জুলাইয়ের পর নতুন বাংলাদেশ কতটা নতুন? মতপ্রকাশ, ক্যাম্পাস সহিংসতা ও সংস্কার নিয়ে নতুন প্রশ্ন
![]() |
| ছবি : সংগৃহীত |
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থান বাংলাদেশের রাজনীতিতে শুধু একটি সরকার পরিবর্তনের ঘটনা ছিল না। আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত মানুষের বড় একটি প্রত্যাশা ছিল—রাষ্ট্র পরিচালনার সেই পুরোনো সংস্কৃতিও বদলাবে, যেখানে ক্ষমতাসীনদের সমালোচনা ঝুঁকিপূর্ণ, পুলিশ রাজনৈতিক প্রভাবের সামনে দুর্বল, বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্ষমতাসীন ছাত্রসংগঠনের আধিপত্য স্বাভাবিক এবং নাগরিক অধিকার অনেক সময় ক্ষমতার প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যাখ্যা করা হয়।
কিন্তু ২০২৬ সালের মার্চ ও এপ্রিলের কয়েকটি ঘটনা সেই প্রত্যাশার সামনে নতুন প্রশ্ন তুলেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সরকার বা প্রধানমন্ত্রীকে নিয়ে পোস্ট করার ঘটনায় অন্তত চারজনের গ্রেপ্তার, শাহবাগ থানায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রনেতা ও সাংবাদিকদের ওপর হামলার অভিযোগ, ক্যাম্পাসে “গুপ্ত” শব্দকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক সংঘাত এবং জুলাই-পরবর্তী সংস্কার অধ্যাদেশগুলোর একটি অংশ নিয়ে অনিশ্চয়তা—সব ঘটনা এক নয়। তবে একসঙ্গে দেখলে একটি বড় প্রশ্ন সামনে আসে।
Human Rights Watch-এর তথ্য অনুযায়ী, মার্চের শেষ থেকে এপ্রিলের মাঝামাঝি সময়ে অন্তত চারজন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত বক্তব্য বা পোস্টকে কেন্দ্র করে গ্রেপ্তার হন। এসব ঘটনা মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে।
একটি কার্টুন থেকে মামলা—সমস্যা শুধু একজনের নয়
কনটেন্ট নির্মাতা এ এম হাসান নাসিমের ঘটনা বিশেষভাবে আলোচনায় আসে। একটি ব্যঙ্গাত্মক কার্টুন শেয়ার করার পর তার বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠে এবং পরে ২০২৫ সালের Cyber Security Ordinance-এর একটি ধারায় মামলা করা হয়। পরে তিনি জামিন পান।
অনলাইনে ব্ল্যাকমেইল, সহিংসতার হুমকি, প্রতারণা বা ব্যক্তিগত ক্ষতি ঘটানোর মতো কর্মকাণ্ড অবশ্যই আইনের আওতায় আসতে পারে। কিন্তু রাজনৈতিক নেতা বা সরকারকে নিয়ে ব্যঙ্গ, সমালোচনা কিংবা অস্বস্তিকর মত প্রকাশ যদি সহজেই ফৌজদারি মামলায় পরিণত হয়, তাহলে এর প্রভাব শুধু একজন ব্যক্তির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না।
আর এখান থেকেই তৈরি হয় মতপ্রকাশের ওপর এক ধরনের অদৃশ্য চাপ। মানুষকে সরাসরি নিষেধ না করেও যদি আইনের ভয় তাকে চুপ থাকতে শেখায়, তাহলে গণতান্ত্রিক পরিসর ধীরে ধীরে সংকুচিত হতে পারে।
থানার ভেতর হামলার অভিযোগ কেন আরও গুরুতর
শাহবাগ থানায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রনেতা ও সাংবাদিকদের ওপর হামলার অভিযোগ পরিস্থিতিকে আরও গুরুতর করে তোলে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে অন্তত ১০ সাংবাদিক আহত হন।
ঘটনার পর ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব দুঃখ প্রকাশ করে এবং ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানায়। ফলে কিছু কর্মীর কর্মকাণ্ডকে পুরো সংগঠন বা সরকারের আনুষ্ঠানিক নীতি হিসেবে দেখানো ঠিক হবে না।
সমস্যাটি শুধু একটি সংঘর্ষের নয়। এখানে প্রশ্ন রাষ্ট্রের নিরপেক্ষতা নিয়ে। কোনো রাজনৈতিক পরিচয় কি আইনের চেয়েও শক্তিশালী হয়ে উঠছে—এমন ধারণা তৈরি হলে তার ক্ষতি দীর্ঘমেয়াদে পুরো আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থাকেই বহন করতে হয়।
‘গুপ্ত’ শব্দ কি নতুন রাজনৈতিক লেবেলে পরিণত হচ্ছে?
সম্প্রতি ছাত্রদল ও ইসলামী ছাত্রশিবিরের বিরোধে “গুপ্ত” শব্দটি নতুন রাজনৈতিক তাৎপর্য পেয়েছে। বিভিন্ন ক্যাম্পাসে এই শব্দ ব্যবহার করে পাল্টাপাল্টি দেয়াললিখন ও রাজনৈতিক বক্তব্য দেখা গেছে।
কোনো সংগঠন সত্যিই যদি নিজের পরিচয় গোপন করে অন্য নামে কার্যক্রম পরিচালনা করে, সেটি অবশ্যই তদন্ত ও সমালোচনার বিষয়। কিন্তু প্রমাণ ছাড়া পুরো একটি রাজনৈতিক গোষ্ঠীকে একটি শব্দ দিয়ে সন্দেহভাজন বানিয়ে দেওয়া হলে রাজনৈতিক বিতর্কের জায়গা দখল করে নিতে পারে পরিচয়ভিত্তিক আক্রমণ।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে “রাজাকার”, “জঙ্গি”, “দেশদ্রোহী” বা “ফ্যাসিস্ট”-এর মতো শব্দ কখনো সঠিক প্রেক্ষাপটে ব্যবহৃত হয়েছে, আবার কখনো প্রতিপক্ষকে রাজনৈতিকভাবে অগ্রহণযোগ্য করে তুলতেও ব্যবহার হয়েছে।
“গুপ্ত” শব্দও যদি প্রমাণের বদলে রাজনৈতিক পরিচয় নির্ধারণের শর্টকাটে পরিণত হয়, তাহলে আজ এক পক্ষ এর শিকার হলেও ভবিষ্যতে অন্য পক্ষের বিরুদ্ধেও একই পদ্ধতি ব্যবহার করা সম্ভব।
ভুয়া স্ক্রিনশট থেকে বাস্তব সংঘর্ষ
শাহবাগের উত্তেজনার পেছনে যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের স্ক্রিনশট নিয়ে অভিযোগ ওঠে, সেটি একটি ফ্যাক্ট-চেকিং প্রতিষ্ঠানের যাচাইয়ে সম্পাদিত বা ভুয়া বলে শনাক্ত হওয়ার খবর প্রকাশিত হয়েছে।
ডিজিটাল যুগের সবচেয়ে বড় বিপদগুলোর একটি এখানেই—একটি ভুয়া ছবি, পোস্ট বা স্ক্রিনশট কয়েক মিনিটের মধ্যে বাস্তব রাজনৈতিক উত্তেজনা তৈরি করতে পারে।
বিশ্ববিদ্যালয় যদি রাজনীতির মাঠ হয়, ক্ষতিটা কার?
বাংলাদেশের ইতিহাসে ছাত্ররাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। ভাষা আন্দোলন, স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন এবং ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানেও শিক্ষার্থীদের রাজনৈতিক অংশগ্রহণ গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
তাই ছাত্ররাজনীতি নিজেই সমস্যা নয়। সমস্যা তৈরি হয় যখন রাজনৈতিক অংশগ্রহণের জায়গা দখল করে দলীয় আধিপত্য, ভয় দেখানো, সহিংসতা, হল নিয়ন্ত্রণ এবং পরিচয়ের ভিত্তিতে সুযোগ পাওয়া।
যদি একজন শিক্ষার্থীর নিরাপত্তা, আবাসন বা সুযোগ মেধার চেয়ে রাজনৈতিক পরিচয়ের ওপর নির্ভর করতে শুরু করে, তাহলে বিশ্ববিদ্যালয়ে স্বাধীন চিন্তা দুর্বল হয়। এর প্রভাব শুধু ক্যাম্পাসের মধ্যে থাকে না; ভবিষ্যতের প্রশাসন, রাজনীতি, শিক্ষা ও পেশাজীবী সমাজেও তা ছড়িয়ে পড়ে।
জুলাইয়ের আসল প্রশ্ন: সরকার পরিবর্তন, নাকি ব্যবস্থা পরিবর্তন?
২০২৪ সালের আন্দোলনের পর রাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান সংস্কারের দাবি সামনে আসে। এর মধ্যে ছিল প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার সীমা, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, নির্বাচনব্যবস্থার সংস্কার, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের ভারসাম্য এবং নাগরিক অধিকার শক্তিশালী করার প্রশ্ন।
২০২৬ সালের গণভোটেও সংস্কারের পক্ষে উল্লেখযোগ্য জনমত দেখা যায়। সংশোধিত ফল অনুযায়ী, বৈধ ভোটের প্রায় ৬৮.৩ শতাংশ ছিল “হ্যাঁ” ভোট।
১৩৩ অধ্যাদেশ: সংস্কার বাতিল, নাকি পুনর্বিবেচনা?
অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা ১৩৩টি অধ্যাদেশের মধ্যে ৯৭টি অপরিবর্তিতভাবে আইনে পরিণত হয়েছে, ১৩টি সংশোধন করা হয়েছে, সাতটি বাতিল করা হয়েছে এবং ১৬টি আরও পর্যালোচনার জন্য রাখা হয়েছে।
তাই সব সংস্কার বাতিল হয়ে গেছে—এমন দাবি সঠিক হবে না। সরকারের বক্তব্য হলো, মানবাধিকার, গুম, তদন্ত, বিচার, জরিমানা ও ক্ষতিপূরণসংক্রান্ত কয়েকটি আইনে দুর্বলতা রয়েছে এবং সেগুলো সংশোধন করে আরও কার্যকর করা প্রয়োজন।
অন্যদিকে উদ্বেগও রয়েছে—“পর্যালোচনা” যেন গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার দীর্ঘদিন আটকে রাখার উপায় হয়ে না দাঁড়ায়।
বর্তমান সরকারের পক্ষে যে যুক্তিগুলো রয়েছে
বর্তমান পরিস্থিতিকে সরাসরি আগের শাসনের পুনরাবৃত্তি বললে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য বাদ পড়ে যাবে।
- অন্তর্বর্তী সরকারের অধিকাংশ অধ্যাদেশ আইনি কাঠামোয় রাখা হয়েছে।
- শাহবাগের ঘটনায় ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব প্রকাশ্যে দুঃখ প্রকাশ করেছে।
- কিছু বিতর্কিত আইন সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
- গণভোট ও সাংবিধানিক সংস্কারের বিভিন্ন প্রশ্ন বিচারিক পর্যালোচনার মধ্যে রয়েছে।
অতএব কয়েকটি উদ্বেগজনক ঘটনা দেখেই পুরো শাসনব্যবস্থাকে একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক অভিধায় সংজ্ঞায়িত করা তথ্যভিত্তিক বিশ্লেষণ হবে না।
তবু সতর্ক হওয়ার কারণ আছে
সরকারের সমালোচনায় গ্রেপ্তার যদি নিয়মিত হয়ে ওঠে, রাজনৈতিক কর্মীদের অভিযোগের পরই নাগরিকদের বিরুদ্ধে দ্রুত মামলা হয়, ক্ষমতাসীন ছাত্রসংগঠনের সামনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী দুর্বল হয়ে পড়ে এবং বিরোধীদের বিশেষ রাজনৈতিক লেবেল দিয়ে চিহ্নিত করা স্বাভাবিক হয়ে যায়—তাহলে ব্যক্তি বদলালেও রাষ্ট্রীয় রাজনৈতিক সংস্কৃতি বদলাবে না।
সাধারণ মানুষের ক্ষতি কোথায়?
এই ঘটনাগুলো শুধু রাজনৈতিক দলগুলোর বিষয় নয়। এর প্রভাব সরাসরি সাধারণ মানুষের ওপর পড়ে।
- সরকারের সমালোচনা করতে ভয় তৈরি হলে নাগরিক স্বাধীনতা সংকুচিত হয়।
- সাংবাদিক নিরাপদ না থাকলে সাধারণ মানুষ সঠিক তথ্য থেকে বঞ্চিত হয়।
- থানায় রাজনৈতিক প্রভাব কাজ করলে আইনের প্রতি মানুষের আস্থা কমে।
- বিশ্ববিদ্যালয়ে দলীয় আনুগত্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠলে মেধা ও স্বাধীন চিন্তা ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
- জবাবদিহিমূলক প্রতিষ্ঠান দুর্বল হলে রাষ্ট্রীয় অন্যায়ের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষ আরও অসহায় হয়ে পড়ে।
দীর্ঘমেয়াদে বাংলাদেশের আসল পরীক্ষা
বাংলাদেশের রাজনৈতিক সমস্যাকে শুধু আওয়ামী লীগ বনাম বিএনপি, বিএনপি বনাম জামায়াত অথবা ছাত্রদল বনাম শিবির হিসেবে দেখলে মূল সমস্যাটি আড়ালে থেকে যাবে।
পুলিশ যদি স্বাধীন না হয়, আজকের বিরোধী দল কাল ক্ষমতায় গিয়ে একই পুলিশ ব্যবহার করতে পারে।
অস্পষ্ট ডিজিটাল আইন যদি টিকে থাকে, আজ যে পক্ষ তার শিকার হচ্ছে ভবিষ্যতে সে-ই অন্যের বিরুদ্ধে একই আইন ব্যবহার করতে পারে।
বিশ্ববিদ্যালয়ে যদি ক্ষমতাসীন দলের ছাত্রসংগঠনই সবচেয়ে শক্তিশালী পক্ষ হয়ে থাকে, তাহলে শুধু সংগঠনের নাম বদলাবে—ব্যবস্থা বদলাবে না।
মূল কথা
২০২৬ সালের কয়েকটি ঘটনাকে দেখে এখনই বলা যাবে না যে জুলাইয়ের সব পরিবর্তন ব্যর্থ হয়েছে অথবা বাংলাদেশ সম্পূর্ণভাবে আগের রাজনৈতিক ব্যবস্থায় ফিরে গেছে।
তবে সরকারের সমালোচনামূলক পোস্টকে কেন্দ্র করে গ্রেপ্তার, থানার ভেতর রাজনৈতিক হামলার অভিযোগ, সাংবাদিকদের আক্রান্ত হওয়া, ক্যাম্পাসে রাজনৈতিক লেবেলিং এবং গুরুত্বপূর্ণ সংস্কারের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা—এসব সতর্ক হওয়ার মতো ঘটনা।
কারণ সরকার পরিবর্তন একটি রাজনৈতিক ঘটনা। কিন্তু পুলিশ, আইন, আদালত, বিশ্ববিদ্যালয়, প্রশাসন এবং সাংবিধানিক ক্ষমতার নিয়ম বদলানোই প্রকৃত রাষ্ট্রীয় সংস্কার।
