শরিফ ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ড: ক্ষমতার আড়ালে থাকা সেই ‘মাস্টারমাইন্ড’ আসলে কে?

গত ১৫ জানুয়ারি এই মামলার তদন্ত নিয়ে জটিলতা তৈরি হয়। ডিবি (গোয়েন্দা শাখা) কর্তৃক দাখিলকৃত অভিযোগপত্রের (চার্জশিট) ওপর অসন্তোষ প্রকাশ করে মামলার বাদী
গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর ওসমান হাদিকে রিকশা করে ঢাকা মেডিক্যালে নেওয়া হচ্ছে

বাংলাদেশের সমসাময়িক রাজনৈতিক ইতিহাসে অন্যতম আলোচিত ও চাঞ্চল্যকর ঘটনা হলো ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিফ ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ড। নির্বাচনের ঠিক আগমুহূর্তে উদীয়মান এই নেতার মৃত্যু কেবল একটি দলের ক্ষতি নয়, বরং দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপর এক বড় আঘাত হিসেবে দেখা হয়েছে। সম্প্রতি এই হত্যা মামলার তদন্তে দীর্ঘসূত্রতা জনমনে কৌতূহল আরও বাড়িয়েছে।

কেন ওসমান হাদি হত্যা মামলায় দীর্ঘসূত্রতা?

শরিফ ওসমান হাদিকে গুলি করে হত্যার ঘটনায় দায়েরকৃত মামলার অধিকতর তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের জন্য আগামী ১৯ এপ্রিল দিন ধার্য করেছেন আদালত। বৃহস্পতিবার (২ এপ্রিল) ঢাকার অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট জশিতা ইসলামের আদালত এই আদেশ প্রদান করেন। ​মামলা সূত্রে জানা যায়, গত (২ এপ্রিল) অধিকতর তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নির্ধারিত দিন থাকলেও তদন্তকারী সংস্থা সিআইডি (পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ) কোনো প্রতিবেদন জমা দিতে পারেনি। মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ও সিআইডির সহকারী পুলিশ সুপার আব্দুল কাদির ভূঞা আদালতে সময় প্রার্থনা করলে আদালত নতুন এই তারিখ নির্ধারণ করেন।

ডিবির দেওয়া চার্জশিটে প্রধান আসামিদের বাদ দেওয়ার অভিযোগ

এর আগে, গত ১৫ জানুয়ারি এই মামলার তদন্ত নিয়ে জটিলতা তৈরি হয়। ডিবি (গোয়েন্দা শাখা) কর্তৃক দাখিলকৃত অভিযোগপত্রের (চার্জশিট) ওপর অসন্তোষ প্রকাশ করে মামলার বাদী এবং ইনকিলাব মঞ্চের সদস্য সচিব আব্দুল্লাহ আল জাবের 'নারাজি' আবেদন দাখিল করেন। জাবের অভিযোগ করে বলেন, ডিবির দেওয়া চার্জশিটে শরিফ ওসমান হাদি হত্যার প্রধান আসামিদের আড়াল করা হয়েছে। আদালত সেই আবেদন মঞ্জুর করে মামলাটি অধিকতর তদন্তের জন্য সিআইডিকে নির্দেশ দেন।

রক্তাক্ত ১২ ডিসেম্বর: যেভাবে হত্যা হয় হাদিকে

গত বছরের ১২ ডিসেম্বর। ওইদিন দুপুর আনুমানিক ২টা ২০ মিনিটের দিকে জুমার নামাজ শেষে মতিঝিল এলাকা থেকে বের হন শরিফ ওসমান হাদি। তিনি নির্বাচনী প্রচারণার জন্য অটো রিকশা করে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের উদ্দেশ্যে যাচ্ছিলেন। কিন্তু পল্টন থানাধীন এলাকায় বক্স কালভার্ট রোডে পৌঁছাতেই আগে থেকে ওত পেতে থাকা দুষ্কৃতিকারীরা মোটর বাইকে করে রিকশার সাইড থেকে তাকে লক্ষ্য করে গুলি চালায়। গুলিটা ওসমান হাদির মাথা ভেদ করে ওপর পাশের কানের নিচ দিয়ে বেরিয়ে যায়।

রক্তাক্ত অবস্থায় হাদিকে উদ্ধার করে প্রথমে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। পরবর্তীতে তাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য এভারকেয়ার হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। সেখানে শারীরিক অবস্থার আশঙ্কাজনক অবনতি ঘটলে ১৮ ডিসেম্বর তাকে এয়ার অ্যাম্বুলেন্স যোগে সিঙ্গাপুর জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। কিন্তু চিকিৎসকদের সব চেষ্টা ব্যর্থ করে দিয়ে ১৮ ডিসেম্বর রাত ৯টা ৪৫ মিনিটে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

ওসমান বিন হাদি গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর নাটকীয় ৩ দিন

ওসমান বিন হাদি গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে জনমনে গভীর অসন্তোষ ও বিরূপ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছে। ঘটনার পর ২৪ ঘণ্টার মধ্যে আসামিদের গ্রেফতারের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও বাস্তবে প্রশাসনের কোনো কার্যকরী পদক্ষেপ পরিলক্ষিত হয়নি। হত্যাকাণ্ডের প্রায় ৩৬ ঘণ্টা অতিবাহিত হওয়ার পর তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকারের স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী অপরাধীদের ধরিয়ে দিতে ৫০ লাখ টাকা পুরস্কার ঘোষণা করেন। তবে এই ঘোষণা জনমনে নতুন প্রশ্নের জন্ম দেয়; অনেকেই ধারণা করছেন যে, খুনিদের নিরাপদে সীমান্ত পার হওয়ার সুযোগ করে দেওয়ার পরই কেবল লোকদেখানো এই পুরস্কার ঘোষণা করা হয়েছে। যদিও প্রশাসনের পক্ষ থেকে বারবার দাবি করা হচ্ছিল যে, খুনিরা দেশেই অবস্থান করছে।

ফয়সাল করিম মাসুদ ওরফে দাউদ খানের সেলফি কান্ড

ইন্টারসেপ্ট করে হাদি হত্যার প্রধান আসমী ফয়সালের ছবি প্রকাশ করেছে জুলকার নাইন সায়ের

চলমান বিতর্কের মধ্যেই সাংবাদিক জুলকারনাইন সায়ের শ্যুটার ফয়সাল করিম মাসুদ ওরফে দাউদ খানের একটি সেলফি এবং তার ব্যবহৃত ভারতীয় ফোন নম্বর প্রকাশ করেন। সায়ের দাবি করেন যে, অত্যান্ত শক্তিশালী প্রযুক্তি 'ইন্টারসেপ্ট' বা তথ্য আড়িপাতার মাধ্যমে এগুলো উদ্ধার করেছেন। তবে আইটি বিশেষজ্ঞ ও কম্পিউটার প্রকৌশলীরা তার এই দাবিকে নাকচ করে দিয়েছেন। প্রযুক্তিগত বিশ্লেষণের মাধ্যমে তারা জানান যে, তথ্য উদ্ধারের বিষয়ে সায়েরের দেওয়া এই দাবিটি ভিত্তিহীন বা ভুয়া।

১৫ ডিসেম্বর রাতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে সায়ের জানান যে, আসামিরা ইতোমধ্যে ভারতে পালিয়ে গেছে। সায়ের দাবি করে গত ১২ ডিসেম্বর সন্ধ্যায় ময়মনসিংহের হালুয়াঘাট সীমান্ত দিয়ে খুনিরা ভারতে প্রবেশ করে। বিশেষ গোয়েন্দা সূত্রের বরাত দিয়ে সায়ের জানান, ভারতে প্রবেশের পর আওয়ামী লীগ নেতা জাহাঙ্গীর কবির নানকের পিএস মো. মাসুদুর রহমান বিপ্লব পলাতক ফয়সাল করিম মাসুদকে একটি ভারতীয় সিম কার্ড ও নম্বর জোগাড় করে দেন +৯১৬০০১৩৯৪০**।

যেকারণে গ্রেফতার দেখানো হয় ওসমান হাদির হত্যাকারী ফয়সাল করিম মাসুদকে

হাদি হত্যার প্রধান আসামী কলকাতায় এসটিএফের হাতে আটক

হত্যাকাণ্ড ঘটিয়ে সীমান্ত পাড়ি দিয়ে ভারতে পালিয়ে যাওয়া প্রধান আসামিদের গত ৭ মার্চ রাতে পশ্চিমবঙ্গের উত্তর ২৪ পরগনা জেলার বনগাঁও সীমান্ত এলাকা থেকে পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের স্পেশাল টাস্কফোর্স (STF) প্রধান আসামি ফয়সাল করিম মাসুদ ওরফে রাহুল এবং তার সহযোগী আলমগীর হোসেনকে গ্রেফতার দেখানো হয়।

এসটিএফ-এর বিবৃতিতে জানা যায়, আসামিরা মেঘালয় সীমান্ত দিয়ে অবৈধভাবে ভারতে প্রবেশ করে। এরপর তারা ভারতের বিভিন্ন স্থানে আত্মগোপন করে থাকে। গোপন তথ্যের ভিত্তিতে গত ৭ মার্চ গভীর রাতে পশ্চিমবঙ্গের উত্তর ২৪ পরগনা জেলার বনগাঁও সীমান্ত এলাকা থেকে তাদের গ্রেফতার করা হয়। এসময় তারা সীমান্ত অতিক্রম করে বাংলাদেশে প্রবেশের পরিকল্পনা করছিলো বলে জানান এসটিএফ।

রাজনৈতিক কারণে শরিফ ওসমান হাদিকে হত্যা করা হয় বলে জানায় পুলিশ

শরিফ ওসমান হাদির হত্যাকাণ্ড নিয়ে যে বিষয়টি সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে, তা হলো তার রাজনৈতিক অবস্থান। আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে তিনি রাজধানীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঢাকা ৮ আসন থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। ওই আসনে তার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন, বিএনপির স্থায়ী কমিটির প্রভাবশালী সদস্য ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা মির্জা আব্বাস। দুই হেভিওয়েট প্রার্থীর এই সম্ভাব্য লড়াই নিয়ে দেশজুড়ে ও রাজনৈতিক মহলে ব্যাপক উত্তেজনা ও সমীকরণ চলছিল। তবে হাদির ওপর হামলার পর মির্জা আব্বাসের প্রতিক্রিয়া ছিল বেশ মার্জিত ও গভীর তাৎপর্যপূর্ণ।

তিনি বলেছিলেন: "হাদি আমার নির্বাচনী প্রতিযোগী হতে পারে, কিন্তু সে আমার প্রতিদ্বন্দ্বী নয়। এই ন্যাক্কারজনক হামলা রাজনৈতিক পরিস্থিতি অস্থিতিশীল করার একটি সুদূরপ্রসারী চক্রান্ত।"

এছাড়া ডিবির প্রাথমিক তদন্তেও উঠে এসেছে যে, চরম রাজনৈতিক প্রতিহিংসা থেকেই এই হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনা করা হয়েছিল। একজন সম্ভাবনাময় তরুণ নেতাকে সরিয়ে দেওয়ার মাধ্যমে রাজনৈতিক ফায়দা লোটার চেষ্টা করা হয়েছিল কি না, সেটিই এখন জনমনে বড় প্রশ্ন।

শরিফ ওসমান বিন হাদি হত্যাকান্ডে স্তম্ভিত গুটা দেশ

এই হত্যাকাণ্ড কেবল ব্যক্তি হাদিকে হত্যা নয়, বরং একটি নির্দিষ্ট আদর্শকে স্তব্ধ করে দেওয়ার প্রয়াস। মামলার বাদী আব্দুল্লাহ আল জাবের গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, "আমরা চাই নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ তদন্ত। সিআইডি যেন কোনো চাপের মুখে না পড়ে প্রকৃত খুনি এবং তাদের নেপথ্যে থাকা পরিকল্পনাকারীদের নাম সামনে আনে।" সাধারণ মানুষের মধ্যেও এই বিচার নিয়ে গভীর আগ্রহ রয়েছে। রাজধানী ঢাকার ব্যস্ততম এলাকায় দিনে-দুপুরে একজন উদীয়মান রাজনৈতিক নেতার ওপর এমন বর্বরোচিত হামলা দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে অনেক প্রশ্ন তুলে দিয়েছে।

শরিফ ওসমান বিন হাদির বিচার নিয়ে জনগণের আকাঙ্ক্ষা

বাংলাদেশে অনেক রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড বছরের পর বছর ঝুলে থাকে। শরিফ ওসমান হাদি হত্যার বিচার যেন সেই দীর্ঘসূত্রতার কবলে না পড়ে, এটাই সাধারণ মানুষের চাওয়া। দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে এই মামলার নিষ্পত্তি এবং খুনিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা গেলে তা ভবিষ্যতে এ ধরনের রাজনৈতিক সহিংসতা রোধে দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে। জনগণ চায় রাজনীতির ময়দান যেন পেশিশক্তি আর বুলেটের লড়াইয়ে পরিণত না হয়। একজন তরুণ ও উদীয়মান নেতাকে নির্বাচনী মাঠ থেকে সরিয়ে দেওয়ার জন্য হত্যার পথ বেছে নেওয়াকে সাধারণ মানুষ গণতন্ত্রের জন্য হুমকি মনে করে। এই বিচারের মাধ্যমে রাজনীতিতে সহনশীলতা এবং সুস্থ প্রতিদ্বন্দ্বিতার পরিবেশ ফিরে আসুক—এটিই বৃহত্তর জনগণের আকাঙ্ক্ষা।