আর্টেমিস ৩: গ্রহ-নক্ষত্র জয়ের এক সাহসী মিশন

Khomota
0
Artemis III Mission
আর্টেমিস ৩ মিশনের কাল্পনিক চিত্র
আর্টেমিস ৩ এই মিশনে মানুষ সরাসরি চাঁদের মাটিতে অবতরণ করবেনা। তবুও এই মিশনটি কেন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চলুন একনজরে দেখে নেওয়া যাক। ​কল্পনা করুন, আপনি জীবনে প্রথমবার একটি গাড়ি চালানো শিখবেন। প্রথম দিনই কি আপনি ব্যস্ত হাইওয়েতে গাড়ি নিয়ে নেমে পড়বেন? নিশ্চয়ই না। তার আগে আপনি নিশ্চয়ই কোনো ফাঁকা মাঠে বারবার অনুশীলন করবেন। যেমন ক্লাচ ছাড়া, গিয়ার পরিবর্তন করা, ঠিক সময়ে ব্রেক ধরা, স্টিয়ারিং হুইল কন্ট্রোল করা সহ সকল ইনস্ট্রুমেন্টের ব্যবহার করা করার জ্ঞান অর্জন করবেন। যতক্ষণ না আপনার হাত পরিপক্ক হচ্ছে, ততক্ষণ আপনি বড় রাস্তায় নামার ঝুঁকি নেবেন না। আর্টেমিস ৩ মিশনটি ঠিক সেই রকমই একটি ‘প্র্যাকটিস সেশন’।

মানবজাতি আবারও চাঁদে যাওয়ার স্বপ্ন দেখছে, কিন্তু সেই স্বপ্ন পূরণের আগে পৃথিবীর কক্ষপথেই সবকিছু একবার ঠিকঠাক আছে কি না, তা দেখে নেওয়া প্রয়োজন। তাই এটি সরাসরি চাঁদে যাওয়ার মিশন নয়, বরং চাঁদে যাওয়ার পথে আমাদের সক্ষমতা যাচাই করার একটি বড় পরীক্ষা। ২০২৭ সালের মাঝামাঝি সময়ে এই মিশনটি শুরু হওয়ার কথা রয়েছে। এই মিশনে নভোচারীরা যখন পৃথিবীর কক্ষপথে যাবেন, তখন তাদের মূল লক্ষ্য থাকবে মহাকাশের কঠিন কৌশলগুলোকে নিখুঁতভাবে সম্পাদনা করা।

আর্টেমিস ৩ মিশনে যে ৩টি মহাকাশে অংশ নিবে

২০২৭ লুইজিয়ানার কেনেডি স্পেস সেন্টার থেকে 'স্পেস লঞ্চ সিস্টেম' বা SLS রকেটের মাথায় চড়ে নভোচারীরা থাকবেন ‘ওরিয়ন’ (Orion) নামক একটি অত্যাধুনিক মহাকাশযানে। এই ওরিয়নই হবে মহাকাশে তাদের ঘরবাড়ি। ​কিন্তু এই মিশনে ওরিয়ন একা যাচ্ছে না। পৃথিবীর কক্ষপথে আগে থেকেই অপেক্ষা করবে আরও দুটি বড় অংশীদার—স্পেস-এক্স (SpaceX)-এর ‘স্টারশিপ এইচএলএস’ (Starship HLS) এবং ব্লু অরিজিন (Blue Origin)-এর ‘ব্লু মুন মার্ক ২’ (Blue Moon Mark 2)।

এই তিনটি আকাশযান পৃথিবীর চারদিকে প্রচণ্ড গতিতে ঘুরতে থাকবে, আর তখনই শুরু হবে মহাকাশ বিজ্ঞানের সবচেয়ে জটিল এক খেলা। আর্টেমিস ৩-এর মূল লক্ষ্য হলো এই বিশাল যানগুলোর মধ্যে ডকিং বা সরাসরি সংযোগ স্থাপন করা। পৃথিবীর মাধ্যাকর্ষণ শক্তি কাটিয়ে এই মহামিলনের সফলতা হবে পরবর্তী চন্দ্রাভিযানের মূল চাবিকাঠি।

ডকিং কি? ডকিং কিভাবে করা হয়?

আপনার মনে হতে পারে, মহাকাশে দুটি যান একে অপরের সঙ্গে যুক্ত হওয়া বা ‘ডকিং’ করা হয়তো খুব সহজ। কিন্তু বাস্তবে এটি পৃথিবীর সবচেয়ে কঠিন কাজগুলোর একটি। মহাকাশে কোনো স্থির মাটি নেই, কোনো হাতল নেই, আবার ব্রেক কষার জন্য কোনো ঘর্ষণ নেই। দুটি মহাকাশযান যখন ঘণ্টায় হাজার হাজার মাইল বেগে পৃথিবীর চারদিকে ঘুরছে, তখন তাদের একে অপরের সঙ্গে এক মিলিমিটারের নিখুঁত মাপে এসে জুড়ে যেতে হয়। একে বলা হয় মহাকাশীয় ডকিং।

আর্টেমিস ৩ মিশনে এই ডকিং প্রক্রিয়াটিই সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। ওরিয়ন মহাকাশযানটি স্টারশিপ এবং ব্লু মুনের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার মহড়া দেবে। যদি এই ডকিং প্রক্রিয়া পৃথিবীর কক্ষপথে নিরাপদে সফল না হয়, তবে চাঁদের কক্ষপথে গিয়ে এটি করা হবে আত্মহত্যার শামিল। কারণ, চাঁদের কক্ষপথে কোনো যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দিলে সেখান থেকে ফিরে আসা বা সাহায্য পাঠানো প্রায় অসম্ভব। তাই পৃথিবীর আকাশকেই বেছে নেওয়া হয়েছে এই ‘ড্রাই রান’ বা মহড়ার জন্য। এটি অনেকটা মাঝ আকাশে দুটি উড়োজাহাজের মধ্যে রিফুয়েলিং করার মতো—একটু এদিক সেদিক হলেই বড় বিপর্যয়।

মহাকাশের গবেষণার সবচেয়ে আরামদায়ক স্যুট: এক্স-ই-এম-ইউ (AxEMU)

মহাকাশে শুধু আকাশযান ভালো হলেই হয় না, নভোচারীদের সুরক্ষার জন্য চাই বিশেষ পোশাক। আর্টেমিস ৩ মিশনে নভোচারীরা যে স্পেস স্যুট পরে পরীক্ষা চালাবেন, তার নাম দেওয়া হয়েছে ‘AxEMU’। এটি তৈরি করছে বিশ্বখ্যাত কোম্পানি অ্যাক্সিওম স্পেস (Axiom Space)। ​আগের জমানার স্পেস স্যুট পরে হাঁটাচলা করা ছিল খুবই কষ্টকর। কিন্তু এই নতুন AxEMU স্যুটগুলো অনেক বেশি নমনীয় এবং আরামদায়ক।

নভোচারীরা এটি পরে খুব সহজেই হাত-পা নাড়াতে পারবেন, নিচু হতে পারবেন বা চাঁদের মাটি থেকে পাথর সংগ্রহ করতে পারবেন। এই মিশনে পৃথিবীর কক্ষপথেই পরিক্ষা করা হবে এই স্যুটগুলো নভোচারীদের অক্সিজেন সরবরাহ, তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ এবং যোগাযোগ ব্যবস্থায় কতটা কার্যকর। যদি এই স্যুটে কোনো অস্বস্তি থাকে বা যান্ত্রিক ত্রুটি ধরা পড়ে, তবে তা চাঁদের প্রতিকূল পরিবেশে নভোচারীর জীবনের জন্য হুমকি হতে পারে। তাই এই নতুন প্রজন্মের স্যুট গুলো পরীক্ষা করা আর্টেমিস ৩-এর অন্যতম বড় লক্ষ্য।

মহাকাশ জয়ের লড়াই : ইলন মাস্কের ‘স্পেস-এক্স’ vs জেফ বেজোসের ‘ব্লু অরিজিন’

আর্টেমিস ৩ মিশনটি কেবল বিজ্ঞানের জন্য নয়, এটি একটি বড় প্রতিযোগিতারও মঞ্চও বটে। এখানে বিশ্বের দুই শীর্ষ ধনী ইলন মাস্কের ‘স্পেস-এক্স’ এবং জেফ বেজোসের ‘ব্লু অরিজিন’ কার্যত একে অপরের মুখোমুখি হবে। নাসা এই দুই কোম্পানিকেই তাদের চন্দ্রযান বা ল্যান্ডার তৈরির দায়িত্ব দিয়েছে। আর্টেমিস ৩-এর এই মহড়ায় এই দুই কোম্পানির ল্যান্ডারই অংশ নেবে। এটি অনেকটা ফুটবল দলের সিলেকশন ট্রায়ালের মতো।

যে কোম্পানির ল্যান্ডার ডকিং পরীক্ষায় ভালো করবে, যাদের জীবন রক্ষাকারী সিস্টেম বা লাইফ সাপোর্ট বেশি নির্ভরযোগ্য প্রমাণ হবে এবং যারা নাসার কঠিন মানদণ্ডে উত্তীর্ণ হবে, তারাই পরের মিশনে চাঁদের মাটিতে মানুষ অবতরণের মূল চুক্তিটি পাবে। এই সুস্থ প্রতিযোগিতা মহাকাশ গবেষণার গতিকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। দুই কোম্পানির ইঞ্জিনিয়াররা দিনরাত এক করে কাজ করছেন যাতে তাদের তৈরি প্রযুক্তিই শ্রেষ্ঠ প্রমাণিত হয়। শেষ পর্যন্ত কার জয় হবে, তা নির্ধারণ করবে আর্টেমিস ৩-এর পারফরম্যান্স।

আর্টেমিস ২ মিশন থেকে যে শিক্ষা অর্জন করলো নাসা

​বিজ্ঞান মানেই হলো ভুল থেকে শেখা। আর্টেমিস ২ মিশনে বেশ কিছু যান্ত্রিক ত্রুটি ধরা পড়েছিল যা নাসার বিজ্ঞানীদের চিন্তায় ফেলে দিয়েছিল। বিশেষ করে ওরিয়ন মহাকাশযানের প্রপালশন সিস্টেমে হিলিয়াম গ্যাসের সামান্য লিক এবং নভোচারীদের টয়লেট বা বর্জ্য ব্যবস্থাপনা সিস্টেমে কিছু ত্রুটি দেখা গিয়েছিল। ​সাধারণ মানুষের কাছে টয়লেটের সমস্যা ছোট মনে হতে পারে, কিন্তু মহাকাশে শূন্য মাধ্যাকর্ষণে এটি একটি বিভীষিকাময় পরিস্থিতি।

আর হিলিয়াম লিক মানে হলো ইঞ্জিনের নিয়ন্ত্রণ হারানোর ভয়। আর্টেমিস ৩-এর একটি বড় উদ্দেশ্য হলো এই সমস্যাগুলো স্থায়ীভাবে সমাধান করা হয়েছে কি না তা নিশ্চিত হওয়া। কেননা চাঁদের পথে রওনা হওয়ার আগে প্রতিটি স্ক্রু, প্রতিটি পাইপ আর প্রতিটি তার যেন নিখুঁত থাকে, তা নিশ্চিত করাই হলো এই মিশনের সার্থকতা। কারণ মহাকাশে ‘সরি’ বলার কোনো সুযোগ থাকেনা।

আর্টেমিস মিশনের প্ল্যান বি

যেকোনো মহাকাশ অভিযানে একটা ‘প্ল্যান বি’ বা বিকল্প পরিকল্পনা থাকে। তেমনিভাবে আর্টেমিস ৩ মিশনে যদি কোনো কারণে একটি কোম্পানির চন্দ্রযানের সঙ্গে ডকিং ব্যর্থ হয়, তবে অন্য কোম্পানির চন্দ্রযানটি বিকল্প হিসেবে তৈরি থাকবে। কেননা নাসা এখানে সামান্য পরিমাণও ঝুঁকি নিতে চায় না।

এই মিশনে প্রাপ্ত তথ্যগুলো বিশ্লেষণ করে ঠিক করা হবে যে, পরবর্তী মূল মিশনে কোন ল্যান্ডারটি ব্যবহার করা সবচেয়ে নিরাপদ হবে। যদি ডকিংয়ে বড় কোনো সমস্যা ধরা পড়ে, তবে নাসা মিশন পিছিয়ে দিয়ে পুনরায় নকশা নিয়ে ভাববে। আর্টেমিস ৩ হলো সেই নিরাপত্তা দেওয়াল, যা নিশ্চিত করবে যে যখন মানুষ এবার সত্যিই চাঁদে নামবে।

কেন আর্টেমিস ৩ মিশন এতোটা গুরুত্বপূর্ণ?

সবশেষে বলা যায়, আর্টেমিস ৩ হলো মানবজাতির এক মহাকাব্যিক মহড়া। আমরা যখন চাঁদের দক্ষিণ মেরুতে বরফের সন্ধান করতে বা সেখানে স্থায়ী বসতি গড়তে চাইছি, তখন এই মিশনটিই হবে আমাদের ভিত্তিপস্তর। পৃথিবীর আকাশে এই অনুশীলন সফল হওয়া মানেই হলো মহাকাশ গবেষণার এক নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হওয়া।

আর্টেমিস ৩-এর প্রতিটি পরীক্ষা, প্রতিটি ডকিং আর প্রতিটি ছোটখাটো সকল অনুশীলন আমাদের আত্মবিশ্বাস জোগাবে। ২০২৭ সালের সেই দিনটি যখন সফলভাবে এই মিশনটি শেষ হবে, তখন আমরা বুক ফুলিয়ে বলতে পারব—আমরা প্রস্তুত। আমরা আবার ফিরছি চাঁদে, আর এবার যাচ্ছি স্থায়ীভাবে বসবাস গড়তে। পৃথিবীর কক্ষপথের এই অনুশীলন শেষ হলেই খুলে যাবে রূপালি চাঁদের রহস্যময় জগতের মেইন দরজা। মানবসভ্যতার ইতিহাসে আর্টেমিস ৩ কোনো সাধারণ মহড়া নয়, এটি হলো গ্রহ নক্ষত্র জয়ের পথে আমাদের সবচেয়ে সাহসী পদক্ষেপ।
মানুষ কেন কোন শক্তিশালী ও উন্নত দেশের অংশ হতে চায় না?
আরও পড়ুন →
Tags

Post a Comment

0 Comments

Post a Comment (0)

#buttons=(Ok, Go it!) #days=(20)

Our website uses cookies to enhance your experience. Check Now
Ok, Go it!