সংসদে নাহিদ ইসলামের ‘মাস্টারক্লাস’ যে জ্বালাময়ী বক্তব্যে তাপ ছড়ালেন নাহিদ
সংসদে নাহিদ ইসলামের জ্বালাময়ী বক্তব্য: ব্যাংক খাতের লুটপাট, রাষ্ট্রপতির অপসারণ এবং বাহাত্তরের সংবিধান সংস্কার নিয়ে এনসিপি (NCP) নেতার রাষ্ট্র সংস্কার
![]() |
| সংসদে নাহিদ ইসলামের মাস্টারক্লাস |
ব্যাংক খাতের ‘রাজনৈতিক গ্রাস’ ও গভর্নরের নিয়োগ বিতর্ক
বক্তব্যের শুরুতেই নাহিদ ইসলাম দেশের ভেঙে পড়া অর্থনৈতিক ও ব্যাংকিং খাতের ওপর আলোকপাত করেন। তিনি সরাসরি অভিযোগ করেন যে, বর্তমান বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে কেবল একটি বিশেষ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে। নাহিদ ইসলামের মতে, গভর্নর সাহেবের মূল ‘স্পেশালিটি’ হলো ঋণ পুনঃতফসিলীকরণ (Loan Rescheduling), যা প্রকারান্তরে সরকারি দলের সংসদ সদস্যদের খেলাপি ঋণের দায় থেকে মুক্তি দেওয়ার একটি আইনি কৌশল।টিআইবির তথ্য উল্লেখ করে তিনি জানান, সরকারি দলের প্রায় ৫৯ শতাংশ প্রার্থীর ১১ হাজার কোটি টাকার বেশি ঋণ রয়েছে। সাধারণ মানুষের আমানতের টাকা দিয়ে ব্যবসায়ীদের পকেট ভরার এই সংস্কৃতির অবসান না হলে দেশ দেউলিয়া হওয়ার ঝুঁকিতে পড়বে বলে তিনি হুঁশিয়ারি দেন।
রাষ্ট্রপতি শাহাবুদ্দিন চুপ্পুর অপসারণ দাবী
নাহিদ ইসলামের বক্তব্যের অন্যতম বিস্ফোরক অংশ ছিল বর্তমান রাষ্ট্রপতি শাহাবুদ্দিন চুপ্পুর বিতর্কিত ভূমিকা। তিনি প্রশ্ন তোলেন, জুলাই গণহত্যার সময় ফ্যাসিবাদের দোসর হিসেবে কাজ করা একজন ব্যক্তি কীভাবে এখনো বঙ্গভবনে আসীন থাকেন? দুদক কমিশনার থাকাকালীন রাষ্ট্রপতির ‘তিনটি বিশেষ মিশন’—তারেক রহমানের শাস্তি নিশ্চিত করা, পদ্মা সেতুর দুর্নীতিতে ক্লিনশিট দেওয়া এবং শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে মামলা প্রত্যাহার—এই বিষয়গুলো নাহিদ ইসলাম অত্যন্ত সাহসের সাথে সংসদে উপস্থাপন করেন। তার মতে, জুলাই বিপ্লবের পর এই রাষ্ট্রপতির অপসারণ কোনো আইনি প্রশ্ন নয়, বরং এটি একটি নৈতিক ও বৈপ্লবিক দাবি।বাহাত্তরের সংবিধান বনাম একাত্তরের সাম্য
সংবিধান সংস্কার নিয়ে নাহিদ ইসলাম যে তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ দিয়েছেন, তা দেশের রাজনৈতিক চিন্তাধারায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে। তিনি দাবি করেন, বাহাত্তরের সংবিধান মূলত ‘মুজিববাদী আদর্শ’ দ্বারা রচিত, যা একাত্তরের প্রকৃত চেতনা—সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচারের সাথে সাংঘর্ষিক। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, বাহাত্তরের সংবিধান ছিল অন্তর্নিহিতভাবেই অগণতান্ত্রিক (Inherent Undemocratic), যেখানে একজন ব্যক্তির হাতে বিচার বিভাগ, নির্বাহী বিভাগ এবং সংসদের সকল ক্ষমতা কুক্ষিগত করার সুযোগ রাখা হয়েছিল। নাহিদ আহ্বান করে বলেন, জুলাই বিপ্লবের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নে আমাদের একটি নতুন গণপরিষদ গঠন এবং সংবিধান পুনর্লিখনের পথে হাঁটতে হবে।ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক: দাসত্ব নয়, সমমর্যাদার দাবি
পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে নাহিদ ইসলাম ভারতের সাথে ‘মর্যাদা ও সাম্যের’ ভিত্তিতে সম্পর্কের ওপর জোর দেন। তিনি বর্তমান সরকারের অস্পষ্ট নীতির সমালোচনা করে বলেন, সীমান্ত হত্যা, নদীর পানির ন্যায্য হিস্যা এবং পুশ-ইন ইস্যু নিয়ে ভারতকে জবাবদিহিতার আওতায় আনতে হবে। বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গের ভোটার তালিকা থেকে লক্ষ লক্ষ মুসলিম ও মতুয়া ভোটারকে বাদ দিয়ে বাংলাদেশে পুশ-ইন করার যে পরিকল্পনা ভারত করছে, তাকে তিনি ‘জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি’ হিসেবে চিহ্নিত করেন। শেখ হাসিনাকে আশ্রয় দেওয়ার মাধ্যমে ভারত জুলাই গণহত্যার অপরাধীদের পক্ষ নিয়েছে বলে মন্তব্য করেন।জুলাই গণঅভ্যুত্থান মুক্তিযুদ্ধের সাথে সাংঘর্ষিক নয়
নাহিদ ইসলাম তার বক্তব্যের শেষভাগে জুলাই গণঅভ্যুত্থানকে মুক্তিযুদ্ধের সাথে সাংঘর্ষিক মনে না করে বরং একে ‘মুক্তিযুদ্ধের নবায়ন’ হিসেবে অভিহিত করেন। তিনি বলেন, "মুক্তিযুদ্ধ আমাদের ফাউন্ডেশন, আর জুলাই গণঅভ্যুত্থান হলো বৈষম্যমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার দ্বিতীয় স্বাধীনতা।" তিনি সতর্ক করে দেন যে, রাজনৈতিক দলগুলো যদি শহীদদের রক্তের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করে এবং জুলাই সনদকে পাশ কাটিয়ে দলীয় ইশতেহার বাস্তবায়ন করতে চায়, তবে নতুন প্রজন্ম পুনরায় রাজপথে নামতে দ্বিধা করবে না।
নাহিদ ইসলামের এই বক্তব্যটি কেবল রাজনৈতিক বিরোধিতার খাতিরে বিরোধিতা নয়, বরং এটি একটি তথ্যনির্ভর এবং আদর্শিক লড়াই। এনসিপি (NCP) নেতা হিসেবে তিনি প্রমাণ করেছেন যে, নতুন প্রজন্ম কেবল স্লোগান দিতে জানে না, তারা রাষ্ট্রের জটিল আইনি ও অর্থনৈতিক কাঠামো পরিবর্তনের সক্ষমতাও রাখে। দেশের জনসাধারণ মানুষ এখন নাহিদ ইসলামের এই ‘রেডিক্যাল’ সংস্কার প্রস্তাবগুলোর বাস্তবায়ন দেখতে উন্মুখ হয়ে আছে।
