![]() |
| আইএমএফ কার্যালয় |
যা দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ও সামগ্রিক বাজেটে বাড়তি চাপ সৃষ্টি করবে বলে ধারণা করছেন বিশেষজ্ঞরা। ওয়াশিংটন ডিসিতে চলমান আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের বসন্তকালীন বৈঠকে অংশগ্রহণকারী বাংলাদেশ প্রতিনিধিদল এই তথ্য নিশ্চিত করেছে। অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর নেতৃত্বে উচ্চপর্যায়ের এই প্রতিনিধিদল বর্তমানে ওয়াশিংটনে অবস্থান করছে।
আইএমএফের ঋণের কিস্তি স্থগিতের মূল কারণ
আইএমএফের ৫.৫ বিলিয়ন ডলারের ঋণ কর্মসূচির আওতায় চলতি অর্থবছরের জুনে বড় অংকের অর্থ ছাড় পাওয়ার কথা ছিল বাংলাদেশের। তবে সংস্থাটি স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, বর্তমান কর্মসূচির অধীনে যেসব কাঠামোগত সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, তার দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি নেই। বিশেষ করে:
- রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে ব্যর্থতা: জিডিপির তুলনায় কর আদায়ের অনুপাত বৃদ্ধির শর্ত থাকলেও বাস্তবে তা নিম্নমুখী।
- ব্যাংকিং খাতের নাজুক অবস্থা: খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণ এবং ব্যাংকগুলোর পুনর্গঠনে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।
- ভর্তুকি ও বিনিময় হার: বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে ভর্তুকি কমানো এবং মুদ্রা বিনিময়ের হার পুরোপুরি বাজারভিত্তিক করার ক্ষেত্রে ধীরগতি।
ব্যাংক রেজল্যুশন আইনেই কাল হলো আইএমএফের ঋণের কিস্তি
ওয়াশিংটনের বৈঠকে আইএমএফের এশিয়া ও প্যাসিফিক বিভাগের পরিচালক কৃষ্ণ শ্রীনিবাসন বাংলাদেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তিনি জানান, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশের রাজস্ব প্রবৃদ্ধি আশঙ্কাজনকভাবে কমেছে। শক্তিশালী রাজনৈতিক অবস্থানের মাধ্যমে এখনই কঠোর সংস্কার গ্রহণের উপযুক্ত সময় ছিল, কিন্তু তার সদ্ব্যবহার করা হয়নি। আইএমএফ বিশেষ করে তিনটি বিষয়ে কঠোর অবস্থান নিয়েছে:- রাজস্ব এনবিআর পুনর্গঠন: এনবিআরের নীতি ও প্রশাসনিক ক্ষমতা পৃথক করার যে পরিকল্পনা ছিল, তা এখনো হিমাগারে।
- ব্যাংক রেজল্যুশন আইন: বিতর্কিত ব্যাংক রেজল্যুশন আইন ২০২৬ এর মাধ্যমে সমস্যাগ্রস্ত ব্যাংকের সাবেক মালিকদের পুনরায় ফিরে আসার সুযোগ এবং আমানতকারীদের ক্ষতিপূরণে সরকারি বাজেট ব্যবহারের বিষয়টিকে সংস্থাটি নেতিবাচক হিসেবে দেখছে।
- কর ছাড় কমানো: রাজনৈতিক ও ব্যবসায়িক প্রভাবে বিভিন্ন খাতে দেওয়া অপ্রয়োজনীয় কর অব্যাহতি বন্ধ না হওয়ায় ক্ষুব্ধ আইএমএফ।
অর্থনৈতিক প্রভাব ও রিজার্ভ সংকট
বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বর্তমানে একটি নাজুক অবস্থানে রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে আইএমএফের ১.৩ বিলিয়ন ডলার সময়মতো না পাওয়া গেলে বাজারে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) গবেষণা পরিচালক তৌফিকুল ইসলাম খান মনে করেন, আইএমএফের মূল্যায়নকে বিশ্বব্যাংক বা এডিবির মতো অন্যান্য উন্নয়ন সহযোগীরাও গুরুত্বপূর্ণ সূচক হিসেবে দেখে। ফলে আইএমএফের অর্থছাড় পিছিয়ে গেলে অন্যান্য আন্তর্জাতিক উৎস থেকেও অর্থায়ন পাওয়া কঠিন হয়ে পড়বে।তৌফিকুল ইসলাম খান আরও উল্লেখ করেন, অন্তর্বর্তী সরকার আইএমএফের শর্ত পালনে কার্যকর রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক উদ্যোগ নিতে ব্যর্থ হয়েছে। অনেক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত পরবর্তী নির্বাচিত সরকারের জন্য ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে, যা আইএমএফ গ্রহণ করছে না।
নতুন ঋণ কাঠামো ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা
আইএমএফ বর্তমান কর্মসূচির চেয়ে সংশোধিত শর্তে একটি নতুন ঋণ কাঠামোর দিকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। তারা অতিরিক্ত কিছু কঠোর শর্তসহ নতুন কর্মসূচি নিয়ে আলোচনার প্রস্তাব দিয়েছে। তবে প্রতিনিধিদলের সদস্যরা মনে করছেন, সব শর্ত পূরণ করে নতুন করে রিভিউ সম্পন্ন হলেও সেপ্টেম্বর বা তার আগে কোনো অর্থ ছাড় পাওয়া সম্ভব নয়।বর্তমানে ৫.৫ বিলিয়ন ডলারের এই কর্মসূচির মধ্যে বাংলাদেশের আরও প্রায় ১.৮৬ বিলিয়ন ডলার পাওনা রয়েছে। এই কর্মসূচির মেয়াদ শেষ হবে আগামী বছরের জানুয়ারিতে। তবে শর্ত পূরণের এই গোলকধাঁধায় পুরো পাওনা অর্থ পাওয়া যাবে কি না, তা নিয়ে অর্থনীতিবিদদের মধ্যে সংশয় রয়েছে।
এই সমস্যা থেকে উত্তরণের পথ কী?
অর্থনীতিবিদদের মতে, সরকারকে এখন অগ্রাধিকার ভিত্তিতে অন্তত দুটি বড় সংস্কার—রাজস্ব আদায় বৃদ্ধি এবং জ্বালানি ভর্তুকি সমন্বয়—কাজে দৃশ্যমান অগ্রগতি দেখাতে হবে। অন্যথায় বাজেট সহায়তা এবং আমদানির জন্য প্রয়োজনীয় ডলারের সংস্থান করা চ্যালেঞ্জিং হয়ে পড়বে। নির্বাচনি বছরের ব্যয় সামলানো এবং উচ্চ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আইএমএফের ঋণ একটি রক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করতে পারত, যা এখন অনিশ্চয়তার মুখে।সরকারকে এখন দ্রুততার সঙ্গে আইএমএফের প্রতিনিধি দলের সাথে সমঝোতায় বসতে হবে এবং ভবিষ্যতে সংস্কার অব্যাহত রাখার সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপ প্রদান করতে হবে। নতুবা সামষ্টিক অর্থনীতির এই অস্থিতিশীলতা দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে।
এক নজরে আইএমএফ ঋণ পরিস্থিতি
| বিবরণ | তথ্য |
|---|---|
| মোট ঋণ কর্মসূচি | ৫.৫ বিলিয়ন ডলার |
| এ পর্যন্ত প্রাপ্ত অর্থ | ৩.৬৪ বিলিয়ন ডলার |
| জুন ২০২৬-এ প্রত্যাশিত কিস্তি | ১.৩ বিলিয়ন ডলার (স্থগিত) |
| অবশিষ্ট পাওনা | ১.৮৬ বিলিয়ন ডলার |
| প্রধান বাধা | রাজস্ব আদায় ও ব্যাংক খাত সংস্কারের অভাব |

