জুলাই-পরবর্তী রাষ্ট্র রূপান্তর: সরকার বদল নয়, রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তনই আসল পরীক্ষা

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর রাষ্ট্র সংস্কার কতটা সম্ভব? দলীয় গণতন্ত্র, প্রার্থী নির্বাচন, জবাবদিহি ও জনগণের ভূমিকা নিয়ে বিশ্লেষণ।
রাষ্ট্র রূপান্তর

একটি জাতির ইতিহাস কখনোই কয়েকটি বিচ্ছিন্ন ঘটনার সমষ্টি নয়। ইতিহাস তৈরি হয় দীর্ঘদিনের সংগ্রাম, অর্জন, ভুল, আত্মত্যাগ, প্রত্যাশা এবং নতুন প্রজন্মের নতুন প্রশ্নের মধ্য দিয়ে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম নেই।

১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ বাংলাদেশকে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র দিয়েছে। কিন্তু একটি স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা আর সেই রাষ্ট্রকে ন্যায়ভিত্তিক, গণতান্ত্রিক, জবাবদিহিমূলক ও নাগরিকবান্ধব করে গড়ে তোলা একই বিষয় নয়। রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পরও সেই রাষ্ট্র কীভাবে পরিচালিত হবে, ক্ষমতা কতটা নিয়ন্ত্রিত থাকবে এবং সাধারণ মানুষ কতটা মর্যাদা ও অধিকার ভোগ করবে—এসব প্রশ্ন থেকে যায়।

এই জায়গা থেকেই ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক গুরুত্বকে দেখা প্রয়োজন। এটিকে শুধু একটি সরকার পরিবর্তনের ঘটনা হিসেবে দেখলে এর বড় একটি দিক আড়ালে থেকে যাবে। বরং এটি বাংলাদেশের রাষ্ট্র ও রাজনৈতিক সংস্কৃতির সামনে আবারও একটি পুরোনো কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন দাঁড় করিয়েছে—রাষ্ট্র কি ক্ষমতাবানদের জন্য, নাকি জনগণের জন্য?

সরকার পরিবর্তন আর রাষ্ট্র পরিবর্তন এক নয়

বাংলাদেশের ইতিহাসে ক্ষমতার পরিবর্তন নতুন কোনো ঘটনা নয়। বিভিন্ন সময়ে সরকার পরিবর্তন হয়েছে, নতুন রাজনৈতিক শক্তি ক্ষমতায় এসেছে, আবার পুরোনো শক্তি ক্ষমতা হারিয়েছে।

কিন্তু শুধু শাসক পরিবর্তন হলেই রাষ্ট্রের চরিত্র বদলে যায় না।

একটি সরকারের জায়গায় আরেকটি সরকার এলেও যদি প্রশাসন একইভাবে রাজনৈতিক প্রভাবের অধীনে থাকে, পুলিশ যদি দলীয় স্বার্থে ব্যবহৃত হয়, বিচারব্যবস্থার স্বাধীনতা নিয়ে প্রশ্ন থাকে এবং রাজনৈতিক দলের সিদ্ধান্ত কয়েকজন নেতার হাতে কেন্দ্রীভূত থাকে—তাহলে সাধারণ মানুষের কাছে পরিবর্তনের বাস্তব অর্থ খুব সীমিত হয়ে যায়।

তাই রাষ্ট্র রূপান্তরের আসল প্রশ্ন কে ক্ষমতায় আছেন, সেটি নয়।

আসল প্রশ্ন হলো—

  • ক্ষমতায় থাকা ব্যক্তিকে জবাবদিহির মধ্যে রাখা যাচ্ছে কি না,
  • আইন সবার জন্য সমানভাবে প্রয়োগ হচ্ছে কি না,
  • নাগরিকের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা আছে কি না,
  • প্রশাসন রাজনৈতিক দলের বদলে রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ করে কি না,
  • এবং জনগণ বাস্তবে রাষ্ট্র পরিচালনায় কতটা প্রভাব রাখতে পারছে কিনা।

এই জায়গাগুলো না বদলালে সরকার বদলাবে, কিন্তু রাজনৈতিক ব্যবস্থা আগের মতোই থেকে যেতে পারে।

১৯৭১ বনাম ২০২৪—এভাবে ইতিহাসকে দেখা কি ঠিক?

জুলাই-পরবর্তী রাজনৈতিক আলোচনায় একটি প্রবণতা দেখা যায়—কখনো ১৯৭১ এবং ২০২৪-কে একে অপরের প্রতিদ্বন্দ্বী ঐতিহাসিক ঘটনা হিসেবে উপস্থাপন করা হয়।

কিন্তু বাংলাদেশের ইতিহাসকে এমনভাবে ভাগ করলে গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা হারিয়ে যেতে পারে।

১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ একটি স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেছে। স্বাধীনতার জন্য অসংখ্য মানুষের আত্মত্যাগ বাংলাদেশের জাতীয় অস্তিত্বের ভিত্তি তৈরি করেছে।

অন্যদিকে ২০২৪ সালের জুলাইয়ের আন্দোলন স্বাধীনতার বিকল্প নয়। বরং স্বাধীন রাষ্ট্রের চরিত্র, ক্ষমতার ব্যবহার, নাগরিক অধিকার, জবাবদিহি এবং রাজনৈতিক ন্যায়বিচার নিয়ে নতুন প্রজন্মের প্রশ্নকে সামনে নিয়ে এসেছে।

১৯৭১ রাষ্ট্র দিয়েছে; ২০২৪ সেই রাষ্ট্র কেমন হবে—সেই প্রশ্ন নতুন করে তুলেছে।

এই দুই ইতিহাসকে পরস্পরের বিরুদ্ধে দাঁড় করানোর প্রয়োজন নেই। বরং বাংলাদেশের দীর্ঘ রাষ্ট্রগঠন প্রক্রিয়ার দুটি ভিন্ন অধ্যায় হিসেবে দেখাই বেশি যুক্তিসঙ্গত।

ইতিহাস কোনো রাজনৈতিক দলের ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়

একটি রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় সমস্যাগুলোর একটি তৈরি হয় তখন, যখন জাতীয় ইতিহাসকে কোনো একটি দল বা রাজনৈতিক গোষ্ঠী নিজেদের একক রাজনৈতিক সম্পদ হিসেবে ব্যবহার করতে শুরু করে।

ইতিহাসের মূল মালিক কোনো রাজনৈতিক দল নয়।

ইতিহাসের প্রকৃত মালিক দেশের জনগণ।

স্বাধীনতার ইতিহাস যেমন সমগ্র জাতির, তেমনি কোনো গণআন্দোলনও কেবল একটি রাজনৈতিক সংগঠনের একক অর্জন হয়ে যায় না, যদি সেখানে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশা ও মতের মানুষের অংশগ্রহণ থাকে।

জাতীয় স্মৃতিকে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করলে কয়েকটি সমস্যা তৈরি হয়।

প্রথমত, সমাজের মধ্যে বিভাজন বাড়ে। দ্বিতীয়ত, নতুন প্রজন্ম ইতিহাসকে নিরপেক্ষভাবে বোঝার সুযোগ হারায়। তৃতীয়ত, ক্ষমতাসীন গোষ্ঠী নিজেদের বৈধতা প্রতিষ্ঠার জন্য ইতিহাসের নির্দিষ্ট অংশকে সামনে আনে এবং অন্য অংশকে আড়ালে রাখার প্রবণতা তৈরি হতে পারে।

ফলে ইতিহাস তখন শিক্ষা দেওয়ার বদলে ক্ষমতা রক্ষার হাতিয়ার হয়ে ওঠে।

জুলাইয়ের বড় প্রশ্ন: রাষ্ট্রের মালিক আসলে কে?

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বার্তাগুলোর একটি ছিল রাষ্ট্রের সঙ্গে নাগরিকের সম্পর্ক নিয়ে।

রাষ্ট্র কি কোনো সরকার বা রাজনৈতিক দলের সম্পত্তি?

নাকি রাষ্ট্রের আসল মালিক জনগণ?

গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের উত্তর পরিষ্কার—সরকার সাময়িক, কিন্তু রাষ্ট্র জনগণের। সরকার পরিবর্তিত হবে, রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় আসবে এবং যাবে, কিন্তু নাগরিকের অধিকার কোনো দলের দয়ার ওপর নির্ভর করার কথা নয়।

এই ধারণা যদি বাস্তব রাষ্ট্র পরিচালনায় প্রতিষ্ঠিত হয়, তাহলেই জুলাইয়ের রাজনৈতিক পরিবর্তনের গভীর অর্থ তৈরি হবে।

অন্যথায় শুধু শাসকের নাম পরিবর্তিত হবে।

সবচেয়ে বড় পরীক্ষা রাজনৈতিক দলগুলোর নিজেদের ভেতরে

বাংলাদেশে গণতন্ত্র নিয়ে আলোচনা সাধারণত জাতীয় নির্বাচনকে ঘিরে হয়। নির্বাচন সুষ্ঠু হবে কি না, ভোটার ভোট দিতে পারবেন কি না, সরকার নিরপেক্ষ থাকবে কি না—এসব অবশ্যই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

কিন্তু এর আগেও আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচন রয়েছে, যেটি সাধারণ মানুষের চোখের আড়ালেই থেকে যায়।

সেটি হলো রাজনৈতিক দলের প্রার্থী নির্বাচন।

একজন সংসদ সদস্য প্রার্থী কীভাবে নির্বাচিত হন?

তাঁকে কি স্থানীয় দলের সদস্যরা বেছে নেন?

তৃণমূলের মতামত কি বাস্তবে গুরুত্ব পায়?

নাকি কয়েকজন কেন্দ্রীয় নেতা শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত নেন কে মনোনয়ন পাবেন?

যদি দ্বিতীয়টি বেশি প্রভাবশালী হয়, তাহলে নির্বাচিত প্রতিনিধির রাজনৈতিক জবাবদিহির ক্ষেত্রেও একটি মৌলিক সমস্যা তৈরি হতে পারে।

যিনি মনোনয়ন দেন, রাজনীতিকের আনুগত্যও কি তাঁর দিকেই যায়?

রাজনীতিতে একটি সহজ বাস্তবতা কাজ করে—যেখানে রাজনৈতিক ভবিষ্যতের নিয়ন্ত্রণ থাকে, রাজনীতিকের মনোযোগও অনেক সময় সেদিকেই বেশি থাকে।

যদি একজন সংসদ সদস্য জানেন যে পরবর্তী নির্বাচনে তাঁর মনোনয়ন নির্ভর করছে কয়েকজন কেন্দ্রীয় নেতার সিদ্ধান্তের ওপর, তাহলে তিনি স্থানীয় জনগণের চেয়ে কেন্দ্রীয় নেতৃত্বকে সন্তুষ্ট রাখতে বেশি আগ্রহী হয়ে উঠতে পারেন।

অন্যদিকে তাঁর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ যদি স্থানীয় সদস্য ও ভোটারের ওপর বেশি নির্ভর করে, তাহলে মানুষের কাছে ফিরে যাওয়ার প্রয়োজনও বাড়বে।

ক্ষমতার উৎস যেখানে, জবাবদিহিও শেষ পর্যন্ত সেদিকেই বেশি ঝুঁকে পড়ে।

এই কারণে রাজনৈতিক দলের ভেতরের গণতন্ত্রকে জাতীয় গণতন্ত্রের বাইরে রেখে দেখা কঠিন।

ভোটার কি শুধু আগে থেকে বাছাই করা প্রার্থীদের মধ্যেই নির্বাচন করবে?

ধরা যাক একটি নির্বাচনী এলাকায় দুই বড় রাজনৈতিক দলের দুজন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।

নির্বাচনের দিন সাধারণ মানুষ তাঁদের মধ্য থেকে একজনকে ভোট দিয়ে নির্বাচিত করলেন। বাইরে থেকে এটি গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া।

কিন্তু প্রশ্ন হলো—এই দুজনকে প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করলেন কারা?

যদি দুই দলেরই অল্প কয়েকজন নেতা জনগণ বা তৃণমূলের বাস্তব অংশগ্রহণ ছাড়াই তাঁদের মনোনয়ন দিয়ে থাকেন, তাহলে ভোটারের স্বাধীনতা নির্বাচনের শেষ ধাপ পর্যন্ত সীমিত হয়ে যায়।

মানুষ ভোট দিতে পারছেন ঠিকই, কিন্তু কার মধ্য থেকে ভোট দেবেন সেই প্রথম সিদ্ধান্তে তাঁদের অংশগ্রহণ খুব কম।

এটি বাংলাদেশের গণতন্ত্র নিয়ে ভবিষ্যতের গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার একটি বিষয় হতে পারে।

দলের ভেতরে গণতন্ত্র কেন প্রয়োজন?

একটি রাজনৈতিক দল রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য গণতন্ত্রের দাবি করবে, অথচ নিজেদের সংগঠনের ভেতরে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা যদি কয়েকজন মানুষের হাতে সীমিত থাকে, তাহলে সেখানে একটি মৌলিক বৈপরীত্য তৈরি হয়।

গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দলের ভেতরে কয়েকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ—

নেতৃত্ব নির্বাচনে বাস্তব প্রতিযোগিতা থাকা, তৃণমূল সদস্যদের মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া, প্রার্থী বাছাইয়ের প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা রাখা, আর্থিক জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং দলের নীতির সঙ্গে দ্বিমত প্রকাশের একটি নিরাপদ ব্যবস্থা রাখা।

এগুলো শুধু দলের অভ্যন্তরীণ বিষয় নয়।

কারণ আজ যে দল নিজের সংগঠনের ভেতরে ক্ষমতা ভাগ করতে শেখে না, কাল রাষ্ট্রক্ষমতায় গিয়ে ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ করবে—এমন নিশ্চয়তা খুব দুর্বল।

প্রাইমারি নির্বাচন কি একটি পথ হতে পারে?

বিশ্বের কিছু গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সাধারণ নির্বাচনের আগেই রাজনৈতিক দল নিজেদের প্রার্থী নির্বাচনের জন্য সদস্য বা সমর্থকদের ভোটের ব্যবস্থা করে। এটিকে সাধারণভাবে প্রাইমারি নির্বাচন বলা হয়।

বাংলাদেশে ঠিক একই ব্যবস্থা হুবহু কার্যকর করতে হবে—এমন কোনো কথা নেই। বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা, সাংগঠনিক সংস্কৃতি এবং সামাজিক কাঠামো আলাদা।

তবে মূল ধারণাটি গুরুত্বপূর্ণ।

কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের পাশাপাশি স্থানীয় সদস্যদের যদি প্রার্থী নির্বাচনে বাস্তব ক্ষমতা দেওয়া হয়, তাহলে মনোনয়নপ্রত্যাশীদের মানুষের কাছে নিজেদের গ্রহণযোগ্যতা প্রমাণ করতে হবে।

এতে কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ কিছুটা কমতে পারে এবং স্থানীয়ভাবে গ্রহণযোগ্য নেতৃত্ব সামনে আসার সুযোগ বাড়তে পারে।

তবে দলীয় নির্বাচনই সব সমস্যার সমাধান নয়

দলের ভেতরে নির্বাচন বা প্রাইমারি চালু করলেই যে সব সমস্যা দূর হয়ে যাবে, তা নিশ্চিতভাবে বলা যায় না।

বরং নতুন সমস্যাও তৈরি হতে পারে।

অর্থের প্রভাব বাড়তে পারে। স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তিরা সদস্য তালিকা নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করতে পারেন। দলীয় গ্রুপিং আরও তীব্র হতে পারে। পেশিশক্তি ব্যবহার করে স্থানীয় ভোট প্রভাবিত করার ঝুঁকিও থাকবে।

তাই শুধু নির্বাচন নয়, এর সঙ্গে প্রয়োজন স্বচ্ছ সদস্য তালিকা, নিরপেক্ষ তদারকি, গোপন ভোট, ব্যয়ের নিয়ম এবং অভিযোগ নিষ্পত্তির কার্যকর ব্যবস্থা।

অর্থাৎ দলের ভেতরের গণতন্ত্রও একটি প্রতিষ্ঠান; শুধু একটি ভোটের আয়োজন নয়।

জুলাইয়ের আকাঙ্ক্ষা শুধু স্লোগানে আটকে গেলে কী হবে?

প্রতিটি বড় গণআন্দোলনের পর মানুষের প্রত্যাশা বেড়ে যায়।

মানুষ আশা করে এবার হয়তো ক্ষমতার অপব্যবহার কমবে, রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী হবে, বিচারব্যবস্থা স্বাধীন হবে এবং রাজনৈতিক নেতৃত্ব আরও জবাবদিহির মধ্যে আসবে।

কিন্তু সময়ের সঙ্গে যদি মানুষ দেখে পুরোনো রাজনৈতিক সংস্কৃতিই নতুন নামে ফিরে আসছে, তাহলে হতাশা তৈরি হতে পারে।

সবচেয়ে বিপজ্জনক বিষয় হচ্ছে—মানুষ যদি বিশ্বাস করতে শুরু করে যে সরকার বদলালেও ব্যবস্থা কখনো বদলায় না।

সেই হতাশা শুধু কোনো একটি রাজনৈতিক দলের জন্য ক্ষতিকর নয়।

এটি পুরো গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার ওপর মানুষের বিশ্বাস দুর্বল করতে পারে।

সাধারণ মানুষের কাছে রাষ্ট্র সংস্কারের অর্থ কী?

রাষ্ট্র সংস্কার শব্দটি শুনলে অনেকের কাছে সংবিধান, কমিশন, সংসদ কিংবা জটিল আইনি আলোচনা মনে হতে পারে।

কিন্তু একজন সাধারণ নাগরিকের কাছে এর অর্থ অনেক সহজ।

তিনি থানায় গেলে রাজনৈতিক পরিচয় ছাড়াই ন্যায়বিচার পাবেন কি না।

চাকরি পেতে ক্ষমতাবান কারও সুপারিশ লাগবে কি না।

ব্যবসা করতে গিয়ে রাজনৈতিক চাঁদা দিতে হবে কি না।

নিজের মত প্রকাশ করলে ভয় পেতে হবে কি না।

সরকারি সেবা পেতে ঘুষ দিতে হবে কি না।

এবং তাঁর এলাকার জনপ্রতিনিধি সত্যিই জনগণের কাছে জবাবদিহি করবেন কি না।

রাষ্ট্রের প্রকৃত সংস্কার শেষ পর্যন্ত এই সাধারণ অভিজ্ঞতাগুলোতেই পরিমাপ করা হবে।

অর্থনীতির জন্যও জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্র প্রয়োজন

রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান দুর্বল হলে ক্ষতি শুধু রাজনৈতিক পরিসরে সীমাবদ্ধ থাকে না।

এর প্রভাব ব্যবসা, বিনিয়োগ এবং কর্মসংস্থানের ওপরও পড়ে।

একজন উদ্যোক্তা জানতে চান আইন সবার জন্য সমান কি না। ব্যবসায়ী জানতে চান সরকার বদলালে তাঁর ব্যবসার নিয়মও হঠাৎ বদলে যাবে কি না। বিনিয়োগকারী জানতে চান আদালত ও প্রশাসনের সিদ্ধান্ত কতটা নির্ভরযোগ্য।

ক্ষমতার পরিবর্তনের সঙ্গে যদি নিয়মও বদলে যায়, তাহলে অর্থনীতিতে অনিশ্চয়তা বাড়ে।

অন্যদিকে শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান থাকলে সরকার পরিবর্তন হলেও রাষ্ট্রের মৌলিক নিয়ম স্থিতিশীল থাকে।

এই কারণে রাজনৈতিক সংস্কার শুধু রাজনৈতিক বিষয় নয়; দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার সঙ্গেও এর গভীর সম্পর্ক রয়েছে।

স্বল্পমেয়াদে বাংলাদেশের সামনে কী কাজ?

জুলাই-পরবর্তী সময়ে সবচেয়ে জরুরি কাজ হচ্ছে মানুষের প্রত্যাশাকে বাস্তব ও পরিমাপযোগ্য সংস্কারে রূপ দেওয়া।

শুধু বড় বড় প্রতিশ্রুতি যথেষ্ট নয়।

জনগণ জানতে চাইবে—কোন প্রতিষ্ঠান বদলেছে, কোন আইন পরিবর্তিত হয়েছে, কোথায় জবাবদিহি বেড়েছে এবং সাধারণ নাগরিক বাস্তবে কী সুবিধা পাচ্ছেন।

একই সঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলোরও নিজেদের দিকে তাকাতে হবে।

দলের নেতা কীভাবে নির্বাচিত হন?

প্রার্থী কে ঠিক করেন?

তৃণমূলের মতামতের কতটা মূল্য আছে?

দলের অর্থ কোথা থেকে আসে এবং কীভাবে ব্যয় হয়?

ভিন্নমত প্রকাশ করলে একজন নেতা বা কর্মী নিরাপদ থাকেন কি না?

রাষ্ট্র সংস্কারের দাবি করা দলগুলোর জন্য এসব প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ ক্রমেই কমবে।

দীর্ঘমেয়াদে আসল পরীক্ষা ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণ করা

একটি দেশের গণতন্ত্রের সবচেয়ে বড় শক্তি শুধু ক্ষমতা পরিবর্তনের সুযোগ নয়।

আসল শক্তি হলো ক্ষমতাকে নিয়ন্ত্রণ করার ব্যবস্থা।

গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র এমন ধারণার ওপর দাঁড়াতে পারে না যে সবসময় ভালো মানুষই ক্ষমতায় আসবেন।

বরং প্রতিষ্ঠান এমন হতে হবে, যাতে ক্ষমতায় থাকা ব্যক্তি ভুল করলেও তাঁকে থামানো যায়।

আইন ভাঙলে জবাবদিহি করতে হয়।

নাগরিকের অধিকার লঙ্ঘন করলে প্রতিকার পাওয়া যায়।

এবং সরকার জনগণের আস্থা হারালে শান্তিপূর্ণ ও গ্রহণযোগ্য পদ্ধতিতে পরিবর্তনের সুযোগ থাকে।

কোন বিষয়গুলো এখনো পর্যবেক্ষণ করা দরকার?

জুলাইয়ের পর বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতি বাস্তবে কতটা বদলাবে, সেটি এখনই নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না।

এর মূল্যায়ন করতে সময় প্রয়োজন।

বিশেষভাবে দেখতে হবে রাজনৈতিক দলগুলো নিজেদের ভেতরে গণতন্ত্রের চর্চা বাড়ায় কি না, প্রার্থী মনোনয়নে স্থানীয় সদস্যদের ভূমিকা বাড়ে কি না, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো দলীয় প্রভাব থেকে বের হতে পারে কি না এবং ক্ষমতায় থাকা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইন বাস্তবে সমানভাবে প্রয়োগ হয় কি না।

এগুলোই শেষ পর্যন্ত নির্ধারণ করবে জুলাইয়ের পরিবর্তন শুধু রাজনৈতিক ক্ষমতার পালাবদল ছিল, নাকি বাংলাদেশের রাষ্ট্রব্যবস্থার গভীর পরিবর্তনের সূচনা।

মূল কথা

বাংলাদেশের ইতিহাসে ১৯৭১ এবং ২০২৪-কে একে অপরের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখার প্রয়োজন নেই।

১৯৭১ স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ভিত্তি তৈরি করেছে।

আর জুলাই ২০২৪ সেই স্বাধীন রাষ্ট্রের চরিত্র নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন করার সুযোগ তৈরি করেছে—রাষ্ট্র কতটা ন্যায়ভিত্তিক হবে, কতটা জবাবদিহিমূলক হবে এবং নাগরিকের মর্যাদা কতটা নিশ্চিত করবে।

কিন্তু এসব প্রশ্নের উত্তর শুধু সরকার পরিবর্তনের মাধ্যমে পাওয়া যাবে না।

পরিবর্তন প্রয়োজন রাজনৈতিক দলের ভেতরে।

পরিবর্তন প্রয়োজন প্রশাসনে।

পরিবর্তন প্রয়োজন পুলিশ ও বিচারব্যবস্থায়।

পরিবর্তন প্রয়োজন ক্ষমতা ব্যবহারের সংস্কৃতিতে।

রাষ্ট্র রূপান্তরের আসল পরীক্ষা হলো—ক্ষমতায় কে আছে তা নয়; ক্ষমতায় যে-ই থাকুক, তাকে জনগণের কাছে জবাবদিহি করতে হয় কি না।

জুলাইয়ের সবচেয়ে বড় অর্জন শেষ পর্যন্ত হয়তো এখানেই নির্ধারিত হবে।

যদি বাংলাদেশের নাগরিকরা এমন একটি ব্যবস্থা তৈরি করতে পারেন যেখানে কোনো সরকার, কোনো নেতা এবং কোনো রাজনৈতিক দল রাষ্ট্রের চেয়ে বড় হয়ে উঠতে পারবে না, তাহলে জুলাই একটি সরকার পতনের ঘটনা হিসেবেই সীমাবদ্ধ থাকবে না।

এটি বাংলাদেশের দীর্ঘ রাষ্ট্র রূপান্তরের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ নতুন অধ্যায় হয়ে থাকবে।