আপাতদৃষ্টিতে এই চিন্তাটি আকর্ষণীয় মনে হলেও, এর গভীরে লুকিয়ে আছে এক ভয়াবহ বাস্তবতা, শোষণের ইতিহাস এবং মানুষের আত্মপরিচয়ের চরম সংকট। মানুষ জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সমুদ্র পাড়ি দিয়ে ইউরোপে যায়, কিন্তু সেই ইউরোপ যখন দেশ দখল করতে আসে তখন কেন যুদ্ধ করে— এই বিপরীতমুখী আচরণের পেছনে রয়েছে মনস্তাত্ত্বিক, রাজনৈতিক এবং ঐতিহাসিক গভীর কারণ।
অধিবাসন আর দখলদারিত্বের অর্থ কি?
প্রথমেই বুঝতে হবে অভিবাসন (Migration) এবং দখলদারিত্বের (Occupation) মধ্যে আকাশ-পাতাল পার্থক্য। মানুষ যখন নিজের দেশ ছেড়ে আমেরিকা বা ইউরোপে যায়, সে যায় একজন 'আবেদনকারী' হিসেবে। সে সেই দেশের সংবিধান, আইন এবং সংস্কৃতিকে শ্রদ্ধা করার অঙ্গীকার নিয়ে। সেখানে সে নিজের যোগ্যতায় কাজ করে এবং বিনিময়ে একটি নিরাপদ জীবন পায়।কিন্তু যখন একটি শক্তিশালী দেশ কোনো ছোট দেশকে দখল করে, তখন সেই সমীকরণটি মূহুর্তের মধ্যে বদলে যায়। দখলদার দেশ কখনোই দখলকৃত দেশের মানুষকে 'নাগরিক' হিসেবে গ্রহণ করে না, বরং তাদের 'প্রজা' বা 'চাকর-বাকর ' হিসেবে গণ্য করে। ইতিহাস সাক্ষী দেয়, কোনো দখলদার শক্তিই স্থানীয় মানুষকে সমান অধিকার দেয়নি।
বৃটিশদের ২০০ বছরের শাসনে কি উন্নত জীবন দিতে পেরেছে?
ব্রিটিশরা যখন প্রায় ২০০ বছর ভারত উপমহাদেশ শাসন করেছিল, তারা কি আমাদের লন্ডনের নাগরিকত্ব দিয়েছিল? না, দেয়নি। বরং তারা আমাদের সম্পদ লুটপাট করে নিয়ে তাদের লন্ডনের রাস্তাঘাট, দালানকোঠা চকচকে করেছিল। তারা আমাদের নীল চাষ করতে বাধ্য করেছিল, আমাদের কৃষকদের ওপর অবর্ণনীয় অত্যাচার চালিয়েছিল।অর্থাৎ, আপনি যখন নিজে যান, তখন আপনি একজন অধিবাসন প্রত্যাসী; তাদের মেহমান। আর যখন তারা আসে, তখন তারা একজন শোষক। মানুষের লড়াই কেবল অর্থের জন্য নয়, মানুষের লড়াই হলো তার 'অস্তিত্ব' ও 'পরিচয়ের' জন্য। প্রতিটি জাতির একটি নিজস্ব ভাষা থাকে, হাজার বছরের সংস্কৃতি থাকে এবং একটি নির্দিষ্ট জীবনদর্শন থাকে। যখন কোনো বিদেশি শক্তি একটি দেশকে গিলে ফেলতে চাই গিলে ফেলে, তারা প্রথমেই আঘাত করে সেই জাতির মূল কেন্দ্রে।
তারা চায় তাদের ভাষা এবং সংস্কৃতি চাপিয়ে দিতে। ধরুন, চীন যদি কোনো দেশ দখল করে, তবে তারা চাইবে সবাই ম্যান্ডারিন ভাষায় কথা বলুক, তাদের মতো করে চিন্তা করুক। কিন্তু একজন মানুষ তার মায়ের ভাষা বা তার পূর্বপুরুষের ধর্ম ও ঐতিহ্য কি কেবল একটি উন্নত পাসপোর্টের বিনিময়ে বিসর্জন দিতে পারে? কখনোই না। মানুষের ভেতরে যে জাতীয়তাবাদ কাজ করে, তা কেবল রাজনীতির বিষয় নয়; এটি একটি আবেগীয় বন্ধন। নিজের মা এবং মাটির প্রতি যে টান, তা কোনো দামী কারেন্সি বা শক্তিশালী পাসপোর্ট দিয়ে কেনা সম্ভব নয়।
এই কারণেই মানুষ পরাধীন হয়ে সোনার খাঁচায় থাকার চেয়ে স্বাধীনভাবে মাটিতে ঘুমানোকেও শ্রেষ্ঠ মনে করে।
শক্তিশালী দেশের সাথে একীভূত হওয়ার পরিণতি
পৃথিবীর ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, যারা এক সময় ভেবেছিল শক্তিশালী দেশের সঙ্গে একীভূত হয়ে তারা লাভবান হবে, তাদের কপালে শেষ পর্যন্ত কি জুটেছে চলুন এবার দেখি। ১৯৩৮ সালে নাৎসি জার্মানি যখন অস্ট্রিয়া দখল করে, তখন অনেকেই ভেবেছিল হিটলারের জার্মান সাম্রাজ্যের অংশ হয়ে তারা বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী জাতিতে পরিণত হয়েছে। কিন্তু ফলাফল কী হয়েছিল? নাৎসি সরকার অস্ট্রিয়ার যুবকদের ধরে জোর করে জার্মানির হয়ে যুদ্ধ করতে পাঠানো হতো এবং এবং তারা জীবন হারাতো।আবার তিব্বতের দিকে তাকালে দেখা যায়, চীন সেখানে অনেক রাস্তাঘাট ও দালানকোঠা বানিয়েছে, কিন্তু তিব্বতিরা কি আজ সুখে আছে? তাদের ধর্মীয় গুরু দলাই লামা নির্বাসিত, তাদের সংস্কৃতি ধ্বংসপ্রায় এবং তারা নিজ ভূমিতেই আজ সংখ্যালঘুতে পরিণত হয়েছে। যখন একটি কোন দেশকে দখল হয়, তখন সেই দেশের মানুষের আর কোনো কণ্ঠস্বর থাকে না। এমনকি আন্তর্জাতিক কোনো ফোরামেও আপনি গিয়ে আপনার সমস্যার কথা বলতে পারবেন না, কারণ আপনার তখন কোনো নিজস্ব পরিচয় নেই। আপনি কেবল একটি বিশাল সাম্রাজ্যের ক্ষুদ্র এবং অবহেলিত অংশ মাত্র।
দখলদার বাহিনীর শোষণ ও লুটপাটের ভয়াবহতা যেমন হয়
দখলদারদের অর্থনৈতিক শোষণের বিষয়টি আরও ভয়াবহ। শক্তিশালী দেশগুলো কেন অন্য দেশকে দখল করতে চায়? তারা কি দয়া করতে আসে? অবশ্যই না। তারা আসে ওই দেশের প্রাকৃতিক সম্পদ, খনিজ সম্পদ, এবং সস্তা শ্রম বাজার দখল করতে। কোনো সাম্রাজ্যবাদী শক্তিই অন্য দেশের মানুষের উন্নয়নের জন্য সেখানে সেনা পাঠায় না। তারা আসে যাতে স্থানীয় কাঁচামাল লুটপাট করে নিয়ে নিজেদের শিল্পকারখানা চালু রাখা যায়। ফলে দখলকৃত দেশের সাধারণ মানুষ অর্থনৈতিকভাবে পঙ্গু হয়ে যায়।মানুষ যখন নিজের স্বাধীন দেশে থাকে, তখন তার দেশের বাজেট তার প্রয়োজনে খরচ হয়। কিন্তু পরাধীন দেশের বাজেট তৈরি হয় দখলদার শক্তির শক্তি বৃদ্ধির কাজে। যেখানে স্থানীয় মানুষের প্রয়োজন নয়, বরং দখলদারের লাভই মুখ্য হয়ে দাঁড়ায়। এই বঞ্চনা যখন চরমে পৌঁছায়, তখন সাধারণ মানুষ বুঝতে পারে যে উন্নত জীবনের যে রঙিন স্বপ্ন দেখানো হয়েছিল, তা ছিল আসলে এক মরীচিকা।
স্বাধীনতা কেবল আজাদী নয় এটা মর্যাদার লড়াই
মানবিক মর্যাদা বা Dignity হলো যুদ্ধের সবচেয়ে বড় চালিকাশক্তি। আপনি যদি ইতালিতে একজন বৈধ অভিবাসী হিসেবে থাকেন, তবে সেখানকার আইন আপনাকে সুরক্ষা দেবে। কিন্তু সেই ইতালি যদি আপনার দেশ দখল করে নেয়, তবে তাদের সৈন্যরা যে কোন সময় আপনার বাড়িতে ঢুকে আপনার উপর নির্যাতন করবে, কারণ আপনি তখন তাদের কাছে পরাজিত পক্ষের লোক। আর পরাজিত জাতির কোনো সম্মান থাকে না।যুদ্ধের সময় মা-বোনের ইজ্জত হারানো, ঘরবাড়ি ধ্বংস হওয়া এবং প্রতিনিয়ত আতঙ্কে বেঁচে থাকা—কোনো পাসপোর্ট কি এই যন্ত্রণার ক্ষতিপূরণ হতে পারে? মানুষ যখন যুদ্ধ করে, সে কেবল একটি ভূখণ্ডের জন্য যুদ্ধ করে না; সে যুদ্ধ করে তার ব্যক্তিগত নিরাপত্তা, তার পরিবারের সম্মান এবং তার উত্তরসূরিদের একটি স্বাধীন ভবিষ্যৎ উপহার দেওয়ার জন্য। মানুষের কাছে স্বাধীনতা মানে কেবল একটি পতাকা নয়, স্বাধীনতা মানে হলো নিজের ভাগ্য নিজে গড়ার অধিকার।
মানুষ কেন অন্য দেশের অংশ হতে চায়না?
মানুষ কেন অন্য দেশের অংশ হতে চায় না, তার উত্তর লুকিয়ে আছে মানুষের জন্মগত স্বাধীনতার তৃষ্ণায়। ইউরোপ বা আমেরিকা আমাদের কাছে স্বপ্নের দেশ হতে পারে কারণ সেখানে 'আইনের শাসন' এবং 'সুযোগের সমতা' আছে। কিন্তু সেই একই দেশ যখন দখলদার হয়ে আসে, তখন তারা আর আইনের শাসন নিয়ে আসে না, তারা নিয়ে আসে 'বন্দুকের শাসন'। আর মানুষ অন্যের অধীনে দাসে পরিণত হয়ে বিলাসিতায় থাকতে চায় না, বরং নিজ দেশের মাটিতে বুক ফুলিয়ে মাথা উঁচু করে বাঁচতে চায়।ইতিহাস বারবার প্রমাণ করেছে, যে জাতি তার স্বাধীনতা রক্ষা করতে জানে না, তার জন্য কোনো উন্নত পাসপোর্ট বা সম্পদ সম্মান বয়ে আনতে পারে না। তাই হাজার বছর ধরে মানুষ তার মাটির টানে, ভাষার টানে এবং সম্মানের টানে শক্তিশালী শক্তির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছে এবং ভবিষ্যতেও দাঁড়াবে। স্বাধীনতা কেবল একটি শব্দ নয়, এটি একটি জাতির আত্মা; আর আত্মা ছাড়া শরীর যতই সুসজ্জিত হোক না কেন, তা আসলে মৃত।

