ঢাকার বাতাস আবারও ‘অস্বাস্থ্যকর’: দূষণের দৌড়ে বিশ্বে দ্বিতীয় অবস্থানে রাজধানী
![]() |
| ঢাকার বাতাস আবারও ‘অস্বাস্থ্যকর’: দূষণের দৌড়ে বিশ্বে দ্বিতীয় অবস্থানে রাজধানী |
নিজস্ব প্রতিবেদক | শ্রেয়া ঘোষ
ঢাকার বায়ুদূষণ আবারও উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। আজ সকালে বিশ্ব তালিকায় দূষিত বাতাসের শহরের তালিকায় দ্বিতীয় অবস্থানে উঠে এসেছে বাংলাদেশের রাজধানী। একিউআই (AQI) স্কোর ১৬০ হওয়ায় ঢাকার বাতাস এখন সবার জন্য, বিশেষ করে সংবেদনশীল গোষ্ঠীর জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। বিশেষজ্ঞরা বলছেন—অনিয়ন্ত্রিত নির্মাণকাজ, যানবাহনের কালো ধোঁয়া ও শিল্পবর্জ্যই এই ভয়াবহ অবস্থার মূল কারণ।
সকালের আকাশে মেঘ, কিন্তু বাতাসে নেই স্বস্তি
আজ সকাল থেকে ঢাকার আকাশ কিছুটা মেঘাচ্ছন্ন ছিল। অনেকেই আশা করেছিলেন, মেঘলা আবহাওয়ার কারণে হয়তো আজ দূষণের মাত্রা কিছুটা কমবে। কিন্তু বাস্তবতা ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। আকাশে মেঘ থাকলেও বাতাসে কোনো স্বস্তি মেলেনি, বরং দূষণের তীব্রতা আরও বেড়েছে। শহরের বাতাস এখন এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যা সরাসরি জনস্বাস্থ্যের জন্য চরম হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।এই পরিস্থিতি ঢাকাবাসীর জন্য নতুন নয়। বছরজুড়েই নগরবাসীকে এমন বিষাক্ত বাতাসের সঙ্গে লড়াই করে টিকে থাকতে হচ্ছে। তবে প্রতিবারই যখন ঢাকা বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত শহরের তালিকায় শীর্ষের দিকে উঠে আসে, তখন বিষয়টি নতুন করে জনমনে আতঙ্ক ও উদ্বেগের সৃষ্টি করে।
বিশ্ব তালিকায় ঢাকার অবস্থান
সুইজারল্যান্ডভিত্তিক বায়ুমান পর্যবেক্ষণকারী প্রতিষ্ঠান IQAir-এর লাইভ র্যাঙ্কিং অনুযায়ী, আজ শনিবার সকালে বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত শহরের তালিকায় ঢাকার অবস্থান ছিল দ্বিতীয়। সকাল ৭টা ৫২ মিনিটে ঢাকার এয়ার কোয়ালিটি ইনডেক্স বা একিউআই স্কোর রেকর্ড করা হয়েছে ১৬০।তালিকায় ১৭৮ স্কোর নিয়ে প্রথম স্থানে রয়েছে পাকিস্তানের লাহোর (Lahore)। তৃতীয় স্থানে ভারতের দিল্লি (Delhi), যার স্কোর ১৫২ এবং চতুর্থ স্থানে চিলির সান্তিয়াগো (Santiago), যার স্কোর ১৪৬। অন্যদিকে, সবচেয়ে পরিষ্কার বাতাসের শহরের তালিকায় শীর্ষে রয়েছে পর্তুগালের লিসবন (Lisbon), যেখানে একিউআই স্কোর মাত্র ১৪। এই বিশাল পার্থক্যই বুঝিয়ে দেয় বিশ্বের কোনো কোনো অঞ্চলের মানুষ যখন স্বস্তির নিঃশ্বাস নিচ্ছে, তখন ঢাকার মতো জনপদে শ্বাস নেওয়াটাই জীবননাশের কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
একিউআই স্কোর কী বলছে?
একিউআই (AQI) হলো বাতাসের মান পরিমাপের একটি আন্তর্জাতিক সূচক। আইকিউএয়ারের মানদণ্ড অনুযায়ী:
১০১ থেকে ১৫০: সংবেদনশীল গোষ্ঠীর জন্য অস্বাস্থ্যকর।
১৫১ থেকে ২০০: সবার জন্যই অস্বাস্থ্যকর।
আজ ঢাকার স্কোর ১৬০ হওয়ায় এটি সরাসরি দ্বিতীয় ক্যাটাগরিতে (সবার জন্য অস্বাস্থ্যকর) অবস্থান করছে। এর অর্থ হলো—শুধু শিশু, বৃদ্ধ বা অসুস্থ ব্যক্তিরাই নয়, সুস্থ মানুষও এই বাতাসে দীর্ঘসময় অবস্থান করলে দীর্ঘমেয়াদী স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়তে পারেন।
কারা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে?
এই দূষিত বাতাস সবচেয়ে বেশি ক্ষতি করে শিশু, বয়োজ্যেষ্ঠ এবং আগে থেকেই শ্বাসকষ্ট বা ফুসফুসজনিত সমস্যায় ভোগা ব্যক্তিদের। বিশেষ করে হাঁপানি (Asthma) রোগীদের জন্য বর্তমান পরিস্থিতি অত্যন্ত ভয়াবহ। অনেক শিশু নিয়মিত কাশি বা শ্বাসকষ্টে ভুগছে। এই পরিস্থিতিকে স্বাভাবিক মনে করার কোনো উপায় নেই; এটি একটি নিরব জনস্বাস্থ্য সংকট।দূষণের মূল কারণগুলো
পরিবেশ বিশেষজ্ঞদের মতে, ঢাকার বায়ুদূষণ বাড়ার পেছনে কয়েকটি সুনির্দিষ্ট কারণ কাজ করছে:
১. নির্মাণকাজ: শহরের বিভিন্ন প্রান্তে চলমান বড় বড় অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প থেকে প্রচুর ধুলাবালি তৈরি হচ্ছে।
২. যানবাহনের ধোঁয়া: ফিটনেসবিহীন পুরনো যানবাহন থেকে নির্গত কালো ধোঁয়া বাতাসের মান কমিয়ে দিচ্ছে।
৩. শিল্পবর্জ্য ও ইটভাটা: রাজধানীর চারপাশের শিল্পকারখানা এবং ইটভাটাগুলো থেকে নির্গত বিষাক্ত গ্যাস ও ধোঁয়া শহরকে আচ্ছন্ন করে ফেলছে।
৪. আইনি প্রয়োগের অভাব: পরিবেশ রক্ষায় কঠোর আইন থাকলেও তার সঠিক ও সময়োপযোগী প্রয়োগ না থাকায় সমস্যাটি দিন দিন জটিলতর হচ্ছে।
আমাদের করণীয় কী?
এই শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে সম্মিলিত উদ্যোগের কোনো বিকল্প নেই:
সরকারের ভূমিকা: কঠোরভাবে পরিবেশ আইন বাস্তবায়ন করা, নির্মাণাধীন এলাকাগুলোতে নিয়মিত পানি ছিটানো নিশ্চিত করা এবং কালো ধোঁয়া নির্গমনকারী যানবাহনের বিরুদ্ধে অভিযান চালানো।
নাগরিক সচেতনতা: অপ্রয়োজনে ঘরের বাইরে বের হওয়া কমানো, বাইরে বের হলে অবশ্যই মানসম্মত মাস্ক ব্যবহার করা এবং ঘরের চারপাশে বেশি করে গাছ লাগানো।
ঢাকার বায়ুদূষণ এখন আর শুধু একটি পরিবেশগত সমস্যা নয়, এটি একটি মানবিক ও জাতীয় সংকটে পরিণত হয়েছে। প্রতিদিন আমরা যে বাতাসে শ্বাস নিচ্ছি, সেটিই যদি আমাদের অসুস্থতার কারণ হয়, তবে তথাকথিত উন্নয়ন কতটা অর্থবহ তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। পরিষ্কার বাতাসে শ্বাস নেওয়া কোনো বিলাসিতা নয়, এটি মানুষের মৌলিক নাগরিক অধিকার। এখনই সময় এই সংকটকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে সমাধানের পথ খোঁজা।
