বজ্রপাতে অন্তত ৪০-এর বেশি প্রাণহানি: বাড়ছে আতঙ্ক

বাংলাদেশে এক মাসে বজ্রপাতে ৪০ জনের বেশি প্রাণহানি। জলবায়ু পরিবর্তন ও ভৌগোলিক কারণে এই দুর্যোগ ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে। বজ্রপাতের বৈজ্ঞানিক কারণ, জরুরি সত..
বজ্রপাতে অন্তত ৪০-এর বেশি প্রাণহানি: বাড়ছে আতঙ্ক
বজ্রপাতে অন্তত ৪০-এর বেশি প্রাণহানি: বাড়ছে আতঙ্ক

​নিজস্ব প্রতিবেদক | ইমরান হুসাইন
​বাংলাদেশে বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠ এলেই কালবৈশাখী ঝড়ের সঙ্গে বাড়ে বজ্রপাতের ঝুঁকি। তবে এবার পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। চলতি বছরের এপ্রিল মাসজুড়ে দেশের বিভিন্ন জেলায় বজ্রপাতে প্রাণহানির সংখ্যা উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে। বিভিন্ন জাতীয় গণমাধ্যম, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সংস্থা এবং আবহাওয়া সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, গত এক মাসে দেশে বজ্রপাতে অন্তত ৪০ জনের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন, যদিও বেসরকারি সংগঠনগুলোর হিসাবে এ সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে।

​বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বাংলাদেশে বজ্রপাতের সংখ্যা ও তীব্রতা দুই-ই বাড়ছে। একইসঙ্গে খোলা মাঠে কাজ করা কৃষক, জেলে ও শ্রমজীবী মানুষদের ঝুঁকিও বেড়েছে। বজ্রপাত এখন আর কেবল একটি প্রাকৃতিক ঘটনা নয়, এটি একটি জাতীয় দুর্যোগ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।

​বাংলাদেশ কেন বজ্রপাতের হটস্পট?

​নতুন গবেষণায় দেখা গেছে, পৃথিবীর অন্যতম বজ্রপাতপ্রবণ এলাকাগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। এর মূল কারণ আমাদের ভৌগোলিক অবস্থান। বাংলাদেশের ঠিক উত্তরে রয়েছে হিমালয় পর্বতমালা এবং দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর। গ্রীষ্মকালে বঙ্গোপসাগর থেকে প্রচুর পরিমাণে আর্দ্র ও উষ্ণ বাতাস দেশের ভূখণ্ডে প্রবেশ করে। এই উষ্ণ বাতাস যখন উত্তরের হিমালয় থেকে আসা অপেক্ষাকৃত শীতল বাতাসের সঙ্গে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়, তখন বায়ুমণ্ডলে চরম অস্থিতিশীলতা তৈরি হয়। এর ফলে খুব দ্রুত তৈরি হয় বিশাল আকৃতির কিউমুলোনিম্বাস (Cumulonimbus) মেঘ বা বজ্রগর্ভ মেঘ। এই মেঘের ভেতরে থাকা বরফকণা ও জলীয় বাষ্পের ঘর্ষণে বিপুল স্থির বিদ্যুৎ উৎপন্ন হয়, যা বজ্রপাত হিসেবে পৃথিবীতে নেমে আসে।

​এক মাসেই ভয়াবহ প্রাণহানি, ​একদিনেই ১৪ জনের মৃত্যু

গত ২৬ এপ্রিল দেশের সাতটি জেলায় বজ্রপাতে একদিনেই অন্তত ১৪ জন নিহত হন। নিহতদের মধ্যে ছিলেন কৃষক, কিশোর ও শ্রমিক। সবচেয়ে বেশি প্রাণহানি ঘটে গাইবান্ধা, সিরাজগঞ্জ, ঠাকুরগাঁও ও জামালপুরে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, গাইবান্ধায় পাঁচজন, সিরাজগঞ্জে দুইজন, ঠাকুরগাঁওয়ে দুইজন, জামালপুরে দুইজন এবং বগুড়া, নাটোর ও পঞ্চগড়ে একজন করে মারা যান। অধিকাংশই মাঠে কাজ করা অবস্থায় বা গবাদিপশু আনতে গিয়ে বজ্রাঘাতে নিহত হন।

দ্য ডেইলি স্টার-এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়, নিহতদের মধ্যে একজন ১২ বছর বয়সী শিশুও ছিল, যে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে বাইরে অবস্থান করছিল। এর মাত্র কয়েকদিন পর, ২৯ এপ্রিল দেশের আরও পাঁচ জেলায় বজ্রপাতে অন্তত ১০ জন নিহত হন। এ ঘটনায় ৫০টিরও বেশি গবাদিপশুও মারা যায়। হতাহতদের বেশিরভাগই ছিলেন পটুয়াখালী, জামালপুর, ময়মনসিংহ, বরগুনা ও শরীয়তপুর এলাকার বাসিন্দা। স্থানীয় প্রশাসন জানায়, অনেকেই মাঠে কাজ করা, গরু বেঁধে রাখা বা মাছ ধরার সময় হঠাৎ বজ্রপাতে আক্রান্ত হন।

​দুই দিনে ২৩ জনের মৃত্যু

গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, ২৬ ও ২৭ এপ্রিল—মাত্র দুই দিনে বজ্রপাতে অন্তত ২৩ জন মারা যান। নেত্রকোনা, সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জ ও নোয়াখালীতেও একাধিক মৃত্যুর ঘটনা ঘটে। এতে স্পষ্ট, প্রাক-বর্ষা মৌসুমে বজ্রপাত এখন বাংলাদেশে বড় ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগে পরিণত হয়েছে। হাওর অঞ্চলে (যেমন- সুনামগঞ্জ, নেত্রকোনা, কিশোরগঞ্জ) বিস্তীর্ণ ফাঁকা মাঠ থাকায় সেখানে প্রাণহানির মাত্রা সবচেয়ে বেশি।

​বজ্রপাত নিয়ে ভয়াবহ পরিসংখ্যান

​ঢাকা ট্রিবিউন-এর তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম চার মাসেই দেশে ৭২ জন বজ্রপাতে নিহত হয়েছেন। এর বড় অংশই কৃষক। অন্যদিকে গবেষণায় দেখা গেছে, ২০১০ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশে প্রায় ৪ হাজার মানুষ বজ্রপাতে মারা গেছেন। ​২০১৬ সালে একদিনে ৮২ জনের মৃত্যুর পর সরকার বজ্রপাতকে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রাকৃতিক দুর্যোগ হিসেবে ঘোষণা করে। এই প্রাণহানির একটি নীরব অর্থনৈতিক প্রভাব রয়েছে। বজ্রপাতে নিহতদের প্রায় ৭০ শতাংশই পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। ফলে তাদের মৃত্যুতে পুরো পরিবারটি আর্থিকভাবে সম্পূর্ণ নিঃস্ব হয়ে পড়ে।

​কেন বাড়ছে বজ্রপাত?

​আবহাওয়া বিশেষজ্ঞ ও পরিবেশবিদদের মতে, কয়েকটি কারণে বাংলাদেশে বজ্রপাতের ঝুঁকি বেড়েছে:

  • জলবায়ু পরিবর্তন ও বৈশ্বিক উষ্ণায়ন বিশ্ব উষ্ণায়নের ফলে তাপমাত্রা বাড়ছে, যার কারণে বায়ুমণ্ডলে অস্থিতিশীলতা তৈরি হচ্ছে। উষ্ণ ও আর্দ্র বাতাসের সংঘর্ষে দ্রুত বজ্রগর্ভ মেঘ তৈরি হয়। বিজ্ঞানীরা বলছেন, পৃথিবীর তাপমাত্রা ১ ডিগ্রি সেলসিয়াস বাড়লে বজ্রপাতের হার প্রায় ১২% বৃদ্ধি পায়। এপ্রিল-জুন সময়ে এই প্রবণতা সবচেয়ে বেশি দেখা যায়। ​
  • বন উজাড় ও তালগাছ কমে যাওয়া আগে গ্রামীণ এলাকায় প্রচুর উঁচু গাছ, বিশেষ করে তালগাছ, নারিকেল ও সুপারি গাছ ছিল, যা স্বাভাবিকভাবে বজ্রপাত আকর্ষণ করত। তালগাছের ছাল পুরু হওয়ায় এবং এটি সোজা ও উঁচু হওয়ায় এটি প্রাকৃতিক বজ্রনিরোধক হিসেবে কাজ করে। কিন্তু বন উজাড়, অপরিকল্পিত নগরায়ন এবং গাছ কেটে ফেলার কারণে প্রাকৃতিক সুরক্ষা কমেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, “উঁচু গাছ কমে যাওয়ায় বজ্রপাত সরাসরি মানুষের শরীর বা খোলা জমিতে আঘাত করছে।
  • কৃষকদের ঝুঁকিপূর্ণ কর্মপরিবেশ বাংলাদেশে অধিকাংশ মানুষ এখনও মাঠে কাজ করেন খোলা আকাশের নিচে। ধান কাটা, মাছ ধরা, গবাদিপশু আনা বা হাওরে কাজ করার সময় তারা হঠাৎ ঝড়ে আটকা পড়েন। হাওর বা বিলে কোনো উঁচু স্থাপনা না থাকায় মানুষের শরীরই বিদ্যুৎ পরিবাহী হিসেবে কাজ করে। ফলে কৃষকরাই সবচেয়ে বেশি হতাহত হচ্ছেন।
  • সতর্কবার্তা পেলেও তা অনুসরণ না করা বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর এখন লোকেশনভিত্তিক বজ্রপাত সতর্কতা দিতে সক্ষম হলেও তা গ্রাম পর্যায়ে যথাযথভাবে পৌঁছায় না, অথবা মানুষ গুরুত্ব দেন না। আবহাওয়াবিদ ড. মুহাম্মদ আবুল কালাম মল্লিক বলেন, পূর্বাভাস ব্যবস্থায় উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়েছে, কিন্তু মূল চ্যালেঞ্জ হলো একেবারে প্রান্তিক মানুষের কাছে সতর্কবার্তা পৌঁছানো এবং তাদের দ্রুত সাড়া পাওয়া।

​বজ্রাহত রোগীর প্রাথমিক চিকিৎসা

​আমাদের সমাজে একটি ভুল ধারণা রয়েছে যে, বজ্রাহত ব্যক্তিকে স্পর্শ করলে বিদ্যুত্স্পৃষ্ট হতে হয়। এটি সম্পূর্ণ অবৈজ্ঞানিক। বজ্রপাতের পর মানুষের শরীরে কোনো বিদ্যুৎ সঞ্চিত থাকে না।
​প্রথম করণীয়: বজ্রাহত ব্যক্তিকে সঙ্গে সঙ্গে নিরাপদ স্থানে নিতে হবে। ​সিপিআর (CPR): শ্বাস-প্রশ্বাস বন্ধ হয়ে গেলে বা পালস না পেলে দেরি না করে তাৎক্ষণিক বুকে চাপ দিয়ে সিপিআর (Cardiopulmonary Resuscitation) শুরু করতে হবে এবং দ্রুত হাসপাতালে নিতে হবে। ​কুসংস্কার বর্জন: রোগীকে মাটিতে বা গোবরে পুঁতে রাখার মতো মারাত্মক কুসংস্কার থেকে বেরিয়ে আসতে হবে, এতে রোগীর মৃত্যুর ঝুঁকি শতভাগ নিশ্চিত হয়।

​কী করলে বাঁচা সম্ভব?

​বিশেষজ্ঞদের মতে, কিছু সাধারণ সতর্কতা মানলেই প্রাণহানি অনেক কমানো সম্ভব। আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত 'থার্টি-থার্টি রুল' (30-30 Rule) এক্ষেত্রে বেশ কার্যকর। অর্থাৎ, বিজলি চমকানোর পর মেঘের ডাক শুনতে যদি ৩০ সেকেন্ডের কম সময় লাগে, তবে বুঝতে হবে আপনি বিপদের সীমানায় আছেন। মেঘের ডাক থামার পর অন্তত ৩০ মিনিট নিরাপদ স্থানে অবস্থান করতে হবে।

​অন্যান্য জরুরি করণীয়:

  • ​বজ্রপাত শুরু হলে দ্রুত পাকা ভবন বা ঘরের ভেতরে আশ্রয় নিন।
  • খোলা মাঠ, নদী, হাওর, বিল বা নৌকায় অবস্থান করবেন না।
  • ​গাছের নিচে আশ্রয় নেবেন না (বিশেষ করে একাকী দাঁড়িয়ে থাকা গাছের নিচে)।
  • ​ধাতব বস্তু, ছাতা, মোবাইল ফোন, বৈদ্যুতিক খুঁটি বা লোহার যন্ত্রপাতি থেকে দূরে থাকুন।
  • ​গবাদিপশু আনতে গেলে আবহাওয়া দেখে বের হন।
  • ​বাসাবাড়ির বৈদ্যুতিক সংযোগের আর্থিং ব্যবস্থা সঠিক আছে কিনা তা নিশ্চিত করুন এবং বজ্রপাতের সময় জানালার গ্রিল স্পর্শ করা থেকে বিরত থাকুন।
  • ​স্কুল, মসজিদ, ইউনিয়ন পরিষদ ও বাজারে বজ্রনিরোধক ব্যবস্থা স্থাপন করতে হবে।
  • গ্রামে গ্রামে সচেতনতামূলক প্রচার বাড়াতে হবে।

​সরকারের করণীয় ও দীর্ঘমেয়াদি প্রস্তাবনা

​বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু সতর্কতা দিলেই হবে না; বাস্তবভিত্তিক অবকাঠামো প্রয়োজন। সরকার ইতোমধ্যেই সারাদেশে ১০ লাখ তালগাছ লাগানোর একটি প্রকল্প হাতে নিয়েছিল, তবে রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে তার একটি বড় অংশই নষ্ট হয়ে গেছে। তাই আরও সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ প্রয়োজন।

গ্রামীণ এলাকায়, বিশেষ করে হাওর ও বিলে 'লাইটিং অ্যারেস্টার' বা বজ্রনিরোধক টাওয়ার স্থাপন করতে হবে। মাঠে কর্মরত কৃষকদের আশ্রয়ের জন্য নির্দিষ্ট দূরত্ব পরপর কংক্রিটের ছোট ছাউনি (Shelter) নির্মাণ করতে হবে। তালগাছ ও উঁচু গাছ রোপণ কর্মসূচি জোরদার এবং তার সঠিক রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করতে হবে। ​কৃষকদের জন্য স্মার্টফোনের অ্যাপ বা দ্রুত সতর্কবার্তা SMS ব্যবস্থা আরও সহজলভ্য করতে হবে।

​বাংলাদেশে বজ্রপাত এখন আর মৌসুমি ঘটনা নয়, এটি ধীরে ধীরে বড় ধরনের জননিরাপত্তা সংকটে পরিণত হচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তন, বন উজাড়, সচেতনতার অভাব ও খোলা মাঠে ঝুঁকিপূর্ণ জীবনযাপন—সব মিলিয়ে প্রতিবছর বাড়ছে মৃত্যুর মিছিল। বিশেষজ্ঞদের মতে, “বজ্রপাতকে শুধু ভাগ্যের ওপর ছেড়ে দিলে চলবে না; বিজ্ঞানভিত্তিক প্রস্তুতি, সচেতনতা এবং স্থানীয় উদ্যোগই পারে প্রাণহানি কমাতে।” দেশের প্রতিটি স্তরে সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ করা হলে প্রকৃতির এই ভয়ংকর রূপ থেকেও জীবন ও জীবিকা রক্ষা করা সম্ভব হবে।