![]() |
| টাইম ম্যাগাজিনের বিশ্বের ১০০ প্রভাবশালী ব্যক্তির তালিকায় বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান |
উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া মুকুট কি তিনি রক্ষা করতে পারবেন?
টাইমের সিঙ্গাপুর ব্যুরোর সম্পাদক চার্লি ক্যাম্পবেলের লেখা প্রোফাইলে তিনি বলেন, তারেক রহমান তাঁর মায়ের দেখানো পথে হেঁটেই আজ দেশের শীর্ষ নেতৃত্বে পৌঁছেছেন। অর্থাৎ, মা যে মুকুট পরেছিলেন, ছেলেও আজ সেই একই মুকুটে ভূষিত। যিনি দেশে ফেরার মাত্র ৫ দিন পর (৩০ ডিসেম্বর ২০২৫) তার মা, বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া ইন্তেকাল করেন।হাসিনা বনাম তারেক রহমান: টাইমে নাম আসা কি ভীতিকর?
তবে টাইম মেগাজিনের এই তালিকায় শেখ হাসিনার নামও একসময় এসেছিল, কিন্তু জুলাই বিপ্লবের সময় তার পতন এবং দেশ ছেড়ে ভারতে পালানোর মতো পরিণতি তাকে ভোগ করতে হয়। তবে তারেক রহমানের ক্ষেত্রে কী হবে, এখন তা নিয়ে জনমনে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে টাইম ম্যাগাজিনের এই স্বীকৃতি তারেক রহমানের বর্তমান জনপ্রিয়তা এবং রাজনৈতিক প্রভাবের প্রমাণ দেয়। গত জানুয়ারি মাসেই টাইমে ‘বাংলাদেশের প্রডিগাল সন’ শিরোনামে তার এক্সক্লুসিভ সাক্ষাৎকার প্রকাশ করেছে, যেখানে ১৭ বছর নির্বাসন শেষে দেশে ফেরা তারেক রহমানকে রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে দেখানো হয়েছে।ঐ প্রতিবেদনে শেখ হাসিনাকে স্বৈরাচারী বলে অভিহিত করে তার পতনের পর ছাত্র আন্দোলন, আইনশৃঙ্খলার অবনতি এবং ইসলামপন্থির উত্থান নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে। তারেক রহমানের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকারের সংস্কার গুলো অসম্পূর্ণ বলে উল্লেখ করলেও, নির্বাচন-পরবর্তী বাংলাদেশের পথ নির্ধারণে তার ভূমিকাকে আশার প্রতীক হিসেবে দেখা হয়েছে।
তবে কি এবার মুছবে অতিতের কালিমা
কিন্তু এই প্রশংসার পাশাপাশি টাইম মেগাজিন তারেক রহমানের অতীতের বিতর্কও তুলে ধরেছে—যেমন দুর্নীতির অভিযোগ এবং ইমেজ পুনর্গঠনের চেষ্টা। এটি তারেক রহমানের জন্য একটা দ্বিমুখী তলোয়ার, কারণ আন্তর্জাতিক মঞ্চে স্বীকৃতি পাওয়া যতটা গুরুত্বপূর্ণ, তার চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ অতীতের ছায়া থেকে মুক্ত হওয়া।তারেক রহমানের উত্থান-পতন ও নির্বাসিত জীবনের স্মৃতি
তারেক রহমানের অতীত ইতিহাস রাজনৈতিক উত্থান-পতনের এক অধ্যায়। বিএনপি নেতা খালেদা জিয়ার জ্যেষ্ঠ সন্তান হিসেবে তিনি ২০০৪ সালে তার মায়ের সরকারে ঢাকা-৯ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন এবং দলীয় কৌশলগত পদে যোগ দেন। কিন্তু এই সময়েই হাওয়া ভবন নামে পরিচিত বর্তমান প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ের পাশের একটি ভবন থেকে দুর্নীতি এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ ওঠে। অভিযোগ ছিল, তারেক রহমান এবং তার সহযোগীরা ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে ঘুষ নিয়ে সরকারি টেন্ডার বিতরণ করতেন এবং সেই অর্থ বিদেশে পাচার করতেন।২০০৭ সালে সামরিক সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে তাকে গ্রেপ্তার হয় এবং তার বিরুদ্ধে মামলা হয়। রিমান্ডে থাকাকালীন তিনি মারাত্মক ভাবে আহত হন। এরপর চিকিৎসার জন্য লন্ডনে যান। পরে লন্ডনে নির্বাসিত জীবন আরম্ভ করেন, যেখানে থাকাকালীনও দুর্নীতি এবং অর্থপাচারের মামলা চলতে থাকে। এই অতীত তারেক রহমানকে ‘দুর্নীতির বরপুত্র’ বলে branding করে দিয়েছে সমালোচকদের কাছে।
হাওয়া ভবন কি? কেন হাওয়া ভবন তারেক রহমানের নামের সাথে জড়িত?
হাওয়া ভবনের ঘটনা বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক রহস্যময় অধ্যায়। এই ভবনকে কেন্দ্র করে অভিযোগ উঠেছিল যে, তারেক রহমান এখান থেকে দেশের ব্যবসায়িক এবং রাজনৈতিক ক্ষেত্র নিয়ন্ত্রণ করতেন। উদাহরণস্বরূপ, ২০০৪ সালে মুরাদনগরের এমপি মোফাজ্জল হোসেন কায়কোবাদ এবং অন্যান্যরা হাওয়া ভবনে গিয়ে তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাত করে আওয়ামী লীগ নেতাদের হত্যা-সংক্রান্ত অপারেশনের সহযোগিতা চেয়েছিলেন, এবং তারেক রহমান সবার সামনে সহযোগিতা করার আশ্বাস দিয়েছিলেন।গণমাধ্যমের দৃষ্টিতে তারেক রহমানের অতীত
প্রথম আলোর মতো প্রতিপত্তিসম্পন্ন পত্রিকায় এই ঘটনা বিস্তারিত ভাবে প্রকাশিত হয়েছে, যা তারেক রহমানের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবাদ এবং দুর্নীতির চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। পলাতক তথ্যমন্ত্রী হাছান মাহমুদও প্রথম আলোতে বলেছিলেন, ‘তারেক রহমান মানে দুর্নীতিতে পরপর পাঁচবার চ্যাম্পিয়ন, হাওয়া ভবনের সবচেয়ে বড় চোর।’ দ্য ডেইলি স্টার এবং অন্যান্য পত্রিকায়ও হাওয়া ভবনকে ‘দুর্নীতির কেন্দ্র’ বলে বর্ণনা করা হয়েছে,।এই দুর্নীতির অভিযোগগুলোর প্রমাণ কতটা শক্তিশালী, তা নিয়ে বিতর্ক আছে। সমর্থকরা বলেন, এগুলো আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক প্রতিহিংসা, কিন্তু সমালোচকরা জোর দিয়ে বলেন যে, হাওয়া ভবনের ঘটনা সাক্ষীদের স্বীকারোক্তি এবং মামলার কাগজপত্র দ্বারা প্রমাণিত। উইকিপিডিয়াসহ বিভিন্ন অথেনটিক গণমাধ্যমে সূত্রে উল্লেখ আছে। প্রতিটি প্রতিবেদনে দেখা যায়, তারেক রহমানের নামের সঙ্গে ‘হাওয়া ভবন ও দুর্নীতি’ যুক্ত হয়ে থাকে, যা তার ইমেজের বিরুদ্ধে একটা স্থায়ী দাগ। এমনকি টাইম মেগাজিনের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনেও এই অতীতকে ‘বোঝা’ বলে উল্লেখ করা হয়েছে, যা তার ভবিষ্যৎ নেতৃত্বের পথে বাধা হতে পারে।
৩৬ জুলাই ও একটি স্বৈরশাসনের পতন
তবে শেখ হাসিনার ক্ষেত্রে টাইম ম্যাগাজিনের স্বীকৃতি এবং তার পরিণতি একটা শিক্ষণীয় উদাহরণ। তার নেতৃত্বকালে আওয়ামী লীগ সরকার অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং নারী নেতৃত্বের জন্য আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পায়, এবং টাইমের তালিকায় তার নামও এসেছিল। কিন্তু ২০২৪ সালের জুলাই মাসে ছাত্র-জনতার কোটা সংস্কার আন্দোলন শুরু হয়, যা ‘জুলাই বিপ্লব’ নামে পরিচিত।এই আন্দোলন কোটা সংস্কারের দাবি থেকে শুরু হয়ে সরকারবিরোধী গণঅভ্যুত্থানের আন্দোলনে রূপ নেয়। যা জুলাই মাসের ১৬ তারিখ থেকে ৫ আগস্ট পর্যন্ত ‘৩৬ জুলাই’ নামে ইতিহাসে অমর হয়ে যায়। তখন শেখ হাসিনা পদত্যাগ করে সামরিক হেলিকপ্টারে ছোট বোন শেখ রেহানাকে নিয়ে ভারতে পালিয়ে যান। এই পতনের পর তার ১৬ বছরের শাসনের অবসান ঘটে, এবং এই ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এমনকি তার অনুগতরা শত শত মানুষকে হত্যা করে। যা টাইমের প্রতিবেদনে এই স্বৈরশাসনের শেষকে ‘শিকল ছিঁড়ে যাওয়া’ বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
সময়ের কঠিন পরীক্ষায় তারেক রহমান
তারেক রহমানের ক্ষেত্রে টাইমের এই প্রশংসা এবং সমালোচনা একসঙ্গে এসেছে। প্রশংসা করা হয়েছে তার নির্বাসন থেকে ফেরা, নির্বাচন জয় এবং সংস্কারের প্রতিশ্রুতির জন্য—যেমন উচ্চ মুদ্রাস্ফীতি, বেকারত্ব দূরীকরণ এবং ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়ন। কিন্তু সমালোচনা করা হয়েছে অতীতের দুর্নীতি এবং ইসলামপন্থির উত্থানের ঝুঁকি নিয়ে।এখন প্রশ্ন হচ্ছে, এর পরিণতি কী হবে? শেখ হাসিনার মতো যদি অতীতের ছায়া তাকেও ঘিরে ধরে, তাহলে জনগণের আন্দোলন মুখে তাকেও পড়তে হতে পারে। কিন্তু তারেক রহমানের সমর্থকরা বিশ্বাস করেন, তিনি মায়ের শিক্ষায় দায়িত্বশীল নেতৃত্ব দেবেন এবং অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করবেন। বর্তমানে বাংলাদেশ উচ্চ মুদ্রাস্ফীতি এবং বেকারত্বের মুখোমুখি, এবং তারেক রহমানের সরকার এগুলোর সমাধান খুঁজছে। টাইমের তালিকা তার জন্য একটা সুযোগ, কিন্তু অতীতের হাওয়া ভবনের দাগ মুছে ফেলতে হবে স্বচ্ছতার মাধ্যমে।
তারেক রহমান সম্পর্কে টাইম মেগাজিনের বিশ্লেষণ
টাইমের নিউজের বিশ্লেষণে দেখা যায়, তারেক রহমানের উত্থান বাংলাদেশের রাজনীতির নতুন অধ্যায়ের সূচনা। কিন্তু দুর্নীতির অভিযোগগুলোকে অস্বীকার করে এগোতে হলে বিচারিক জবাবদিহিতা দিতে হবে। শেখ হাসিনার পরিণতি দেখিয়েছে, জনগণের অসন্তোষ সহ্য করা যায় না।তারেক রহমান যদি অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলা করতে পারেন এবং অতীতের ভুল স্বীকার করে সংস্কার করেন, তাহলে টাইমের প্রশংসা তার জন্য স্থায়ী হবে। অন্যথায়, জুলাই বিপ্লবের ছায়া তার উপরও পড়তে পারে বলে আশংকা করা হয়েছে। বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ এখন তার হাতে, এবং আন্তর্জাতিক দৃষ্টি এখন বাংলাদেশের দিকে।

