![]() |
| হজ ফ্লাইটের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান |
এ বছর বাংলাদেশ থেকে প্রায় সাড়ে ৭৮ হাজার ধর্মপ্রাণ মুসলমান হজের উদ্দেশ্যে সৌদি আরব পাড়ি জমাচ্ছেন। সরকারের পক্ষ থেকে বাংলাদেশ অংশেই সৌদি আরবের ইমিগ্রেশন সম্পন্ন করার মতো যুগান্তকারী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, যা হজযাত্রীদের ভোগান্তি লাঘবে সহায়ক হবে।
অব্যবস্থাপনার কালো ছায়া থেকে মুক্তি চান হাজিরা
তবে প্রধানমন্ত্রীর এই আন্তরিক উদ্বোধনের আবহেও দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত অনিয়ম, প্রতারণা এবং অব্যবস্থাপনার কালো ছায়া হজযাত্রীদের মনে এখনো শঙ্কা জমে আছে। মাঠ পর্যায়ের তথ্যানুসন্ধানে দেখা গেছে, সমস্যার শুরু হয় দেশ থেকেই।২০২৫ সালের এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, ৯টি অসাধু এজেন্সি সময়মতো বাড়ি ভাড়া ও পরিবহন চুক্তি না করায় প্রায় ১০ হাজার মুসল্লির যাত্রা শেষ মুহূর্তে অনিশ্চিত হয়ে পড়েছিল। অনেক এজেন্সি হজযাত্রীদের কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ টাকা নিয়েও সময়মতো টিকিট করতে ব্যর্থ হয়, যা ধর্মপ্রাণ মুসলিমদের সরল বিশ্বাসের ওপর এক চরম আঘাত।
প্যাকেজ মূল্যের অস্বচ্ছতা ও হাজিদের ভোগান্তি
অনিয়ম ও প্রতারণার সবচেয়ে বড় জায়গা হলো প্যাকেজ খরচের অস্বচ্ছতা। প্রতি বছর বিমান ভাড়া অস্বাভাবিক হারে বাড়িয়ে প্যাকেজ মূল্য প্রায় ৭ লাখ টাকার কাছাকাছি নিয়ে যাওয়া হয়। কিন্তু হজের এই মোটা অঙ্কের টাকা জমা দেওয়ার পরও সৌদি আরবে গিয়ে হাজিরা দেখেন ভিন্ন চিত্র।অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, দূর্নীতি করতে হারম শরীফ থেকে অনেক দূরে এবং খুবই নিম্নমানের হোটেলে তাদের রাখা হয়। চুক্তিতে এসি রুম বা ভালো মানের খাবারের কথা থাকলেও বাস্তবে তীব্র গরমের মধ্যে জরাজীর্ণ কক্ষে গাদাগাদি করে থাকতে হয়। বিশেষ করে মিনা ও আরাফাতের ময়দানে আবাসন সংকট চরম আকার ধারণ করে।
এসি ছাড়া তাঁবুতে রাত কাটানো, পর্যাপ্ত শৌচাগারের অভাব এবং যাতায়াতের জন্য বাসের সুব্যবস্থা না থাকায় মাইলের পর মাইল পথ তপ্ত বালুর ওপর দিয়ে হাঁটতে হয় বৃদ্ধ ও অসুস্থ হাজিদের। ফলে অনেক হাজিরা অসুস্থ হয়ে পড়েন। এমনকি মৃত্যুর ঘটনা পর্যন্ত ঘটে।
এবারের হজ যাত্রায় কি দালাল চক্রের দৌরাত্ম্য কমবে?
প্রতারণার আরেকটি ধরণ হলো মধ্যস্বত্বভোগী বা দালালদের দৌরাত্ম্য। অনেক সাধারণ মানুষ গ্রামের মোয়াল্লেম বা দালালের মাধ্যমে টাকা জমা দিয়ে প্রতারিত হন। সৌদি আরবে গিয়ে তারা দেখেন তাদের জন্য কোনো গাইড বা মোয়াল্লেম নেই। পথ হারিয়ে ফেলা, খাবারের অভাবে অনাহারে থাকা কিংবা অসুস্থতায় সঠিক চিকিৎসা না পাওয়া এখনকার হজ ব্যবস্থাপনার নিয়মিত চিত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে।২০২৪ সালে তীব্র গরমে (প্রায় ৫০° সেলসিয়াস) অনেক হাজির মৃত্যু এবং নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা বিশ্ব বিবেককে নাড়িয়ে দিয়েছিল। সৌদি সরকারের নিয়ম না মেনে অতিরিক্ত লোক প্রবেশ করানোর ফলেও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়, যার দায়ভার অনেকাংশেই অসাধু এজেন্সিগুলোর ওপর বর্তায়।
আইন প্রয়োগ ও ডিজিটাল মনিটরিং
এই অসহনীয় পরিস্থিতি থেকে উত্তরণ এবং হজযাত্রীদের পূর্ণ সন্তুষ্টি নিশ্চিত করতে হলে কঠোর প্রশাসনিক ব্যবস্থা জরুরি। 'হজ ও ওমরাহ ব্যবস্থাপনা আইন, ২০২১' এর কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করে যেসব এজেন্সি চুক্তি ভঙ্গ করবে বা হাজিদের সাথে হয়রানি মূলক আচরণ করবে, তাদের লাইসেন্স স্থায়ীভাবে বাতিল ও জরিমানা করতে হবে।বিমান ভাড়ায় স্বচ্ছতা আনতে প্রতিযোগিতামূলক বাজার উন্মুক্ত করা এবং প্রতিটি প্যাকেজের পুঙ্খানুপুঙ্খ ব্যয় বিবরণী হাজিদের হাতে তুলে দেওয়া প্রয়োজন। এছাড়া প্রতি ৪৪ জন হাজির জন্য একজন দক্ষ গাইড নিয়োগ, জিপিএস চালিত আধুনিক বাস সার্ভিস এবং মিনা-আরাফাতে পর্যাপ্ত শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত তাঁবুর নিশ্চয়তা দিতে হবে। হাজিদের স্মার্ট কার্ড ও বিশেষ অ্যাপের মাধ্যমে ডিজিটাল মনিটরিং করা হলে পথ হারানোর ভয় থাকবে না।

