আইন ও রাজনৈতিক প্রতিহিংসার একাল-সেকাল
এই জামিনের খবরটি সামনে আসার পর জনমনে যে প্রশ্নটি সবচেয়ে বেশি আলোচিত হচ্ছে তা হলো—আইন কি তবে টাকা আর প্রভাবশালীদের জন্য? যেখানে তিন বারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার মামলার দিকে তাকালে এই বৈষম্য দিনের আলোর মতো পরিষ্কার হয়ে যায়। বেগম খালেদা জিয়াকে মাত্র দুই কোটি টাকার একটি সাজানো অভিযোগে বছরের পর বছর কারাবন্দী করে রাখা হয়েছিল।তার শারীরিক অবস্থা অত্যন্ত সংকটাপন্ন হওয়া সত্ত্বেও তাকে উন্নত চিকিৎসার সুযোগ দেওয়া হয়নি, এমনকি জামিনের জন্য মাসের পর মাস উচ্চ আদালতের দ্বারে দ্বারে ঘুরতে হয়েছে। অথচ জুলাই আন্দোলনের হত্যা মামলার মতো গুরুতর অপরাধে অভিযুক্ত শিরীন শারমিন চৌধুরীকে গ্রেফতারের মাত্র পাঁচ দিনের মাথায় জামিন দেওয়া হলো। এই তুলনামূলক চিত্রটি প্রমাণ করে যে, দেশের বিচার বিভাগ এখনো প্রভাবশালী ও রাজনৈতিক আশীর্বাদপুষ্টদের জন্য কতটা নমনীয়।
জুলাই গণহত্যায় শিরীন শারমিনের ভূমিকা কি ছিলো?
২০২৪ সালের জুলাই মাসে ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা সরকারের নির্দেশে ছাত্র-জনতার ওপর যখন নির্বিচারে গুলি চালানোর নির্দেশ আসছিলো, তখন শিরীন শারমিন চৌধুরী ছিলেন সেই জাতীয় সংসদের অভিভাবক। তিনি সেই সংসদের স্পিকার ছিলেন, যে সংসদটি জনগণের ভোট ছাড়াই গঠিত হয়েছিল এবং যেখান থেকে প্রতিটি দমনমূলক আইন ও সিদ্ধান্ত পাস করা হয়েছিল।শিরীন শারমিন কেবল একজন নীরব দর্শক ছিলেন না, বরং তিনি ছিলেন শেখ হাসিনার শাসনযন্ত্রের অন্যতম প্রধান সহযোগী। যে আন্দোলনে হাজারো তরুণ প্রাণ বিসর্জন দিয়েছে, সেই আন্দোলনের সময় তার ভূমিকা ছিল ফ্যাসিবাদকে সুরক্ষা দেওয়া। আজ যখন সেই জুলাই হত্যাকাণ্ডের মামলাগুলোতে তাকে আসামি করা হয়েছে, তখন "অসুস্থতার" দোহাই দিয়ে তাকে জামিন দেওয়া মূলত সেই শহীদদের রক্তের সাথে বেইমানি করার শামিল বলে জনগণ মনে করছেন।
জামিনের স্বচ্ছতা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন
৫০ হাজার টাকা মুচলেকায় জুলাই গণহত্যার মতো একজন খুনের মামলার আসামিকে জামিন দেওয়া আইনি অঙ্গনে এক নজিরবিহীন উপহাস। রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীরা জোরালোভাবে জামিনের বিরোধিতা করে বলেছিলেন যে, মামলার তদন্তাধীন অবস্থায় শিরিন শারমিন মুক্ত থাকলে তথ্য-প্রমাণ নষ্ট হওয়ার এবং তদন্তে ব্যাঘাত ঘটার প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে।তবুও ঢাকার অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট যেভাবে তড়িঘড়ি করে এই সিদ্ধান্ত নিলেন, তা বিচার বিভাগের স্বাধীনতার ওপর জনমনে এক বিশাল প্রশ্নচিহ্ন রয়ে গেলো। মাত্র ৫ দিনের মাথায় এমন মুক্তি প্রমাণ করে যে, পর্দার আড়ালে কোনো এক রহস্যময় শক্তি এখনো কাজ করছে, যা ফ্যাসিস্টদের সুরক্ষা দিতে তৎপর রয়েছে।
ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার ফেরার পথ কি সুগম হলো?
শিরীন শারমিনের এই জামিনে অনেকেই মনে করছেন, তাহলে কি শেখ হাসিনা ও তার দোসরদের আইনি সুরক্ষা দেওয়ার একটি পরীক্ষামূলক প্রক্রিয়া ছিলো? যদি শিরীন শারমিনের মতো উচ্চপদস্থ সহযোগী এত সহজে বেরিয়ে আসতে পারেন, তবে এটি ভবিষ্যতে শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে হওয়া মামলাগুলোর ওপরও প্রভাব ফেলবে। এটি অত্যান্ত বিপজ্জনক বার্তা দিচ্ছে যে, যারা জুলাই মাসে গণহত্যা চালিয়েছিল বা যারা সেই গণহত্যার বৈধতা দিয়েছিল, তারা বর্তমান ব্যবস্থার ভেতর থেকেও পার পেয়ে যাচ্ছে। মূলত এই ধরনের নমনীয়তা স্বৈরাচারী শক্তিকে পুনরায় সংগঠিত হওয়ার সুযোগ করে দিচ্ছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।বাংলাদেশের বিচার ব্যবস্থা কি জনগণের বিশ্বাসকে গলা টিপে হত্যা করলো?
বিপ্লবোত্তর বাংলাদেশে মানুষ আশা করেছিল একটি বৈষম্যহীন বিচার ব্যবস্থা তৈরি হবে। কিন্তু বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ উল্টো গেলো। যদি শিরীন শারমিন এর মতো গণহত্যার সহযোগীরা অসুস্থতার দোহাই দিয়ে জামিন পেয়ে যায়, তবে কেন বেগম খালেদা জিয়াকে মুমূর্ষু অবস্থায় বছরের পর বছর ধরে বন্দী রাখা হয়েছিল? কেন গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যার স্বীকার পরিবার গুলো ন্যায় বিচার পেতে বছরের পর বছর আদালতের বারান্দায় জুতো ক্ষয় করেছে?এই প্রশ্নগুলোর উত্তর না পাওয়া পর্যন্ত বিচার বিভাগের ওপর জনগণের আস্থা ফিরে আসা অসম্ভব। বিচারকদের মনে রাখা উচিত যে, তারা কোনো ব্যক্তির অনুগত নন, তারা আইন ও জনগণের সেবক। ৫ দিনের মাথায় এই জামিন আদেশ কেবল একজন ব্যক্তিকে মুক্তি দেয়নি, বরং এটি বিচারালয়ের প্রতি সাধারণ মানুষের বিশ্বাসকে হত্যা করেছে।
সাধারণ জনগণ ও বিশেষজ্ঞদের মতামত
সাধারণ জনগণ ও বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, শিরীন শারমিন চৌধুরীর এই মুক্তি কেবল একটি জামিন নয়, এটি একটি রাজনৈতিক বার্তা। এটি প্রমাণ করে যে, বাংলাদেশে এখনো "আইনের শাসন" অপেক্ষা "ব্যক্তির শাসন" শক্তিশালী। যদি অতি দ্রুত এই দ্বিমুখী নীতি বন্ধ করা না হয় এবং অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনা না হয়,তবে জুলাই বিপ্লবের চেতনা ধূলিসাৎ হয়ে যাবে। জুলাই গণহত্যায় শহীদী পরিবার ও শহীদদের আত্মা কখনো শান্তি পাবে না যদি তাদের খুনিরা আইনের ফাঁকফোকর দিয়ে এভাবে বেরিয়ে যাওয়ার সুযোগ পায়। এখন সময় এসেছে বিচার ব্যবস্থার গভীরে লুকিয়ে থাকা ফ্যাসিবাদের সেই শেকড় উপড়ে ফেলার এবং সবার জন্য সমান বিচার নিশ্চিত করার।

