প্রশাসনের অভ্যন্তরীণ চিত্র দেখে আমি আতঙ্কিত, রাষ্ট্র কাঠামো নিয়ে ফখরুলের শঙ্কা
প্রশাসনের অভ্যন্তরীণ অনিয়ম ও তদবির বাণিজ্যে আতঙ্ক প্রকাশ করেছেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। মেধা ও সততা ছাড়া রাষ্ট্র কাঠামো ভেঙে পড়ার শঙ
![]() |
| প্রশাসনের অভ্যন্তরীণ চিত্র দেখে আমি আতঙ্কিত, রাষ্ট্র কাঠামো নিয়ে ফখরুলের শঙ্কা |
নিজস্ব প্রতিবেদক | মুইদ হাসান
বাংলাদেশে দুর্নীতি, অনিয়ম আর স্বজনপ্রীতির কথা নতুন কিছু নয়। অনেক দিন ধরেই এসব নিয়ে আলোচনা চলছে। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে বিষয়টি আবার নতুন করে আলোচনায় এসেছে। বিশেষ করে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের একটি বক্তব্য অনেকের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বর্তমান রাষ্ট্র কাঠামোর সংকট নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেছেন যে, বিগত দেড় দশকের ফ্যাসিবাদী শাসনে দেশের নৈতিকতা ও প্রশাসনিক শৃঙ্খলা পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গেছে।
তিনি আক্ষেপ করে জানান, বর্তমানে প্রশাসনের প্রতিটি স্তরে মেধার বদলে তদবির, দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতি জেঁকে বসেছে যা একটি জাতির অগ্রগতির পথে প্রধান বাধা। শিক্ষকদের উপস্থিতিতে তিনি জোর দিয়ে বলেন, মেধা, সততা এবং পরিশ্রম ছাড়া কোনো রাষ্ট্রকে উন্নতির শিখরে নিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। জিয়া পরিষদ প্রসঙ্গে তিনি স্পষ্ট করেন যে, একে বিএনপির কোনো সাধারণ অঙ্গ-সংগঠন হিসেবে ব্যবহার না করে একটি সমৃদ্ধ গবেষণা প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তুলতে হবে।
যত্রতত্র কমিটি বা রাজনৈতিক 'দোকান' না খুলে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের জীবন ও দর্শন নিয়ে আন্তর্জাতিক মানের গবেষণাধর্মী বই ও পত্রিকা প্রকাশের ওপর তিনি গুরুত্বারোপ করেন।
সমস্যা কি এখন সিস্টেম-এর অংশ?
মির্জা ফখরুল দীর্ঘদিন ধরে রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। তিনি দেশের প্রশাসন ও রাজনীতি খুব কাছ থেকে দেখেছেন। তাঁর বক্তব্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—তিনি বলছেন, দুর্নীতি আর অনিয়ম এখন আলাদা কিছু নয়, বরং পুরো ব্যবস্থার অংশ হয়ে গেছে। তিনি বলেছেন, তদবির ছাড়া এখন কোনো কাজই হয় না। অর্থাৎ, নিয়ম মেনে কাজ করার চেয়ে পরিচয় বা সুপারিশ বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।এটি একটি বড় সমস্যা। কারণ একটি রাষ্ট্র তখনই ভালোভাবে চলে, যখন তার নিয়ম-কানুন ঠিকভাবে কাজ করে। কিন্তু যদি ব্যক্তিগত পরিচয় বা প্রভাবই সবকিছু ঠিক করে দেয়, তাহলে সাধারণ জনগণ পিছিয়ে পড়ে। বিশেষজ্ঞরা বলেন, যখন আনুষ্ঠানিক নিয়মের চেয়ে অনানুষ্ঠানিক প্রভাব বেশি শক্তিশালী হয়ে যায়, তখন দেশে গণতন্ত্র দুর্বল হয়ে যায়।
গত ১৫ বছরে কী পরিবর্তন হয়েছে?
ফখরুলের মতে, গত ১৫–১৬ বছরে দেশের সামাজিক ও প্রশাসনিক সংস্কৃতিতে বড় পরিবর্তন এসেছে। তিনি মনে করেন, এই সময়ে নৈতিকতার অনেক অবনতি হয়েছে। এটা শুধু তাঁর ব্যক্তিগত মত নয় আন্তর্জাতিক কিছু রিপোর্টও একই রকম ইঙ্গিত দেয়। যেমন, ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের দুর্নীতি সূচকে বাংলাদেশ খুব ভালো অবস্থানে নেই। যদিও কিছু উন্নতি হয়েছে, তবুও সমস্যা এখনও রয়ে গেছে।বিশ্লেষকরা বলেন, যখন একটি সরকার দীর্ঘ সময় ধরে ক্ষমতায় থাকে, তখন প্রশাসনের মধ্যে একটা স্থিরতা তৈরি হয়। কিন্তু সেই স্থিরতা অনেক সময় পরিবর্তনের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়।
তদবির সংস্কৃতি: যোগ্যতার মূল্য কমে যাচ্ছে?
বাংলাদেশে তদবির বা সুপারিশ নতুন কিছু নয়। কিন্তু এখন অনেকেই মনে করছেন, এটি খুব বেশি বেড়ে গেছে। মির্জা ফখরুল আলমগীর বলেন, একজনকে দিয়ে আরেকজনকে বলানো এটাই এখন নিয়ম। এর মানে হলো, অনেক ক্ষেত্রে কাজ পাওয়ার জন্য যোগ্যতার চেয়ে পরিচয় বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে।এটি খুবই উদ্বেগজনক। কারণ এতে মেধাবী মানুষরা পিছিয়ে পড়ে। যারা সত্যিই যোগ্য, তারা সুযোগ না পেলে দেশের সামগ্রিক উন্নয়নও বাধাগ্রস্ত হয়। অবশ্যই এই বৈষম্য দূর হওয়া প্রয়োজন। এমন অনিয়ম আর বৈষম্যের কারণেই বাংলাদেশে ৩৬শে জুলাইয়ের জন্ম হয়েছে। জুলাই পরবর্তী নতুন বাংলাদেশে এমন বৈষম্য কোন ভাবেই কাম্য নয়। একজন অর্থনীতিবিদ বলেছেন, দুর্নীতি শুধু টাকা-পয়সার ক্ষতি করে না, এটি মানুষের সম্ভাবনাও নষ্ট করে। দীর্ঘমেয়াদে এটি দেশের জন্য বড় ক্ষতি ডেকে আনে।
রাষ্ট্র ব্যবস্থার সামনে বড় চ্যালেঞ্জ
এই পরিস্থিতিতে একটি বড় প্রশ্ন উঠে আসে এই ব্যবস্থার মধ্যে থেকে কি ভালোভাবে দেশ চালানো সম্ভব? মির্জা ফখরুল প্রশ্ন করেছেন, এই মানুষগুলো দিয়ে আমরা কীভাবে রাষ্ট্র কাঠামো ঠিক রাখব?এই প্রশ্নের উত্তর সহজ নয়। তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন জরুরি। যেমন-
- প্রশাসনে আরও স্বচ্ছতা আনা
- সবার জন্য জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা
- স্বাধীন প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করা
- রাজনৈতিক সদিচ্ছা তৈরি করা
মানুষ কী চায়?
বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ খুব বেশি কিছু চায় না। তারা চায়-- ন্যায়বিচার
- যোগ্যতা ও মেধার মূল্যায়ন
- দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশ
- মানুষ ভোট দিতে আগ্রহ হারায়
- রাজনৈতিক বিভাজন বাড়ে
- সমাজে অস্থিরতা তৈরি হয়
মেধা ও সততার গুরুত্ব
ফখরুল তাঁর বক্তব্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তুলে ধরেছেন। তিনি বলেছেন, মেধা, সততা আর পরিশ্রম ছাড়া কিছুই সম্ভব না। এটি খুবই বাস্তববাদী কথা। উন্নত দেশগুলোর দিকে তাকালে দেখা যায়, তারা মেধা ও কঠোর পরিশ্রমকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেয়। যেখানে যোগ্য মানুষকে সুযোগ দেওয়া হয়, সেখানে উন্নয়ন দ্রুত হয়। আর যেখানে স্বজনপ্রীতি বেশি, সেখানে অগ্রগতি ধীর হয়ে যায়। শিক্ষাবিদরা মনে করেন, এখন সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন তরুণদের মধ্যে নৈতিকতা, দায়িত্ববোধ এবং সততা গড়ে তোলা।পরিবর্তন কি সম্ভব?
সবশেষে প্রশ্ন আসে এই পরিস্থিতি কি বদলানো সম্ভব?উত্তর হলো, সম্ভব, কিন্তু সহজ নয়। কারণ এই সমস্যা একদিনে তৈরি হয়নি, তাই একদিনে সমাধানও হবে না। এর জন্য দরকার—
- সরকারের আন্তরিক উদ্যোগ
- রাজনৈতিক দলগুলোর সহযোগিতা
- জনগণের সচেতনতা
