আমরা বিড়ালকে দিচ্ছি মাছ পাহারার দায়িত্ব : কতটুকু সফল হলো জনগণের আকাঙ্খা?

Khomota
0
হাসনাত আব্দুল্লাহ সংবাদ সম্মেলন
২০২৪ সালের বিপ্লবের চেতনা এবং বর্তমান রাষ্ট্রীয় কাঠামোর আমূল পরিবর্তনের লড়াই নিয়ে সংবাদ সম্মেলনে হাসনাত আব্দুল্লাহ
২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লবের সেই উত্তাল দিনগুলোর কথা কি আমরা ভুলে যেতে পারি? রাজপথে ছাত্র-জনতার সেই রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম কোনো বিশেষ ব্যক্তিকে গদিতে বসানোর জন্য ছিল না; বরং তা ছিল একটি পচে যাওয়া সিস্টেম বা রাষ্ট্রকাঠামোর আমূল পরিবর্তনের লড়াই। এক ইনসাফ প্রতিষ্ঠার লড়াই। কিন্তু ২০২৬ সালে এসে সেই আকাঙ্ক্ষা কতটুকু পূরণ হলো? সম্প্রতি এক ভিডিও বার্তায় জাতীয় নাগরিক পার্টির নেতা ও বর্তমান সংসদ সদস্য হাসনাত আব্দুল্লাহর দেওয়া বক্তব্যে সাধারণ মানুষের মনে নতুন করে এক বড় প্রশ্ন উঠেছে, তাহলে কতটুকু সফল হলো জনগণের আকাঙ্খা?

রাষ্ট্রীয় কমিশনগুলোর স্বাধীনতা নিয়ে হাসনাত আব্দুল্লাহ ক্ষোভ

হাসনাত আব্দুল্লাহর তার বক্তব্যে রাষ্ট্রীয় কমিশনগুলোর স্বাধীনতা নিয়ে বেশ উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, বর্তমান অবস্থা “বিড়ালের কাছে শুঁটকির পাহারা” দেওয়ার মতো। মানবাধিকার কমিশন বা দুর্নীতি দমন কমিশনের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো যদি সরাসরি মন্ত্রণালয়ের অধীনে থাকে, তবে সাধারণ মানুষ ন্যায়বিচার কার কাছে পাবে?

জুলাই বিপ্লবের মূল মন্ত্র ছিল বৈষম্যহীন এক বাংলাদেশ বিনির্মান। যেখানে পুলিশ বা প্রশাসন কোনো রাজনৈতিক দলের লাঠিয়াল বাহিনী হিসেবে কাজ করবে না। কিন্তু বর্তমানে আমরা কী দেখছি? হাসনাত আব্দুল্লাহর ভাষায়, বিরোধী দলে থাকলে সব দলই বড় বড় সংস্কারের কথা বলে, কিন্তু ক্ষমতার মসনদে বসলেই তাদের সুর বদলে যায়। এটি কেবল তার একার উদ্বেগ নয়, বরং এটি আজ সাধারণ জনগণের মনের চাপা ক্ষোভ।

বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও ভয়ের সংস্কৃতি

একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে বিচার বিভাগ হলো মানুষের শেষ আশ্রয়স্থল। ভিডিওতে হাসনাত আব্দুল্লাহ বিচারকদের বদলি ও পদোন্নতির ক্ষমতা মন্ত্রণালয়ের হাতে রাখার তীব্র সমালোচনা করেছেন। জনগণের ভাবনাও ঠিক একই রকম—যদি একজন বিচারকের কলম ক্ষমতার রক্তচক্ষুর ভয়ে কাঁপতে থাকে, তবে সাধারণ মানুষ কি কখনো প্রভাবশালীদের বিরুদ্ধে মামলা করে জিততে পারবে?

বিচারপতিদের নিয়ন্ত্রণ যদি সরকারের হাতে থাকে, যদি প্রভাবশালী ব্যাক্তিরা নিজের ক্ষমতা ও অর্থ বলে বিচারকে প্রভাবিত করতে পারে, তবে সেখানে আইনের শাসনের চেয়ে 'ক্ষমতার শাসন' প্রতিষ্ঠিত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। এই ভয়ের সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসার জন্যই তো মানুষ ২০২৪ সালে রাজপথে বুক পেতে দিয়েছিল।

তবে কি নতুন মোড়কে ফিরে আসছে আয়নাঘর?

মানবাধিকার কমিশনের ভবিষ্যৎ নিয়ে ​হাসনাত আব্দুল্লাহর গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, ২০০৯ সালের আইন অনুযায়ী তদন্তের ভার যদি পুনরায় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের হাতে থাকে, তবে তা হবে বিপ্লবের চেতনার সাথে এক চরম বিশ্বাসঘাতকতা। যাকে অভিযুক্ত করা হচ্ছে, তার দপ্তরের হাতেই যদি তদন্তের চাবিকাঠি থাকে, তবে সেই তদন্তের ফলাফল কী হতে পারে তা বুঝতে রকেট সায়েন্স জানার প্রয়োজন নেই। ​তাহলে কি এখন সংস্কারের নামে পুরনো ব্যবস্থাই ফিরে আসছে? ২০২৪-এর চেতনা কি তবে ২০২৬-এর রাজনৈতিক কৌশলের কাছে হেরে যাচ্ছে?

হাসনাত আব্দুল্লাহর বক্তব্যে জনগণের সম্মতি কতটুকু?

আমিন নামের একজন জুলাই যোদ্ধা হাসনাত আব্দুল্লাহর বক্তব্যকে সম্মতি দিয়ে বলেন,
হাসনাত আব্দুল্লাহর এটি ব্যক্তিগত ক্ষোভ নয়, বরং এটি ২০২৪-এর বিপ্লবীদের হৃদয়ে জমে থাকা এক গভীর দীর্ঘশ্বাসের প্রতিধ্বনি। যে ইনসাফ কায়েমের লক্ষ্যে আমরা ছাত্র-জনতা বুলেটের সামনে বুক পেতে দিয়েছিলাম, ২০২৬ সালে এসে সেই ইনসাফ যদি পুনরায় আমলাতান্ত্রিক জটিলতা আর রাজনৈতিক মারপ্যাঁচে বন্দি হয়ে যায়, তবে তা হবে ইতিহাসের এক করুণ পুনরাবৃত্তি।

মোহাম্মদ নজরুল ইসলাম নামের একজন পথচারী বলেন,

রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে স্বাধীন করা কেবল আইনি সংস্কার নয়, এটি জনগণের সাথে করা নতুন বাংলাদেশের এক অলিখিত চুক্তি। বিড়ালের হাতে শুঁটকির পাহারার মতো ব্যবস্থাকে জিইয়ে রেখে প্রকৃত গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা অসম্ভব। যদি বিচার বিভাগ আর মানবাধিকার সংস্থাগুলো আজও মন্ত্রণালয়ের নিয়ন্ত্রণে থাকে, তবে ‘আয়নাঘর’ বা ‘গুম-সংস্কৃতি’র মতো অন্ধকার অধ্যায়গুলো অন্য কোনো নামে ফিরে আসবে।

এখন সময় এসেছে নীতিনির্ধারকদের ভাববার—তারা কি জুলাই বিপ্লবের রক্তে ভেজা সেই ত্যাগের মর্যাদা রাখবেন, নাকি ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার পুরনো কৌশলেই হাঁটবেন? জনগণের আকাঙ্ক্ষা পূরণ করতে হলে শাসন নয়, দরকার আমূল সংস্কার। অন্যথায়, ইতিহাসের শিক্ষা হলো—জনগণ যখন অধিকার আদায়ে একবার জেগে ওঠবে, তখন হতে পারে দেশ বিরোধী আইন রুখতে জনগণ সংসদেও উপস্থিত হতে পারে। বিপ্লবের চেতনাকে বাঁচিয়ে রাখতে হলে প্রতিষ্ঠানের পূর্ণ স্বাধীনতা এখন আর কোনো বিকল্প নয়, বরং সময়ের দাবি।
জুলাই বিপ্লবের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নে দ্বিমুখী আচরণ: গভীর উদ্বেগ টিআইবির
আরও পড়ুন →
Tags
ncp

Post a Comment

0 Comments

Post a Comment (0)

#buttons=(Ok, Go it!) #days=(20)

Our website uses cookies to enhance your experience. Check Now
Ok, Go it!