ক্যান্টনমেন্ট থেকে কারাগারে। যেভাবে দীর্ঘদিন প্রশাসনিক পাহারায় সুরক্ষা দেওয়া হয়েছে শিরীন শারমিনকে

Khomota
0
শিরীন শারমিন গ্রেফতার
গ্রেফতারের পর পুলিশ হেফাজতে সাবেক স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী
তিন বারের সাবেক স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরীর গ্রেফতার নিয়ে দেশজুড়ে বইছে আলোচনার ঝড়। ২০২৪ সালের ৫ই আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পলায়নের পর দীর্ঘ ১৮ মাস পরে আজ মঙ্গলবার ভোরে ধানমন্ডির একটি বাসা থেকে তাঁর গ্রেফতার হওয়ার ঘটনাটি মানুষের সামনে আসে। বিশেষ করে, গণঅভ্যুত্থানের পর যেখানে বাঘা বাঘা সব নেতা ধরা পড়ছিলেন, সেখানে এতদিন তাঁর 'নীরবে বসবাস' এবং হঠাৎ জনসমক্ষে আসাকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক মহলে চলছে তীব্র সমালোচনা।

এদিকে গ্রেফতারের পর মঙ্গলবার তাকে আদালতে তোলা হলে পুলিশ মাত্র দুই দিনের রিমান্ড আবেদন করেন। কিন্তু আদালত তার রিমান্ড নামঞ্জুর করে তাকে সরাসরি কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন। এই রিমান্ড নামঞ্জুরের ঘটনাটিও জনমনে সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। জুলাইয়ের নৃশংস হত্যাকাণ্ডের মতো স্পর্শকাতর মামলায় যেখানে সাধারণ কর্মীদেরও দফায় দফায় রিমান্ডে নেওয়া হচ্ছে, সেখানে নীতি-নির্ধারণী পর্যায়ের একজনকে কেন জিজ্ঞাসাবাদ ছাড়াই কারাগারে পাঠানো হলো, তা নিয়ে জনমনে তীব্র অসন্তোষ ও ক্ষোভ দেখা দিয়েছে।

সেনাবাহিনীর ভয়ে কি চুপ ছিলেন ড. ইউনুসের সরকার?

৫ই আগস্ট শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে হেলিকপ্টার যোগে ভারতে পালিয়ে যাওয়ার পর শিরীন শারমিন চৌধুরী কোথায় গিয়েছিলেন, তা নিয়ে দীর্ঘ সময় ধোঁয়াশা ছিল। তবে পরবর্তীতে ডিবির জিজ্ঞাসাবাদে সাবেক প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক যে জবানবন্দি দেন, তাতে থলের বিড়াল বেরিয়ে আসে। পলকের তথ্যমতে, ৫ই আগস্ট সকাল থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত শিরীন শারমিন চৌধুরী, ডেপুটি স্পিকার শামসুল হক টুকুসহ প্রায় ১২ জন নেতা সংসদ ভবনের একটি গোপন কক্ষে লুকিয়ে ছিলেন। এরপর রাত আড়াইটার দিকে সেনাবাহিনী তাদের উদ্ধার করে সেনানিবাসে নিয়ে যায়।

২০২৪ সালের ১৮ই আগস্ট আইএসপিআর এক বিবৃতিতে জানায় যে, "মানবিক দায়বদ্ধতার কারণে ও আইনবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড থেকে জীবন রক্ষা করতে" প্রায় ছয় শতাধিক ব্যক্তিকে সেনানিবাসে আশ্রয় দেওয়া হয়েছিল। এই তালিকায় যে শিরীন শারমিনের নাম ছিল, তা গত বছরের মে মাসে প্রকাশিত তালিকায় নিশ্চিত হওয়া যায়। প্রশ্ন হলো, একজন অভিযুক্ত ব্যক্তিকে কতদিন রাষ্ট্রীয় আশ্রয়ে রাখা যায়? আইএসপিআর বা অন্তর্বর্তী সরকার তাকে কেন পুলিশের হাতে সোপর্দ না করে দীর্ঘ সময় পর্দার আড়ালে থাকতে দিল? এই প্রশ্নটিই আজ সাধারণ জনগণকে ক্ষুব্ধ করে তুলেছে। তবে এটি কি ছিলো অন্তর্বর্তী সরকারের প্রশাসনিক ব্যর্থতা নাকি গুপ্ত কোনো সমঝোতা?

গণহত্যার দায় থেকে কি মুক্ত দেওয়া হলো শিরীন শারমিনকে?

চব্বিশের বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময় ঢাকাসহ সারাদেশে যে গণহত্যা চালানো হয়েছিল, তার দায় কি কোনোভাবেই তৎকালীন স্পিকার এড়াতে পারেন? পুলিশের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ঢাকা ও রংপুরে একাধিক হত্যা মামলায় শিরীন শারমিন চৌধুরীর নাম রয়েছে। বিশেষ করে ঢাকার লালবাগ থানায় হওয়া একটি হত্যা মামলায় তাকে গ্রেফতার দেখানো হয়েছে। এছাড়া রংপুরের মুসলিম উদ্দিন হত্যা মামলাটি ছিলো অত্যন্ত চাঞ্চল্যকর।

২০২৪ সালের ২৭শে আগস্ট মুসলিম উদ্দিনের স্ত্রী দিলরুবা আক্তার বাদী হয়ে যে মামলা করেন, তাতে শিরীন শারমিন চৌধুরী এবং সাবেক বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশিসহ ১৭ জনকে আসামি করা হয়েছে। এজাহারের বর্ণনা অনুযায়ী, ছাত্র আন্দোলনের সময় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী ও পুলিশের মারমুখী অবস্থানে পুলিশের গুলিতে মুসলিম উদ্দিনের মৃত্যু হয়। তৎকালীন স্পিকার হিসেবে শিরীন শারমিন চৌধুরী কি সংসদীয় বা নৈতিক কোনো ভূমিকা পালন করেছিলেন এই রক্তপাত থামাতে? উত্তরটি আজ সবারই জানা!

পলাতক অবস্থায় রাষ্ট্রপতির কাছে পদত্যাগপত্র জমা দেন শিরীন শারমিন

৫ই আগস্টের ২৭ দিন পর ২রা সেপ্টেম্বর তিনি রাষ্ট্রপতির কাছে পদত্যাগপত্র পাঠান। মজার বিষয় হলো, তিনি তখন পলাতক এবং সেনানিবাসে থাকা অবস্থায় এই পদত্যাগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেন। অথচ প্রকাশন তাদের হন্যে হয়ে খুঁজছেন। তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকারের কর্মকর্তারা বিষয়টি নিশ্চিত করলেও তাকে ধরার কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। অথচ একই সময়ে অন্যান্য নেতাদের বিমানবন্দর থেকে শুরু করে দেশের বিভিন্ন সীমান্ত এলাকা থেকে গ্রেফতার করা হচ্ছিল। ডিএমপি ডিবির প্রধান শফিকুল ইসলাম জানিয়েছেন যে, সেনানিবাস থেকে বের হওয়ার পর থেকে তিনি দেশেই ছিলেন এবং বিভিন্ন জায়গায় ‘আত্মগোপন’ করে ছিলেন।

অন্যদিকে তার কূটনৈতিক পাসপোর্ট বাতিল করা হলে ৩ অক্টোবর ২০২৪-এ সাধারণ ই-পাসপোর্টের জন্য তিনি আবেদন করেন। এমনকি আত্মগোপনে থাকাকালীন অবস্থায় বিশেষ ব্যবস্থাপনায় ১০ অক্টোবর তার বায়োমেট্রিক (আঙুলের ছাপ ও ছবি) নেওয়া হয়েছিল। তখন এটা নিয়ে দেশজুড়ে ক্ষোভ সৃষ্টি হলে চাপের মুখে তার পাসপোর্ট আবেদন বাতিল করা হয়। তবুও তিনি কিভাবে ১৮ মাস ধরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিয়ে ধানমন্ডির মতো এলাকায় থাকতে পারলেন? সাধারণ মানুষের ধারণা, এটি কোনো সাধারণ আত্মগোপন নয়, বরং এটি ছিল প্রশাসনের পক্ষ থেকে একটি ‘সেফ প্যাসেজ’।
জুলাই বিপ্লবের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নে দ্বিমুখী আচরণ: গভীর উদ্বেগ টিআইবির
আরও পড়ুন →

আওয়ামী রাজনীতিতে শিরীন শারমিনের উত্থান ও পতন

২০০৯ সালে সংরক্ষিত নারী আসনের মাধ্যমে রাজনীতিতে আসা শিরীন শারমিন চৌধুরীকে তৎকালীন ফ্যাসিস্ট প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অতি দ্রুত পদোন্নতি দিয়ে মহিলা ও শিশু বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী করেন। এরপর ২০১৩ সালে আব্দুল হামিদ রাষ্ট্রপতি হলে অনেকটা আকস্মিকভাবেই তাকে স্পিকার হিসেবে নির্বাচিত করা হয়। বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথম তিনিই ছিলেন কোন নারী স্পিকার। তাঁর এই যাত্রা যতটা জাঁকজমকপূর্ণ ছিল, তাঁর বিদায়টা ছিলো ততটাই কলঙ্কিত।

টানা তিন মেয়াদে তিনি স্পিকারের চেয়ারে বসে সংসদের যে তথাকথিত ‘গণতন্ত্র’ রক্ষা করেছেন, তার আসল রূপ উন্মোচিত হয়েছে চব্বিশের জুলাই মাসে। জনগণের ভোটে নির্বাচিত নয় এমন একটি সংসদের নেতৃত্ব দিয়ে তিনি মূলত শেখ হাসিনার একনায়কতন্ত্রকেই বৈধতা দিয়েছেন তা নয়, বরং শেখ হাসিনার সকল গুম-খুন বিচার বহির্ভূত হত্যাকান্ড, আয়নাঘরের মতো মানবতা বিরোধী সকল কর্মকান্ডের সহযোগী ছিলেন।

শিরীন শারমিনের বিচার নিয়ে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র সমাজ সহ দেশের জনগণ ও বিশেষজ্ঞদের সংশয়

বর্তমানে কারাগারে থাকা শিরীন শারমিন চৌধুরীকে পর্যায়ক্রমে অন্য মামলাগুলোতেও গ্রেফতার দেখানো হবে বলে জানিয়েছেন কর্মকর্তারা। কিন্তু বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে বিচার প্রক্রিয়া কতটা নিরপেক্ষ হবে তা নিয়ে জনমনে বেশ সন্দেহ রয়েছে। বৈষম্যবিরোধী ছাত্ররা মনে করছেন, আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী এই নেতাদের গ্রেফতারের ক্ষেত্রে প্রশাসনের মধ্যে এক ধরনের ‘গড়িমসি’ কাজ করছে।

আদালতে তাঁর রিমান্ড নামঞ্জুর হওয়া এবং দীর্ঘ সময় পর ‘সুবিধাজনক সময়ে’ গ্রেফতার হওয়ার বিষয়টি ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, রাজনৈতিক সমঝোতার ডালপালা অনেক গভীরে। মুসলিম উদ্দিনের মতো শত শত শ্রমজীবী মানুষ ও ছাত্র যারা জুলাইয়ের আন্দোলনে প্রাণ হারিয়েছেন, তাদের পরিবারের কাছে এই গ্রেফতার আদৌ কি স্বস্তির হবে? নাকি এটি কেবল জনরোষ কমানোর একটি রাজনৈতিক কৌশল সেটিই দেখার অপেক্ষায় দেশের জনগণ।
বিএনপির পতন কি আসন্ন? বিএনপি কি পারবে ক্ষমতার পূর্ণ মেয়াদ শেষ করতে?
আরও পড়ুন →
Tags

Post a Comment

0 Comments

Post a Comment (0)

#buttons=(Ok, Go it!) #days=(20)

Our website uses cookies to enhance your experience. Check Now
Ok, Go it!