? তবে কি প্রশাসনই চাচ্ছে না এই সিন্ডিকেট ভেঙ্গে দিতে?
পাম্প মালিকদের উল্লাস এ যেন লাশের উপরে নৃত্য
সবচেয়ে আশ্চর্যজনক বিষয় হলো, জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় বাংলাদেশ পেট্রোল পাম্প মালিক সমিতি সরকারকে ‘সাধুবাদ’ জানিয়েছে। যখন সাধারণ মানুষ তেলের বাড়তি দাম দিতে গিয়ে দিশেহারা অবস্থা, তখন ব্যবসায়িক সংগঠনের এই উল্লাস জনগণের কাটা গায়ে নুনের ছিটার মতো।কেননা দাম বাড়লে মালিকদের কমিশন বাড়ে, আর সেই মুনাফার লোভেই জনগণের ভোগান্তিকে তারা উপেক্ষা করে সংকট তৈরি করে। যেখানে ব্যবসায়ীদের উচিত ছিল এই কঠিন সময়ে জনগণের পাশে দাঁড়ানো, সেখানে তারা সরকারের এই গণবিরোধী সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়ে নিজেদের স্বার্থপরতার চরম বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়েছে।
আমদানিনির্ভরতা আর কতকাল?
মন্ত্রী নিজেই স্বীকার করেছেন যে, দেশের এলপিজির বাজার ৯৮.৬৭ শতাংশ আমদানিনির্ভর। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে এই সরবরাহ ব্যবস্থা ঝুঁকির মুখে পড়েছে। তবে এই নির্ভরতা তো আর একদিনে তৈরি হয়নি। দীর্ঘদিনের ভুল জ্বালানি নীতি আর নিজস্ব খনিজ সম্পদ উত্তোলনে অনীহার কারণে আজ দেশ আমদানিনির্ভরতার শিকলে বন্দি।আন্তর্জাতিক বাজারে সামান্য অস্থিরতা দেখা দিলেই তার মাশুল দিতে হচ্ছে এদেশের সাধারণ মানুষকে। নিজস্ব গ্যাস ও খনিজ সম্পদ অনুসন্ধানে পর্যাপ্ত গুরুত্ব না দিয়ে কেন শুধু আমদানির ওপর নির্ভর করে চলতে হয় বাংলাদেশকে? এই জবাবদিহি আজ সময়ের দাবি।
ডিজিটাল সমাধান নাকি আইওয়াশ?
সংকট নিরসনে ‘ফুয়েল কার্ড’ চালুর কথা বলে আসছে সরকার। এটি একটি দীর্ঘমেয়াদী প্রক্রিয়া হতে পারে, কিন্তু বর্তমানের জ্বলন্ত সংকটের তাৎক্ষণিক সমাধান কী? তেলের সরবরাহ ১০ থেকে ২০ শতাংশ বাড়ানো হবে বলা হলেও, বাজারে তার প্রভাব কতটুকু পড়বে তা নিয়ে জনমনে সংশয় রয়েছে। কারণ, যতক্ষণ পর্যন্ত কালোবাজারি আর মজুদদারদের লাগাম টেনে ধরা না যাবে, ততক্ষণ সরবরাহ বাড়িয়েও কোনো সুফল পাওয়া সম্ভব নয়।জনগণের প্রত্যাশা ও বাস্তবতা
গত ১৬ এপ্রিল এক অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বিশ্ববাজারের দোহাই দিয়ে জনদুর্ভোগের কথা উল্লেখ করেছিলেন। জনগনকে আস্বস্ত করেছিলেন। জনগণও আশায় ছিলো পজিটিভ কিছু হবে। কিন্তু তার ঠিক দুদিন পরেই এই বিশাল অংকের মূল্য বৃদ্ধি সরকারের কথার আর কাজের অমিলকেই স্পষ্ট করে। সাধারণ মানুষের আয় বাড়েনি, অথচ জীবনযাত্রার ব্যয় হু হু করে বাড়ছে। জ্বালানি তেলের এই দাম বৃদ্ধি কেবল পরিবহনেই নয়, বরং চাল, ডাল, আটা, সবজি সহ কৃষিখাতেও বড় প্রভাব ফেলবে। সেচের খরচ বেড়ে যাওয়ায় কৃষকও বিপদে পড়েছে।সরকারকে বুঝতে হবে, উন্নয়ন কেবল অবকাঠামোতে নয়, মানুষের স্বস্তিতেও নিহিত। জ্বালানি তেলের এই আকাশচুম্বী দাম বৃদ্ধি আর সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য সাধারণ মানুষকে দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে দিয়েছে। কৃত্রিম সংকট নিরসনে কেবল জরিমানা আর লোকদেখানো অভিযান যথেষ্ট নয়। যদি সত্যিই দেশে তেলের পর্যাপ্ত মজুদ থাকে, তবে কেন মানুষ পাম্পে গিয়ে তেল পাচ্ছে না? এই প্রশ্নের উত্তর প্রশাসনকে দিতেই হবে।
সিন্ডিকেটের থাবা থেকে জ্বালানি খাতকে মুক্ত করতে না পারলে এবং ভর্তুকির নাম করে জনগণের ওপর ঋণের বোঝা চাপানো বন্ধ না হলে, সাধারণ মানুষের ক্ষোভ চরমে পৌঁছাবে। এখনই সময়—দাম পুনর্মূল্যায়ন করে এবং বাজার মনিটরিং আরও কঠোর করে জনগণের পাশে দাঁড়ানোর। অন্যথায়, এই কৃত্রিম সংকট আর আকাশছোঁয়া দাম দেশের অর্থনীতির মেরুদণ্ড ভেঙে দিতে পারে।
রাষ্ট্রের অন্যতম মূল দায়িত্ব হলো পরিকল্পিত অর্থনৈতিক বিকাশের মাধ্যমে নাগরিকদের অন্ন, বস্ত্র, আশ্রয়, শিক্ষা ও চিকিৎসাসহ জীবনের মৌলিক উপকরণের ব্যবস্থা করা। কেননা, জ্বালানি তেলের দাম বাড়লে যখন নিত্যপণ্যের দাম আকাশচুম্বী হয়, তখন এই সাংবিধানিক অঙ্গীকার বাধাগ্রস্ত হয় বলে মনে করছেন দেশের ১৮ কোটি জনগণ।

