​ব্যাংকিং খাতের তারল্য সংকট: দায় কি গভর্নরের নাকি দীর্ঘস্থায়ী লুটপাটের পরিণাম?

​ব্যাংকিং খাতের বর্তমান তারল্য সংকট এবং গভর্নরকে নিয়ে চন্দন আজিজের বিশ্লেষণের ব্যবচ্ছেদ। কেন গ্রাহকদের টাকা না তুলতে পারার দায় কেবল কেন্দ্রীয় ব্যাংকের
ব্যাংকিং খাতের তারল্য সংকট দায় কি গভর্নরের
​ব্যাংকিং খাতের তারল্য সংকট কয়েক দশকের পদ্ধতিগত লুটপাট
​সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত এক অভূতপূর্ব অস্থিরতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। গ্রাহকদের টাকা তুলতে না পারা, ব্যাংক একীভূতকরণ (Merger) নিয়ে আতঙ্ক এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নতুন নীতিমালার প্রভাব নিয়ে জনমনে তৈরি হয়েছে মিশ্র প্রতিক্রিয়া। বিশিষ্ট বিশ্লেষক চন্দন আজিজের সাম্প্রতিক এক বিশ্লেষণে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নরের কিছু পদক্ষেপকে 'ব্যর্থতা' হিসেবে চিহ্নিত করা হলেও, গভীর অর্থনীতি গবেষকরা মনে করছেন—এটি কেবল উপরিভাগের দৃশ্য।

মূল সংকটটি লুকিয়ে আছে কয়েক দশকের পদ্ধতিগত লুটপাট এবং কাঠামোগত দুর্বলতার গভীরে। ​গভর্নরের সিদ্ধান্তকে 'গ্রাহকদের শত্রু' হিসেবে চিত্রায়িত করার যে প্রচ্ছন্ন চেষ্টা চলছে, তা প্রকৃত অর্থনৈতিক বাস্তবতাকে আড়াল করছে কি না, তা এখন বড় প্রশ্ন।

​ব্যাংকিং প্যারাডক্স: টাকা নেই কেন?

​চন্দন আজিজের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, গভর্নর টাকা না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে গ্রাহকদের বিরাগভাজন হয়েছেন। কিন্তু মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং ব্যাংকিং শৃঙ্খলা রক্ষায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এই 'কঠোর' অবস্থান কি সত্যিই ব্যক্তিগত ব্যর্থতা?
প্রকৃত বাস্তবতা: কেন্দ্রীয় ব্যাংক যখন বাজারে টাকার জোগান কমিয়ে দেয়, তখন তার মূল লক্ষ্য থাকে লাগামহীন মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা। যদি ব্যাংকগুলো থেকে অনিয়ন্ত্রিতভাবে টাকা বের হতে দেওয়া হয়, তবে টাকার মান আরও কমে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে। ব্যাংকগুলো আজ গ্রাহককে টাকা দিতে পারছে না কারণ—

পূর্ববর্তী লুটপাট: বিগত বছরগুলোতে রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় কয়েক হাজার কোটি টাকা বেনামি ঋণের নামে বিদেশে পাচার করা হয়েছে।


​খেলাপি ঋণের ভার: ব্যাংকের ভল্টে বা হিসেবে যে টাকা থাকার কথা ছিল, তা এখন প্রভাবশালী খেলাপিদের পকেটে।


আস্থার সংকট: গুজব এবং অব্যবস্থাপনার কারণে গ্রাহকরা আতঙ্কিত হয়ে একসাথে টাকা তুলতে যাওয়ায় 'ব্যাংক রান' পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।


​সুষ্ঠু বিচার বিশ্লেষণে দেখা যায়, গভর্নর কেবল সেই 'শূন্য ঝুড়ি'র পাহারাদার হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন যা আগে থেকেই লুট হয়ে গেছে।

​ব্যাংক মার্জার ও বিনিয়োগকারীদের আতঙ্ক

​ব্যাংক একীভূতকরণের ফলে বিনিয়োগকারীদের শেয়ার বাজেয়াপ্ত হওয়া বা লোকসানের দায় গভর্নরের ওপর চাপানো হচ্ছে। কিন্তু এখানে একটি বিষয় স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন—একটি দেউলিয়া প্রায় ব্যাংক যখন অন্য একটি ভালো ব্যাংকের সাথে একীভূত হয়, তখন পূর্ববর্তী অব্যবস্থাপনার দায়ভার গভর্নরের ওপর নয়, বরং ওই ব্যাংকের সাবেক পরিচালক ও ঋণখেলাপিদের ওপর বর্তানো উচিত।

​বিশ্লেষকদের মতে, মার্জার প্রক্রিয়াটি একটি 'কঠিন সার্জারি'র মতো। সার্জারির সময় রক্তপাত হওয়া মানে এই নয় যে ডাক্তার রোগীকে মারতে চাচ্ছেন, বরং পচনশীল অংশ বাদ দিয়ে পুরো শরীরকে বাঁচানোই তাঁদের লক্ষ্য। বিনিয়োগকারীদের শেয়ারের মূল্য কমে যাওয়ার মূল কারণ ওই ব্যাংকের দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত লোকসান, যা মার্জার প্রক্রিয়ায় কেবল প্রকাশ্যে এসেছে।

​'তলাবিহীন ঝুড়ি' বনাম বিচারহীনতার সংস্কৃতি

​চন্দন আজিজ তাঁর লেখায় 'তলাবিহীন ঝুড়ি'র কথা বললেও, সেই ঝুড়ি কারা তৈরি করেছে তাদের বিচারের বিষয়টি গৌণ করে দেখিয়েছেন। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের টেকনিক্যাল সিদ্ধান্তগুলোকে (যেমন: সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি) প্রশ্নবিদ্ধ করা সহজ, কিন্তু যে মাফিয়াতন্ত্র ব্যাংকিং খাতকে এই পর্যায়ে নিয়ে এসেছে, তাদের আড়াল করা অর্থনীতির জন্য আত্মঘাতী।


​বিচারাধীন প্রশ্ন: কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নরের 'বেশি কথা বলা' বা মিডিয়া উপস্থিতিকে বড় ভুল হিসেবে দেখানো হলেও, অর্থনীতির ছাত্ররা জানেন যে—একটি ভঙ্গুর অর্থনীতির সংস্কার কেবল কথা দিয়ে হয় না। তবে গভর্নরের উচিত ছিল কারিগরি সিদ্ধান্তের পাশাপাশি লুটেরাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থার পথ সুগম করা। যখন মূল হোতাদের বিচার হয় না, তখন নিয়ন্ত্রক সংস্থার ছোটখাটো ভুলও বিশাল আকারে চোখে পড়ে।

​গ্রাহক ভোগান্তি: এটা কি কৌশল নাকি অচলাবস্থা?

​বর্তমানে গ্রাহকরা ব্যাংকে টাকা তুলতে গিয়ে খালি হাতে ফিরে আসছেন—এটি একটি অমানবিক বাস্তবতা। চন্দন আজিজ এই ভোগান্তিকে সামনে এনে আবেগী বয়ান তৈরি করেছেন, যা সাধারণ মানুষের কাছে জনপ্রিয় হতে পারে। কিন্তু এই কৌশলী প্রচেষ্টা মূলত প্রকৃত দায়মুক্তি দিচ্ছে তাদের, যারা ব্যাংকের আমানতকে নিজেদের ব্যক্তিগত সম্পদ মনে করে ভোগ করেছে।

​গভর্নর টাকা ছাপিয়ে দিলে সাময়িক সমাধান হতো ঠিকই, কিন্তু তাতে চাল-ডাল-তেলের দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যেত। অর্থাৎ, গভর্নর এখানে 'জনপ্রিয়' হওয়ার চেয়ে 'যৌক্তিক' হওয়ার কঠিন পথটি বেছে নিয়েছেন।

​এর থেকে উত্তরণের পথ কী?

​ব্যাংকিং খাতের এই গভীর সংকট থেকে মুক্তি পেতে কেবল গভর্নরের পরিবর্তন বা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ছিটেফোঁটা সংস্কার যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন:


​স্পেশাল ট্রাইব্যুনাল: যারা ব্যাংক থেকে টাকা পাচার করেছে, তাদের সম্পদ বাজেয়াপ্ত করে আমানতকারীদের টাকা ফেরত দেওয়ার জন্য বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন।


​রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত ব্যাংকিং: ঋণের অনুমোদন এবং পরিচালক নিয়োগে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ পুরোপুরি বন্ধ করা।


​স্বচ্ছ অডিট: প্রতিটি সংকটে পড়া ব্যাংকের আন্তর্জাতিক মানের অডিট ফার্ম দিয়ে অডিট করানো।


​জনসচেতনতা: কেন্দ্রীয় ব্যাংককে আরও দায়িত্বশীলতার সাথে গ্রাহকদের আশ্বস্ত করতে হবে যে তাদের আমানত সুরক্ষিত।

​বিশেষজ্ঞরা কি ভাবছেন?

​চন্দন আজিজের মতো বিশ্লেষকরা যখন ব্যক্তিগত আক্রমণ বা ছোট ভুলগুলোকে বড় করে দেখান, তখন মূল অপরাধীরা পর্দার আড়ালেই থেকে যায়। ব্যাংকিং খাতের বর্তমান অবস্থা কোনো একজনের তৈরি করা নয়, বরং এটি দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনার সম্মিলিত ফসল। গভর্নরকে 'ভিলেন' না বানিয়ে বরং ব্যাংক লুটেরাদের আইনি কাঠামোর আওতায় আনাই এখন সময়ের দাবি। গ্রাহকের শত্রু গভর্নর নন, বরং গ্রাহকের শত্রু সেই লুটেরা শ্রেণি যারা ব্যাংকের ভল্ট খালি করে দিয়ে বিদেশে রাজত্ব তৈরি করেছে।
জনগণের পকেট কেঁটে সিন্ডিকেটের উল্লাস, সংবিধান কি বলছে?
আরও পড়ুন →