ছাত্র রাজনীতি থেকে নগরপিতার মঞ্চে, ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের মেয়র প্রার্থী সাদিক কায়েম
ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামীর মেয়র প্রার্থী হিসেবে মনোনীত হলেন ডাকসু ভিপি সাদিক কায়েম। ছাত্র রাজনীতি থেকে নগরপিতার লড়াইয়ে...
![]() |
| ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের মেয়র প্রার্থী সাদিক কায়েম |
বাংলাদেশের রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু ঢাকা। আর এই ঢাকার হৃদপিণ্ড হিসেবে পরিচিত ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন (ডিএসসিসি)। দীর্ঘ সময় ধরে এই নগরী নানা অব্যবস্থাপনা, যানজট এবং দূষণে জর্জরিত হলেও নেতৃত্বের পরিবর্তনের দাবি ছিল দীর্ঘদিনের। ২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লব-পরবর্তী বাংলাদেশে যে নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতির সঞ্চার ঘটেছে, তার সবথেকে বড় প্রতিফলন ঘটতে যাচ্ছে আসন্ন সিটি নির্বাচনে। রাজধানী ঢাকার রাজনৈতিক অঙ্গনে সকল জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ঘোষণা করেছে তাদের মেয়র প্রার্থীর নাম—তিনি আর কেউ নন, চব্বিশের অভ্যুত্থানের অন্যতম রূপকার এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের সফল (ডাকসু) বর্তমান ভিপি সাদিক কায়েম।
আজ সকালে রাজধানীর কাকরাইলে আয়োজিত এক সম্মেলনে এই ঘোষণা করে জামায়াতে ইসলামী। ঘোষণা আসার পর থেকেই পুরো নগরজুড়ে বইছে এক নতুন আলোচনার জোয়ার। ছাত্র রাজনীতির গণ্ডি পেরিয়ে এক তরুণের সরাসরি নগর প্রশাসনের শীর্ষ পদের লড়াইয়ে অবতীর্ণ হওয়াকে দেশের রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা ‘নতুন যুগের সূচনা’ হিসেবে অভিহিত করছেন।
একটি লড়াকু জীবনের গল্প: পাহাড় থেকে শাহবাগ
সাদিক কায়েমের রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত জীবন পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, তার এই উত্থান কোনো আকস্মিক নাটকীয়তা নয়। বরং এটি দীর্ঘ সংগ্রাম, ত্যাগ এবং তৃণমূল থেকে উঠে আসার এক বাস্তব চিত্র। চট্টগ্রামের সাতকানিয়া উপজেলায় জন্ম নেওয়া সাদিকের শৈশব ও কৈশোরের বড় একটি অংশ কেটেছে পাহাড়ঘেরা খাগড়াছড়িতে। সাধারণ এক মধ্যবিত্ত পরিবার থেকে উঠে আসা এই তরুণ ছোটবেলা থেকেই অন্যায় ও জুলুমের বিরুদ্ধে সোচ্চার ভূমিকা পালন করেছেন।তার রাজনৈতিক সচেতনতা ও সংগ্রামের হাতেখড়ি হয়েছিল নবম শ্রেণিতে পড়াকালীন। ২০১৩-১৪ সালের রাজনৈতিক উত্তাল সময়ে খাগড়াছড়িতে পুলিশের নির্বিচার লাঠিচার্জে তিনি গুরুতর আহত হয়েছিলেন। সেই রক্তঝরা দিনগুলোই তার মনে ইনসাফ ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার বীজ বপন করে দিয়েছিল। সাধারণ শিক্ষার্থীদের অধিকার আদায়ে কাজ করতে করতে তিনি আজ দেশের জাতীয় রাজনীতির অন্যতম কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছেন।
শিক্ষা ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় জীবন
মেধা ও চারিত্রিক মাধুর্য সাদিক কায়েমকে অন্যদের থেকে আলাদা করেছে। চট্টগ্রামের বাইতুশ শরফ আদর্শ কামিল মাদ্রাসা থেকে কৃতিত্বের সাথে আলিম শেষ করার পর তিনি দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হন। রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের ছাত্র হওয়ার সুবাদে রাজনীতির তাত্ত্বিক ও প্রায়োগিক উভয় দিকেই তার দক্ষতা তৈরি হয়। ক্যাম্পাসে তিনি একজন মেধাবী, বিনয়ী এবং পরোপকারী ছাত্র হিসেবে পরিচিত। সাধারণ শিক্ষার্থীদের সংকটে তাকে সবসময় পাশে পাওয়া যায়, যা পরবর্তীকালে তাকে ডাকসু নির্বাচনে একচ্ছত্র আধিপত্য এনে দেয়।জুলাই বিপ্লব: যেখান থেকে ইতিহাসের যাত্রা
সাদিক কায়েমের জীবনের সবচেয়ে বড় টার্নিং পয়েন্ট এবং জাতীয়ভাবে পরিচিতি পাওয়ার মূল ভিত্তি হলো ২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লব। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত তিনি ছিলেন অন্যতম প্রধান সমন্বয়ক। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজপথ থেকে শুরু করে সারা দেশের শিক্ষার্থীদের এক সুতোয় গাঁথতে তার সাংগঠনিক দক্ষতা ছিল প্রশংসনীয়।বিশেষ করে, গণভবন অভিমুখে ছাত্র-জনতার সেই ঐতিহাসিক ও চূড়ান্ত যাত্রাকে তিনিই প্রথম 'ফাতহে গণভবন' হিসেবে অভিহিত করেছিলেন। তার সেই দূরদর্শী ডাক এবং নির্ভীক নেতৃত্ব স্বৈরাচারী শাসনের পতনে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে। বিপ্লব পরবর্তী সময়ে তিনি রাষ্ট্র সংস্কারের কাজেও নিজের মেধার স্বাক্ষর রেখেছেন।
ডাকসু নির্বাচনে এক অবিশ্বাস্য বিজয়
২০২৫ সালের ৯ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত ডাকসু নির্বাচন ছিল বাংলাদেশের ছাত্র রাজনীতির ইতিহাসে একটি মাইলফলক। দীর্ঘদিনের অচলায়তন রক্ষণশীল ব্যবস্থা ভেঙে অনুষ্ঠিত সেই নির্বাচনে সাদিক কায়েম প্রমাণ করেছিলেন যে, সাধারণ শিক্ষার্থীরা তথাকথিত রাজনৈতিক আধিপত্যের চেয়ে সৎ ও দক্ষ নেতৃত্বকে বেশি ভালোবাসে। নির্বাচনী ফলাফলের দিকে তাকালে তার জনপ্রিয়তার চিত্রটি সূর্যের আলোর মতো স্পষ্ট হয়ে যায়:সাদিক কায়েম (ভিপি প্রার্থী): ১৪,০৪২ ভোট
নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী (ছাত্রদল প্রার্থী): ৫,৭০৮ ভোট
বিশাল এই ব্যবধানে জয়ী হওয়ার পর তিনি ডাকসুর ভিপি হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তার মেয়াদে তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক সংস্কার, আবাসন সংকট দূরীকরণ এবং খাবারের মানোন্নয়নে সরাসরি কাজ করেছেন। "সহজ ও সরাসরি" যোগাযোগের মাধ্যমেই তাকে দলমতনির্বিশেষে সব মতের শিক্ষার্থীর কাছে জনপ্রিয় করে তুলেছে।
কেন মেয়র পদে সাদিক কায়েম?
এখন প্রশ্ন উঠেছে, ছাত্র রাজনীতি থেকে সরাসরি কেন সিটি কর্পোরেশনের মেয়র পদে? ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের ভোটারদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, তারা দীর্ঘদিনের প্রথাগত ও বয়োজ্যেষ্ঠ নেতাদের ব্যর্থতায় ক্লান্ত। তারা চান এমন একজন নেতৃত্ব, যিনি আধুনিক প্রযুক্তি বুঝবেন এবং জনগণের পালস অনুভব করতে পারবেন।ভোটারদের সাদিক কায়েমের প্রতি আস্থার প্রধান তিনটি কারণ:
ইনসাফ ভিত্তিক সমাজ গঠন: সাদিক তার প্রতিটি বক্তব্যে জোর দিয়েছেন ন্যায়বিচার ও 'ইনসাফ'-এর ওপর। তিনি মনে করেন, ঢাকা দক্ষিণের নাগরিকরা কর দিলেও তাদের প্রাপ্য নাগরিক সুবিধা থেকে বঞ্চিত। তিনি বারবার বলেছেন, "আমি নগরপিতা নয়, বরং নগরের সেবক হতে চাই।"
কঠোর নিষ্ঠা ও প্রস্তুতি: মেয়র নির্বাচনের প্রতি তার সিরিয়াসনেস বোঝা যায় তার একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে। তিনি নিজের ভোটার আইডি খাগড়াছড়ি থেকে স্থানান্তর করে ঢাকা-৮ আসনের ভোটার হয়েছেন। এটি প্রমাণ করে যে, তিনি কেবল আবেগের বশবর্তী হয়ে নয়, বরং সুপরিকল্পিতভাবে ঢাকার মানুষের জন্য কাজ করতে প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
তরুণদের আইকন: ঢাকার যানজট, জলজট ও দূষণমুক্ত নগরী গড়তে তার টিমে কাজ করছে একঝাঁক মেধাবী তরুণ ও নগর পরিকল্পনাবিদ। তার ভিশন হলো রাজধানীকে একটি স্মার্ট এবং বাসযোগ্য নগরীতে রূপান্তর করা।
নগর নিয়ে সাদিক কায়েমের ভিশন
সাদিক কায়েম বিভিন্ন জনসভায় ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তার পরিকল্পনার কিছু দিক তুলে ধরেছেন। তিনি এমন এক ঢাকা গড়ার স্বপ্ন দেখেন যেখানে:নাগরিকদের অধিকার কোনো দয়া বা দান হিসেবে নয়, বরং ন্যায্য পাওনা হিসেবে দেওয়া হবে। প্রতিটি ওয়ার্ডে থাকবে আধুনিক স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র ও কিশোরদের জন্য খেলার মাঠ। যানজট নিরসনে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) ও আধুনিক ট্রাফিক ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম চালু করা হবে। বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় আধুনিক রিসাইক্লিং পদ্ধতি ব্যবহার করা হবে।
রাজনৈতিক পরিবেশ ও সরকারি প্রস্তুতি
সম্প্রতি স্থানীয় সরকার পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ঘোষণা করেছেন যে, গণতান্ত্রিক ধারা অব্যাহত রাখতে দ্রুতই দেশের সকল স্তরে নির্বাচন সম্পন্ন করা হবে। এই ঘোষণার পরপরই প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো মাঠের প্রস্তুতি নিতে কাজ শুরু করেছে।জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের জানিয়েছেন, সাদিক কায়েমকে মনোনীত করার মাধ্যমে তারা তারুণ্যের জয়গান গাইতে চান। আগামী কয়েকদিনের মধ্যেই আনুষ্ঠানিকভাবে বড় পরিসরে প্রার্থিতার ঘোষণা ও নির্বাচনী ইশতেহার প্রকাশ করা হবে।
তৃণমূলে সাদিক কায়েমের পদচারণা
আনুষ্ঠানিক প্রচারণা শুরুর আগেই সাদিক কায়েম ঢাকা দক্ষিণ সিটির অলিগলিতে সাধারণ মানুষের সাথে মতবিনিময় শুরু করেছেন। আজিমপুর থেকে শুরু করে সূত্রাপুর, ডেমরা থেকে লালবাগ—প্রতিটি ওয়ার্ডেই তিনি ছোট ছোট মতবিনিময় সভার মাধ্যমে মানুষের আ-অভিযোগ শুনছেন। কোনো বড় বহর বা প্রোটোকল ছাড়াই তাকে সাধারণ মানুষের সাথে কথা বলতে দেখা যাচ্ছে, যা ভোটারদের মনে পজিটিভ ইম্প্যাক্ট তৈরি করছে।ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন কেবল একজন মেয়র নির্বাচনের লড়াই নয়, এটি হতে যাচ্ছে পুরাতন ও জরাজীর্ণ রাজনৈতিক ব্যবস্থার সাথে নতুন ও বৈষম্যহীন নতুন প্রজন্মের রাজনীতির লড়াই। সাদিক কায়েম সেই নতুন প্রজন্মের প্রতিনিধি হিসেবে কতটা সফল হবেন, তা সময়ই বলে দেবে। তবে খাগড়াছড়ির সেই আহত কিশোর থেকে আজকের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিপি এবং সম্ভাব্য মেয়র প্রার্থী হিসেবে তার এই যাত্রা দেশের তরুণদের জন্য এক বড় অনুপ্রেরণা। সাধারণ মানুষের এখন একটাই প্রত্যাশা—ভোটের মাঠে যেন গণতান্ত্রিক পরিবেশ বজায় থাকে এবং তারা তাদের পছন্দের যোগ্য নেতাকে বেছে নিতে পারেন।
