![]() |
| ইমাম মাহাদীর সাথে দেখা করতে গিয়ে নিখোঁজ ২ তরুণী সহ তিন জন |
যেভাবে ঘটনার সূত্রপাত
নিখোঁজ ব্যক্তিরা হলেন—ওয়াহাব মন্ডল, তার মেয়ে নুসরাত জাহান এবং মেয়ের বান্ধবী রুকাইয়া তৃষা। ঘটনার দিন গত ৮ ফেব্রুয়ারি ওয়াহাব মন্ডল তার মেয়ে ও মেয়ের বান্ধবীকে নিয়ে বাড়ি থেকে বের হন। প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, নিখোঁজ হওয়ার কিছুক্ষণ আগে তারা একটি ধানক্ষেতে দীর্ঘক্ষণ শলাপরামর্শ করেন এবং এরপরই ব্যাগ গুছিয়ে এক কাপড়ে ঘর ছাড়েন।পরিবার সূত্রে জানা গেছে, নিখোঁজ হওয়ার আগের রাতে নুসরাত জাহান তার মাকে জানিয়েছিলেন যে, তিনি স্বপ্নে হযরত মুহাম্মদ (সা.) এবং ইমাম মাহাদীকে দেখেছেন। ইমাম মাহাদী তাকে সাক্ষাতের ডাক দিয়েছেন—এমনটি বিশ্বাস করেই তারা অজানার উদ্দেশ্যে পাড়ি জমান।
এই ঘটনার পেছনে পরিবারের সদস্যরা চুয়াডাঙ্গার জীবননগরের এক কবিরাজ লস্কর মন্ডলকে দায়ী করছেন। ভুক্তভোগী পরিবারের দাবি, অসুস্থতার চিকিৎসা নিতে গিয়ে ওই কবিরাজের সাথে তাদের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। নিখোঁজ হওয়ার পর ওই কবিরাজ আশ্বাস দিয়েছিলেন যে, তারা কুমিল্লায় আছেন এবং শিগগিরই ফিরে আসবেন। তবে পরবর্তীতে তিনি এই অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, চিকিৎসার বাইরে তাদের সাথে আর কোন যোগাযোগ নাই।
একই ঘটনা কেন বারবার ঘটছে?
ইমাম মাহাদীর আগমনের কথা বলে বা ধর্মীয় উন্মাদনা ছড়িয়ে নিরুদ্দেশ হওয়ার ঘটনা বাংলাদেশে এবারই প্রথম নয়। এর আগেও এমন বেশ কিছু আলোচিত ঘটনা ঘটেছে:২০২০ সালে সৌদি আরবে ইমাম মাহাদীর সন্ধানে গমন
২০২০ সালের জুলাই মাসে খবর এসেছিল যে, একটি নির্দিষ্ট উগ্রপন্থী মতাদর্শে বিশ্বাসী একদল বাংলাদেশি যুবক ইমাম মাহাদীর 'বায়াত' গ্রহণ করতে সৌদি আরবের উদ্দেশ্যে দেশ ছাড়ে। এদের অনেকেই তথাকথিত 'হিজরত' করার কথা বলে ঘর ছেড়েছিল। পরে তাদের বড় একটি অংশ আন্তর্জাতিক মানবপাচারকারী চক্রের খপ্পরে পড়ে বলে সংবাদ প্রচার হয়।ধর্মীয় দূর্বলতাকে পুঁজি করে কি এমন ঘটনার সূত্রপাত?
অতীতে দেখা গেছে, অনেক নিষিদ্ধ ঘোষিত চরমপন্থী সংগঠন তরুণ প্রজন্মকে বিপথে নিতে 'ইমাম মাহাদীর আগমন' এবং 'গাজওয়াতুল হিন্দ' এর মতো বিষয়গুলোর ভুল ব্যাখ্যা দেয়। অনেক ক্ষেত্রে দেখা গেছে, যারা এভাবে ঘর ছাড়ে, তারা প্রকৃতপক্ষে কোনো ধর্মীয় উদ্দেশ্যে নয়, বরং মগজ ধোলাইয়ের শিকার হয়ে কোনো নির্দিষ্ট এজেন্ডা বাস্তবায়নে ব্যবহৃত হয়।অতীতে এ ধরনের নিখোঁজ ব্যক্তিদের অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দুর্গম সীমান্ত এলাকা বা জঙ্গিবাদী আস্তানা থেকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী উদ্ধার করেছে। অনেক ক্ষেত্রে দেখা গেছে, 'ধর্মীয় স্বপ্ন' দেখার বিষয়টি ছিল স্রেফ পাচারকারী দলের সাজানো নাটক।
পুলিশের তদন্ত ও ডিজিটাল ফুটপ্রিন্ট
কুষ্টিয়া মডেল থানা পুলিশ জানিয়েছে, নিখোঁজ ব্যক্তিরা কোনো মোবাইল ফোন ব্যবহার করছেন না, যা তদন্তের কাজকে আরও জটিল করে তুলেছে। তবে ডিজিটাল ফরেনসিকের মাধ্যমে তাদের হোয়াটসঅ্যাপ এবং মেসেঞ্জার অ্যাক্টিভিটি ট্র্যাক করার চেষ্টা চলছে। সীমান্তবর্তী জেলা হওয়ায় এই ৩ জন পাচারকারী চক্রের খপ্পরে পড়ে সীমান্ত পার হয়েছেন কি না, সেই আশঙ্কাও উড়িয়ে দিচ্ছেন না বিশেষজ্ঞরা।সমাজকর্মী ও বিশেষজ্ঞদের উদ্বেগ
জেলার মানবাধিকার কর্মীরা বলছেন, বর্তমানের তথ্যপ্রযুক্তির যুগে 'স্বপ্নে দেখা' বা 'ফকিরাতন্ত্রের' দোহাই দিয়ে নিখোঁজ হওয়া অত্যন্ত উদ্বেগের। এটি কেবল অন্ধবিশ্বাস নয়, এর পেছনে বড় কোনো সংঘবদ্ধ অপরাধী চক্র থাকতে পারে যারা ধর্মীয় আবেগকে পুঁজি করে মানুষদের গুম বা পাচার করছে।ধর্মীয় হিজরত ও রহস্যময় নিখোঁজের বৈশ্বিক ও স্থানীয় পরিসংখ্যান
| সাল | অবস্থান | ঘটনার ধরণ | ফলাফল |
|---|---|---|---|
| ২০২০ | বাংলাদেশ (ঢাকা ও অন্যান্য) | ১৭ জন যুবক ইমাম মাহাদীর অনুসারী হওয়ার জন্য সৌদি আরব যাওয়ার উদ্দেশ্যে ঘর ছাড়ে। | আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তাদের বড় একটি অংশকে সীমান্ত এলাকা থেকে আটক করে। |
| ২০১৫-১৬ | বিশ্বব্যাপী (ইউরোপ ও এশিয়া) | কয়েক হাজার তরুণ-তরুণী তথাকথিত 'খেলাফত' বা ধর্মীয় রাষ্ট্রে যোগ দিতে ঘর ছাড়ে। | এদের একটি বড় অংশ তুরস্ক সীমান্তে নিখোঁজ হয় বা যুদ্ধে প্রাণ হারায়। |
| ২০১৯ | ভারত (কেরালা) | ১১ জনের একটি পরিবার ইমাম মাহাদীর আগমনের কথা বলে দেশ ত্যাগ করে ইয়েমেনে যাওয়ার চেষ্টা করে। | আন্তর্জাতিক গোয়েন্দা সংস্থা তাদের পাচারকারী চক্রের হাত থেকে উদ্ধার করে। |
| ২০২২ | বাংলাদেশ (কুমিল্লা) | 'হিজরত' এর নামে ৫ কলেজ ছাত্রসহ বেশ কয়েকজন তরুণের রহস্যজনক নিখোঁজ হয়। | র্যাব তাদের পাহাড়ি এলাকার প্রশিক্ষণ ক্যাম্প থেকে উদ্ধার করে। |

