আগাম বন্যা ও কালবৈশাখীর তাণ্ডবে লণ্ডভণ্ড কৃষকের স্বপ্ন: দেশজুড়ে খাদ্য সংকটের শঙ্কা

ভারত থেকে আসা পাহাড়ি ঢল ও প্রবল কালবৈশাখীতে দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বোরো ধানের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি। সুনামগঞ্জ, কিশোরগঞ্জসহ বিভিন্ন জেলায় তলিয়ে গেছে ফসলি
কালবৈশাখীর তাণ্ডবে লণ্ডভণ্ড কৃষকের স্বপ্ন
কালবৈশাখীর তাণ্ডবে লণ্ডভণ্ড কৃষকের স্বপ্ন
অপ্রত্যাশিত বৃষ্টিতে ​দেশের কৃষি খাতের ওপর দিয়ে বয়ে যাচ্ছে এক ভয়াবহ বিপর্যয়। একদিকে ভারত থেকে আসা আকস্মিক পাহাড়ি ঢল, অন্যদিকে দেশজুড়ে চলমান কালবৈশাখী ঝড় ও অতিবৃষ্টি—এই ত্রিমুখী সংকটে দেশের বিস্তীর্ণ এলাকার বোরো ধান এখন পানির নিচে। বিশেষ করে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের হাওরাঞ্চলসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় পাকা ও আধাপাকা ধান হারিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন লাখো কৃষক। কৃষি অর্থনীতিবিদরা আশঙ্কা করছেন, এর ফলে চলতি মৌসুমে জাতীয় খাদ্য উৎপাদনে ১০ শতাংশ পর্যন্ত ঘাটতি দেখা দিতে পারে।

হাওরাঞ্চলে হাহাকার: কোমর পানিতে ডুবছে 'সোনার ফসল'

​দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সুনামগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ, নেত্রকোনা ও মৌলভীবাজারের হাওর এলাকা এখন কার্যত এক বিশাল জলরাশি। কয়েক দিন আগেও যে মাঠে ধান কাটার উৎসব চলছিল, সেখানে এখন শুধুই বিষাদ ও হাহাকার। তার ওপর ভারতের মেঘালয় ও চেরাপুঞ্জিতে ভারী বৃষ্টির ফলে নেমে আসা ঢলে নদ-নদীর পানি হু হু করে বাড়ছে।

​সুনামগঞ্জ: এখানে গত ২৪ ঘণ্টায় পানির উচ্চতা বেড়েছে ৫০ সেন্টিমিটার। অধিকাংশ হারভেস্টার মেশিন এখন অকেজো, কারণ জমি পানির নিচে। শ্রমিক সংকটের কারণে কৃষকরা সপরিবারে বুক সমান পানিতে নেমে ধান কাটার আপ্রাণ চেষ্টা করছেন।

​কিশোরগঞ্জ: ইটনা, মিঠামইন ও অষ্টগ্রামের হাওরে প্রায় ২ হাজার ৩১ হেক্টর জমি ইতোমধ্যে তলিয়ে গেছে। জলাবদ্ধতার কারণে কাটা ধান নিয়ে পরিবহনেও পোহাতে হচ্ছে চরম দুর্ভোগ।

​মৌলভীবাজার: জুড়ি নদীর পানি বিপৎসীমার ১১৫ সেমি ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এ জেলার প্রায় ৮৯৭ হেক্টর বোরো আবাদ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

​কালবৈশাখীর তাণ্ডবে লণ্ডভণ্ড উত্তরাঞ্চল ও কুমিল্লা

​শুধুমাত্র বন্যা নয়, ঝোড়ো হাওয়া ও শিলাবৃষ্টিতে দেশের অন্যান্য অংশেও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।

​দিনাজপুর ও বীরগঞ্জ: দিনাজপুরের বীরগঞ্জে শত শত একর ভুট্টা ও বোরো ধান মাটির সাথে মিশে গেছে। আমের মুকুল ও লিচুর ফলন শিলাবৃষ্টিতে ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

​কুমিল্লা: কালবৈশাখীর ভয়াবহ থাবায় প্রায় ৩ হাজার হেক্টর জমির ফসল নষ্ট হয়েছে। এর মধ্যে ১,৭৩৩ হেক্টর ধান এবং ৫৫০ হেক্টর ভুট্টা রয়েছে। ঝড়ে কুমিল্লার ১৭টি উপজেলাতেই বিদ্যুৎ সরবরাহ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে; পল্লী বিদ্যুতের প্রায় ৭১টি খুঁটি উপড়ে পড়ে আছে।

​ব্রাহ্মণবাড়িয়া (নবীনগর): এখানে ১৫১ হেক্টর বোরো ধান ও ২০ হেক্টর তিল খেত মাটির সঙ্গে মিশে গেছে। কৃষকরা বলছেন, ধান ডুবে যাওয়ায় এখন কাটার খরচও উঠবে না।

​দক্ষিণাঞ্চল ও সাভারের চিত্র

​বরিশালে টানা বৃষ্টিতে কাটা ধান মাঠেই পচে যাচ্ছে। সমুদ্রবন্দরে ৩ নম্বর সতর্ক সংকেত থাকায় কৃষকরা ধান শুকাতে পারছেন না। এদিকে সাভারের বিরুলিয়া এলাকায় বিখ্যাত 'গোলাপ গ্রাম'গুলোতেও আঘাত হেনেছে বৈশাখী ঝড়। যেকারণে গোলাপ বাগান ও সবজি খেত লণ্ডভণ্ড গেছে। স্থানীয় সবজি ও ফুল চাষিরা বড় ধরনের আর্থিক লোকসানের মুখে পড়েছেন।

​প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণা ও সরকারের পদক্ষেপ

​বর্তমান পরিস্থিতিতে সরকার কৃষকদের পাশে থাকার অঙ্গীকার করেছে। জাতীয় সংসদে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এই প্রাকৃতিক বিপর্যয় নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তিনি ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের জন্য টানা তিন মাস সরকারি সহায়তা এবং দ্রুত ত্রাণ ও পুনর্বাসন কার্যক্রম জোরদার করার নির্দেশ দিয়েছেন।
​কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের পরিচালক ওবায়দুর রহমান মণ্ডল জানিয়েছেন:
​মাঠ পর্যায়ে তদারকি জোরদার করা হয়েছে। ​জরুরি ভিত্তিতে ড্রায়ার মেশিন সরবরাহ করা হচ্ছে যাতে ভেজা ধান দ্রুত শুকানো যায়। ​যেখানে সম্ভব হারভেস্টার ও রিপার মেশিন দিয়ে দ্রুত ধান কাটার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।

​অর্থনীতিবিদদের সতর্কতা ও উৎপাদন ঘাটতির শঙ্কা

​কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. জাহাঙ্গীর আলম মনে করেন, বোরো ধান থেকেই দেশের প্রায় ৫৪ শতাংশ চাল আসে। হাওরের এই বিপর্যয় জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তায় বড় ধরনের সংকট তৈরি করবে। তিনি বলেন, "জ্বালানি ও সারের চড়া দামের কারণে এবার উৎপাদন খরচ এমনিতেই বেশি ছিল। তার ওপর এই ক্ষতি কৃষকদের মেরুদণ্ড ভেঙে দেবে।"

​তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, মার্কিন কৃষি বিভাগের (USDA) পূর্বাভাস অনুযায়ী ধান উৎপাদন ঘাটতি ৭.৫ শতাংশ হওয়ার কথা থাকলেও, বর্তমান পরিস্থিতিতে তা ১০ শতাংশ ছাড়িয়ে যেতে পারে। তিনি সরকারকে কৃষকদের জন্য জরুরি 'প্রাইস সাপোর্ট' বা মূল্য সহায়তা দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।

​আবহাওয়া পূর্বাভাস: কবে থামবে বৃষ্টি?

​আবহাওয়াবিদ ড. বজলুর রশিদ জানিয়েছেন, এই বৈরী আবহাওয়া ৪ মে পর্যন্ত অব্যাহত থাকতে পারে। পশ্চিমা লঘুচাপের কারণে বজ্রপাত ও শিলাবৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েই গেছে, যা কৃষকদের দুশ্চিন্তা আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।
​এক নজরে ক্ষয়ক্ষতির পরিসংখ্যান (প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী):
জেলা/অঞ্চল ক্ষতিগ্রস্ত জমি ক্ষতিগ্রস্ত ফসল ও সম্পদ
কিশোরগঞ্জ ২,০৩১ হেক্টর বোরো ধান (ইটনা, মিঠামইন, অষ্টগ্রাম)
কুমিল্লা ৩,০০০ হেক্টর ধান, ভুট্টা, আউশ বীজতলা ও বিদ্যুৎ লাইন
মৌলভীবাজার ৮৯৭ হেক্টর বোরো ধান, আউশ বীজতলা ও কাঁচা ঘরবাড়ি
ব্রাহ্মণবাড়িয়া ১৫১ হেক্টর বোরো ধান, সবজি ও তিল খেত
সুনামগঞ্জ প্রায় ৭০% বোরো ধান (পাহাড়ি ঢলে নিমজ্জিত)
দিনাজপুর ব্যাপক ভুট্টা, লিচু, আম ও টমেটো
সাভার উল্লেখযোগ্য গোলাপ বাগান ও সবজি

কৃষকদের বর্তমান দাবি

​বিপর্যস্ত কৃষকদের দাবি, অধিকাংশ কৃষকদের ফসল উৎপাদনের ক্ষেত্রে লোন করতে হয়। তাই শুধু তিন মাসের সহায়তা নয়, বরং কৃষি ঋণের কিস্তি স্থগিত করা এবং পরবর্তী মৌসুমের জন্য বিনামূল্যে বীজ ও সার সরবরাহ নিশ্চিত করা হোক। যেন কৃষকরা এই আর্থিক ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে পারে। কেননা পচে যাওয়া ধানের দুর্গন্ধ আর আর্থিক ক্ষতির হিসেবে দেশের অন্নদাতাদের চোখে এখন শুধুই জল। তাই এই অন্নদাতাদের সংকটে সরকারকেই অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে।

প্রকৃতির এই রুদ্ররূপ মোকাবিলা করা মানুষের হাতে নেই, তবে সঠিক সময়ে সঠিক ব্যবস্থাপনা এবং ড্রায়ার মেশিনের মতো প্রযুক্তির ব্যবহার ক্ষয়ক্ষতি কিছুটা কমিয়ে আনতে পারত। এখন দেখার বিষয়, সরকারের ত্রাণ সহায়তা কত দ্রুত প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের হাতে পৌঁছায়।
​জনগণই রাষ্ট্রের মালিক: জণগণকে দেওয়া ওয়াদা বাস্তবায়ন করতে চায় বিএনপি সরকার
আরও পড়ুন →